Skip to main content

Full text of "Parampurush Sri Sri Ramkrishna Vol. 2 Ed. 3rd"

See other formats


চা 








বিযানির জু 2০৯ 5 নল চা রি এ 
০.৯ 2 ॥ সন ও ৮৯ সু এ ০১9 নিন ন্‌ 
হজ 
্ 
রী 


' ৮ ০৯ খু. 





গু 
ক, হা ৮ কত 
শি আস ০০ পা ্ধ * ৮ 1 ক সশ 
হ 

শি শি ঞ& - চা ল রি 
রঙ ্ রহ 
৮ রী এ হর লু 
চা এ হু + ঃ ন্‌ * টি 
রর চা লী সী, রঙ ৫ 
চর হর সুপ ২ মিশর ৯৮ চালে হি ৫ 


১ 1১011১217 


চা] রে ূ ১ 
না ৫ এটি /« 
“িস্য 'বাঁষেণ কাতিনো বয়ং চ তুবর্মানি চ। 
ৃ - ৯১ চ। 
১১১৮: 
ৃ ১ ॥ ৮১ 


সতে আমরা ও সমুদয় কাছ | 


“শ্রীরাম ভারতবর্ষের সমগ্র অতত ধর্ম. 
বর আকার সদ কে 
নমস্কার করবে সে সেই মূহ্‌তে সোনা হয়ে: 
যাবে ।”-স্যালী বিবেকানন্দ সি 


বৈশাখ ১৩৬৪ 


. লেট প্রেস 
১০২ একাগিন রোড 
কলকাতা ২০ 


_ সতাঙগিৎ রায় 


প্রভাতচগ্দর রায় 
প্রীশোরাঙ্গা প্রেস প্রাইভেট লিঃ 
৫ চিন্তামাণ দাস লেন 

হাব ও -প্রচ্ছদপট মদ্ুক 
গসেন এণ্ড কোম্পানি 
1১ গ্রাশ্ট লেন 

কাগজ সরবরাহ 
রঘ্মনাথ দত্ত এণ্ড সনস- লিঃ 
৩২এ ম্নেযোন" রোড 


রূপম লিমিটেড 

6 ঈনউ বউবাজার লেন 
থাই 

২৬১৯ মির প্রি 

"ধ্বস্ব সারাক্ষিত . 


॥৭%. & ও রা ৫ হয /+ র 
' চক হাগাবতে জগ সন আহা 





প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় যা 'লিখোঁছ দ্বিতীয় খশ্ডেরও সেই কথা । 'দয়াশলাই জেলে 
সূর্যকে দেখানো যায় না, কিল্তু গৃহকোথে পৃজার প্রদশপাঁট হয়তো জ্বালানো বায়। 
আমার এ বই শুধু সেই দীপ-জবালানো পুজা, দীপ-জবালানো আরাতি। 
এ বইয়ে যত তথ্য সংগৃহীত হয়েছে সবই কোনো না কোনো পূর্বালখিত প্রাসম্ধ 
গ্রল্থ থেকে আহৃত। কোনো তথ্যই আমার কপোলকজ্পনা নয়। 
বাক্য ঈশ্বরের বিভূতি, কিন্তু ঈশ্বর আবার সমস্ত বাক্যের অভীত। অথচ বচন 
ছাড়া সে অনিরচনীয়ের আভাস আনি কি করে? শব্দ ছাড়া কি করে বোঝাই 
আমার কান্না? কিল্তু সব সময়ে ভয়, বাক্য বুঝি আন্রণ না হয়ে আবর্জনা হয়ে 
উঠল! আর, আভরণ হলেই বা কি, আভরণ দিয়েই কি র্‌প বোঝানো যায়? বর্ণ 
দিয়ে কি বোঝানো যায় অবর্ণনীয়কে ১ তবু ভয়, এই বুঝি মাহমাম্বতকে খর্ধ 
করে ফেললাম! 
কিন্তু ভগবানকে ছোট কাঁর এমন আমাদের সাধ্য কি! তিনি নিজের থেকেই ছোট 
হয়েছেন ভন্তের জন্যে। শ্রীরামকুফ বলেছেন, ভন্তের কাছে ঈশ্বর ছোট হয়ে ধান, 
যেমন ঠিক অরুণোদয়ের সূর্য । তিনি ছোট না হলে তাঁকে ধার কি করে? মধ্যাহের 
সর্ষের তেজে চোখ যে ঝলসে যাবে। ধরা দেবার জন্যে তিনি স্বেচ্ছায় ছোট হয়েছেন। 
সুলভ হয়েছেন আমরা দুবল বলে। সমকোমল হয়েছেন যেহেতু আমরা ভঙ্গুর । 
রন্ত হয়েছেন যেহেতু আমরা 'নিঃসম্বল। বললেন শ্রীরামকৃফ, ভক্তের জন্যে ভগবানের 
নরম ভাব হয়ে যায়, তিনি এশবর্ধ ত্যাগ করে আসেন।, 
তিনি তো খাজনা আদায় করতে আসেনান, তান প্রেম ভিক্ষা করতে এসেছেন। 
বালগোপাল হয়ে এসেছেন ননী ভিক্ষা করতে । তাই দয়ারের ধাইয়ে ফেলে 
এসেছেন তাঁর প্রতাপের রাজমুকুট, তাঁর অশ্র্ষের সাজসজ্জা । প্রবপ্ডিতের বন্ধ 
বলে নিম্কিষ্ন হয়ে এসেছেন। রাজ্োষ্বর় হয়ে ফিরছেন কাঙালের মত। 'এরে, 
কেউ চিনলি না রে, বললেন শ্রীরামকৃফ : 'সে পাগলের বেশে ধন হান 
কাঙালের বেশে ফিরছে জীবের ঘরে-বরে। যে কাঙাল তার কদ আর আছে মে 


[কেড়ে নেব? 


যি তাঁর বেন িয়?' বলেন ভীরামযাক : 'খোল দিয়ে জায মেন গর প্রিয়? 
দেখতে হাথে জাধে খোল দেশানো হল কিনা। বাক্যের মধ্যে তাল্ডারকতা 
আছে কিনা। ডাকের ঘধ্যে আছে কিনা অন্তরলাতার গর নিমলণের গে আছে 
কিনা আতিখেয়তার আম্ছাদ। 








ঈবসংযাদ-স্ণলপ।.. চবাক্ষরে। সমস্ত অঙ্ধকায়ে জবলুক এই প্রার্থনার দপাশিধা। 


$ই ফামগনে ১৩৫৯ ০৩ 





শঃ 
চড় শক, 





নি দ 7৪৮০৭ দার দস 


নি 





শ্এ 








। সম রটি রা 








নি আম খাল 
শিপ আ এত পা পজ  শির 


পরমপুর;য শ্রীপ্রীরামকৃষঃ 


খন্ড 





সমস্ত সাধনার হাতি করে দিলে রামকৃফ। 

আর পাখা চালিয়ে কী হবে? দক্ষিণ থেকে চলে এসেছে মলয় হাওয়া। আর 
কণ' হবে দাঁড় টেনে ? ব্যাক কাটিয়ে অনুকূল বায়তে পাল তুলে দে নৌকোর। 
সাধনের প্রথম অবস্থাতেই খাটনি। তার পরে পেনসন। প্রথমে র্সাড় ভাঙা, 
পরে পাহাড়ের চূড়ায় পরেশনাথের মান্দির। 

িদ্ধি-সিম্ধ বললে কি হয়? 'সাম্ধ গায়ে মাথলেও নেশা হয় না। খেতে হয় 
একটু । দুধে মাখন আছে বললেই কি মাখন হবে? দুধকে দই পেতে মম্ধন 
করো নিজনে। 

'হাঁরসে লাগি রহ রে ভাই। তেরা বনত বনত বনি যাই।' 

হারতে লেগে থাকো । লেগে থাকতে-থাকতেই হার হয়ে যায়ে। বঙ্গতে-বলতেই 
হরি বনে যাবে। 

রামকৃফ হরি হয়ে গেছে । যে আছে সে-ই হয়েছে। এই হওয়া অর্থ থাকাটিকেই 
প্রকাশিত করা। এর পর আবার সাধন কি? 

বাউল বৈষবরা বলে, সাই । 'সহিয়ের পর আর কিছু নাই। 

রামকৃফেরও আর কিছ নেই। রামকৃফের পরেও আর কিছু নেই। 

বৈকব বাউলরা একেই বলে সহজ অবস্থা । সহজ অবস্থার দুটি লক্ষপ। প্রথম, 
কৃষগন্ধ গায়ে নেই। তার মানে ঈশ্বরের ভাব অন্তয়ে ওতপ্রোত, বাইয়ে কোনো 
পিহ নেই, মুখে হারনাম পঞ্তি বলছে না। আর 'দ্বিতীর, পন্মের উপয়ে আলি 
বসবে অথচ মধ খাবে না। তার মানে, 1ঞ৩৩-্৪ কামস্ফাগানে ষ্গছো সেই। 
রামকৃষের এখন সেই সহজ অবস্থা । 

অনেক পিত্ত জমলে ন্যাবা লাগে, তখন চার 'দিকে হঙ্দে দেখায়। অনেক ভাতা 
জমলে মধ্‌ লাশে, তখন চার দিক হি দেখায়। শ্রীমতণ যখন শ্যামকে বলে, 
সমস্ত শ্যামময় দেখলে । আর নিজেকেও শ্যাম বোধ হল। রামকুফ সমস্য খিজ্ব 
ঈত্বরময় দেখল, দেখল দেও ঈশ্বর । পারার ছুদে শিশে অনেক দিন থাকলে শে 
পারা হয়ে যায়। রামড়ক ভগবানের মধো আচ্ছার হয়ে থেকে ভগবান হয়ে গেগ। 
কমে পোকা ভাবতেন্ভারতে আরশুলা নিশ্চল হয়ে যাক, নড়ে না, শেষে তাকে 
আগ্তে-আস্তে কুষুরে *পোকাই হতে হয়। রামকফ জহর ভাবতেভাবতে জহর হয়ে 
' গেল। বে নিরাকার ছিগ সে হয়ে দাঁড়াল নরাকার। 

৯৫৪৮) 





(রাহ, সাধন ভজন 'কি। হরি আবার কবে ফুরিনাম কুরে! 
১১১ নেমেছে ভার আবার জঙ্গল কিসেন্ব$.. 

খোলা নামবে কখন? এক জন বাউল এসেছে রারকের কাছে রাম 
তাকে শুধোল : 'তোমার খোলা নেমেছে ?+ 7 

বাউল তাকিয়ে রইল অবাক হয়ে? ৫ 

খাল রসের কাজ সব শেষ হরে গেছে? ধত জনাল দেবে তত “রেফাইন” হবে 
রস। প্রথম আকের রস, পরে গড়, পরে দোলো, পরে 'চান--তার পর 'মছাঁর-_ 
কিন্তু, জিগঞ্গেস কার, খোলা নামবে কখন ? অর্থাৎ সাধন কবে শেষ হবে? 
বাউল শুনতে লাগল মল্মমশ্ধের মত। 

যখন ইন্দিয় জয় হবে। তার আগে নয়। যেমন জোঁকের উপর চুম দিলে জোঁক 
আপাঁন খুলে পড়ে যায় তেমান শাথিল হয়ে যাবে হীল্দ্িয়। তার আগে নয়। 
জবাল নিভিয়ে খোলা, নামিয়ে বসে আছে রামকফ। সে এখন আকাশের মৌন। 
সমুদ্রের শাল্তি। ধাঁরন্রীর সমর্পণ । 

গুকার ধন্দ, আত্মা শর আর ব্রহন লক্ষ্য। নির্ভুল চোখে লক্ষ্য ভেদ করতে হবে, 
তার পর তণরের মুখে লক্ষ্যের সঙ্গে তন্ময় হতে হবে। প্লহনতল্লক্ষামূচ্যতে। 
ণকল্তু জানিস, তাঁকে যখন লাভ হয়, তখন আর শু উচ্চারণ করবারও যো নেই। 
সমাধি থেকে অনেক নিচে নেমে না এলে ওঁ বলতে পারি না।' 

শাস্লে যেমন বলা আছে তেমান দর্শন হয় রামকৃফের। কখনো দেখে জগত্ময় 
আগানের প্ফ্যলিষ্গ। কখনো দেখে চার দিকে যেন পারার হুদ ঝকঝক করছে। 
কখনো বা গাঁলত রুপোর ম্লোত। কখনো বা গ্রহতারায় রংমশালের কফুলবাি। 
নীক্িমাভ্রমের উধের্ব কখনো বা অন্তহীন অন্তরীক্ষের শান্রতা। 

রামকৃষ এখন একটি অখণ্ড প্রা্তি, একাঁটি অখণ্ড প্রত্যুন্তর। 

এক্কাঁট আকাশাবস্তীর্ণ প্রশান্ত স্তথ্খতা। 

কিচ্ছু ব্রহন্ন নিয়ে আমি কতক্ষণ থাকব? ছাদে উঠে আবার সিপড়তে নামা । কখনো 
লীলায় কখনো নিত্যেষেন ঢেশকর পাটে ওঠা-নামা করাছ। এক দিক নিচু 
হয় তো আরেফ দিক লাফিয়ে ওঠে। যোদকে তাকাই সোঁদকে তান। অন্তর্খে 
সমীধস্ধ হয়ে আছ তখনো তান, বাহিমখে জবজগৎ নিয়ে আছি তখনো 
1তাঁন। ঘখন আয়াশর এ পিঠ দেখাঁছ তখনো তান, আবার যখন উলটো শিঠ 
দেখাছ তখনো 'তীন। | 

পক হয়ে আছ, দতান। জীব হয়ে আছ, তান 

তুষের দ্বারা আর্ত .থাকলেই ধান্য, তুষ থেকে মুক্ত হলেই তণ্ডুল। জণবে-শিবে 
ভেদ নেই। ডেদ হচ্ছে ভ্রান্তির ফল। কোরকে ধেমন পৃঙ্পভাব, প্রস্ফরটিত 
 প্হক্পেও তেমাঁন কোরকাক। ঈশ্বরে যেমন জদ্বভাব, জগীবে তেমাঁস ই্বরভার। 
গকন্তু যাই বলো বাগ: বনার্বকল্প ব্রহন্ন হয়ে বসে খাকতে পারব না। বালকের 
মতন থেকেছি, থেকোছি উন্মাদের মত। কখনো জড় হয়েছি,” কখনো পিশাচ? 
ত্বারপর জাবার নিত্য থেকে চলে এসেছি লীলায়। রামজালাকে কোলে 'নয়ে 
1. 


বোঁ়রেছি, নাইর়েছি-ধাইয়েছি। হনযান সেজে গাছে উঠে বসো, জালড-ছাল্ত 
“ফল খেয়োছি। তারপর শ্রীমতাঁ হয়ে করম ছয়ে গেলাম। আবার জলা হোল 
নিত্যে মন উঠে গেল। আজা-্রাহ্য রইল না। সজনে তুলসণী সব এক হয়ে গেজ। 
যত ঈষ্বরীয় পট বা ছবি ছিল সব খুলে ফেললাম। হয়ে গেলাম সেই অন্য 
সাচ্চদানন্দ আদি পুরুষ সেই আঁদ যার আর অক্ত নেই। 

সব রকম সাধনই করেছি। তামাসক, রাজসিক আর সাঁতৃক। জয় মা কালী, 
দেখা 'দিবিনে ? দেখা যাঁদ না 'দাব তো গলার ছার দেব। এই হুল তামাঁপক 
সাধন। 

রাজাঁসক সাধনে নানারকম ক্রিয়াকলাপ, অনুজ্ঠানের সমারোহ। এত তাঁর্থ করতে 
হবে, এত পুরশ্চরণ, এত পণ্চতপা! আর সাত্বক দাধনা শাম্তশীলের সাধনা। 
1 ফলাকাঙ্ক্ষা নেই, শুধু নামটি নিয়ে 'নার্নমেষ হয়ে পড়ে থাকো। নাম দদিয়ে-দিয়ে 
কাম ধুয়ে ফেল। 

আর কাম ঘুচলেই মনস্কাম। 

আমারই মতন রুপ কে একজন প্রবেশ করলে আমার মধ্যে। দেহেক্স ঘটপদ্ম ফুটে 
উঠল তার আবির্ভাবে। নিম্নমুখ ছিল, উধ্বমূখ হয়ে উঠল। 

আমি জীবের জন্যে এসোছ জশবের মধ্যেই থাকব । থাকব “ডাইলিউট” হয়ে। 
আমার আপন জন কত আসবে আমার কাছে, কত আহ্যাদের দিন আছে, কত 
ভাবের আস্বাদের দিন। 

গাঁজাখোরকে দেখলে গাঁজাখোরই আহমাদ করে। গায়ে পড়ে কোলাকুলি করে। 
অন্য লোক দেখলে মুখ লুকোয়। গরু আপন জনকে দেখলে গা চাটে, অন্য 
লোক দেখলে ঢ: মারে। 

আমার আপন জন সব বখন আসবে তখন আমাকে আপন ভাষায় কথা বলতে 
হবে। ব্রহন হয়ে বোবা হয়ে থাকলে আমার চলবে কেন? 

পাকা ঘির কোনো শব্দ থাকে না। কিন্তু যখন আবার পাকা ধঘয়ে কাঁচা ল:চ 
পড়ে, তখন একবার কলকল করে ওঠে। কাঁচা লুচিকে পাকা করে জাবার সে 
চপ হয়ে যার। 

এই 'ঘিয়ে পড়বে অনেক কাঁচা ল্চি। তাই একটু কলকল না করে উপায় নেই। 
মৌমাছি ধতক্ষণ ফুলে না বসে ভনভন করে। ফুলে বসে মধ্‌ খেতে আর্ত 
করলে চুপ হয়ে যায়। মধু খেয়ে যখন মাতাল হয় তখন আবার আনন্দে গুনগুন 
করে। 

তাই আমাকে গুনশ্ান করতে গিস। গান গাইতে দিল প্রাণ ভরে। 


পটসম্ধ্যা যে রলে কাল 
পৃজা সন্ধা সে কি চায়? 
সন্ধ্যা তার সম্ঘানে ফেরে 
কড়ু সন্ধি নাছ পায়। 


পরার রর বারা রা রর য় রা 
মিরর রসাল পরকাল রিপার 
ষ্তঞ্ধতায় মহন, আবার শব্দেও ব্রহন। আমাকে াথন একা, শব্দ করতে দে। 
আমার আপন লোকরা সব আসবে, তাদের সলো আমি নত্য করব না? 
ভাগ্েকার লোক বলত, কালাপানিতে জাহাজ গেলে ফেরে না। ওরে, ভয় নেই, 
আমার রিটার্ন টিকিট কাটা আছে। আম বারে-বারে ফিরে-ফির়ে আঁসি। 

হায় পর একবার ডুব দিয়ে ফের ফিরে আস ণন'তে। জানিস না সেই 'কিতুনের 
কাণ্ড? কিত্তুনে প্রথমে গান ধরে “নিতাই আমার মাতা হাতি! নিতাই আমার 
মাতা হাতি! তারপর ভাব যখন জমে, তখন শুধু বলে, ছার্তি! হাতি! তার 
পর কেবল হাতি! শেষকালে 'হা'। বলতে-বজ১.'সমাধি, একদম চুপচাপ 
কিন্তু আমি 'হা'-র পর আবার ণন'তে ফিরে আদি । শোনবার জন্যে তোরা যে 
সব রয়োছস উৎকর্ণ হয়ে। তোদের তৃাঁষিত কর্ণে আমাকে যে নাম দিতে ছবে। 
আমার কি ফাঁক দিলে চলবে? শ্যামগ্বকুরে পেছোঁছ বলে ক আম তৌলপাড়ার 
খবর রাখব না? 

শোন, দুটি ভাব নিয়ে থাকবি। এক দাসভাব, আরেক সম্তানভাব। অহং তো 
আর যায় না, হাজার বিচার করো, ঘুরেফিরে ফের এসে উপক মারে। আজ 
অম্বঙ্থ গাছ কেটে দাও, কাল আবার ফেব্কাঁড় বেরুবে। উপায় কি? উপায় 
হচ্ছে, আমি ভত্ত, আম দাস, আম বালক এই ভাবাঁটি আরোপ করা। মিষ্টি খেলে 
অন্বল হয় কিন্তু মিছারর মিষ্টিতে হয় না। অকামো বিফুকামো বা। (বক, 
কামনা নয়। 

আয় শেষ ভাব, মৃখ্য ভাব- সন্তানভাব। পৃজায় আদ্যাশান্তকে প্রসন্ন করতে না 
পারলে কিছুই হবে না। সেই ব্রহনময়ীর প্রাতমাই তো স্মীজাতি। মাতৃভাবই 
তাই শম্খ ভাব। সে ভাবেই তাদের প্রাণময় আঁভষেক। আর কোনো ভাবে নয়। 
আমি মাতৃভাবেই ষোড়শী পুজা করোছিলাম। দেখলাম স্তন মাতৃস্তন, যোনি 
মাতৃযোনি। 

শ্রীমাকে জগগ্েস করল এক জন ভন্ত : 'মা, আপানি ঠাকুরকে কি ভাবে দেখেন? 
শ্ীমা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকলেন। পরে গম্ভীর মুখে বকালেন, 'লল্তানের 
মত দেখি। 

ওরে এইটিই মহাভাব। 

সারাধসার বস্তু হয়েও ঈষ্বর ভাবর'প ধয়ে রয়েছেন। আমাকেও থাকতে দে 
ভাবাখে। 


'এবার ভালো ভাব পেয়োছ। 
ভবের কাছে পেয়ে ভাব 
ভবীকে ভালো ভুলায়েছি। 





জোন্ঠ মাসে ষোড়শ পূজা হল, আম্বিন কক কার্তকেই সারদা ফিরে গেল কামার- 
পুকুর। শাশ্দাড় বললেন ফিরে যেতে। ভাবের সংসার তো দেখলে এযার একট; 
অভাবের সংসারটা দেখে এস। 

রামেশবর বুঝতে পারছে তার দিন আর বেশি নেই। বাড়ির সামনে একটা আমগ্গাছ 
কাটছে, রামেনবর বললে, ভালোই হল আমার কাজে লাগবে। 

পাঁচ-দাত দিন পরে, অগ্রহায়ণ মাসে, চোখ বৃজল রামেশ্যর। 

গাঁয়ের গোপাল কাছাকাছিই থাকে। রান্নে হঠাৎ তার বাঁড়র দরজায় একটা শব্দ 
হল। 

কে? 

“আম রামেম্ধর।' 

এএত রাশ্রে?, 

'ঙ্গাম্নানে যাচ্ছি। বাঁড়তে রঘ্বীর রইল, তার সেবায় যাতে গোল না হয় 
দেখো ।' 

দরজা খুলতে এগিয়ে গেল গোপাল। 

“দোর খুলে কী হবে? আমার শরণর নেই, আমাকে দেখতে পাবে না।' 

খবর এসে পেশছুল দক্ষিণেশ্বরে। রামকফের ভাবনা ধরল এ দুঃসংবাদ মাকে 
কি করে শোনাই! এ শোক মা সামলাতে পারবেন না। 

সর্বপ্রথমে জগদম্বাকে শোনাই। 

মা্দরে গেল রামকুফ। বললে, অবস্থা যা করেছিস এবার বাবস্থা করে দে। 
পুরশোক দিয়েছিস এবার তা সহ্য করবার মতো শন্তি দে, সালানা দে। এক হাতে 
নিবি আরেক হাতে 'দাব নে, তা হতে পারবে না। 

নবতে গিয়ে গ্চন্্রমগিকে বললে রামকফ। 

ভৈযোছল চল্দমণি শোকে বিহ্বল হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়বে। 'কন্তু চল্গুমপি 
বিশেষ বিচলিত হলেদ না। চোখের কোণের অলটুকু মুছে নিয়ে বললেন, 
“সংসার অনিত্য। অত্যু নিশ্চিত। তাই শোক করা অনর্থক ।' যামকষের 'দিকে 
ভাফালেন উৎনুক হয়ে। বললেন, 'সে |, ছুই কাঁদছিস কেন? এত সব বুকিগে 
বনজেই শেষে অব্য হোল? 

না) কোথায় চোখের জা? সবশ্ি আ।লল্দক্য। 1 


িনিতিটি না কলির বিনা নিন কান্রনা 
আঁছদ তেমন আছিস সহনে। যেমন আছিস ভাবনে তেমনি জাছিস পাবনে। 
মঙ্ুরযাহ্‌ গেছেন, এসেছেন শস্ভু মলিক। 1স:টিয় শল্চু মলিক। সদাগরণী . 
আপিসে মজ্ছদ্দির কাজ করে, অচেল পরসা। গোড়ায়-গোড়ায় খুব রাজনিক 
ভাব, ইস্কুল করব, হাসপাতাল করব, রাস্তা-প্ত্কণণ' করব। শেষকালে বিগলিত । 
দর্মপর্থ : 'আশদবদ কয়ো যাতে“এই এগ্ব্য তাঁর পাদপদ্মে দিয়ে মরতে পারি । 
দাক্ষলেশ্বরের কাছেই বাগানবাড়ি, কি ভাবে এক দিন এসে গড়ল পথ ভুলে। 
্রাইধর্মে মতি, ভাবখানা, আধা-সাহেবি, কিন্তু রামকুফের কাছটিতে এসে আর 
যেতে চায় না। যে কাজে হাসপাতালে এসে নাম 'লাখিয়েছ, রোগের বতক্ষণ কগুর 
থাকবে ছাড়বে না ডান্তার নাহেব। আর ছাড়ান-ছোড়ান নেই। তুমি নাম লেখালে 
কেম? 

রামকফের দ্বিতীয় রসদদার । বলে, 'আর কিছু বৃঁঝ না, তুম 'আমার গুরু 
আমার গুর্্জশ।' 

'কে কার গর” রামকৃফ হাসে। করজোড় করে বলে, "তুমি আমার গুরু 

শম্ডুর স্বমী আবার আরেক কাঠি উপরে প্রাত মঙ্গলবার সারদাকে তার বাড়ি 
ধনয়ে আসে । যোড়শোপচারে পৃজ্জো করে তার পা দুখানি। মঙ্গলাচরণে মঙ্গল 
চরপ। 

জলন্ত বিধ্বাস। অন্ধকার জঙ্গলের মধ্য 'দয়ে পথ চলে শম্ভু। বলে, তাঁর নাম 
করে বৌরয়েছি, আমার আবার বিপদ কিসের! ক্রমে-রুমে পাঁর্থব বিষয়ে ওুদাসশন্য। 
রাদকৃুফকে বলে, তুমি ন্যাংটা, তোমারই অখণ্ড আরাম। আমরা এ গ্রন্থি খুলি 
তো ও গ্া্ঘধতে পাক দিই । 

"তোমরা যে অনেক গ্রল্থ পড়েছ। গ্রন্থই তো গ্রান্থ। আদম গ্রন্থের গ-ও জান না। 
আমি খাই-দাই আর বগল বাজাই। ন্যাংটার নেই বাটপাড়ে ভয় 

তোমার মত সরজই যে হতে পারি না। সরল ভাবে ডাকলে কি তিনি না শুনে 
পারেন? শম্ডুর এখন সেই সরল অশ্রু। বলে, সরল হওয়ার সাধনই তো সব 
চেয্লে কঠিন সাধন। সামান্য গা খাঁল করতে পার না তো মন খাল করব। 
জাঁমকে নিত্কঙ্কর কার ফি করে? জমি পাট করতে পারলেই তো বীজ পড়বে, 
আঁকুর বেরুবে। এ সব জাম যে কাঁকুরে জামি। 

রামকৃফের মূখে শুধ্‌ একটি হাঁসির দারল্য। 

তুমি আমার যেমন দেখতে সরল তেমন তোমাকে বুঝতে সরল। 
রামকঞের তখন খুব পেটের অস্মখ, শল্ভুষাব্য পরামর্শ দিলেন, একট; আফিং 
খাও। রামকক গিয়েছে তার 75৬৬5, ব555115 সামনেই স্দ-বাব্ধন্থ 
িজপেনলার। বললেন, রাসমির বাগানে ফেরবার সময় আমার' থেকে নিয়ে যেও 


আকটকু। 

কথায়-কথায় ভুলে গিয়েছে আঁফছের কথা। পথে এসে রামস্কফের মনে পড়জ, 
 ধ হাঃ, আফিংটকেই নিয়ে আসা হয়নি। মান ফিরে গেল শন্ডুর বাগানবাড়িতে । 
ক 


॥ 
* & 


পি হি পুরা 
গিনপেনসারির কম্পাউশ্ডারের থেকে চেয়ে নিলেই 'হবে। বম্পাউন্জার তক্ষনি 
কাগজে ছনড়ে দিয়ে দিল এক দুলা । ফেরার পথে রামকুফ দেখল তার জার শা. 
চলছে না, কে ফেন তার পা চেনে ধরে রয়েছে। রাস্তায় না উঠে পা এগিয়ে 
যাচ্ছে ড্রেনের দিকে। এ কি, এ কোন পথে চলেছি? পথ .কই গৃহে ফেরবার? 
পথ সব হছে দেল নাকি? অনচ [পহছন কিরে হম্্ষরের বাঁডির কে তাকিয়ে 
পথ তো দেখতে পারছি দিব্যি। তবে এ কা পথত্রম! 

রম ফের শকচ্যাঝূর বাড়ির ককের কাছে ফিরে এল। এইবার (ঠিক হবিন 
হবে পথের। সামনে গিয়ে ডাইনে। পথঘাট তো মখস্ত।, তবে কেন বেচালে 
পা পড়বে? আঁফিণ্ের পুটাল টাকে গণুজে রামকৃষ আবার রওনা হল। আস্তে 
আস্তে এক পা দু পা করে, মুখস্তের জের টেনে-টেনে। কিন্তু ধথাপ্ৰং 
তথাপরং। আবার 'দকদ্রম আবার পথল্দপ্তি। আবার কে পা ধরে টানতে লাগল 
শ্িছন 'দকে। কি, কোথায় ক ভুল হল আমার! 

হঠাৎ মনে পড়ে গেল রামকৃষের। শম্ভু বলোছিল, আমার থেকে নিয়ে যেও, তাকে, 
না বলে' আমি তার কম্পাউণ্ডারের থেকে চেয়ে নিয়ে গোছ। তাই মা আমাকে 
খেতে দিচ্ছেন না! ঘ্্ারয়ে মারছেন। আমার বে সতচ্যাত হয়েছে। এ ভাবে 
নেওয়া তো চুরি করার সামিল। | 
অমনি ফিরে গেল রাীমকৃফ। িডসপেনসারিতে গিয়ে দেখে সেই কম্পাউস্ডারও 
নেই। দরজা বম্ধ নাকি? কে জানে। জানলা একটা খোলা আছে। সেই জানলা 
দিয়ে আফিঙের পালটা ছাড়ে ফেলে দিল ভিতরে। বলে, 'ওলো, এই. তোমাদের 
আফিং রইল ।, 

চঞযৃলসপৃপনিতী রন রর নর রল্লিরারল 
কেউ টানছে না পা ধরে, ঠেলছে না এদিক-গাঁদক। চোখের দ্টি ফর্সা হয়ে 
গিয়েছে। ৰ 
অমার মা আছে আর আমি আছি। আমি তো মা'র হাত ধাঁরান, মাই আনা 
টিনিরারার? পরার র্যা রানার সারাা গগন 
পড়তে দেন না বেচালে। 
আম তোমাকে ছেড়ে থাকি, মুদি আমাকে ছে থেকো মা। সে 
তুম মত ছোড়ো। 
ওরে শোন; বাঁদরের বাচ্চা হাব না, বেড়ালের বাজ হাঁধ। বাঁদরের বাছা ভা 
সলাকে ধরে, মা বখন এক গাছ থেকে আর এক গাছে জাফর, কখনো ছিটকে পড়ে 
যায় বাচ্চা । আর বেড়ালের বাজ্জাকে তার মা ঘাড়ে কামড়ে ধরে, বেড়ালের বাচ্ছায় 
কার ভয় নেই। মাই তাকে আকড়ে ধরে নিয়ে যাবে যেখানে খ্শ। কাড় আগার 
. খারে, কতু বা ছাইরের গাদায়, ঝতু বা বাবুদের (ি্ছানায়। :.. 

ছু কো, তোমাকে বাত পাছা এ ছা বারে ছু আসা 
হয়ে. 





আঠা মাঝে আহাপথ, এক গাঁ থেকে আরেক গাঁ। বাগ তার দি, ছেলেকে সঞ্মে 
গনগনে যাচ্ছে সেই আলপহ দিয়ে, প্রামান্তরে। ছোট ছেলেটিকে বাপ কোলে করে: 
' দিয়ে. খাচ্ছে। বড়টি সেক্সানা, সে নিজেই বাপের হাত ধরে চলেছে; সর পথ, 
“পড়ে রাবার ভগ্প) তাই দু ছেলেই বাপের আশ্রয় দিয়েছে। য্চ্ছে-যাচ্ছে, হঠাৎ 
একটা শঙ্খাটল উড়ে যেতে দেখল, একেবারে ঠিক মাথার উপর দিয়ে! দেখেই 
ঘু ছেলের মহা আহত্রাদ। দূজনেই আপনা ভুলে হাততালি +₹দয়ে উঠল। ছোট 
ছেরেটা জানে, বাপ আমাকে ধরে আছে, আমার ভয় কি, আম আনন্দে হাততালি 
রা ররর তাল বা লাকা 
পড়ে গেল নিচে, ঘা খেয়ে কে'দে উঠল। ী টা 
মাকে অমনি কোলে নিতে বল। মা'র কোলে বসে হাত ছেড়ে দে। ্‌ 

সারা বাধা রাম রামনবমী [তিথিতে মার গেলেন। দারদর মন চেঞ্ে পড়ল। 
ভাবল আবার দক্ষিণেশ্বরে 'ফিরে যাই। 

বৈশাখ মাস, ১২৮১ সাল, সারদা আবার দাঁক্ষিণেন্বরে ফিরে এল। 
কল্ঠু থাকে কোথায় 

আর কোথায়! সেই সংকীর্ণ নবত ঘরে। চন্দুমাণর সঙ্গে । 
একরতি ঘর। একটুখানি দরজা। ঢুকতে-যেরদুতে মাথা ঠুকে বায়। একজনে 
থাকবার মতও তাতে জায়গা হয় না-তা দুজনে, শাশ্দাড়-বৌয়ে। এটুকু ঘরের 
মধ্যেই হাঁড়-কুড়। পোটলা-পঃটলি। যত হাবজা-গোবজা ৷ “?শকেয় ঝুলছে ষত 
কড়ানডেকৌচ। রামকৃফের জন্যে 'জিয়ানো মাছ পর্যন্ত। এখানে থাকতে বোৌ'র যে 
বেঞ্জায় কষ্ট হবে। ' 

কথাটা শম্ভু মুয়াকের কানে উঠল । মধুর হলে হয়তো অট্টালিকায় রাখতেন, শম্ভু 
মল্লিক মন্দিরের কাছে সারদার জন্যে একখানা চালাঘর তুলে দিলেন। তার জন্যে 
 জামিনতে হল মৌরসণ স্বত্বে। আড়াই শো টাকা সেলামী দিলেন শন্ডু। 

 ছাঁম তো হঙ্গাকন্তু কাঠ কই? . | 
কাঠ যোগাল কাপ্তেন। বিশ্বনাথ উপাধ্যার়। বিন্বনাথ নেপালরাজের কর্মচারী । 
: কলকাতার ও অফস্বলে নেপালের শাল কাঠের সে যোগানদার। .বেলড়ে তার 
কাঠের গ্াঁদ। বললে, 'যত জাগে পাঠিয়ে দেব শালের চকোর | ... 

আড়াই বামুনের ঘরের ছেলে। বা ভারতাঁয় ফৌজের 'স্ুবাদার। এরা লড়াইও 
করে আবার গ্রচ্ছোও করে। হম্ষক্ষে্রে শব নর যায়। এক হাতে শক অন্য 
হাতে তরবার |: 

বেব-বেদালত গাঁতনাগবত সব ক্ঠম্ব। তারগর ভার কত। বদন প্জে। করে 
কর্পরের আরতি করে। পুজো করতে-করতে স্তব করে আমনে বসে। সে 
আরেক মানুব। প্রজো করার সময় চোশ্ের ভাব তিক যেন বোলতা কাষড়েছে। 
'কণ ভুত! নিজের মা'র কাছে নচে বসে। মা যে আদনে বসে তার চেয়ে নিচু আসন। 
এনকংরা ঘে আসনে দে বসবে তার হয়ে উদ্চু আসনে মাকে বসাবে। ্ 
ফী রক বনের ল্য াছে, হে এলে মার উপরে ছাজ 


ধরে। বাড়িতে নিয়ে গিয়ে নানা তরকারি রে'বে খাওয়াম। যেখানে খাওয়ার 
সেঞ্খানেই আঁচাবার বাবস্থা করে, উঠতে দের মা। বাতাস করে, পা পে দেয়। 
ওদের বাড়িতে গিয়ে পাইখানায় বেহ:স হয়ে পড়েছে রামকফ--এত আচার, তবু 
পাইখানায় য়ে ঠিকমত বসিয়ে দিয়ে এল। বদি কখনো সমাধি হয় রামড়ফের, 
কাস্তেন মাথার হাত ব্যীলয়ে দেয়। সে এককালে হউযোগ করত । তাই গুণ আছে 
তার হাতে। 

শালের চকোর পাঠিয়ে দিল বিশ্বনাথ । একখানা আবার গঙ্গার জোয়ারে ভেসে 
গেল একাদিন। হৃদয় দুঃখ করে বললে সারদাকে, 'তোমার যেমন অদেক্ট, একটা 
লকাঠও ঠিকমত জোটে না। 

সারদা শুধ; একটু হাসল উদাসীনের মত। 

গেছে-গেছে ও শালকাঠ। 'ব*বনাথ আবার নতুন পাঠিয়ে দিলে। ঘর উঠল সারদার়। 


চালাঘর। 
শালকাঠ নিয়ে বিশবনাথেরও বিপদ কম নয়। গঞ্গার জোয়ারে রদ কাঠ 
তার ভেসে গেছে। রাজসরকারের দারুণ ক্ষাত। এখন কী কৈফিয়ং দেয়া যাবে 
এর জন্যে, কে বলবে? কাঠের হিসেব পাঠালে না এবার বিশ্বনাথ । ঠিক করলে 
পরের বছরের লাভে এ লোকসানের পূরণ করবে। কিন্তু হঠাৎ কাটামন্ডু থেকে 
ভার তলব এল। 'বিকৃত কি রিপোর্ট গেছে রাজধানীতে, বিন্বনাথের চাকার নিয়ে 
টানাটানি। সংসারী লোক, ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। নেপালে বাবার আগে এল সে 
দক্ষিণেশবরে। সেই সরল সত্যশরণের কাছে। 

বললে, 'এখন উপায় বলুন।, 

উপায় খুব সোজা । বললে রামকৃফ। নরিরারি রাহি রারার 
পক? 

গর রর বড জার রাড পর উনার করের রা রর 
গিয়ে দরবারে । তোমার কিচ্ছয হবে না। মা তোমাকে, তোমার ধত্যকে রক্ষা 
করবেন। সত্যের মত সহজ আর কিছু নেই 

বুকের ভার নেমে গেল বিদ্বনাথের। মোজা সত্য কথা বলব এ সধ চেয়ে বড় 
আম্বাস। অতলস্পর্শ শাল্তি। 

হলও তাই। সত্য কথা বলায় তার দোষক্ষালন তো হলই, তার প্রমোশন হল। 
কাস্তেন ছিল কর্ণেল হল। ফিরে এল কলকাতায় নেপালের রাস্টীদ্ত হয়ে। 
বাঙালীদের নিন্দা করে 'িদ্বনাথ। নিষ্জা করে টধাবাজ-গড়ুয়াদের | ঠাকুরের 
পায়ের কাছে বসে বলে, 'এমন মালিককে ওরা চিন না।' 

সংসারে থাকতে গেলে সত কথার খুব আঁট চাই। আর এই সতোঠ ভগবান। 
সতা কথাই কালির পস্যা। দকাযমনোবাফ্যে বারো বছর সত্য পালন করলে মানব 
সতান্সক্কষ্প হয়ে যার়। 

খ্মাঁম মাকে সব দিয়েছিলুম। জআআন-অজান, ধর্মনভাধমণ পাপ-পুগা, দ্যালোন্দকা। 
পৃচঅশৃতি, লব। বিল্কু সত্য দাকে ফিতে পানজমে না। মলতে পারলে লা 


শই'লে তোর সত্য, এই নে তোর অসত্য। এ সত্য বাদ ভাগ কারি ভবে মাকে 
যো পবস্য অপি করল সেই সত্য রাখি কিসে? সত্য ভগবানকেও দেয়া যায় 
'না। সন্ভাই তো ভগ্ববান। তা আবার দেব কাকে? ৮ 
নেই শালকাঠে হযে বাদ করতে জাগন লারলা। একা দে রর ওর 
করতে । সেই ঘরেই রাঁধে সারদা-_রামকৃফের সেই 'ছিনাথ হাতুড়ে । খালা-বাটি সাজিয়ে 
নয়ে যায় সান্দিরে। কাছে বাঁসয়ে রামককককে খাইয়ে আসে মাথা থেকে ঘোমটাটি 
সরে না হচওয়ায়। | ৰ 
তে রক আকোবে হয় লই চালামরে। শের নিযে আনে 
ঘোমটার ভিতর থেকে কথা কয় সারদা । 

একদিন হল £কি, তোর দে পরেছে বাদক আর মে নও অন 
মষলধারে বর্ষণ! সে বর্ধণ আর থামে না। মান্দরে এখন ফিরে যাই ধক করে? 

না, ধাব না মান্দিরে। তোমার চালাঘরাটতেই থাকব আজ। কি খাওয়াবে আজ 
বলো? 

ঝোজ-ভাত তোমার পথ্য, নিন বৃনিন্রা্রুদ হারে উন 
খেতে-খেতে রামকুফ বললে, 'এ কেমনতরো হল? কালাঘরের বামুনরা যেমন 
রাত্রে বাঁড় আসে এ যেন আম তেমনি এসোঁছি। | 

চালাঘরেই রাত কাটাল রামকৃফ। চালাঘর নয়, কালশঘর। 





চাঙ্গায়ে থেকে লারদার কঠিন আমাশা হল। 

শন্ভুবাবূ প্রসাদ ডান্তারকে নিয়ে এলেন। খাওয়ালেন অনেক ওষ্যপর । কিন্তু 
রোগের কিতেই আরাম হয় না। বাই বলে, দেশে ফিরে বাক। সেখানকার 
খোলা হাওয়া আর মিঠে জল ছাড়া সারবে না অস্খ। 
জয়রামবাঁটিতে ফিরে গেল সারদা । আন্বিন মাস, ৯২৮২ সাল। শ্যামাস্ন্দরী 
তাকে টেনে নিলেন বৃকের ঘধ্যে। 

অস্মথ বেড়েই চলল। কোথায় মৃত হাওয়া, কোথায় গন্টি জল! সারদা মিশে 
টি সপ শন শপ চোখে আঁধার দেখলেন। দেশের হাতড়ে- 
' রোজাদের ডাকেন এমনও ঝাকি তাপ সংক্থান নেই । আছেন শুধু গয়াময়। 

স্ 


রি 
ন্ট 


সারদার দেহ বাধ আর থাকে না। খবর পেশহৃজ রামকুফের কাছে। 

পাই তো রে হপদ সারদা কেবল আসবে আর যাবে? শান্ত স্বরে বলেন 
রামকুফ। অন্য্যজন্ের কিছুই তায় করা হবে না।' 

বিছানার থেকে আস্তেন্সাস্তে উঠে বসল সারদা । কাছেই প্রামাদেবী সিংহযাহিনীর 
মন্দির। ডিক করল সংহবাহনীর মাড়ে গিয়ে হত্যা দেবে। হয় রোগ নাও, নয় 
আমাকে নাও। | 
€/-547দ কোনো নাষ-ডাক নেই। কিচ্ছু আমার ডাকেই তার নাম হবে। 
মা-ভাইয়েরা যেন জানতে না পারে। চুপি-ুশি যেতে হবে মান্দরে। কিন্তু ঘেতে 
পায়ব তো একা-একা'? নিজের গায়ে ভর করে? 

কে যেন তাকে হাত ধরে নিয়ে গেল ধীরে-ধীরে। মা-ভাইয়েয়া জানতেও পেল নাঃ 
[সংহবাহিনীর মাড়ে হত্যে দিয়ে পড়ল সারদা। 

খানিকক্ষণ পড়ে থাকবার পরেই' সিংহবাহিনী নেমে এল সিংহাসন থেকে । বললে, 
তুমি কেন পড়ে আছ গো?" বলে হাত ধরে তাকে তুলে 'দিল। 'ওলতলার মাটি 
একটু খাও গে, আধি-ব্যাধি সেরে যাবে? 

মাটি খেয়ে অসুখ সেরে গেল সারদার। জীর্ণ দেহ সবল হয়ে উঠল। 
গ্রামে-গ্রামান্তরে ছাড়িয়ে পড়ল 'সিংহবাহিনশর মাহাত্য। দূর-দূরাষ্তর থেকে আসতে 
লাগল আর্ত-আতুর। কেউ আমরা আগে জানিনি, আগে বুঝিনি, খোঁজ কারান 
আমাদের গাব্দা'8.ক। সাপের বিষ পর্যন্ত নাশ হয় এ মাটির হোঁয়ায়। চল-চল 
যাই সিংহবাহনীর দুয়ারে। 

লোকমাতা লোকের কল্যাণের জন্যে ঘুমন্ত দেবীকে জাগিয়ে 'দিলেন। যেমন 
জগতের প্রড়ু ভুবনের কল্যাণের জন্যে জাগিয়ে দিয়েছিলেন ভবতারিণীকে। 

এ 'দকে শম্ডু মাল্লকের অবস্থা সঙন হয়ে উঠেছে। ঘোর 'বিকার। স্বাধিকার 
এসে দেখে বললে, ওষুধের গরম ।' 

দেখতে গেল রামকৃফ। শম্ডুর (বকাগ।- ল মুখে ভেসে উঠল তৃপ্তির প্রশান্তি। 
'শম্ভুর প্রদশীপে আয় তেল নেই।' 

অসৃখের গোড়ার দিকে শম্ভু বলেছিল একদিন হৃদয়কে : "হুদ পোঁটিলা যে'যে 
বসে আছি। কাশ্ডারী এলে তার হাতে তুলে দেব পোঁটিলা। বলব ফেলে দাও 
ভবনদশতে । ভার হালকা করো ।' 

এঞ্যর্য ছিল, আসাম 'ছিল না। সংসারে টাকায় দয়কার বটে, বিল্ভু ওগুলোর 
জন্যে ভাববে কে বসে-বসে? যখন আসে আসবে যখন ধাবায় ধাবে। বদজ্ছা লাভ । 
ঈষ্বরের ধায়া ভক্ত ঈষ্ষরের যারা শরপাগত, ভারা কিছু ভাবে লা, তাদের বদ 
লাভ। য় আয় তর ব্যয়। এক দিক থেফে আগে আরেক দিক ঘিয়ে বৌরিয়ে যায 
বৈরাগ্য মানে তো শ্দুধ্‌ সারে বিরাগ নয়, বৈরাগা মালে ঈ্বরে অনুরাগ । মায় 
ঈদ্বরে অনুরাগ আছে তার গন্য অপারাঞে দরকার নেই। 

জানিস বাক্য ভন, তারা হচ্ছে ঈদ্ঘরের ক্ষয়, ঈদ্বরের সলো খাদের রন্সাহসের 
 ঈক্যা্ঘ। ঈদ্ধযই তাদেয় টেসে নেন। দাকোধসেরা হখন গ্ধবের কাছে ধাগণ হজ 
| ১১ 


য্াবিস্ঠিরই তাদের উদ্ধায় কন্ধলেন। বললেন, আত্মীয়দের এ অবস্থা হলে জামাদেরই 
করাজ্ক। 

ভন্কের আবার ভয় কি! অভাবের তয়, না, আঘাতের ভয়? না, ময়ণের ভয়? 
ওরে ভন্ের নাশ নেই। 'ন মে ভত্তঃ প্রণশ্যাতি'। 

শম্ভু চলে গেল। এখন কে হবে রসদদার ? 

বি কাল'র মা সেবা করে চল্দ্রমণিকে। নব্যুয়ের উপর বয়স হয়েছে চল্রমণির। 
বাধ্ধর জড়তা এসে গিয়েছে । হৃদয়কে দেখতে পারেন না দু চক্ষে । কি করে তাঁর 
ধায়গা হয়েছে অক্ষয়কে ওই মেরে ফেলেছে। এখন বলছেন রামক়ফ আর সারদাকে 
গে মেরে ফেলবে। মাঝে-মাঝে রামকফকে বলেন গলা নাময়ে, 'হব্দয়ের কথা 
কখখনো শুনার না। ও শতুর। | 

রাসমণির বাগানের কাছেই আলমবাজারের পাটের কল। দুপুরে কলে 'সাঁট 
বাজে। সেই 'সিটিকে চন্দ্রমণ বৈকুণ্ঠের শঙ্খধ্বান বলেন। এ সিটি না শোনা 
পর্য্তি খেতে বসেন না। কেউ অনুরোধ করলে বলেন, 'এখন কী খাব গো? 
অপকাশতযদ ভোগ হয়ান, বৈকুষ্ঠে শঙ্খ বাজেনি, এখন 'কি খাওয়া যায় 2" যোঁদন 
কলের ছুটি থাকে সোঁদন আর বাঁশি বাজে না। সোঁদন চন্দ্রমণিকে খাওয়ানো 
শত্ত হয়ে ওঠে। বৈকুণ্ঠের শঙ্খ নেই আমারও খাওয়া নেই। রামকৃফ তখন নানারকম 
কৌশল করে। ছোট মেয়েকে যেমন করে ভোলায় তেমনি করে পাশে বাঁসয়ে 
খাওয়ায় মাকে। 

রোজ ভোরে উঠে মাকে দর্শন করা চাই রামকৃষের। কিছুক্ষণের জন্যে তাঁর কাছে 
েকে তাঁকে সেবা করা চাই স্বহস্তে। আর কত 'দিন মা'র পাদপদ্ম স্পশ" করা 
যাবে মা-ই জানেন। 

হৃদয় দেপে যাবার জন্যে তোড়জোড় করছে। বাঁধছে বোঁচকা-বচকি। হাটের 
থেকে নানা দ্ুব্য কিনে এনেছে । না গেলেই নয় । শুনতে পেয়েছে দেশে 'কি-এক 
বেধেছে মোকদ্দমা। 

রামকৃফের কাছে গেল অনাতি চাইতে । 

“মামা, খাব 2 

“না।' রামকুফ বারণ করল। 

'কেন বারণ করছ? 

রামফফ কারণ বললে না। হূদয় বত জিদ করে, গামকৃফ তত স্তব্ধ হয়। 

শেষকালে হদয় গেল গাজার কাছে। মামা না বজলে কি হয় খাজা ঘাঁদ 
ছাট দেয়, তবেই হল । খাজান্টি ছাট জর করলা । আর হদয়কে পায় কে? 
লঙ্ষের সময় রামকফ নধতে এল । এল মা'র কাছ'টিতে। 

ক্দুরু, করল হত গব পাযর়োনো কথা, গাঁয়ের কথা, পাড়া-পড়শীর কথা । গুকোনো 
কথার মত এমন আর কী ছালো লাগে মায়েদের । ছেলেদের ছেলেবেলায় বাগায় 
গলে মায়েদের আর খানায় কে! জাত বাড়ছে, তব, কথার মত মায়েশশোয়ে। 
আনি ছেকে হয় ভাকাভাকি ফর বরল। কি গো দানা) খাষে না? খেতে 
৬ 


সারার না 
কাশীধাদ। হ-দয়ের চটঙফার তীরতর হল... -' ূ ১১. 
আমারটা রেখে তোরা দুজনে খা গে।' বঙমে সামু! 


আম্মি আরো একট বাস মা'র কোল ঘে'ষে। আরো একটু কথা শুনি। 

রাত প্রায় দুপুর, মাকে ঘুম পাড়য়ে রামকৃফ। ফিরে এল নিজের ঘরে। খেয়ে” 

দেয়ে শুলো নিজের বিছানায়। 

বিচ্তু হদয়ের চোখে ঘুম নেই। কেবল এ পাশ ও পাশ করছে। রাত বত বাড়ছে 

তত বাড়ছে হৃদয়ের ছটফটানি। কে ষেন আস্টেপৃন্টে তাকে বে'ধে ধরেছে বিছানায়, 

ছাড়া পাবার জন্যে হাত-পা ছ'ড়ছে কষণে-্ণে। 

রামকফের পাশের বিছানা হদয়ের। রামকৃফ দেখেও দেখছে লা। 

এক বটফায় উঠে পড়ল হৃদয় । ঘরের কোণে গাঁঠার বাঁধা, কাল ভোরেই সে রওনা 

হবে ঠিকঠাক। সহসা সে ক্ষিপ্র হাতে গাঁঠারর বাঁধনগ্ঁল খুলে ফেলতে লাগল। 

আর বাঁধনও 'কি একটা দুটো! যেমন যত রাজ্যের জানিস পেয়েছে পরেছে তেমন 

এ'টেছে দাঁড়দড়ার ঘোরপ্যাঁচ। টেনে খি'ছে ছি'ড়ে খুলতে লাগল দাঁড়র জট।, 

রামকৃফ 'জগগেস করল, পক হল? 

'প হল! বিছানায় শুতে পাচ্ছি না। যতক্ষণ এ বাঁধনগলো না যাচ্ছে ততক্ষণ 

আমার শান্তি নেই। গঠিরির মতই দাঁড় 'দিয়ে কে আমাকে বেধেছে নাগপাশে-- 

'বাঁড় ঘাঁব না?, 

'আর গেছি! মনে একটা ইচ্ছে হলেই যাঁদ কেউ বাগড়া দেয়, তাহলে বাঁচ 'কি 

করে ?' বন্ধন মস্ত হয়ে হৃদয় ফের ফিরে এল বিছানায় । বললে, পকল্তু কেন যে বাঁড় 

যেতে দিলে না বুঝতে পারলঃম না। 

'পারবি। ভোর হোক ।' 

নিজে আগে ভোরে উঠে কালীর মাকে জাগিয়ে দেন চল্দ্রমণি। সেদিন কালশর 

মানই আগে উঠল। বেলা এক-গা হতে চলল তব; চগ্দ্রমাণর সাড়া নেই। ডাকাভাকি 

করতে লাগল কালণর মা। তব্‌ দরজা খোলেন না। 

দরজায় কান পেতে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল কালখর মা। শুনতে পেল গলায় একটা 

ঘড়ঘড় শব্দ । ছুটে গেল হদয়কে খবর দিতে। 

বার থেফে কী কোঁশলে হেয় খুলে ফেলল হুড়কো। দেখল চগ্রুমাঁণর শেষ' 

অবস্থা । ওধুধ আর গল্গাজল দিতে লাগা ফোটানফোঁটা করে। 

তিন দিন কাটল এমনি অবস্থায় । হয় অসুরের মত বুজতে লাখাজ যমের সঙ্গো। 

রামরুফ রললে, এবায় অল্তজর্খল করা হোক । চল্ুমণিকে নিয়ে চলল গঞ্ছায়।' 

যাবার আগে ফুল চন্দন আর তুলসী দিয়ে মার পায়ে অঙালি' দিলে রামরক। 

প্ল্নকে শিয়রে রেখে মা ছোখ বাজলেন। 

রার়লাল ফলে নিয়ে গল, হের নিয়ে এল শ্বেত জ্দম। ধার পা দদানি গঙ্গা” 
৯ 


কালে হয়ে ভাতে রামকুক গুদ করে চন্দন সাঁখিয়ে দি্জ। এ গজ চোখের জাল কারী 
খা চন্দন ভাঁ্তর চন্দগ, ভাল্গোবাসায় চজ্গন। 
“যে দেহ' থেকে জামার দেহের প্রকাশ সেই দেহ আজ মিলে গেল পণ্যভূতে 
দেদার 'সশানে নিয়ে বাওয়া হল চন্দুমখিকে। রারলাঙা মুখাপ্দি করলে, সংকার 
 করলে। রামকুক যে সম্যাসী। 
৷ শ্লামলালই শ্রাঙ্থ করল বৃযোগসগ*। 
 ম্বাদহক অশোচ পর্যন্ত পালন করেনি। প্রেতপিশ্ড দেওয়া তো দূরের কথা। 
০০ 
আমকুফের। অল্তত একটু তর্পদ কার মাকে। 
সন ৯৯০পািনিটিনািক র্যা 
জলের অঙ্জল নেবার জন্যে গঙ্গায় হাত ভোবাল রামকৃফণ। কিন্তু ধযই অঙ্জীলবদ্ধ 
হাত উপরে তুললে অনান হাতের আঙ্ুলগ্যাল অসাড়, শিথিল হয়ে গেল। একে 
বে'কে ফাঁক হয়ে গেল। সব জল পড়ে গেল ফাঁক দিয়ে। ধতক্ষণ জলের মধ্যে 
থাকে হাত ঠিক বদ্যাঞ্জলি থাকে, যেই জল নিম্নে উপরে ওঠে আঙুংলগ্যাল অমান 
কাঠির মতন শত্ত হযে প্রসারিত হয়ে পড়ে। এক বিন্দু? জঙগ বন্দী হয় না। বারবার 
। চেন্টায করেও পান্সছে না কিছুতেই । 
: ডুকরে কেদে উঠল রামকৃণ। 'মা গো, তোমার জন্যে কি কিছুই করতে পারব না? 
কোনো দোষ স্পর্শোন তোমাকে । তুমি গাঁলত-হস্ত। বললে এসে পশ্ডিতেরা। 





। মরযাব: তখন যে'চে, রামকৃক তাঁকে এক্ষ দিন ধরে বঙ্গ : 'দেষেন ঠাকুরের যাঁড়: 
যাব ।' 

৷ অঙ্রবাধ; আভমানী লোক, জাগাপছহ করতে লাগলেন আমরা কেন দেখে তার 
৷ খাড়ি বাই? দে নিজে আনতে পায়ে না? 

৷ ক্গো, দেবেল্র যে ঈত্বনের মাম করে৷ 

ানানিযাগিররাগাদ রা ডারিগানালাটি 

৷ কটি 


আমি গাম করলো কি হয়, আমার নিজের কি কফোড়না নাম আছে? তাঁর লাম দিয়ে 

নিজের নামটাকে মুছে ফেলোছি। তার" নামেই নিজের নামের নান হযেছে। 

দেবেন্দের কত 'িবদে, কত এক্তর্ব। দে তো কাঁলর জনক । দে এ দিক-ও দিক 

দু দিক নোখে দুধের বাটি শায়। সে ভোগেও ক্সাছে যোগেও আছে। রাদনও 

করছে দাসত্বও করছে'। দে একটা মহাতিশর্ধ। তাকে এখানে আসতে না দিয়ে আমার 

ওখানে যাওয়াই তো আমার লাভ । আমি অনন একটা তীর্থ করব না? 

টির রে ররর রাবার লারা, 

ভাকে! .. 

যেকেন জার হরে একসলে পরতেন হিল কলেজে। মৌ স্বারে যাওয়া সহজ 

হয়ে গেল। সঙ্গে নিয়ে গেলেন রামকৃফকে। 

দেবেন্দ্রনাথের তখন দেশজোড়া নাম। খুন্টানি থেকে দেশকে উদ্ধার করার জন্যে 

তিনি ব্রাহ্নধর্ম আর ব্রাহনসমাজ প্রতিষ্ঠত করলেন। রাজা রামমোহন এসে 

বোঝালেন বেদান্ত-প্রাতপাদিত ধম সত্যধর্ম আর তাই প্রচার করবার জন্যে স্থাপন 

করলেন ব্রহমসভা । দেবেন্দুনাগ্ের সাধনায় সেই ধর্মই হয়ে দাঁড়াল ব্রাহনধর্ম, আর 

সেই সভাই হয়ে দাঁড়াল ব্রাহরসমাজ। 

বিদেশের গুরুর কাছে গোটা দেশ যখন ধর্মে দীক্ষা নিতে যাঁচ্ছল তখন রাজা 

রামমোহন দেখালেন তাকে তার আপন সত্যসম্পদ। সেহ দেখানোর কাজে দেবেন্দ- 

নাথ একটি দিব্য শিখা। ব্রহনকে 'তান শষ্য অন্ঠানে রাখেনান নিয়ে এসেছেন 

জাঁবনের অধিষ্ঠানে। তিনি প্রত্যাগাত্বা। তিনি ঈম্বরদশশ। 

দিব্যি ভূপড় হয়েছে মতুরবাব্‌র, তব ভাঁকে চিনতে পারলেন দেবেল্দ্রনাথ। বিনয় 

বচনে জিগগেস করলেন, 'সঙ্গে ইনি কে?' 

কথার সূরে একটি প্রসন্ব বিস্ময্ন। চোখের সম্মখে হঠাৎ যেন দেখতে পেয়েছেন 

স্ন্দরের মহামাহম প্রকাশ । একাটি বিভান্বিত বিভূতি। 

এই এক জন আত্মভোলা মান্দুষ। ঈশ্বর-ঈ*্বর করে পাথল।, মথ্বরবাব্দ পারচয় 

করিয়ে দিলেন। 

যেন শুধু এইটনকুই পাঁরিচয় নয়। পাগল নয়, পারজ্গাম; অল্তগুধগন্ভীর। মান্য 

নয়, লীলামান্যবিগ্রহ। তাকিয়ে রইলেন দেবেন্দুনাথ। 

'সংসারে থেকে তুমি ঈশ্বরে মন রেখেছ, তাই তোমাকে দেখতে এসেছি ।' খললে 

রামকফ। তুমি জনক রাজার মত দৃখানা তরোয়াল ঘোরাও, একখানা জ্ঞানের 

একখানা কমের। তুমি পাকা খেলোয়াড় । 

সিমতশান্ত নেত্রে হাসলেন দেবেন্ছুনা। 

পল্তু 'খ দেখায় চলবে না। দোখ তোষার গা দোখি। 

সহজ-সূন্দর মানাখাটির ঞএ অনুরোধ যেন গৃহোহিত প্রত্যাগাক্যার আগেন। 

জাবদ-5 হওয়া মানেই, ভারবত হওয়া, বাজিসামৃত হওয়া। আবরল খানে 

ফে্দতে পারলেই রইল মা আর অহক্ধায। রইল লা আলা ঘালল্যোষ। 

গায়ের জাঙা গ্মলে ফেলকোন, দেবেসানাধ। রামকৃষ্ণ বেখ্ল (সী উদ. 
্‌ সি 


% 


পরছ--নদকে। ধেখলা তাঁর পৌরবরের উপর টুর জড়িয়ে বিযেছে। 
নারির রনি ররর রানির 
বিরেছে। 
জাগে শি আর ধরে না রামফুষের। তুমি তো তবে জামার দেশের লোক, আমার 
দ্বণ-বান্ঘব। রামকৃফ। চেপে ধরল দেবেস্ুমাথকে। “তবে আমাকে কিছ ঈম্বরণর 
কথা শোনাও।, 
হব থেকে কিছু-কিছা; শোনালেন দেবেন্দ্রনাথ । এই 'রশ্বজগাং প্রকাণ্ড একটা ঝাড়, 
গর ভালে 
৯৬৮ একস 

আশ্চর্য! যে দেখেছিলুম এক দিন । তোমার 
কা সে ক নন 
'ঝাড়-লণ্ঠন না হলে কে জানত কে দেখত এই জগৎসংসারকে ?' দেবেল্দুনাথ ব্যাখ্যা 
করতে লাগলেন। ঈিষ্বর মানুষ স্যাম্ট করেছেন শুধু নিজেদের দেখাতে নয়, 
ঈদ্বরকে দেখাতে । শুধু নিজেদের গৌরব প্রচার করতে নয়, ঈম্বরের গৌরবের প্রচার 
করতে। মানুষ ছাড়া ঈশ্বরকে বোঝেই বা কে, বোঝায়ই বা কাকে। ঝাড়ের আলে 
না থাকলে সব-ীকছু অন্ধকার, স্বয়ং ঝাড় পর্যন্ত দেখা যায় না।' 
বড় লুন্দর করে বললে তো। একই বহুধা হয়েছেন। গণনাহশীন অনৈক্য দিয়ে 
দেখাচ্ছেন সেই এককে। সেই সমগ্রকে। সেই অখণ্ডকে। তিনি যে অখন্ডৈকরস। 
“আমির মধ্যে কিছু নেই। আমার মধ্যেই সমস্ত রয়েছে। 
আলাপ করে উল্লাস হল দেবেন্দ্রনাথের। বললেন, “আমাদের উৎসবে কিন্তু আসতে 
হবে। 
দে ঈধ্বরের ইচ্ছা ।' উদাসীন বামকক। 
পান 

দেখছ তো আমার অবস্ধা। আমার কাপড়-চোপড়ের আঁট 

ভাবে তিনি রাখবেন তিনিই জানেন ।' টিন 
'না, আসতে হবে! দেবেন্দ্রনাথ পীড়াপীড় করতে লাগলেন। "শুধু একটা ধৃত 
আর উড়ানি পরে আসবেন। আপনাকে এলোমেলো দেখে কেউ বদি কিছু বলে 
আমার কদ্ট হবে।' 
''সা থাপ আছি তা পারব না। বাব হতে পারব না আমি 
পি ১৯ উর ধবস্ডু রামকফ মৃষসমস্তসঙ্গা। 
| | তাক কাপড় থাকলেই খা 
বন কেই বা কি লন বলেই ছো সে সণ চাদ বলেই ডো লে 


গছ শাজসিনতায় বাধল ঢাবেন্নাথের। পর দিন মথুরবাধুকে চিঠি লিখে 
পাতাহেন। একেবারে খাজিগায়ে এলে ভালো দৈখাবে দা। গায়ে তাগঠত এককখটাট 





ওরে, ওরা এখনো বস্ছুকে দেখে, সত্যকে দেখে না। আদাকে দেখে না, আমার 

কাপড় দেখে। ওরে, এ যে ছবির শরার। হরির শরীরের জন্যে ক হাত কাপড় 

কিনাব, কোন বাজারে? হারই জগত জঙ্গংই হারি-এর বাইরে আর শরণর কই? 

হ'রিরেব জগৎ, জগদেব হরিঃ, হারতো জগগতো ন ?হ ভিন্ন তন্ঃ। 

'দেবেম্দ্ু এখনো ভোগে আছে। তাই সে ভাগেও আছে।' 

আমার ভোগও নেই, তাই ভাগও নেই। আমার ইয়ন্তাও নেই, পারচ্ছেদ্ড নেই। আমি 
। 

পকল্তু গৃহস্থেরা কি একেবারে ডুবে যেতে পারে না? জিগগেস করল কেশব 

সেন। 

“তোমরা ডুবে যাবে কি গোঃ তোমরা একবার ডুব দেবে আবার উঠবে।' হাসল 

রামকৃফ। 

তোমরা ঈম্বরকোটি নও, তোমরা পানকোৌটি। 

শকল্তু, কেন, মহার্ধ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর 

মহর্য বলতে পারো, কিন্তু আসলে রাজার্ধ। রাজার্ধ জনক। সংসারে থেকেও 

থাকতেন অরণ্যে। অরণোর নির্জনতায়। 

'দেবেল্দ্ুনাথ ঠাকুর? দেবেন্দ্ুঃ দেবেন্দ্র? দেবেচ্দ্রনাথের উদ্দেশে প্রণাম করল 

রামকৃফ। বললে, 'তবে কি জানো, পর্যাপ্তকাম হতে হয়। এক জনের বাড়তে 

দুর্গাপুজার সময় উদয়াস্ত পাঁঠাবলি হত। এখন আর বাঁলর দে ধুমধাম নেই। 

এক জন জিগগেস করলে, মশাই আপনার বাড়তে আর বার সে ধূমধাম কই? 

বাব; বললে, আরে, এখন যে দাঁতি পড়ে গিয়েছে । থেমে আবার বললে রামকুফ, 

মেকেনুনাগ খবে মান্য। হাতে হেল দেখে দিয়ে কাঁচাল ভাতছে। হাতে ছেল 

মেখে নিয়ে কঠিল ভাঙলে হাতে আর আঠা লাগে না।, 

রা রা সারা রা সা 

গোঁতা থাক, যে-সোনা সে-সোনাই থেকে যাঁব। 

মথুরবাবকে আবার ডাকল রামকৃক। বললে, চলো এবার আরেক তীর্থে। 

সে আবার কোথায়? 

দশীননাথ মুখুজ্জের বাঁড়। বাগবাজারের পোলের কাছে থাকে। লোকটি বড় 

ভালো । 

ভালো লোক হলেই তার বাঁড়তে যেতে হবে? মথরবাব্‌ ঝাড়া দিয়ে উঠলেন। 

শুধ ভালো নয়, ভন্ত। সব সময়ে তাঁতে আছে, ধন-প্রাথ সব তাঁতে গত হয়েছে। 

এমন লোককে আম দেখতে যাব না? ভক্তকে দেখা তো তাঁকেই দেখা। 

' দঁিনয়ার আঁঙতে-গাঁজিতে কত এমন ভত্ত আছে। তাই বলে সবাইকার বাড়ি-বাড়ি 

ধাওয়া করতে হবে না কি? 

আমাকে সে সব আঁলশালির 'ঠকানা এনে দাও। আমি জনে-জনে গিয়ে প্রণায় 

ফরে আসব। ভন্ত হচ্ছে ভগ্খবানের বৈঠকখানা। সৈথানেই তিনি বিশেষরগে 

প্রকাঁশিত। 1বিশেষয়পে তরঙ্গাগ্িত, ০৮০০৪০০০০৮৪ 


ন (৪8) 


খুলমেজাজে, 'দিলদারয়া হয়ে। মঞ্জা ওড়াবার মজিশ চালাচ্ছেন চাব্ধশ ঘণ্টা । 
আমাকে সেই আখড়ায় আহ্ডাধারী করে দাও। 

ভন্ত ছাড়া তাঁথ নেই মহণীতলে। যোলো টাকার পরসা এক কাঁড়, কিন্তু ফোলোটি 
টাকা বখন এক করো তখন আর কাঁড় দেখায় না। ষোলো টাকার বদলে খাঁদ 
একটি মোহর করো তখন আরো কত ছোট হয়ে গেল। আবার সোঁটর বদলে বাদ 
এক কগয হশরে করো, তা হলে লোকে টেরই পায় না। 

ভন্ত ছোট্রটি হয়ে আছে। শুধ্‌ ঈশ্বরের নামটি ধরে বসে আছে। তীরথভ্রমধ, 
গলার মালা ভেক-আচার কিছু নেয় না, শু ভান্ত নিয়ে পড়ে থাকে । ভার নেয় না 
সার নেয়। জীবনে শুধ্‌ একখানি দালল লিখে চুকিয়ে দেয় লেখা-পড়া। সে দলিল 
উইল বা দানপন্র নয়, নয় কোনো বন্ধক-তমশৃক, শুধ একখানি আমমোস্তারি! ভন্ত 
ঈশ্বরকে আমমোন্তারি দিয়ে নিঝর্ঝাট হয়ে বসে থাকে । সে আমমোস্তাঁর বিশ্বাসের 
খাতায় রেজেস্টারি করা। রদ-রাহত নেই কোনো কালে। 

তাঁর নাম আর তান তো অভেদ। যা রাম তাই নাম। তেমনি যা ভগবান তাই 
ভত্ত। 

মথ্রবাব্‌ গাড় নিয়ে এলেন। তার্থদর্শনে বেরুল রামকৃফ। 

সোঁদন দীননাথের বাঁড়তে দীননাথের এক ছেলের পৈতে হচ্ছে। বাঁড়াটি ছোট, 
কিন্তু হৈ-চৈ প্রচণ্ড। তার উপর কে এক জন বড়লোক এসেছে ল্যান্ডো করে, 
তাকে নিয়ে দীননাথের ঘরগষ্টি ভীষণ ব্স্ত। এমন সময় এদের দেখে ওদের 
অপ্রস্তৃত অবস্থা। কোথায় বসায় এই অনাহ্‌তকে? নিমন্ত্রণ না করলেও যে চলে 
আসে পথ চিনে, প্রার্থনার অপেক্ষা না করে? কোথায় বসাইঃ ঘরে যে অনেক 
জিনিস, অনেক আসবাব, সেখানে জায়গা কোথায় ? 

পাশের ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিলেন মথুরবাবু, ওপাশ থেকে কে ঝাঁজয়ে উঠল : 'ও-ঘরে 
হবে না, ও-ঘরে সব মেয়েরা আছেন। 

মহা অপ্রস্তুত। জায়গা হল না রামকৃফের। তাকে নিয়ে বাইরে বৌরয়ে এলেন 
মহ্যরবাব্য। 

“কেমন? দেখলে ?' চটে 'গিয়েছেন মথুরবাবু। 

রামকুফ হাসতে লাগল । বললে, 'কেন, দীননাঘকে দেখলাম । তিনি দীননাথ, তিনি 
ক আমাকে ফাঁক 'দিতে পারেন! 

“আর বোলো না। বসতে জায়গা দিল ঘরে? 

প্বয়ে জায়গা না দিক, হদয়ে দিয়েছে । 

'তোদার কথা আর শুনব না। তোমার সঙ্গে যাব না আর কোথাও ।' তবু রা 
বায় না মধ্যরবাব্র । “তোমাকে যারা স্থান না দেয়? 

'আমাকে স্থান না দিলে স্থান কোথায় আর সংসারে? দশননাথের মডই হাসতে 
লাগল রানকৃষ। 

তুমি, মথুরবাব;, তুমি আল নেই। তবে আমাকে এখন বেলঘরের বাগানে কেশব 
ধননের কাছে কে নিয়ে খাবে? 

তি 


আমি আছ--এাগয়ে এল কাপ্তেন | 

পল । সঙ্গো দব্ীগ হন্দয়। 

গ্বাড় আমি দেব। কাস্তেন বললে । 

কাণ্তেনের সঙ্গে তার গাড়িতে চড়ে চলল রামক়ফ। চলল মাইল দুই দুরে 

স্স্্ সত 
| শুনে আি। মা হাতছানি 'দিয়ে 

রামকৃষের পরনে শু 

লাল নি পা হিলি রানার 

মজালশে 
দল ০ । যেখানে হাঁরগ্ণগান, সেখানে গুণই বা কি, 





দেবেন্দ্রনাথের ডান হাত কেশব সেন। 
পপ সোম্য, প্রশান্ত, ওজঃপূর্শ। মুখগ্রীতে ঈশ্বরাবম্বাসের লাবণ্য 
মাখানো । কণ্ঠস্বরে যেমন ভান্তর মধূরতা তেমনি প্রতিজ্ঞার তেজ। দার্টয 
৯১৪০ জপ ৩ 
চমৎকার দেয় কেশব। যেমন ই্ারাজ তেমনি বাংলা । প্রথম-প্রথম ইধারাঁজ। 
কে বব বালা! লে তর কা হা কালা বে 
রা পথের ধ্রুব জ্যোতিটি চোখের সামনে জবলতে 
দেশ তখন ভেসে বাচ্ছে। ভেসে বাচ্ছে মদে, খুম্টাঁনতে, 
দুল » খু ই্যারাঁজয়ানায়। উচ্ছমে 
্ঃ প্‌ ছদটোছ7টি করছে চার দিকে ছনটতে বা পারছে কই, 
সি পরপাজসর 
লিক আছ 
লী বাবা, নরমার, মিউনিসিপ্যালাটিতে আছি, পুলিশ 
এল ০৫ ২৫০০০ 
৯৮ 


২৩০৫৬ 


“গধবার একাদশনপ্র নিমচাঁদ বলে, সেকালে ভূতে পেত, একালে আল্মাদের দে 
পেয়েছে। ভ্রাপ্ডির নাম বোতরাছাক্সুহাসনী। আমি তাকে ছাড়তে পারি কল্তু সে 
আমাকে ছাড়ে কই? বাঁদ 'রাইম' করতে চাও তো মদ খাও। 

সে যুগে মদ না খাওয়া, মানে শিক্ষিত বলে কল্‌কে না পাওয়া। যে-কলেজ থেকে 
বেসিয়েছে পাশ করে তার নাম ভোবানো। জ্বনামধন্য রামগোপাল ঘোষের ভাখ্নে 
গ্রাজুয়েট হয়েছে 'বিন্তু মদ খায় না। ঘোষ মশায় দুঃখ করে তাকে বলছেন, 
“তুই মদ খেতে শিখাল না, তোকে আমি সমাজে বার কার কি করে? 
প্যারীচরণ সরকার “সুরাপাননিবারণী সভা” স্থাপন করলেন। মাঁদরার ম্লোত তবু 
বন্ধ হয় না। নিমে দত্ত বলছে, ও সভা বাঁদ ত্বরায় না নিপাত ছয় আম নিপাত হব। 
বড়মানৃষের ছেলে-ব্যাটারা এক-একটি করে সভ্য হবে আর আম ধেনো খেয়ে মরব 
এ হতে দেব না। এক ব্যাটা বড়মানুষের ছেলে মদ ধরলে ক্যাদশ'টি মাতাল প্রাতিপালন 
হয়-_ 

গিরীঁশ ঘোষ মদ খায়। তা নইলে না কি তার নেশা হয় না। 

ঠাকুর বলেন, “খা না--কত খাব? কত দিন খাব? শেষে যখন তোকে সে-নেশা 
ভগ্গবং-নেশায় পেয়ে বসবে তখন মদ কোথায় পড়ে থাকবে টেরও পাবি না।' 
সে-নেশা মদের চেয়েও দুদ । সে-নেশাই সর্বনাশের নেশা । 

তা ছাড়া, আরেক লক্ষণ, শিক্ষিত সমাজ সদলবলে :/বকলান মোসাহেবি শর 
করে দিয়েছে। গায়ে বালাত খেলাত, মুখে 'বালাত বুকনি। যা কিছ ইংরেজি, 
যেমন কিছু সাহেবি তাই ওঠ-বোস মক্স করো । ইংরেজের পায়ে দেশ বিকিয়ে 
1দয়েছ, ভাব-ভাষাও 'বিলিয়ে দাও। 

মে দত্ত বলছে, আই রীভ ইংঁলশ, রাইট ইংলিশ, টক ইংলিশ, স্পরথীচফাই ইন 
ইংলিশ, থিজ্ক্‌ ইন ইংালশ, ভ্রীম ইন হইহাঁলশ। 

সেইখানে ঠাকুর এলেন খাঁট 'দাঁশ বাংলার জয়ধহজা ভীঁড়য়ে। বললেন, “চার দিকে 
, বড় গোলমাল। কিন্তু গোলমালেও মাল আছে। গোল ছেড়ে মালি নেবে? 
ঠাকুর যেমন আপ্পনি অকপট তেমনি ভাষাও অকপট। 

বললেন, পতনটে “স” হয়েছে কেন বলতে পারিস? শ, ধ, স-এই 'তিন “দল” 
কেন? এই 'তন “স""র মানে হচ্ছে, স, স, স। মানে সহ্য কর সহ্য কর সহ্য 
করু। যে কোনো কাজে হাত 'দিস, বাঁসস যে কোনো সাধনায়, সহ্য করতে হবে। 
সহ্য না করলে 'সাঁদ্ধ নেই। এই সওয়ার বা সহ্য করার উপরে জোর দেবার 
জনোই তিনটে “সপ” হয়েছে । বলেই একটি ছন্দ গাঁথলেন : 'ষে সয় সে রয়, যে না 
সয় সে নাশ হয়। 


এক দিকে চাঁনির সাহেব আরেক দিকে যাগবাজারের বাব্‌। 

' থাবুর বর্ণনা দিচ্ছে নিমচাঁদি। £:1..1.25 দেখে বলছে, "তুমি যে বাধ সেজে 
বাহার দিয়ে এসেছ। মাথার মাঝখানে ?স'তে, গায় নিম্র হাফচাপকান, গলায় 
, কি 


বিলাতশ কাই চাঙর; বিপমলাগরপেত ধুতি পল, গয়াম' কালে হল সোজা 
পার, তাতে আবার ক্ষুল-কাটা গটেোর, জনতোরফিতের খবলে' গার বস, 
হাতে হাড়ের হ্যাশ্ডেল বেতের ছাড়, আঙ্গুলে দুটি আাট-_: ণ | 
ভোলচাঁদ ইংরোজতে বলছে, কাদার ইমলা 'িভ সার-ইউ সাই ফাদার ইনলা 
সার 
আর রামককের পরনে লালপেড়ে ধত, গায়ে বড় জোর একটি কনের জাম 
পায়ে কালোরার্নিশ-কল্পা চাট, বড় জোর কখনো ক্টিং হাফ-মোজা। ..... 
মাস্টারকে বললেন, সেটা দু-এক মানের জামা [দও। সকলের জমা তো পা 
না! কাপ্তেনকে বলব নে করেছিলাম, তা তুমিই দিও । 
মাস্টার বসে ছিল, উঠে দাঁড়াল। কতার্থের মত বললে, 'যে তাহের । 8: 
কল্তু ঠাকুর যখন তদ্ুলোক ছেড়ে ভাবলোকে আসেন তখন তিনি একেবারে 
দিশ্বঙ্কল! তখন 'তনি মঙ্গলায়তন হার। তখন তিনি সকলেম্বর। তাঁর ললাাটফলকে 
কষ্তূরীতিলক, বক্ষস্থলে কৌস্তভ, নাসাগ্নে নবমৌন্তিক, করতলে বেগ সর্বাঞ্ে 
হরিচন্দন। 'তানি অহেতৃক-দয়ানাঁধ। 
তখনকার 'দিনের লোকেরা প্রণাম করে না। প্রণাম করাকে কুসংস্কার ধলে। প্রণাম 
না করে বলে, গুড মার্নং। বলবার সময় তর্জনী টা. একবার একটু রপালে ঠৈকায়। 
ঘাড়টা মোটা করে রাখে, কার কাছে মাথা নোয়ার না। মাথা নোয়ালেই বেন 
মানাট খোয়া ঘাবে। 
ওরে, মাথা নত কর। যেখানে যেটুকু গুণ দেখাছিস সেখানেই তো ঈশ্বরকে দেখাছির। 
উঈ্বর যে গুপগ্র্। গুণাতীত হয়েও তিনি যে গুপণবর্ধক। সে গুণের কাছে মাথা 
নোয়া। ঈম্বরকে স্বীকার করলেই তো নিজেকে মান 'দিলি। ধার এই মান সম্ধষ্থে 
হস আছে সেই তো মানুষ বে বোঝে সে অনতের সন্তান নয়, 'অনৃতের সন্তান, 
সেই তো যথা মানশ। | 
গংককেতের মার মানে শান লেখার পাঠশালা? 5 
2 
যাচ্ছেন সেখান 'দিয়ে। 'গিরশকে দেখেই ঠাকুর প্রথমে প্রণাম করলেন । প্রপাম ফিরিয়ে 
দিল 'গিরীশ। ঠাকুর আবার প্রধাম করলেন তক্ষনি। যতযার গিরাঁশ প্রণাম ফেরার 
ততবার ঠাকুর আগ বাঁচিয়ে নতুন আরেকটা প্রপাম করে বসেন। কাঁহাতক চালানো 
ঘায় এই প্রথামের *প্রাতযোশিতা 2 ক্ষান্ত হল গিরীশ ঘোব। কিচ্তু প্রগামে 
*প838877794 
8. | 
পরশ ঘোষ বজলে, দল .৩: এ পাগলা বামলটার,সঙ্গে প্রদানে আর উর 
দেওয়া চলে না। ওর ঘাড় বাথা হয় না কিছুতে । . 
ঠাকুর জঙগব্মাতাকে প্রণাম করছেন আর বলছেন, সানগবতত বত, ভগবান, জানীর চশে 
প্রপাম, ভন্বের চরণে প্রণাম, - ৬১৭ হয়ণে প্রদান, [2 ৬০৮ উরনে তনাম 
সতীর্থ ছার। সরবত, লব প্রণাম” 5 


কলিতপিশ ঘোষ বলে, 'রাম অবতার়ে ধনুর্বাণ নিয়ে জখাজর হয়োছিল, কৃ কসবতারে 
গৎজয় হয়েছিল নংপীষবনিতে, আর রাম অরতারে জগবজর় হবে প্রণাম- 
গদ্যে । 

নাম করো আর প্রণাম ঝূরো । প্রন্কষ্টর্পে নামই তো প্রণাম । 

আরেক হাওয়া চলাছল সে বৃগে--খম্টানর হাওয়া। যেহেতু ইংরেজের ধর্ম, 
দেহেছু আর কথা নেই, মেতে যাও। 'হন্দুধম” মানে পৃতুল পুজো, স্রেফ ছেলেখেলা ! 
[শিক্ষার আলোতে এসে ও সব কুসংগ্কার মানতে কেউ রাজী নয়৷ 
গশতা-উপানষদের কেউ নাম শোনোন। চণ্ডী? সে আবার কি মাথমুস্ডু? 
চৈতন্যদেবের বাঁড় কোথায় তা কে জানে? ভাগবত? ও তো 'কথকের কথা'। 
সে ধুগে কথকের কথা মানে আবাঢ়ে গঞ্প। যাঁদ কেউ কিছ? আডীগ্যাব কথা বলে, 
ভদুলোকেরা অমনি বলে বসে--এ কথকের কথা । ভদ্রলোকেরা শেঃনা না কথকতা । 
তার চেয়ে গাঁজায় দম দেওয়া ভালো । 

তবে তোমরা পড় কি? 

পাদাররা বাঁড়-বাঁড় বাইবেল দিয়ে গেছে, তাই পাঁড় এক-আধটু। ইংরোজতে 
লেখা, বেশ বোঝা যায় সহজে । 

দেশের কতগুলো মাথাল লোক খ্টান হয়ে গেল। দেখাদেখি আরো অনেকে । যেন 
একটা হুজুগ পড়ে গেল। গা ভাসিয়ে দিল গনড্ডলিকায়। 

বাঙাল পাদারর দল বেরুল গাঁলর মোড়ে, হেদোর ধারে, কেন্ট বন্দ্যোর গিজের 
কোণে। কালাপাহাড় মুসলমান হয়েছিল, এরা হল শাদাপাহাড়। এদের ধর্মের 
মধ্যে কর্ম শুধু হিল্দু 04474, গাল পাড়া । সব চেয়ে বাল বেশি কালণী আর 
কৃফের উপর । কালী ন্যাংটা আর কৃ ননঈচোর। 

শ্রোতায় দল মেতে ওঠে। এক কথায় বাপ-পিতেমোর ধর্মকে নাকচ করে দেয়। 
হিন্দুধর্ম একটা কুসংস্কার। ছত্রিশ রকম জাত মানে। স্মীলোকে আর বাসনকোসনে 
তফাত রাখে না। পালাকিতে বাঁসয়ে পালকি-শুম্ধ জলে ডুবিয়ে গঞ্গাস্থান করায় 
মেয়েদের। বিনি অনন্ত তাকে কি না নিয়ে এসেছে ঘটে-পটে, মাটির ডেলায়। 
আর দেবতাও একটি-দুটি নয়, তেমিশ কোটি। 

অত হিসেব সামলাতে পারব না। পাদারর কথাই ঠিক। ঈশ্বর এক আর নিরাকার । 
আর ঈশ্বরের অবতার যীশুখন্টই একমাঘ সমৃদ্ধর্তা। 

গির্জের খাতায় নাম লেখাতে লাগল দলে-দলে। যেহেতু খ্ঙ্টান হলাম সেহেতু 
সাহেব হয়ে গেলাম । তাই নিয়ে এসো মদ, নিয়ে এসো নিষিদ্ধ মাংস। 

একেই বলেছে, 'জাত মাল্লে পাদার এসে, প্যাট মাল্লে নীল বাঁদরে। 

এখন এর উপায় কি? লব যে যায়! 

ধর্দে। আর কেশব লেগে গেজ প্রচারণায় । বন্তৃতা 'দিয়ে ফিরতে জাখল। শুধু 
বন্তুতা নয়, ধার করল একাধিক পল্লিকা। 

উল্জাগ্গামদরা একট: এঘকে দাঁড়াল 

১০ 


খষ্টধর্স আর 'হন্দযর্মের অথো একটা আপোষ ঘটালো কেশব দেন। মাত দে 

করে দাও, নিয়ে থাকো ভান্তর ভার্বটি। ঘখশ্যাবহশন খীশ্যর ধর্ম গ্রহ করো। 

তুলে দাও জাতিভেদ আর যাঁদ দেশের মানত আত্মার ম্যান্ত চাও, মি দাও 

স্লীজাতিকে। 

বেশ ভাব। ইংরেজের ধর্ম খুষ্টানও আছে, বাপ-পিতেসোর ধর্ম 'হন্দয়ানিও আছে । 

চলো ব্লাহমসমাজে গিয়েই নাম লেখাই। 

কেনারাম ডেপুটিকে জিগগেস করছে নিমচাঁদ : “তুমি তো ব্রাহম হয়েছ, 'হজ্দু- 

শাপ্মের তেতিশ কোট দেবতার সব ত্যাগ করেছ, না, দ্াট-একটি রেখেছ, সাত 

দোহাই তোমার, যথার্থ করে বলো"; 

কেনারাম বললে, 'আম কেতাব না দেখে উত্তর 'দিতে পার না। আপাঁন ভারি 

শন্ত প্রন করেছেন-_ 

পর ব্যাটা ঘাঁটরাম, নিমচাঁদ ঝাঁজয়ে উঠল : “তুমি ব্রাহরধর্ম যত বৃঝেছ তা এক 

আঁচড়ে জানা গিয়েছে । যখন ভ্রাহনধর্মের সর্ত হচ্ছে একমেবাদ্বতীয়ম্‌, তখন 

তেত্রিশ কোটি দেবতার সব ত্যাগ্ধ কারচিস কি না, বলতে কতক্ষণ লাগে?” 

কেনারাম চিন্তিত মুখে বললে, 'একটি-আধাঁট ঠাকুর হলে খপ করে বলা বায়, 

তোন্িশ কোটির কথা বাঁ করে বলা যায় না-জানি কি, যদি দুটো-একটা রাখবার 

মত হয়! 

ব্রাহনধর্ম বুঝুক আর না বুঝৃক, লোক তো আগে 'ফিরুক পাদরিদের খস্পর থেকে । 

হহজুগটা তো বন্ধ হোক। 

কেশবের বাণ্মিতায় আর ধর্মসাধনায় বিশ্বাস ফিরে এল উদ্ভ্রান্তদের। ঝাড়াই- 

বাছাই করে যাঁদ দেশের মাঠেই পাই তবে কেন আর যাই বিদেশের মাটিতে । 'কিল্তু 

ব্াহমসমাজে নাম লিখলেই তো শুধু চলবে না, নিতে হবে নীতি আর পাঁব্ততার 

পাঠ, সতানিষ্ঠা আর পরোপকারের রত । ব্যাড অফ হোপ" নামে এক দল খুলল 

কেশব। মদ-তামাক খাব না। ছোঁব না 'নাষিম্ঘ মাংস। 

রি সিদারার : তুমি বসো, আমি তোমার শ্রাম্ধের আয়োজন করে 

রত 

নিমে বললে, 'ব্রাহন্রমতে কোরো বাবা । অনেক বৃষ পার করেছি, এখন আর বৃষ 

উৎসর্গ ভালো লাগবে না। 

এর পর আবার আরেক দল উঠল যারা ঠাকুর-দেবতাও মানে না নিরাকার রহাও 

বোঝে না। তারা নাস্তিক, সংশয়ে ছিমবাচ্ছত্। কোনটা যে ধরবে 'ঠিক করতে 

পারছে না। হাল-ছাড়া নৌকো মতো দিশেহারা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আরেক 

দল উঠল, হারা প্রত্তাক্ষবাদশ। ধর্ম ধার ধারে না, ইন্দিয়ের বাইরে জানে না 

আর কোনো অনুভূতির আঁ্তস্ব। ' 

চার দিকে বিগঞ্খলা, অশাঞ্তি, একটা ঝোড়ো হাওয়ার এলোমেলো ধুলো । 

আমন সময় ঠাকুয় এলেন। সলাতন ধর্মের শাম্বত জ্যোঁতির 'স্লিশ্ধিতা লিয়ে, 

বম্বাবস্তীথ উদায় উল্গতি লিয়ে। শহল্দহর্মের উজ্জহলল্ত প্রতীক ছয়ে, 
৪৩ 


নিগগণলত গাষ্য হয়ে। নিয়ে এজেন শান্তি, সানা, দামজস্য। নিয়ে এলেন স্পা, 
সহি, সমম্যর। খণ্ডের ঘরে ক্র ঘরে রইলেন নচ, এলেন একেবারে তুবনচ্োড়া 
আসন মেলে। 

ক এলেন সভ, শোঁচ হয় শান্তি, হাষ, সল্তোষ আর আরব শম ধম 
৮ 
ভঙ্গরান ভূতভাবন 'হল্দুধর্মের মল্মাঙ্কিত পতাকা নিয়ে 'অবতীর্ণ হলেন 
দ::$21 ষদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবাতি ভারত--হতপ্রভ সূর্য উদ্দীপিত 
হল? ঠাকুর মৃতদেহে নিশ্বাস সম্ভার করঙেন। রলমে-কুমে সপ্ঠার (করলেন আশ্বাস 
রর নিরিরটাানিরাসনিরারউারদাররালা নার 


পনির দুটির ারানানি হ্রনুজান কাত লোকে তার 
ন্ধাটর খবর পায় কি করে? ফুল তো ফ:টলেই চলে না, চাই গজ্ধবহ সমীর । 
যে বলবে, দেখ, কেমন ফুল ফুটেছে; আর, শোনো, আমার সঙ্গ ধরো, দেখবে 
চললো, কোথায় ফুটেছে এ ফুল! আম নিয়ে এসোঁছ সেই কাননের ঠিকানা। 
কেশব সেনই সেই গন্ধবহ সমীরপ। 





কেপব সেনকে রামকৃফ প্রথমে দেখে জাঁদি সমাজে, সে অনেক আগে। মসজিদ 
ঘুরে) গিজে ঘুরে গিয়েছিল এক দিন রাহমসভায়। গিয়ে দেখে বেদীর উপর 
চার পাশে অনেক লোক, মাঝখানে কেশব। ধ্যান করছে চোখ বুজে । 
'জোড়াসাঁকোর দেবেন্দের সমাজে গিয়ে দেখলাম, তাকের উপর ক'জন বসেছে, কেশব 
মাঝখানে । দেখলাম যেন কান্ঠবং। সেজবাব্‌কে বললাম, যত জন ধ্যান. করছে তার 
মে এ ফেশৰ ছোকরারই ফাতনা বেছে ও কি সে ছেলে? লেখাপড়া নেই 
বাপের ধার মেনে নে এক কথায়? অন্য ছেলে হলে মানত 2. ডি ূ 
িস্তু চোখ ধুজেই বা ধ্যান করতে হবে:কেন? চোখ চেরেও ধ্যান হয়। রাখা 
কট্‌ছে তু ধ্যান। যেমন ধরো দাঁতের ব্যথা। সব কাজ করছে 'কিন্তু মন রয়েছে 
দরদের্‌ দিফে। চোখ চেয়ে আছে, কথা কইছে, কাজ করছে, কিন্তু মন রয়েছে 
হি রি 


বান দ্ধ হয়ে তিনিও আমাকে চাল, আও তাঁকে চাই, তব বরতে পারা 

না, মিলতে পারছ না-ঞ কি কম বন্ম্া? 

বার জন দয় থেকে দেখা নয়, কাছে এসে বঙ্গ, আলাপ 'করা, অন্তরের অঙ্গ 
হয়ে. যাওয়া। তার আগে কেশবকে এক 'দিন স্বশ্নে দেখেছিল রামরুফ। মাই. 

জাবরোদিরন। কেন দেন দেখার! অর হকের মালার রা । জাই 

ব্যধিযে দিরোছিলেন। পেখন' হচ্ছে কেশবের শিবামশ্ডল আর মনো হচ্ছে তায 

"15850477: দীপ্তি । 

সকাল বেলার দিকে কেশব তার শিতযবন্দ নিয়ে গরুর বাঁধাঘাটে বসে আছে, 

হৃদয় আস্তে-আস্তে' কাছে এল। বললে, 'আমার মামা আপনার সঙ্গো দেখা 

করতে চান! 

কে আপনার মামা? 

চিএ পৃঃএজিনিন্ও িন্রাটিন্রিন রব 

আছেন এই হরিকথায়। যেখানে হরিনাম পান হ'রিভন্ত পান সেখানেই গিয়ে উপস্থিত 

হন। হারগ্গান শ্দনে তাঁর ভাবসমাধি হয়। আপানি এখানে হারনাম করতে 

এসেছেন জেনে আপনার সঙ্গো দেখা করতে এসেছেন। 

“কোথায় তানি? 

“গাড়িতে বসে আছেন। 

শনয়ে আসুন নামিয়ে । কেশব বাদ্ত হয়ে উঠল। 

হব গিয়ে নামিয়ে নর এল কামককফকে। সবাই রামকৃফকে দেখবার জন্যে উতর 

হয়ে রয়েছে। দেখে হতাশ হবার ভাব করল। ও! এই? এ তো এক জন সাধারণ 

লোক। আজেবাজে পাঁচ জনেরই এক জন। | 

রামকৃষ্ণ বুঝতে পেরেছেন কোন জন কেশগব। বুকের ভিতরে তারে-তারে সুর বেজে 

উঠল। কেশবের কাছে আসবার আগে নারায়ণ শাস্মণকে. পাঠিয়েছিল একবার 

রামকৃফ। বলেছিল, তুমি একবার যাও, য়ে দেখে এস তো ফেমন লোক। নারারগ 

দেখে এসে বলপোঁছল লোকটা জপ সম্ঘ । 

রামকৃফ কেশবের কাছটিতে চলে এল। বললে, 'বাব জনন পর 

থা তে এনোইছি। তোমরা না ক দেখেছ ঈদ্বরকে? সে কেমনতরো দর্শন 

আমাকে একটু বলবে৮ 

বেশ ত্র মত ভাবিয়ে রইল রক িকে। এ সে কা ছে? কে 

দেখছে? বললে, 'আপনি বলুন 2. | 

নিরার জয্ারা রন | 

রে বকে জানে কাল কে, 2 

4 হডরশনে না পায় দরশন,. 

যব মলাধারে সহশ্রারে ৃ 

18... * সফাকোগণ করে অনন।,. 


ঘটে ঘটে বিয়াজ করেন 
ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছা যেমন ॥ 
মায়ের উদরে ব্রহ্রাপ্ড-ভাপ্ড 
: প্রকাণ্ড তা জানো কেমন, 
মহাকাল জেনেছেন কালীর মম” 
অন্য কেবা জানে তেমন। 
প্রসাদ ভাষে লোকে হাসে 
সম্তরণে সিম্ধ তরণ॥, 


গাইতে-গাইতে রামকৃফের সমাধ হয়ে গেল। উপাস্থত সকলে ভাবলে এ ব্যাঝ 
একটা ঢং মস্তিচ্কের বিকার । কিংবা হয়তো লোকটার মূখ আছে। 

রামকৃফের কানে হূদয় প্রণব-মল্প্ উচ্চারণ করতে লাগল। হি ৩! হাঁর ৩! 
ধীরে-ধীরে রামকফের মুখ প্রসন্ন পাত্র হাস্যে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। যে 
আস্বাদন করে এসেছে, অবগাহন করে এসেছে এ তার মূখ । এ মুখ উপলাব্ধির, 
সমাপান্তর। জ্ঞানানন্দ, বোধানন্দ আর 13-%4-4র সংমগ্রণ। | 
এ মুখের বিভা দেখে অভিভূত হয়ে গেল সকলে। 

অন্ধেরা হাতি দেখে এল ছ:য়ে-ছংয়ে। এক জনের হাত পড়েছিল পায়ে, সে বললে, 
হাতি ঠিক থামের মতো। আরেক জনের হাত পড়েছিল পেটে, সে বললে, জলের 
জালার মতো। দূর, কুলোর মতো কানে হাত রেখোঁছল যে তৃতীয় জন, সে 
বললে। 


“ভাবলে ভাবের উদয় হয়। 
ধেমনি ভাব তেমনি লাভ মূল সে প্রত্যয় । 


গ্রাছে এক গিরাঁগটি থাকে। এক জন তাকে দেখে এসে বললে, একটা সুন্দর লাল 
রঙের জানোয়ার দেখলাম । আরেক জন বললে, ভূল দেখোছিস, লাল নয় নীল। 
তোরা তো খুব জানিস! আমি স্বচক্ষে দেখে এসেছি আজ সকালে, 
হলদে। বললে তৃতীয় জন। কাকে যে তোরা কশ রঙ বাঁলস কিছু ঠিক নেহা? 
বিদ্ুপ করে হেসে উঠল চতুর্থ জন। ভ্রেফ সবৃূজ, একেবারে কচু পাতার রঙ। 
 মহাবিরোধ উপস্থিত। সবাই মিলে চলল সেই গাছের নিচে। গিয়ে দেখে এক 
জন লোক বসে আছে সেখানে । তাকে সবাই ধরলস। আপাঁন তো এখানকার 
বাসিন্দা, বঙ্গুন জানোয়ারটার কী রঙ? যে যেমন দেখ তেমনি। তোমাদের 
কলের কথাই ঠিক, ও কখনো লঙ্জ কখনো নীল কখনো হলদে কঞ্ধুনো সবূজ। 
ওটা বহদরেপী। আবার কখনো-কখনো দেখা যাবে ওটার একদম রঙ নেই। ওটা 
 বর্গহীন, 'নর্থদ। 

সবাই তুক্জর হত শুনতে জাখল রামক্কফকে। 

৬৪ 


ভন্ত ধে রুপাঁট ভালোনামে ভগবান সেই রুখ্ণটি ধয়ে দেখা দেন। এক জনের এক 
গামলা রঙ 'ছিল। অনেকে আসত তার কাছে কাপড় রঙ করবার জন্যে । যে যে-র 
চায় তার কাপড় সেই রঙে ছুপিয়ে দিত। এক জন দেখাঁছল এই আশ্চর্য ব্যাপার । 
তাকে রগওয়ালা দ্বিগঞ্গেন করলে, তোমার কী রঞ্ড চাই? সে বললে, 'ভাই যে 
রঙে রঙে আমায় সেই রঙ দাও ।, 
কী গভীর কথা কেমন দরদ করে বলছে রামকৃফ। স্নানাহারের বেলা হয়ে গেল' 
তবু কারু ওঠবার নাম নেই। 
নিরাকার জ্ঞানের সাধন, সাকার ভন্তির। ভান্তর কাছে নিরাকার এনো না, কিছু 
দেখতে না পেলে ধরতে না পেলে তার ভান্তর হানি হবে। সাকার থেকে চলে 
আসবে নে নিরাকারে। আগে হয়তো দশভুজা নিলে সে মৃর্তিতে বেশি এম্বর্ধ। 
তার পর চতুর্ভূজ। তার পর দ্বিভুজ। তার পর গোপাল-_বালগোপাল। এ্বযের 
বালাই নেই, কেবল একটি কচি ছেলের মাার্ত। তার পরে আরো ছোট হয়ে 
গেল- একাট শিবলিষ্গ বা শালগ্লাম। তার পর? আর দরকার নেই রুপে। প্রতপক 
তখন প্রত্যক্ষের বাইরে। তখন মহাব্যোমে একটি অখণ্ড জ্যোত। দেই জ্যোতি 
দর্শন করেই লয়। 
কিল্তু, তার পর? ধ্যান যখন ভাঙবে ? জ্ঞানের পর কোথায় এসে দাঁড়াবে? দাঁড়াবে 
এসে প্রেমে। তখন আবার সাকারে চলে আসবে। তখন দেখবে সমস্ত জীব 
ঈশ্বরের প্রাতভাস। জীবের আকারে ব্রহন বিচরণ করছেন। তখন ব্লহেনাপাসনা 
মানে জীবোপাসনা। আর জণবে যা প্রেম ঈশ্বরে তাই ভন্তি। আর, তন্তির প্রগাঢ় 
পারপক অবস্থাই প্রেম। 
উপাসনার ঘণ্টা বাজল। এখন উঠতে হয় এই আড্ডা ছেড়ে। 
কে ওঠে! কোথায় আবার উপাসনা! ভগবানের কাছটিতে বসাই তো উপাসনা। 
এ কি আমরা ভগবানের কাছটিতে বসে নেই? 
বেদাল্তের 'বিচারে ব্রহনন নিগ্ণ। তাঁর কী স্বরূপ কেউ বলতে পারে না। কিল্চু 
যতক্ষণ তুমি সত্য ততক্ষণ জগংও সত্য। ঈশ্বরের নানা রূপও সত্য। ঈশ্বরকে 
ব্যান্তবোধও লত্য। 
দই সত্য। নিরাকারও সত্য, সাকারও সত্য। কবীর বলত, নিরাকার 'আমার বাণ, 
সাফার আমার মা। তুগি কাকে ছেড়ে কাকে রাখবে? 
নানা রকম পূজা তিনিই আয়োজন করেছেন, অধিকারী ভেদে । যার যেমন পেটে 
সয় তেমনই তো পাঁরবেশন করবেন। বাড়িতে যাঁদ বড় মাছ আসে, মা নানা রকম 
মাছের তরকারি রাঁধেন-যার যেটি মুখে রোচে। কারু জন্যে মাছের টক, কার 
জন্যে মাছের চচ্চড়ি, কার্য জন্যে মাছ ভাজা । যোট বার ভালো লাগে, ঘেটি ধার 
গেটে সয়। সই সেই মৎসাম্বাদ। 
আমাদের হলধারণ 'দিনে সাকারে আর রাতে নিরাকারে খাকত। তা থে ভাবেই 
থাকো, ঠিক-ঠিক বিশ্বাস হলেই হল। বিজ্যাস, বিশ্বাস, 'বষ্বাদ। গর খলে 
দিয়েছে, রামই সব হয়েছেন--ওছি রাম ঘট ঘটমে লেটা। কুকুর এনে হাটি খেয়ে 
২% 


ধাচ্ছে। ভন্ত বলছে, 'রাম! দাঁড়াও, দাঁড়াও, রুটিতে ঘি দেখে দিই গৃর্বাক্যে 
ক্্থান বিদ্বাস! 

কিস্তু বাই বলো, নাকারই বলো :3:% বলো, তিমি রয়েছেন এই খোলের 
আধ্যেই। হরিণের নাঁডতে কষ্তুরী হয়, তখন তার গন্ধে হরিপগুলো দিকে-দিকে 
ছুটে বেড়ায়, জানে না কোথেকে গন্ধ আসছে। তেমাঁন ভগবান এই মানুষের দেহের 
'আধ্যেই রয়েছেন, মানুষ তাকে জানতে না পেরে ঘুরে-ঘুরে মরছে। 

এ কি, আজ ি আর কোনো কাজ হবে না না কি? সবাই এমানি বসে থাকবে 
সারাক্ষণ? মগ্গামুগ্ধের মত বসে আছে। মল্মৃণ্ধের মত চেয়ে আছে। চার দিকে 
"ধু আনন্দের চেউ। 

+এ যেন গরুর পালে গর এসেছে । বাঁকের কই মিশেছে বাঁকে এসে। তাই এত 
জহর পড়েছে চার দিকে । 

কেশব ভান্ততে অভিভূত হয়ে পড়েছে। এমনটি তো সে কই ভাবোনি। এ যে 
'একেবারে 'আদিত্যবর্ণৎ তমসঃ পরস্তাৎ।' ভূমার অখণ্ড অভ্যুদয় । প্রণামের রসে 
'আগ্লদত হল কেশব। নিজেকে বালকের মতন মনে হল। 'চানির পাহাড়ের কাছে 
ক্ষুদ্র এক 'পপশীলকা। 

নিশ্চয়ই ঈশ্বর দেখেছে, পেয়েছে, হয়েছে। নইলে এমন লব কথা কয়! কথায়-কথায় 
'এমন একটি ভাব আনে! এমন সব সহজ করে দেয় সহজে । 

তর্কের জায়গা নেই, প্রশ্ন সব ঘুমিয়ে পড়েছে। সন্দেহ মাথা তুলতে পারছে না। 
"চোখের সামনে বসে আছে যেন প্রত্যক্ষ প্রমাণ। সর্বশেষ উপলাব্ধ। 

উঠল রামকৃফ। যাবার আগে কেশবকে বললে, 'তোমার ল্যাজ খসেছে। 
কেশব তো অবাক। 

ব্যাঙ্ডাচির যাঁদ্দন ল্যাজ থাকে তাঁন্দন জলেই থাকে, ডাঙায় উঠতে পারে না। কিন্তু 
ল্যাজ যখন খসে পড়ে তখন জলেও থাকতে পারে, ভাগায়ও উঠতে পারে। তেমান 
মানৃষের বদ্দিন আবিদ্যার ল্যাজ, থাকে তাঁ্দন সে সংসার-জলেই থাকতে পারে, 
ব্হনস্থলে উঠতে পারে না। ল্যাজ খসে পড়লেই সংসার ও সারাৎসার দুই জায়গায়ই 
সে থাকতে পারে। তুমি তেমনি সংসারেও আছ সাঁচ্দানন্দেও আছ্। 

সংসারে থেকে যে তাঁকে ডাকে সে বারভন্ত। যে সংসার ছেড়ে এসেছে সে স্তুঢা 
ডাকবেই--ডাকবার জন্যেই এসেছে, তাতে তার বাহাদুরি 'ফি। সংসারে থেকে যে 
ডাকে, সে বিশ মণ পাথর ঠেলে দেখতে চায়, সেই ধন্য, সেই বাহাদুর, সেই বার- 
পণ্রদ্ষ। 

রামকৃফ চলে গেলে এ ওর মুখ চাওয়া-চাও্াঁয় করতে লাগল। এই সহজ সন্দরাট 
কে? কে এই সদয়হদয় ? কে এই মায়ামানুষবেশশ? 

চলো যাই সভ্ভা করে দবাইকে বাল গে। আঁখিল অধুরের খানি আঁধপাঁত তিনি 
'াসেছেন ধ।ক্ঘেম্বহে। 

তুমি কি তাঁকে চোখে দেখেছ? সবাই 'ঘিরে ধয়ে কেশরকে। 

চোখে দেখোঁছ। দুই চোখে তাঁকে কুলোর না। চল তোর়াও দেখাব চল। 

খ্ 





দক্ষিণেন্বরে চর পাঠিয়ে দিল কেশব। লক্ষ্য করবে রামকৃফকে। চোখে চোখে 
রাখবে। রাত-দিন পাহারা দেবে। ঠিক-ঠিক খাঁটি কিনা, না, আছে কিছু 
বুজর্দকি। 

হ্যাঁ, ভালো কথা, বাজিয়ে নাও, যাচাই করে নাও । পরের মৃখের ঝাল খাবে কেন? 
কেন মেনে নেবে শোনা কথা? নিজে এসো, বসো, দেখ পরখ করে। তাব-্তম 
করে দেখ। 

কিন্তু পরাক্ষার পর প্রমাণে দি পাঁরতৃস্ত হও, তখন কণ হবে? কোন 'দিকে বান্না 
করবে? 

তিন জন রাহন-ভন্ত এল দক্ষিণে্বরে। তাদের মধ্যে এক জন প্রসন্ন । পালা 
করে রাত-দিন দেখবে রামকৃফকে আর কেশব সেনকে রিপোর্ট দেবে । পোশাক 
আর আটপৌরে এমন কিছ ভেদ আছে নাকি রামকৃফের। সে মনে-মুখে এক 
কি না। সে কি সাঁত্যই জিতাসন, জিতশ্বাস, জিতেন্দুয়? সে কি সাঁতাই 
পরিমুস্তসঙ্গ ? 

রামকৃষের ঘরের মধ্যে চলে এল সটান। বললে, 'রাপ্লে আমরা ও-ঘরে শোব। 

বেশ তো, শোও না! ঢালাও নিমন্মণ রামকৃষের। 

িল্তু শ্াঁব তো চুপ করে শুয়ে থাক। তা না, কেবল 'দয়াময়, 'দয়াময়' করতে 
লাগল। নিরাকার না, তাই ঈশ্বরের দগ্না ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ে না। 
তাঁর এশ্বই তো দয়া। সূর্যের এশ্বযই যেমন আলো । সূর্যকে যাঁদ 'আলোময়' 
'ন্রলাময়। বলা যায়, কিছুই বলা হয় না। নতুন.িছ; বল। ডাকার মগ্ন 
করে ডাক। যে-ডাকে শুধু দয়া দেখাতে আসবে না, ভাঙ্গোবাসায় গলে জল হয়ে 
যাবে। 

ব্রাহম-ভন্তরা কেশবের স্ভুতি আরম্ভ করঙগ। বলল, 'কেশববাবূকে ধরো, তা হলেই 
তোমার ভালো হবে। 

পঁকল্তু আম যে সাকার মানি।, 

আঁম যে না বলে ভাকি। মাকে বাঁদ মিযাকায় কার তবে অমন কোলটুকু পাব 
'ি করে? ফি করে দেখব তবে সেই সখশ্রসম্ন বদনের স্নেহমন্ন সুষমা? 

মা কি আমার গামান্য ঃ মা আমার অসল্তযযাশপপপ । মা আমার কালানপ্যামলাঞ্ন, 
বগালতাচকা, খা । মহানেখপ্রভা, ্মনানালরবালিনশ। বলতে চাও, 
ৃ ২. 


পন পাটি আদি দেখব না লরদ রে? দেখব না তে, অসার দরন হন 
জে কমল ক বলছে দে, পরকেনতে জেনো না ভবে 
জীন | 


নমর আলো করে কার কামিনী! : 
সজল জলদ 'জানয়া কার 

দশনে প্রকাশে দামিনী॥ 
এলায়ে চঁচির চিকুর পাশ. 

সুরাসূর মাঝে না করে রাস, 
অট্ুহাসে দানব নাশে 

রণপ্রকাশে রঙ্গিণী ॥ 
দিবা শোভা করে শ্রমজ বিন্দু 

ঘন তনু ঘোর কুমনদবন্ধু 
অমিয় িম্ধু হেরিয়ে ইল্দু 

মলিন, এ কোন মোহিনী 
এ 'কি অসম্ভব ভব-পরাভব 

পদতলে শব সদৃশ নীরব 
কমলাকান্ত কর অনুভব 

কে বটে ও গজগামিনী॥ 


এই রণরামা নশরদবরণণধকে দেখব না আমি? আহা, দেখ, দেখ, শোপিত-সায়রে 
যেন নীল নাঁলনী ভাসছে! 

তব্হও ব্লাহনর-ভন্তরা কেবল 'দয়াময়' 'দয়াময়' করে। ঘনমদূতে দেবে না রামকৃকে। 
তখন রামকৃফণের ভাবাবস্থা হল। সেই অবস্থায় আরুঢ় থেকে বললে, সেই 
ভঙ্বদের : 'এ ঘর থেকে চলে যাও বলাছি।, 

হিরাদারা লা রগগান্রিরাজ গাগা যার 
তন বারান্দার 'গয়ে 

জগতকে এন তি নিম্ন দু এর নে রকছ 
রামকৃফকে, ঠিক করলে রাতের বেলাও দেখে যেতে হবে । দেখে যেত হবে রাতেও, 
এ স্ব সমপ্রভই থাকে কিনা। কোটিতে ছাঁপ-ছুপি রইল চোখ মেলে। দেখজ 
এ সূর্যের উদয়াচলই আছে, অস্তাচল নেই। | ৃ 
আমাকে সঙ ছাতে বাঁজরে নব, বেমম জরে শানের উপরে মহাজনে টান বাজার 
'বেপারী যেমন তীক্ষ] চোখে দেখে নেয় মালের ট;টা-ফনটা। ভন্ত হয়োছিস বঙ্ে, 
বোফা হাব কেন? যুঝো-সুযে বেখে-পনে নব সল্দেহই যা রাম তব 
সন্ধান জানাব কি করে? .. নর ৃ 


0. ও 


লরেচ্ছু 1.5 এসেছে। ঠাকুরের ঘরাটিতে গিয়ে দেখে, ঠাকুর নেই। কোথায় 

তান? কলকাতার শিয়েছেন। ফিরবেন কখন? এই এলেন বলে। 

তা হোক, এই সোনার সময়। দেখা যাক কেমন তাঁর সোনার উপর বিতৃষা! 

খর ফাঁকা হতেই পকেট থেকে একটা টাকা বের করলে নরেন। ঠাকুরের বিছানার 

নিচে আলগোছে ল্যাকয়ে রাখলে। সে-তল্লাটেই আর রইল না তার পর। সিধে 

চলে গেল পণ্ঠবট। কেউ যেন ঘূণাক্ষরে না টের পায়! 

কতক্ষণ পরেই ফিরে এলেন ঠাকুর। দেখতে পেয়েই নরেন এগিয়ে এল তাড়াতাঁড়। 

এবার বোঝা যাবে কফাণ্চনত্যাগের মহিমা। ঘরের মধ্যে আগে-ভাগে ঢুকে ঠিক 

কোণাঁট বেছে দাঁড়য়ে রইল চুপচাপ । 

যেমন নিত্য বসেন তেমনি বিছানায় এসে বসলেন ঠাকুর। 'কিল্তু গা ঠোঁকয়েছেন 

ক না ঠোঁকয়েছেন চশৎকার করে উঠলেন। যেন জলন্ত অঙ্গারের উপর বসেছেন 

এমান দগ্ধকর যন্ণা। কী হল? ল্রস্তব্যস্ত হয়ে চারাদকে তাকাতে লাগল 

সকলে। বিষান্ত কিছু দংশন করল নাকি? কই, বিছানায় কিছু দেখা বাচ্ছে 

নাতো! 

ঠাকুর সরে দাঁড়ালেন খাটের থেকে। কাছাকাছ যারা ছিল সবল হাতে ঝাড়তে 

লাগল বিছানা । টং-্টং করে হঠাৎ একটা আওয়াজ হল মেঝের উপর। ওটা 

কি? ওটা একটা টাকা দেখছি না? বিছানায় এল কি করে? 

নরেন তাড়াতাঁড় চলে গেল ঘর ছেড়ে। 

রর রক সটান রারী রা নীরা রা 
। 


বেশ তো, নাবই তো পরাক্ষা করে। কত পরীক্ষা করেছেন মথ্রবাবু। ফাঁকা 
ঘরে মেয়েমানুষ ঢুকিয়ে দিয়েছেন, বলেছেন জামদারির খানিকটা তোমাকে 'লিখে 
দ। তোদের যার যেমন মন চায় যাচাই করে নে। যা চাই তা পাব কিনা--এ 
জিজ্ঞাসায় যখন এসোছস তখন যাচাই করা ছাড়াব কেন? 

তোদের সকলের সন্দেহ নিরসন করে নে। চলে আয় সতোর স্থিরতায়। 
সিদ্ধান্তের শাঞ্তিতে। 

দক্ষিণেশ্বরের জমিদার নবীন রায়চোৌধূরীর ছেলে যোগশীন। বিয়ে করেছে, তবু 
রোজ রাতে বাঁড় যায় না, প্রায়ই ঠাকুরের কাছটিতে পড়ে থাকে । যখন আর-আর 
ভন্তরা কাছে-ভিতে কেউ নেই, তখন ফাঁকতালে ঠাকুরের কোনো কাজে লেগে যেতে 
পারে কিনা, তারই আশায় জেগে থাকে। 

সেদিন সন্ধে হতে-না-হতেই ভন্কেরা বিদ্যায় নিয়েছে। যোগশন ধসে আছে 
একলা টি। 

শর রে, বাঁড় যাবি না? 

কেউ আজ নেই আপনার কাছে। ভাবাছ, আমিই তবে থেকে যাই রাতখানা। 
ঠাকুর খুশি হলেন। দাত দশটা পর্যপ্ত আলাপ করলেন একটানা । আলাপেন্ন 
বিষয়ও সেই একটানের বিষয় । অটনেন্জনীনে সেই এই ঈস্বরের দীন । 


ত% 


ফ্ুয়ে পড়লেন তাঁর বড় খাউটিতে। দেই ঘরেই মেঝেতে বিছ্ান্মা পাত যোগীন। 
মাঝ রাত। ঠাকুরের একটিবার বাইরে যাবার দরকার হল? তিনি তকালেন 
ভযাগীনের দিকে। অঙ্বোরে ঘুমৃচ্ছে ছেজেটা। কেমন মায়া হল ঠাকুরের, ডেকে 
হুম ভাঙলেন না। নিজেই দোর খুলে বৌরয়ে গেলেন। একা-একা চলে গেলেন 
বাউতলা। 
খানিক পরেই হম ভেঙে গেল. যোগণীনের। এ (বি, ঘরের দরজা খোসা কেনঃ 
ঠাকুর ফোথায় ; বিছানা শূন্য। এত রাব্রে কোথায় গেলেন তিনি একা-একা? 
শ্লাড়ং-গামছা তো সব 'ঠিক-ঠিক জায়গায়ই আছে। আর, তাই ।যাঁদ যাবেন, তবে 
তকে দাঁড়িয়ে দিতে নিয়ে গেলেন না কেন সঙ্গে করে? তবে বোধ হয় চাঁদের 
আলোয় একটু বেড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। গঙ্গায় ঝিরাঁধরে হাওয়া দিটয়ছে।. | 
কই, গঞ্গার কাছাকাছি কোথাও [তিনি নেই তো! যোগান বাইরে এসে উৎসৃক 
চোখে দেখতে লাগল চার দিক। কোথাও সাড়াও নেই শব্দও নেই। হঠাং বুকের 
মধ্যে ধাক্কা খেল যোগণীন। ঠাকুর লুকিয়ে তাঁর স্তর কাছে নহবৎখানায় যাননি তো £ 
ভয় করতে লাগল যোগীনের। দিনের বেলা তিনি যা বলেন রাতের বেলা তানি তা. 
- পালন করেন না? ভুবেনডুবে জল খান ? 
না, এর. একটা হেস্ত-নেস্ত দেখে যেতে হবে। নহবংখানার কাছাকাছি এগিয়ে 
গেল যোগাঁন। নিজ্পলক চোখে চেয়ে রইল দরজার 'দিকে। ব্যাপারটা অন্যায় হচ্ছে 
তব্;,নিশ্চল্ত না হওয়া পর্যন্ত মৃন্তি নেই, 
কা এরা উর রাড রাডার মারেন রা রা ডান বা 
ঝোগীন। পথ ভুলেও আসবে না এ তল্লাটে। 
গমস্ত আকাশ-বাতাস যেন নিশ্যাস রুদ্ধ করে আছে। একটি গাছের পাতাও 
নড়ছে না। উৎসুক একটা প্রতীক্ষা মুহূর্তের মালায় স্তথ্ধঘতার মন্ত্র জপ করে 
চঙ্লেছে। যিনি অচ্যুত তিনি যেন এখ্যান বিচ্যুত হয়ে পড়বেন! 
চ্উস্টট--চাঁট, জুতোর আওয়াজ শোনা গ্েল। কে ধেন আসছে পণ্/বটীর ওদিক 
থেকে। কান খাড়া করল যোগান । এ তো সেই পরিচিত পদশন্দ। স্াঞ্গে শিউরে 
উঠে তাকাল চন্দ্রাোলোকে। সাঁতাই তো, ঠাকুরই তো আসছেন। 
কে কাকে ধরে ফেলে! যোগশীনের ইচ্ছে হল মাঁটর সঙ্গে মিশে যাই। যে মাটিতে 
খতম পা রেখেছেন সেই পদম্পর্শনের মাটিতে । . 5. 
সপ ৮ 
8... 
অধোমৃথে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল যোগীন। ঠা ৃ 
অন্ঠরদশস বুঝেছেন এক পলকে । তবু অপরাধ নেবার নাম নেই। ভব; আদ্বাসের 
স্লেহছন্ন সেলে ধরলেন স্বচ্ছন্দে। বললেন, 'বেশ, বেশ, এই তো চাই । সাধূকে 
সহজে বনবাল করবি.নে। সাধক দিনে দেখাব, রাতে দেখাবি, তবে বিশ্বাস করাঁধ 
নৌ। চ্, (ক করেছিস, এখন ঘরে আয়. 


উর বপজ্পাজন খরে হকল যোগীদ। 

বারা জাত বার গম এলো না যোগানের। ঈসে-নে বারংবান থা চাইতে লাগলো 
সেই খগাদয়ের কাছে। 

ভগবানকে ছোট করেছেন বলে ধ্যাসদের বৈমন অথা চেকোছিলেন। বলোছিজেন, 
হে জগব*ধ্বর, তুমি :551-5০, অথচ গদি ধ্যানে তোমার বৃপকষ্পনা করোছি। 




















সেই সর্বব্যাপিত্ব খন্ডন করোছি। আমি ঘোরতর অপ্লাধী। আমার এই বিকজ্পতা- 
দোষ্রয় মানা করো। 

তেমান করেই আকুল অনিদ্রায় ক্ষমা চাইতে লাগলো যোগণীন। তুমি সংশয়" 
পাঁরলেশশ্‌ন্য। অথচ আমি আমার আঁবিঙ্গ মনের কুটিল সন্দেহের ছায়া ফেললাম 
তোমার উপর। প্রভ্‌, আমাকে ক্ষঘা করো। তোমায় পারচ্ছল্ন দুষ্টিতে আমাদের 
ঘনচ্ছব দুষ্টি সংশোধন করে দাও। 

'কাকে সাধ বলে মশাই ?' এক প্রািবেশী এসে জিগ্গেস করলে রামকৃফকে। 

“যার মন-্রাণ-অল্তরাত্মা ঈষ্বরে অত হয়েছে তিনিই সাধু । ধিনি কামকাণ্ঠনভ্যাগণী। 
যান 81545: ক মাতৃবৎ দেখেন, পৃজো করেন। সর্বদা ঈশ্বর চিন্তা করেন, 
ঈশ্বরীয় কথা বই কথা কন না। আর সর্ধভূতে ঈষ্ধর আছে জেনে আপামর দকলের 
সেবা করেন ।, 

সাধুর আশা নেই, আসান্ত নেই। দে সতত সন্তুষ্ট । সে বাহার্নিশ্চেষ্ট। ভার 
আরম্ভ-উদ্যোগ নেই । তার সর্ব সমব্দ্থি। তার ফলেও যা অফলেও তাই। তায 
কাছে নিন্দা-নান্দী এক কথা। শ্রু-মিতর এক জন। তার গাঁত চণ্তল কিন্তু মীতিটি 
স্থির। তার দ্বেষ-লেশ নেই। সে প্রহ্াদ মৃর্তি। হেতু নেই অথচ ভত্তি। অকারণে 
অবারণ ভন্তি। প্রহয়াদকে খন কৃফ বর দিতে চাইলেন, প্রহনাদ কণ বললে? 
বললে, 'বাঁদ বর দেবেনই তবে এই বর 'দিন, আমায় যারা কন্ট দিয়েছে, তাদের 
যেন অপরাধ না হয়। তারা যেন কন্ট না পার।' যে সার সে প্রহ্যাদের মতই 


দলেন্দলে। 

খান ভাবার বা দিতে জাল বেলন দো অহনার অত হো 
এমন ধক রাহঠাসমান্ছের বেদিতে বসে অশ্রু স্বরন্পানন্দ রামকুক। গাকেবাধে 
বাজস্*-১.:.1 খর়ের কাছে এই অনল্ত ধনের খব্র লা লয়ে মাঝে তোগরা 1বদেগের 
বিগাঁখতে? 

সন্ত দাদনা লয়, শকাস্ধিণ লেখনী চালালে কৈশঘ। সত সযক্হা। সানা 
ঈনবরা ব্আয় িইবল্টিক ১... ছিযারে লিখতে জল 
পরার ঢাল দেবর নর অন নিশ ঢাল পার চল ও ও 
'$ (৮) 


তৈমাঁন দীপ্ত লেখা। এ ক ফেলা চলে? দেখছিস, ধ্লতে-বলতে কফেপবের গোর 
মীন কেদন অনা হয়ে উঠছে। একেই বাক হলে প্রভা প্রাাতা ॥ 'কি ছে, কি 
খলাঁছাদ, বাঁধ একবার দক্দিগ্ন্যের? স্বচক্ষে দেখে আমাঘ? 

সার ওদিকে রামন্কক ডাকছে আবুল কণ্ঠে : ওরে, তোরা কোথায়? তোদের ছাড়া 
বাম বে থাকতে পার়াছ না। আকাঠের মাঝে কোথায় তোরা সব চল্জন তরংঃ 
ধাঁরতার মাঝে বেগ, জড়তার ছাঝে বল, তাঁর্তার গাথে বীর্ঘ-কোথখার তোরা 
সব সৈনিক সন্গ্যাসী। চলে আর। বন-জঙ্খাজ ভেদ করে নবনালা দাঁতিরে তারবেছে 
বাযুবেগে মনোবেগে চলে আয়। আমি তোদের জন্যে কত কথা কত ভাব কত 
ভালোবাসা নিয়ে বসে আছি। কত গান কত সমর কত নৃত্য । ক স্বাদ কত র্দাচ। 
চললে আয়, চলে আয়। 





কর়াপাটের ছাটতলা। লারদাকে নিয়ে এসেছেন হর ্ী। এসেছেন লে 
দাগখাতে। 

 শিবসান্দিরের অঙ্গানে বহু লোকের ভিড়। জ্বরে-জবরে সবাই সারা হয়ে গেল। 
শিলে দান্খানো লোকাঁটকে ঘরে সবাইর কাতর ওধসংক্য। ক্ষাল্প কখন ডাক পল়্ে। 
সবাই পিলে দাগাবে। 

খানিকটা আগহন, লোহার শিক আর একটা কি পাতা। এই শৃধ্ সরজাম। এতেই 
শিলে পাজাবে দেশ ছেড়ে । আর মাথা তুলতে পাবে না। 

বেলা বেডে বাচ্ছে। খামার ফিরতে হবে বাড়ি। কত রাক্ের পাথ। পাল “৭৭ 
অসাহফ্‌ হয়ে উঠলেন। 

েরেকে নিয়ে অনেক্ষণ হলে আই বাধা। বাদ একট; এদিক পানে হাত দাও। 
গৈ 'আমনো জবরে-জবরে বারস্যনর হল।' 

“এট বে খাজে, মা। দেখছ তো গাহেকের ভিড় 

. *য়োদার জন্যে গ্রবসানা অতুস কাপড় এনেছি । চান করে পারো । একাটু ছল খাছ, 
'ভান্$ এনোঁছি তালার খানে” * 

লাকা? ধক এতক্ষণে সজাগ হাল 

ছু নতুন সাতার নতুন আসনে দাও। দেয়ে আমার গদ্যের মতন পট 


তাই হল। (গিলে দেখে দি পারধার। 

বপলে আরাদ হল খটে, কিন্তু সংসারের দাত কার বায় না। দ্যামাসনদরণ 
বাঁড়ুযোরের ধান ভানেন। যোলো কুঁড়িতে এক ভান়্া। এক আড়া ধান ছেলে চা 
কুড়ি ধান পায়। মায়ের সঙ্গে সারদাও হাত লাঙখার। 

গাঁয়ে কম্বল হবে। বাঁড়-বাড়ি ঘরে পুজোর চাল মোখাড় হচ্ছে। তাদের 
বাড়ির বরাম্দ চাল যোগাড় করে রেখেছেন শ্যামাসজ্দরণী। 'িল্তু খাঁজের মোড়ল 
৮০০০ সুপ 
শ্যামাসৃন্দরাঁর পুজোর চাল ফারয়ে দিলে। শ্যামাস্ল্দরী সমস্ত রাত কাঁদজেন। 
'বললেন, কালীর জন্য চাজ করেছি, নিলে না, 'ফারয়ে দিলে? ধাখন এ চাল 
আমার কে খায়? কাকে দিই ?' 

কাঁদতে-কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে মাটির উপর শুরে পড়েছেন। রাত হরেছে। হঠাৎ চোখ 
চেয়ে দেখেন দোরগোড়ায় কে এক জল সংন্দরী স্প্শী বসে আছে চুপচাপ। বনে 
আছে পায়ের উপর পা দিয়ে। মুখ-হাতশপা সব লাল। প্রথম সূর্য উঠলে ফোন 
হয়, তেমাঁন অরুণ বর্ণের ঝলস দিয়েছে চার 'দিকে। 

স্মীলোকাট কাছে এসে গা চাপড়ে-চাপড়ে গঠালেন ৮১4৩ ৫০1 

তুমি কাঁদছ কেন? তোমার কালার চাল আমি খাব।* 

্যামাসুক্দরী তো অবাক। মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে শুধোলেন : 'ভুশি কে? 
এ যে গো-এর পরেই বায় পুজো হয়। সেই আমি।' 

পরদিন সারদাকে জিগগেস করলেন শ্যামাসূন্দরণ : "গায়ের রঙ লাল, পায়ের উপন 
পা দিয়ে বসে--ও কোন ঠাকুর রে সারদা 2, 
'জগাম্ধান্রশী। 

'আমি জগন্ধাল্লীর পূজো করব। 

কিন্তু ওটুকু চাঙ্গে হবে না। আরো চাল লাগবে। : তি থেকে দু আড়া 
ধান আনালেন শু. 1 ধান আলালেন তো ববৃষ্টও নামল অঝোরে। আক 
দিনও ফাঁক নেই, স্াঙ্জ গিয়েছে বনবাসে। চাটাই 'বাছয়ে ধান মেলে বসে আছি 
কবে থেকে । শব খ-এ। হতাশার সুর ধরলেন : পক করে তবে আয় তোমায় 
পুজো হবে মা? ধালই শ্দকুতে খাম নি, তবে ঢাল করব কি করে?! 

চার ধ্দকে বৃষ্টি, ৮:%:8-5শন ধানের ঢাডাইয়ে রোদ । জ্দ্যারীর আশনবণদ 
কাঠের আগুনে সেকে মতি শৃকিযে রঙ দেওয়া হল। প্রজোর পর প্রতিমা 
বিলর্জপে- সময় -'/4হ +7* গতর কানে বলে দিজেন, খা জাই, আবার আর 
বছর এসো। দামি বছর ভোর তোমার সব যোগাড় করে রাখ । 

জগদ্ধাহদীর পুজো করেই শ্রী ফিরল সংসারের । 

মেয়েকে শামাসন্দেরী বজলেন, 'হুমি কিছ দিও, আমার জাঙগাইরের পরো 
হবে।' 

শর খাতে দোল রানে, বাদ জরা ক দেন) ও জব আাঙা হবি গিয়া । 
আকবার গো তো হল, আবার কেন? 


ঞ 


কী 


গাছে, বপ্দ দেখল সারদা। তিন জন কে-কে দিয়েছে ভাব সামনে । হজাছে, স্তন! 

ঝি তবে খা? 

দুধ তোমরা” 

“শামি জগন্দাী-আর এরা জযা-বিডয়া। 

'না দা, হোমাদের যেতে বগল, কোথা থাধে ভোমরা? তোমরা থাকো) বে না! 

গার আঁচক়া দিয়ে জগাধ্ধারশর পায়ে গড় করল দারা । 

সাদা আর কি দেষে! প্রম দেবে, গেবা দেবে। জল্হরের নিষ্ঠা দেবে। 

জগন্ধযাশ্র পুজোর সয় সায়সদা গিয়ে তাই বাসন মেজে দেয়। 

“সোই থেকে ঘরাবয় জগম্যারশরর পৃজোতে জয়রামবাটি যাই--বাসন শ্রাজতে হয় 

িনা।' বললেন শ্রীমা, 'শেষকাল্গে যোগণন,সব কাঠের বাসন করে দিলে। বললে, 

সা, তোমাকে আন যেতে হবে না বাসন মাজতে । 

প্রীতিমা.বলজ০৭ সময় জগগম্ধারশর কানের গয়না একটি খুলে 

'নেইটিই মনে করে মা 'আবার আসবেন পরের বছর।” বললেন শ্রীমা। 

মা আমাদের রাজরাজেস্বরী। 

তাঁর ফিরে আদতে কারণের আকর্ষণ লাগে না। তিনি যে দশন-দারঘ্রের মা। 

শুধ্য একটি কাতর 'মা' ডাক শুনলেই তান চলে আসেম। ডাকও লাগে না, 

অন্তরে আকুলতা থাকলেই হল। প্রার্থনার চেয়েও বড় হচ্ছে আকুলতা। মুখযের 

রনিলাল রানীর নরসিনানিজারারারসা 
? 

মা আমাদের অমৃতভাষপণ অন্নপূর্ণা । 'অচক্ষ) সরি চান অকর্ণ শুনিতে পান! 

কোনো ভয় নেই। মা স্বতন্যেশ্বরণী শ্রীশ্রী" বনেম্ধ।। 





ৰা 


চিনা রটনা ররর 

সলো ভুরগ রশ্ডলের মা ও ক্মায়ো কজন বধদরনী ঘাহলা। জার খানে হাজী 
' ছার তার ভাই শিবরাম। 

' ফাদারধকের থেকে আরামবাগ-স্সাট মধ্ুজের থাজা। আরামবাগ পোরিযে। 
সিিসিলির রর রন রেদা রি বাসা রর 





মিতার সাঠি। বোকলার মধ পেয়ে দৈদাবাতি। নৈধাবারি আবে খন্ধা 
পোয়িয়ে ্কিষেগ্বর। 
তেলে আর বোকা এই দূ মাঠে জাকাতের আজ্চাদা। আর এ মাঠ ছাড়াও 
পথ নেই। পগডারীদের উপর কখদ বে হামজা হবে তা ভাকাতে-কালধই বলতে 
পারেন। তেলো আর ভেলো,। পাশাপাশি দুই প্রা, মাঝখানের মাঠে এক 
ভঁমদর্শনা ফরালবদনা কাল'মতি। এ ভাকাত্েন্কালশ। দসমুদের আরাধনীয়া। 
ধান্দা ধনদায়িনী। ডাক-নাম তেলোকেলোর ভাকাতে-কালী। ভূত্মথসোবিকা 
ঘোরণ্ডী। জপরামা। ও 

শুধু লুণ্ঠন নয়, চক্ষের পলকে খুন করে ফেলা, লাশ লোপাট করে দেওয়া। 
যাকে বলে গায়েবী খ্ুন। ভাকাতের সে লাঠি বছর চেয়েও নশংস। টাকা বাসি 
যা আছে খুলে দিচ্ছি বাল কেড়ে-এটুকু প্রস্তুত হযারও সময দেয় না। আগে 
লাঠি, শেষে লুট । কাড়ো আর মারো নয়, মারো আর কাড়ো। এর থেকে একমর 
উপায় হচ্ছে দল পাকিয়ে পথ হাটা। দল দেখে ডাকাতেরা বাদ ভয় পায়। দল 
থাকলে 4০74 অন্তত লাহল বাড়ে। 

সন্ধের বেশ আগ্নেই পেশীচেছে আরামবাগ । চুলতে-চলতে সারদার পা দখানি ক্লান্ত 
হয়ে পড়েছে। রাতটা আরামবাঙ্গে কোথাও' বিশ্রাম করলে হয়! কিন্তু সঞ্গীরা 
নারাজ । তারা বলে, আঁধার লাগবার আগেই বেলাবোল তেলোভেলোর গাঠ পরিয়ে 
যাওয়াটাই ব্যাম্ধমানের কাজ। এখনো দিব্যি দিন আছে, সহজেই বেগিয়ে খেতে 
পারব। মিছামিছি এক রাত নন্ট করি কেন? 

পথর্লাল্তির কথা কাউকেও বললে না সারদা । তোমরা যখন চলেছ, আমিও চলি 
তোমাদের 'পিছে-পিছে। 

কেব্ই' পাঁছিয়ে পড়ছে থেকে-থৈকে। পা টেনে-টেনে তব, চলে এসেছে চার মাইল। 
কিন্তু তার সঙ্গীরা কোথায় ? 

সঙ্গাদরা থেমে পড়ছে বারে-বারে। থেমে পড়ছে যাতে পা চাঁজয়ে এলে সারদা 
তাদের সঙ্গ ধরতে পারে। কিছুতেই তাড়াতাড়ি চলতে পারছে লা মেয়েটা । 
'কাঁহাতক তোমার জন্যে এমান কয়ে দাঁড়াই বলো তো! রাযি জানায় খঙ্ীরা : 
'বেলা চলে পড়ল, এখন একট. তাড়াতাড়ি পা চালাও । 

সাধ্যমত পদক্ষেপ দুতি করে লারধা। কিন্তু তার সাধ্য কি, সঙ্গীদের দো তা 
রাখে। জবার সে পিছিয়ে পড়েছে। বিখস্পপচশ হাত নয়, প্রা পিকি মাইল। 
এমা করে চললে ক করে চলবে? আবার ধমকে ওঠে লম্দাদরা : তোমার জনো 
কি লবাই খেধকালে ডাকাতের হাতে মারা পড়ব? পশ্চিমের জাক্াশখানা জবার 
দেখছ ?, 

সন্ধান 'লেষ গালিমা:কুও মিজিয়ে মায় বনি । 

সাঁতাই ডো! ভার একলার অঙ্গদতার জন্যে অধ কেগ বিগ হরে? আর 
দোষ! এদের দেহে হখর লা গাছে তখন সয়া বাবে তো আগ বাধিয়ে) 'নিদোর 
| ম্ঘাববের জনয খাদের !সে আস্য্ঘযে ঘটামে কেন? এ 





'য়োররা আমার জন্যে জার দীদয়ো নাচলে যাছ চলম্দন হজ । সঞ্গাপনোতায 
। জার এতটয়ে কাতর নয় সারদা। নেই এতটুকু 'অস্হারতার স্যর। বলত, 'একেখারে 
 ছারকেন্যরের চাঁউতে গিয়ে উঠে। জামি সেখানে বিয়েই বধ তোমাদের। আনা 
শরীর জার ফইছে মা--আমি বাচ্ছি আস্তে-আল্তে।' 

'ঘড় শিগাঁগির প্রন বেরিয়ে আর তাড়াতাড়ি । চার দিক আঁধার হয়ে এল । মাঠের 
বড় দুম 

পিছনে ফিয়ে তাঁকিয়েও দেখল না। সারদাকে ফেলেই ভ্রুতবেগে এগিয়ে গেল 
পঙ্াণিরা। বযাঁজিয়ে গেল চোখের বাইরে। জনমন্দষাহণন বিস্তীর্ণ প্রাম্তরে সারদা 
কা! 

শরীরে আর দিচ্ছে না, তব্দ ক্টে পা টেনে-টেনে চলেছে। অন্ধকারে পরথ-ঘাটের 
টির রানী জারা ররর ারারাগান 

'কে ঘার়? কেএকজন বাদ্দের গলায় হমকে উঠল। 
প্রকাণ্ড একটা কালো লোক চোখের সামনে দাঁড়িয়ে টিন,  দৈত্ের মতন 
চেহারা । মাথায় ঝাঁকড়া চুল, হাতে রুপোর ধালা, কাঁধে মস্ত লাতি। 

কে যায় 

'তোমার মেয়ে গো- সারদা ।, 

নিজন মাঠের মধ্যে, সন্ধ্যার অন্ধকারে, আমার মেয়ে! লোকটার কানে কেমন যেন 
অস্ছৃত শোনাল। এত বছর ধরে ডাকাতি করাছ, কই, এমন কথা তো কখনো 
গুনীন! সারদার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল ডাকাত। স্থির গ্লাতমার মতই 
দাঁড়িয়ে রইল পারদা। প্রাতমার মতই স্থির নেত্রে। 

'ক তুমি? এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন ?' 

'বাবা, দক্ষিণেদ্যয়ে যাঁচছিলাম। চলতে পাচ্ছিলাম না, তাই আমার সঙ্গীরা আমাকে 
ফেলে গিয়েছে। অন্ধকারে পথ হারিয়ে ফেলেছি । 

'দাক্*দেদ্বনে যাচ্ছ কেন? 

পাক্ষিণেন্যরে যে তোমার জামাই থাকে। রানি রাসমাণির কালীবাড়ি আছে না? 
সেই ক্লাব তিনি থাকেন। তাঁর কাছেই আম যাচ্ছি । 

কেমন বেদ মধুময় লাগল কণ্ঠদ্ঘর। বার্গদি ডাকাতের বুকের ভিতরটা আনচান 
করে উঠল। শুধ্‌ ডাকাতের নর, দেই কন্তম্বরের আমেজ এসে লাগল ধেন আরো 
এক জলের ফানে। কাছেই কোথায় ছিল, ছ:টে এল দে বকুল পায়ে। সারদা তো 
অধাক, এ যে দেখি স্রীলোক। দেখেই বুবল, বাগাধিণ্ভাকাতের গ্রশি। 

তায় হাত দুখানা চেপে ধরল সারদা । যেন কলে কূল পেল । 

'ভুমি কে গা? ভাকাত-পর্ীয় চোখে স্লেহকরগ জালা । 

'কোগার সেয়ে লারদা। চিনতে পাঞ্ছ লা? বাকল ধাক্দেষ্ক- তোর জাজ, এর 
কাছে। সঙ্গানরা পিছে ফেলে আনেন্গাণে পালিয়ে িয়েছে। ফাঁকা জান মাঠে 
'অন্জকারের জধ্যে কী 'বঙ্দদেই পদেছিলম, মা। তোয়াদের পেয়ে খড়ে প্লাগ খজঃ 
তোমাদের বা পেলে কশ সববনাল যে হত কে জানে । 

রা 


প্রাণ হাযির গৈ । কিন পাথর ফেটে বের সহযান্যারা। হরজটিন মারার 
লাফাশে নয় দেখের আাধুধ। * 

মেয়ে মলা নেতিয়ে পড়েছে ধে গো। বিষ ওকে খেতে দা আগে ভাকাভ- 
কট বললে ভাফাতকে। 

পা, আম গাগোই। তারকেন্বরে গিয়ে ধরয আমার সঙ্গীদের ।' 

অসম্ভব, পথের মাঝেই পড়বে টাল খেয়ে। বাপ হয়ে মেয়েকে কেউ পাঠাতে পায়ে 
নাও বিপদের মুখে । এ ঘোর অন্ধকারে, জনশূন্য মাঠের মধ্য দিয়ে । তার শরীরের 
এই অবসন্ব' অবস্থায় । তার চেয়ে চলো, কাছে-পিঠে যে দোকান অঙ্গে, সেখানে 
তোমার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা কাঁর। রাত ফুহূলে খোঁজা বাবে ফের পথের 
নিশানা । তোমায় সঙ্গাঁদের উদ্দ্শে। 

তেলোভেলোর ছোট একটি মুদি-দোকান। সেখানেই নিয়ে গেল সারদাকে। নিজের 
হাতে শধ্যা রচনা করল ডাকাত-বউ। ভাকাত নিজে গিয়ে মৃড়-মড়ফি কিনে 
আনল। বাপের দেওয়া খানার তৃষ্তি করে খেল সারদা। মায়ের করা বিচ্বানায় 
শুলো আরাম করে। ছোট মেয়েকে মা যেমন করে ঘুম পাড়ায় তেমনি করে ভাকাত- 
বউ ঘুম পাড়াল সারদাকে। জার সারা রাত লাঠিহাতে দয়ার আগলে দাঁড়িয়ে রইল 
ডাকাত-বাবা। 

কোথায় সব কিছ লুটপাট করে, চাই কি গুম খুন করে ফেলবে-_তা নয়, নিদ্রাহীন 
দীর্ঘ রাতি দুয়ারে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে! 

উপার কি! এ বে তার মেয়ে। যে মেয়ে সেই আবার মা! 

ভোরে ঘুম ভানতেই মেয়েকে নিয়ে এগোলো তারকেম্বরের পথে। খেতে কড়াই, 
শট ফলেছে। তাই ছি'ড়েশছ'ড়ে ডাকাত-বউ 'দতে লাগল দারদাকে। বললে, 
(তোর "খিদে পেয়েছে, খা।' মুখ ধোয়া হয়ান, তথ্য ছোট মেরের মত তাই খেতে 
লাগল সারদা। স্বাদে অপূর্ব মাতৃঙ্নেহ। 

চার দণ্ড বেলা হয়েছে, পেশছুল তারকেন্বর। 

'আমার মেয়ে কাল সারা রাত কিছ খায়নি। বাও, 'শগাগির-শিগদ্ধির ধাবাকে 
পৃজো 'দিয়ে বাজার কয়ে নিয়ে এসো। মাহ-তরকার 'দিয়ে মেয়েকে ভালো করে 
খাণুয়াতে হবে।' ভাকাত-যউ তাঁগিন দল স্বামীকে! 

বাগাঁদ-ডাকাত বাজার করতে ছাটেল। তার মেয়ে ব্বগর-্ঘরে বাচ্ছে। বাবার আগে 
বাপের বাড়িতে আজ তায় শেষ দাওয়া। 

সঞ্গাদের সম্ঘান পেল সারদা । 'জয তুই বেচে আছিল? আনতে পেয়েছিম পথ 
চিনে? কোথায় 'ছিলি তুই সারা রাত? 

বাবা-দা'র কাছে ছিলাম । ছিলাম 'নির্ভ'রের জাশ্রমে, নিশ্চিল্তের হোড়নসডে। যাদসঙগা 
রসের সরষে । 

আায়ানংওয়ার পর ধধগায়ের গাজা আল। যায়ীদল এবার 8. পা9গ গার 


ধরষে। ও 
বাঞাদ বাপ-া কাঁধতে লাগল ভাঝোরে। [সায় দারদা নিজেকে সামলাতে গলদ 
। ১ 


না। সেও কান্নায় ভেঙে পড়ল। এক রাতের পাঁরচয়ে এক জন্মের সম্পর্ক । কণ্ঠের 
একটি মাতৃ-সম্বোধনেই অনন্ত জীবনের বন্ধন। ' 

এমন মেয়ের বিচ্ছেদ সয়ে কি করে বাঁচবে তারাঃ কাদতে-কাঁদতে অনেক দূর 
পরন্ত এগোল বাগাদ-বাগাদনী। বাগাদনী কড়াইশটি ছি'ড়ে মেয়ের আঁচলে বেধে 
দিল যত্ন করে। বললে, মা সারু, রাতে খন মুড় খাবি, তখন এগুলো দিয়ে 
খাস।' বলতে-বলতে নিজের আঁচলে চোখ চেপে ধরল। 

বাগাদ বললে, 'যাঁদ পায়ের বোঝা স্্ী না সঙ্গে থাকত, সোজা তোমাকে পেশছে 
দিয়ে আসতাম। দেখে আসতাম জামাইকে ।' 

ধকল্তু বলো দক্ষিণে*্বরে তুমি যাবে। সারদা পাঁড়াপীড় করতে লাগল। রাজী 
করাল ডাকাত-বাবাকে। মাঝে-মাঝে গিয়ে মেয়েকে না দেখে এসে কি সে থাকতে 
পারবে £ মা কি মেয়েকে পাঠিয়ে দেবে না তার নিজের হাতে গড়া মোয়া-নাড়ু ঃ 
পথ ছাড়াছাঁড় হয়ে গেল। ডান 'দিকের রাস্তায় বাবা আর মা চলে গেল, সারদা 
আর তার সঙ্গীরা চলল বাঁ দিকে । ঘত দূর দেখা যায় বাবা আর মা ফিরে-ফিরে 
তাকায় আর কাঁদে। সারদাও থেকে-থেকে তাকায় পিছন ফিরে আর আঁচলে চোখ 
মোছে। 

ডাকাতের ছদ্মবেশে কে এরা বাগাঁদ-বাগাঁদনী ? 

জানস আমরা কী দেখলুম ঃ গাঁয়ে ফিরে এসে বলতে লাগল বাগাঁদ-দম্পাঁত। 
দেখলুম, স্বয়ং কালণ এসে দাঁড়য়েছেন। ষে কালীর পুজো কার সেই কালী। 
বলো কি গো? দেখলে ? ঠিক তাই দেখলে! 

সাত্য-সাঁত্যই দেখলুম। কিন্তু বেশিক্ষণ দেখি এমন সাধ্য কি। আমরা যে পাপী। 
আমরা পাপী বলে যে রূপ গোপন করে ফেললে । সারাক্ষণ দেখতে দিলে না। 
চকিতে যখন একবার দেখেছ তখন পলকেই পাপ চলে গিয়েছে। চকিতের দেখাই 
অনন্ত কালের দেখা । যা চাঁকত তাই 'চিরকালিক। 





কেশবের ডাকে ইয়ং-বেঙ্গলে সাড়া পড়ে গেল। পল্লব-প্রফল্ল বসন্তের শিহরণ 
জাগল অরণ্যে। 'কিন্তু যার ডাকে এই অবস্থা, তার 'নজের অবস্থা কি! 

জয়গোপল সেনের বাগানে রামকৃষ্ণ লালপেড়ে কাপড় পরে গিয়েছিল। 

৪890 4 


কেশব বললে, “আজ বড় যে রঙ। লালপাড়ের বাহার! 

রামকৃফ বললে, 'কেশবের মন ভোলাতে হবে, তাই বাহার দিয়ে এসেছি। 

রঙ লাগল কেশবের মনে । রসে ডুবে ভাসতে লাগল ভাবের জোয়ারে। হয়ে দাঁড়াল 
' সে রামকৃফের মনের মানুষ৷ 


'মনের মানুষ হয় যে জনা 
ও তার নয়নেতে যায় গো চেনা। 
সে দু-এক জনা। 

ভাবে ভাসে রসে ডোবে 
ও তার উজান পথে আনাগোনা । 


ধকন্তু গোড়ার দিকে রাজাঁসকতার ভাবটা একটু সজাগ ছিল কেশবের। কেশবের 
কলুটোলার বাঁড়তে গিয়েছে রামকৃষ্ণ, সঙ্গে হৃদয়। টেবিলের কাছে চেয়ারে বসে 
কি-সব লিখছে কেশব। যে ঘরে বসে লিখছে সেই ঘরে এনেই বসাল রামকৃষ্কে। 
িল্তু কেশবের চেয়ার ছেড়ে ওঠবার নাম নেই। একমনে লিখেই চলেছে। অনেক 
পরে লেখা শেষ করে চেয়ার ছেড়ে নেমে বসল। নেমে বসল বটে, 'কিল্তু রামকৃষকে 
একটা নমস্কার পর্যন্ত করলে না। 
নমস্কার না করাটাই বাঁঝ সে ষুগের জ্ঞানী-গুণীদের শালীনতা । 
কিন্তু কেশব যখন এসেছে দক্ষিণেশ্বরে, রামকৃষ্ণ তাকে আনত হয়ে প্রণাম করলে। 
একবার নয়, যতবার এসেছে ততবার । যখন যে দলবল নিয়ে এসেছে, সবাইকে। 
তখন তারা আর করে কি। ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করতে 'শিখলে। 
কঠিনকে নম্ম করে দিলে রামকৃফ। আভিজাতকে নিরভিমান। রামকৃফের সমস্ত 
সাধনাই এই সহজের সাধনা । নিকটের সাধনা । নিকটে পাবার সহজ সাধনা । 
বললে, 'যাঁকে তোমরা ব্ৃহম বলো তাঁকেই আমি মা বাঁল। মা বড় মধুর নাম।' 
আমি ঈশ্বর বুঝি না। আমি আমার মাকে ববি, মাকে ডাকি। আর কে আছে 
মা আছে কে জানে, আমি আছি আর আমার মা আছে। ঈশ্বরের এশব্যের আমি 
তত্ব কার আমার সাধ্য কি, আমার মা আছে এই আমার পরম এঁশ্বর্য। 
বিজয়কৃষফ গোস্বামশ ব্রাহমসমাজের পদ্ধাত অনুসারে বেদীতে বসে উপাসনা করছে। 
কিন্তু ঈশ্বরকে ডাকছে 'মা' 'মা” বলে। 
"ভুমি তাঁকে “মা” “মা” বলে প্রার্থনা করছিলে। এ খুব ভালো। এ খুব ভালো ।' 
বিজয়কৃফকে বললে রামকৃঞ্ণ। 'কথায় বলে বাপের চেয়ে মায়ের টান বেশি । মায়ের 
উপর জোর চলে, বাপের উপর চলে না। ন্রেলোক্যের মায়ের জামদাঁর থেকে 
গাঁড়-গাঁড় ধন আসাছল, সঙ্গে কত লাল-পাগাঁড়ওয়ালা লাঠি-হাতে দারোয়ান। 
ন্রিলোক্য রাস্তায় লোকজন নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, জোর করে সব ধন কেড়ে নিলে। 
মায়ের ধনের উপর খুব জোর চলে। বলে নাকি ছেলের নামে মা'র তেমন নালিশ 
চলে না।' 

৪১ 


'জানাইব কেমন ছেলে 
মোকদ্দমায় দাঁড়াইলে, 
যখন গূরুদ্ত দস্তাবেজ 
গুজরাইব মিছিলকালে। 
মায়ে পোয়ে মোকদ্দমা, 
ধূম হবে রামপ্রসাদ বলে। 
আমি ক্ষান্ত হব যখন আমায় 
শান্ত করে লবে কোলে ॥, 


মা কতক্ষণ মামলা চালাবে? কতক্ষণ মুখ ভার করে থাকবে? কখন নিজেই এক 
সময় বাহ্‌ মেলে টেনে নেবে কোলের মধ্যে। 

আমাদের শাস্ে ঈশ্বরকে আমরা পিতা বলে কল্পনা করোছ। 'িতা হচ্ছে 
সৃষ্টকর্তা, লালনকর্তা, রক্ষণকর্তা। পিতার মধ্যে ষে ভাবটি প্রকাশিত তা 
প্রতাপের ভাব, প্রভুত্বের ভাব। তিনি শুধু আমাদের পালন করেন না, চালনা করেন, 
পোষণ করেন না শাসন করেন। তিনি জগংসংসারের সময় বিধাতা । একচ্ছত্র 
একাধিপাতি। 

বেদে বলেছে, পিতা নোহসি। তুমি আমাদের 'পতা হয়ে আছ। বলেছে, পিতা 
নো বোধ। তুমি যে আমাদের পিতা এই বোধের আলোকে আমাদের দুচোখ 
উদ্ভাসিত হোক। এই জানা আর অনুভব করার মধ্যে শিতার সবসাম্রাজ্যময় 
বিরাটত্বকেই কল্পনা করা হয়েছে। যখনই বলেছে, শৃশ্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য 
পূত্রাঃ। তখন আমরা যাঁর পূত্র সেই আঁদত্যবর্ণ পুরদষকে 'দিব্যধামবাসী একনায়ক 
সম্রাট বলেই মেনে নিয়েছি। সমস্ত অন্ধকারের পরপারে সেই পিতা ভাস্বর 
ভাস্কর। 

এ ভাবির মধ্যে যতই মাহমা থাক, কিছুটা যেন ভয় আছে। সম্ভ্রম তো আছেই, 
হয়তো বা রয়েছে একটু নিষ্ঠুরতা । পিতা আমাদের যতই 'প্রয় হোন, তাঁর সঙ্গে 
কোথায় যেন রয়েছে একট; ব্যবধান। কোথায় যেন একট আড়াল বাঁচিয়ে চলছি। 
যেন তাঁর চোখে চোখ রেখে মুখোমুখি দাঁড়াতে পার না, একটু পাশ কাটিয়ে 
পালিয়ে বেড়াই। যাঁদ বা কখনো কাছে আঁস সম্ভ্রমসূচক দূরত্ব বজায় রাখ। 
কখনো যাঁদ অপরাধ কার, তবে তো আর কথাই নেই; ভয় পাই, শাসনে যেন 
উদ্যতবজ্ধু হয়ে আছেন। 

কিন্তু মামা আমাদের কাঙাঁলনী। আমরা কাঙাল বলে মা-ও কাঙালিনশ 
সেজেছেন। মা'র সঙ্গে আমাদের তন্তুমান্ন ব্যবধান নেই, নেই লেশমানন অন্তরাল। 
আমরা মা'র অঙ্গের অঙ্গ বলে তাঁর সঙ্গে আমাদের অন্তহীন অল্তরঙ্গতা । যতই 
আঁকণ্ন হই, আমরা মা'র অণ্তলের নাধ। যতই ধুলো-মাঁটি মাথি, মা'র অণ্চলে 
আমাদের জন্যে অবাঁরত মাজনা। যাঁদ অপরাধ কার, মা-ও নিজেকে অপরাধশ 
মনে করেন। সন্তানের দুঃখে তাঁর দুঃখ । 

৪২ 


কোনো কুণ্ঠা নেই, লচ্জা নেই, শুধু ক্ষমা শুধু স্নেহ। শুধু প্ান্ট দেন না 
তুষ্টি দেন, শুধু 1পপাসা মেটান না, নিয়ে আসেন পাঁরতৃস্তির আস্বাদ। মা 
আমাদের মৃর্তিমতাঁ সরলতা, মা আমাদের অভয়ময়ী। পূত্ন বত বৃদ্ধই হোক, 
মার কাছে সে শিশু, অর্বাচীন 'অপোগন্ড শিশু। আর মা যত বন্ধই হোক, 
ছেলের কাছে সে সনাতনী মা। পিতার জন্যে আমাদের শ্রদ্ধা, সম্ভ্রম, আনুগত্য, 
কিন্তু মা'র জন্যে আমাদের ভালোবাসা, আবরল অফুরন্ত ভালোবাসা । পিতার 
থেকে আমরা দুরে-দূরে থাকি, কিন্তু মা আমাদের একেবারে কোলের মধ্যে টেনে 
নেন। আর্ত হই বাণ্চত হই পাঁড়ত হই পাপাঁলস্ত হই, অকূলে মা'র কোল 
আছেই। পিতা আমাদের রাজচক্রবতর্+, মা আমাদের বিষ্বকল্যাণী। 
দুর্গাচরণ নাগ ঠাকুরের নিদারুণ ভন্ত। অসুখের সময় আমলকী খাবার ইচ্ছে 
হয়েছিল ঠাকুরের। এমন সময় আমলকী কি কোথাও পাওয়া যায়? জিগগেস 
করলেন ঠাকুর। তখন শ্রাবণ মাস, আমলকাঁর পক্ষে অকাল। কিন্তু ঠাকুরের যখন 
ইচ্ছে হয়েছে, নিশ্চয়ই কোথাও পাওয়া যাবে আমলকী । দূর্গাচরণ বোরয়ে পড়ল 
আমলকী খজতে। বনে-বাগানে ঘুরে-ঘরে তিন দন পরে ঠিক আমলকী 'নিয়ে 
এল। সেই দুর্গাচরণকে শ্রীশ্রীমা একখানি কাপড় 'দিয়েছেন। সেই কাপড় না পরে 
মাথায় বেধে রাখে দূর্গাচরণ। আর আনন্দে ধ্যনি করে : 'বাপের চেয়ে মা দয়াল! 
বাপের চেয়ে মা দয়াল! 
্রীশ্রীমার তখন অসুখ । খুব যন্ত্রণা পাচ্ছেন। এক ভন্ত বললে, মা, আপাঁন এত 
কম্ট পাচ্ছেন, কষ্টটা আমায় দন না! 
মা চমকে উঠলেন। 'বল 'কি! ছেলে! মা কখনো ছেলেকে দিতে পারে? ছেলের 
কম্ট হলে যে মা'র আরো বোশ কম্ট।' 
বিভূতি বলে একটি ছেলে আসত শ্রীমা'র কাছে। এলেই পেট ভরে খেয়ে যেত। 
এক 'দিন তার খাওয়া দেখে তার মা বললে, পবভূঁতি তো এখানে বেশ খায়। বাড়তে 
মান্ন এত কপট খায়! " 
অমানি শ্রীমা বললেন, 'আমার ছেলেকে তুমি খুড়ো না। আম ভিখারীর রমণণ, 
আমার ছেলোদকে আম যা খেতে 'দি, ছেলেরা আমার তাই আদর করে খায়।' 
চন্দ্র দত্ত উদ্বোধন-আফিসের কর্মচারী । এক 'দিন শ্রীমাকে বললে, 'মা, আপনাকে 
কত দূর দেশ থেকে কত লোক দর্শন করতে আসে । আপাঁন তো ঘরের ঠাকুরমার 
মত পান সাজেন, শৃপ্যার কাটেন, -খনো বা ঘর ঝাঁট দেন। আপনাকে দেখে 
সাম তো কিছুই বুঝতে পারি না।' 
মা বললেন, চন্দ্র, তুমি বেশ আছ। আমাকে তোমার বোঝবার দরকার নেই ।' 
স্বভাবে সহজ, কর্‌ণায় কোমল, স্নেহে সীমাহীন-এই আমাদের মাতৃপ্রাতমা। 
আমাদের বোঝবার দরকার নেই, ডাকবার দরকার। ডাক শুনে মা যখন 
হটে এসে কোলে তুলে নেবেনস্তখন সেই স্পশেহি বুঝতে পারব, মা এসেছে রে, 
'অ' এসেছে 
মান অবাগুমানসগোচর, অগম্য অপার, সমস্ত রুদ্ধ অন্ধকারের ওপারে যাঁর 
৪৩ 


বাসা, তাঁকে নিকটতম, নিবিড়তম করে পাবার সাধনায় রামকৃষ্ণ নতুন মন্ম আবিজ্কার 
করলেন। ৩-এর মত এ মন্মও একাক্ষর মল্ম। এ মন্তের কথা হচ্ছে--মা'। এ 
মল্পের আকর্ষণে যা অত্যন্ত দূর তা নিমেষে কাছে চলে এল, যা অত্যন্ত দুরূহ 
তা হয়ে দাঁড়াল জলের মত সোজা । যা ছিল পর্বতশৃঙ্গে তাই বিগাঁলতধারে 
নেমে এল নিবঝাঁরণী হয়ে। যা এশ্বর্যশালিনী শন্তি, তাই দেখা দিল দয়ার্‌পে, 
ক্ষমারূপে, অমিয়ময়ী প্রশান্তিরূপে। 

একেই বলে এক চালে মাং। এক বাণে জগজ্জয়। এক অক্ষরে পরা 'সাদ্ধ। 
রামকৃষের সবই সহজ । তত্ব সহজ, পদ্ধাতও সহজ । মানুষটি যেমন সহজ, মন্লাটিও 
তেমান। একেই বলে তরঙ্গহীন স্বতগাঁসদ্ধ স্বরুপসমদ্দ্র। কিংবা, সহজ করে 
বললে, সহজানন্দ। 

বিজয়কৃষ্ণকে বলে রামকৃষ্ণ, “কারণের বোতল এক জন এনেছিল, আম ছঃতে গিয়ে 
আর পারলুম না।' 

বিজয় বললে, 'আহা ! 

*সহজানন্দ হলে অমাঁন নেশা হয়ে যায়। মদ খেতে হয় না। মা'র চরণামৃত 
দেখেই আমার নেশা হয়ে যায়। ঠিক যেমন পাঁচ বোতল মদ খেলে হয়।, 
কেশবকেও তেমান সহজ করে দিল রামকৃফণ। কেশব 'মা' ধরল। ঈ*বরকে 
ডাকতে লাগল “মা বলে। ঈশ্বরকে 'মা' বলে ডাকে আর কেশবের দুই নয়নে 
ধারা নামে। 





এ মাতৃসাধনার গোড়াপত্তন রামপ্রসাদে। তার পর তাতে সৌধ তুলল কমলাকান্ত। 
1হসেবের খাতায় দুর্গানাম কালীনাম লেখে । সমস্ত 'হসেব বোহসেব হয়ে যায়। 
'পদে-পদে শ্রুটির কাঁটা খোঁচা মারে। 

নালিশ গেল মানবের কাছে। মানব খাতা তলব করলেন। দেখলেন আম্টেপচ্ছে 
অঙ্কের আঁচড় নেই, কেবল দর্গানাম কালীনাম। কেবল মাতৃসঙ্গীত। 

ক নান আছে এই গন! মা পড়ত লাগলেন। লোকটার আন 
সামান্য মূহরি হয়ে তাঁবলদারি চাইছে! 


88 


“আমায় দাও মা তাঁবলদার, 
আমি নিমকহারাম নই শঙ্করী। 
আমি বিনা মাহিনার চাকর, 
কেবল চরণ-ধূলার আঁধকারাঁ॥, 


মানব ছুটি দিয়ে দিলেন রামপ্রসাদকে, বললেন, 'তুমি বাঁড় যাও। এখানে যেমান 
ন্রশ টাকা মাইনে পেতে তেমনি পাবে তুমি বাঁড় বসে। তুমি মা'র নামের গান 
গাও।' 

ছাড়া পেয়ে গেল রামপ্রসাদ। কিন্তু মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ডেকে পাঠালেন, রাজসভায় 
চাকার দেবেন। আবার চাকার! চরণ-ধূলার জন্যে এই তো 'দাব্য চাকর আছ 
বিনি-মাইনেয়। হলই বা না রাজসভা, মা'র শোভার কাছে আবার রাজসভা কি! 
মহারাজের অযাচিত দান প্রত্যাখ্যান করলে। এবার না কোপে পড়ে মহারাজার। 
মহারাজার কি মাত হল, রামপ্রসাদের বৈরাগ্য দেখে একশো বিঘে নিজ্কর জাম দান 
করে বসলেন। 

'মন তুই কাঙাল কিসে । রামপ্রসাদ গান ধরল : 'অনিত্য ধনের আশে, ভ্রামতেছ 
দেশে-দেশে। ও তোর ঘরে চিন্তামাঁণ 'নাধ, দোঁখস রে তুই বসে-বসে। 

মাকে নিয়ে সাধনায় বসল রামপ্রসাদ। কারু সাধনা জ্ঞানে, রামপ্রসাদের গানে । 
আর-সব সাধকেরা জ্ঞানানন্দ, রামপ্রসাদ গানানন্দ। 

মাকে নিয়ে তার নানান খেলা, নানান লুকোচুরি। কত নালিশ-আপাস্ত, কত 
আঁভমান-আভযোগ! কখনো ঝগড়া, কখনো মামলা-মোকদ্দমা, কখনো বা রফা- 
নিম্পান্ত। কখনো রাগ, কখনো কান্না, কখনো অহঙ্কার, কখনো ম্লেফ গায়ের জোর। 
সাধ্য নেই মা আর বসে থাকেন ল্বীকয়ে। কালী বটে, 'কল্তু কালা তো নন। 
ডাকের মত ডাক হলে শুনতে পান ঠিকঠাক । কান্না শুনে না আসেন, আসবেন, 
ধমক খেয়ে। ভালো-মানুষের মত না আসেন, আসবেন ভয়ে-ভয়ে। 


'এবার কালী তোমায় খাব। 
গণ্ড যোগে জনমিলে, 
সে হয় যে মা-খেকো ছেলে, 
এবার তুমি খাও কি আমি খাই 
' দুটার একটা করে যাব। 
হাতে কালী মুখে কালী 
সর্বাঙ্গে কাল মাঁখব, 
ত যখন আসবে শমন বাঁধবে কষে 
সেই কালী তার মুখে দিব ॥ 


মাকে লচ্জা দিতেও ছাড়ছে না রামপ্রসাদ। বিদ্রুপ করছে। অনুযোগ করছে। 
৪৬. 


“কে বলে তোরে দয়াময় । 

কারো দুখ্ধেতে বাতাসা 

আর আমার এমনি দশা 
শাকে অন্ন মেলে কই॥ 

কারো দিলে ধন-জন মা, 
হস্ত অ*্ব রথচয়। 

ওগো তারা কি তোর বাপের ঠাকুর 
আমি কি তোর কেহ নই&, 


বড়াই করো কিসে গো মা 
বড়াই করো কিসে। 
আপাঁন ক্ষ্যাপা পাঁত ক্ষ্যাপা 
থাকো ক্ষ্যাপা সহবাসে। 
তোমার আদ মূল সকাল জানি 
দাতা তুমি কোন পুরুষে ॥ 
মাগী-মিন্সে ঝগড়া করে 
রইতে নার আপন বাসে। 
মা গো তোমার ভাতার ভিক্ষা করে 
ফেরে কেন দেশে দেশে ॥, 


খকংবা-_ 


আবার বলছে-_ 
মা হওয়া কি মুখের কথা । 
কেবল প্রসব করে হয় না মাতা । 
যাঁদ না বুঝে সন্তানের ব্যথা॥ 
দশ মাস দশ দন যাতনা পেয়েছেন মাতা 
এখন ক্ষুধার বেলায় শুধালে না 
এল পন্ত্র গেল কোথা॥, 


শেষকালে আঁভমানে ভেঙে পড়ছে রামপ্রসাদ-_ 


আর কি ক্ষমতা রাখো এলোকেশন। 

দ্বারে দ্বারে যাব ভিক্ষা মাগি খাব 

মা মলে কি তার সন্তান বাঁচে না। 
বাস্তুর পাশে ডোবা, ডোবার পাশে বাগান। সেই বাগানে রামপ্রসাদকে দেখা 
দিলেন অল্নদা। দেখা না দিয়ে আর উপায় কি। এত ভাবে ডাকলে 'ক করে 
5৬ 


আর সরে থাকা বায়? শেষকালে কন্যা হয়ে ঘরের বেড়া বাঁধতে বসলেন। এই 
মাতৃসাধনা চরম হল রামকৃকে। 
"মা, তুই রামপ্রসাদকে দেখা 1দয়োছস, কমলাকান্তকে দেখা দিয়েছিস, আমায় কেন 
দেখা দিবি নে? 
এ আকুলতা শদধদ মাকে লক্ষ্য করেই জানানো যায়। এ দাবি এ আবদার মা ছাড়া 
আর কে পূরণ করবে ? 
দেখা দিব নে? এই গলায় তবে ছুরি দেব। 
কোন মা ঘ্ঁময়ে থাকবে ? 
আবার বলছে, মা, আমি নরেন্দ্র ভবনাথ রাখাল কিছুই চাই না। কেবল তোমায় 
চাই। আমি মানুষ নিয়ে কি করব? 
'মা, পূজা উঠয়েছ, সব বাসনা যেন যায় না। মা, পরমহংস তো বালক-_বালকের 
মা চাই নাঃ তাই তো তুমি মা, আর আম তোমার ছেলে। মা'র ছেলে মাকে 
ছেড়ে কেমন করে থাকে ? 
সাধ্য ক, এমন ছেলেকে মা কোলে না নেয়! 
রাত্রে একলা রাস্তায় কে'দে-কে*দে বেড়ায় রামকৃফ। আর বলে, মা, বিচার-বাদ্ধতে 
বজ্রাঘাত দাও।, 
'বিচার-বিতর্ক ভেসে গেল। রইল শুধু ভান্ত আর ভালোবাসা । মাকে ভালোবাসতে 
পারলে আর ভাবনা নেই। আর, ভালোই যাঁদ বাসাবি, মা'র মতন আর কে আছে 
ভালোবাসবার ? 
কা্তিক-গণেশকে বললেন ভগবত, যে আগে ব্রহম্াশ্ড প্রদক্ষিণ করে আসতে পারবে 
তাকে গলার এই রত্নহার দেব। কার্তক তথখ্দান ময়ূরে চড়ে বৌরয়ে পড়ল। 
গণেশ শুধু মাকে একবার প্রদক্ষিণ করে প্রণাম করলে । মা'র মধ্যেই তো শ্রহনান্ড। 
প্রসন্ন হয়ে গণেশকেই হার দিলেন ভগবতীঁ। অনেক পরে ঘুরে এসে কার্তিকের 
তো চক্ষযীস্থর। দাদা দিব্যি হার পরে বসে আছেন। 
মা, আমি বলবো তবে তুমি করবে-এ কথাই নয়। আচ্ছা মা, যাঁদ না-বলতাম, 
আম খাবো, তা হলে কি যেমন খিদে তেমন খিদে থাকত না? তোমাকে বললেই 
তুমি শুনবে, আর ভিতরটা শন্ধু ব্যাকুল হলে তুমি শুনবে না-এ কখনো হতে 
পারে? তুমি যা আছ তাই আছ-_তবে বাঁল কেন, প্রার্থনা কার কেন? ও! যেমন 
করাও তেমন করি। 
এই সরলতা এই ব্যাকুলতা এই আন্তাঁরকতার কাছে মা কি ধরা না দিয়ে পারেন ? 
মাতে ওতপ্রোত হয়ে আছে রামকৃ্ণ। মা ছাড়া আর ছু নেই জীবজগতে । মা-ই 
আমাদের একমান্র মাধুরী । যান মানসী তিনিই আবার মানুষ । 
যতক্ষণ গরভধারিণ মা আছেন ততাঁদন তাঁতেই জগজ্জননশ আরোপ করতে 
| 
মাকে ফৃলচন্দন দিয়ে পূজা করতাম বললে রামকৃফ, 'সেই জগতের মা-ই 
ম% হয়ে এসেছেন! 
| ৪৭ 


ণকল্তু যখন মা থাকবে না, কিংবা পুজা থাকবে না, তখন? তখন অন্য কথা। 
তখন মা'র মনোমূর্তি। তখন 'বিশ্বব্যাঁপনী জগল্মাতা। 

'মা, পূজা গেল, জপ গেল, দেখো মা যেন জড় কোরো না। সেব্য-সেবকভাবে 
রেখো । মা, যেন কথা কইতে পারি, যেন তোমার নাম করতে পারি-আর তোমার 
নামগুণ কীর্তন করব, গ্রান করব মা। আর শরীরে একটু বল দাও, ষেন আপাঁন 
একটু চলতে পাঁর। যেখানে তোমার কথা হচ্ছে, যেখানে তোমার ভন্তরা আছে, 
সেই সব জায়গায় যেতে পারি।, 

শুধু গান নয়, নৃত্য করছে রামকৃ। আমাদের নিত্যানন্দ ঠাকুর এখন 
নৃত্যানন্দ। 

মাকে কখনো আদর করছে, শাসন করছে কখনো । কখনো বিলাপ করছে, কখনো 
বা মূখ ভার করে থাকছে । কখনো িনাতি করছে, কখনো বা জোর ফলাচ্ছে। 
কখনো বা রগ্গরসের তরঙ্গ তুলছে। 


“কে মা এীল গো 'িরে দাদার বোঁট। 
দোনো ছোকরা 'ব সাং 

দোনো ছকাঁর ব সাৎ 

আর এক বেটা জুলাঁপ-কাটা 
বাঘটা কামড়ে নেছে ট:টি ॥ 
একবার নেমে দাঁড়া শ্যামা 

ভাঙল বুড়োর পাঁজর-কট। 

শব মলে অনাথ হবে 
কার্তক গণেশ ছেলে দাট ॥ 


গালে হাত 'দয়ে অবাকের ভাব করে নাচছে রামকুফণ। 


“আই মা কি লাজের কথা 
মিনসের উপরে মাগী। 
বোঁটর পদতলে পড়ে ভোলা 
অপরূপ এক যোগী ॥ 
নয়নে না দেখ চেয়ে 
শব আছেন শব হয়ে 
আবার কে দেখেছে এমন মেয়ে 
কুল-লজ্জা-ভয়-ত্যাগী ॥ 
আবার অন্য রকম তাল ধরছে : 


“কোন হিসেবে হরহদে 
দাঁড়য়েছ মা পদ 'দিয়ে। 


৪৬ 


সাধ করে জিভ বাড়ায়েছ 

যেন কত ন্যাকা মেয়ে॥ 
বল মা তোরে শুধাই তারা 
এমান কি তোর কাজের ধারা 
তোর মা কি তোর বাপের বুকে 


দাঁড়য়েছিল অমাঁন করে? 


রসো বৈ সঃ যে তিনি। নানা ভাবে তাঁর রস আস্বাদ করতে হবে, তবে তো 
হবে।' বললেন রামকৃফণ। 'নইলে কেশবদের মত খালি দয়াময়, প্রভু বললে 'কি 
রস হয় ?, 
বামকৃষে যেমন সর্বধর্মসমন্বয় তেমনি সর্বরসসমাশ্রয়। 
না-ও রামকৃষকে দেখা দিলেন নানান ভাবে। নানান রস-বেশে। 
এক দিন মুসলমানের মেয়ে হয়ে চলে এলেন। ছ-সাত বছরের মেয়ে। মাথায় 
তিলক কিন্তু দিগম্বরী। রামকৃষ্ের সঙ্গে বেড়াতে লাগল আর 'িচকোমি করতে 
নাগল। একবার চোখ নাচাল, অমাঁন নীল আকাশে গ্রহ-তারা সব দুলে উঠল 
একসঙ্গে । 
কালো পেড়ে কাপড় পরনে শ্রীগৌরাঙ্গ হয়ে এক দিন দেখা 'দলেন হৃদয়ের 
বাড়তে । 
তার পর, হলধারী যখন বন্্রণা দচ্ছে আর বলছে রৃপ-টুপ কিছু নেই, তখন 
এক দিন মা'র কাছে গিয়ে নালিশ করলে রামকৃফ। মা রাতির মা'র বেশে দেখা 
দলেন। বললেন, তুই ভাবেই থাক। 
এক-একবার ও-কথা ভুলে যাই বলে কষ্ট হয়। ভাবে না থেকে দাঁত ভেঙে গেল। 
তাই দৈববাণী যতক্ষণ না শুনছি বা প্রত্যক্ষ যতক্ষণ না হচ্ছে ভাবেই ডুবে থাকব, 
ধাকব ভক্ত নিয়ে। 
সেই সহজ কথাই কেশবকে শেখাতে বসল। 
দুধ কেমন £ না, ধোবো-ধোবো। দুধকে ছেড়ে দুধের ধবলত্ব ভাবা যায় না। আবার 
দুধের ধবলত্ব ছেড়ে দুধকে ভাবা যায় না। তাই ব্লহন্নকে ছেড়ে শান্তকে, শান্তকে 
 ব্রহম্নরকে ভাবা যায় না। যান নিত্য তিনিই ব্রহন, যিনি ললা তাঁনই কালণী। 
ব্রহন, ব্রহন্ই কালা ।, 
লশতত্ব জানবার জন্যে ধরে বসল কেশব । কালী অত কালো কেন? 
ক কালো? দূরে, তাই কালো, জানতে পারলে কালো নয়।' বললে রামকৃফণ। 
দূর থেকে নীলবর্ণ। কাছে গিয়ে দেখ, কোনো রঙ নেই। সমুদ্রের জল 
্ থেকে নীল, কাছে গিয়ে হাতে তুলে দেখ, কোনো রঙ নেই।' 
িহবল হয়ে গান ধরল রামকু্ণ। 
আমার কালো রে? কালরুপ দিগম্বরীী, হৃৎপদ্ম করে আলো রে। 
একান্ত কাছটিতে সরে এসেছে রামকৃফ। কাছে এসে আলোয় আলোময় 
৮) ৪৯ 


দেখছে। সরে, আসতে-আসতে নিজেই মাতে মিশে মা হয়ে গিয়েছে। শ্যামা 
প্দরদষ না প্রকাতিঃ এক জন ভন্ত পুজো করছিল। এক জন দর্শন করতে এসে 
দেখে মার্তর গলায় পৈতে। তুমি মা'র গলায় পৈতে পারয়েছ? দর্শক আপান্ত 
করলে । ভন্ত বললে, ভাই, তুমিই চিনেছ। আমি এখনো চিনতে পারিনি, তিনি 
পুরুষ কি প্রকৃতি । তাই পৈতে পরিয়েছি।, 

তাকেই তো বলে যোগমায়া, অর্থাৎ পুরদষপ্রকৃতির যোগ । পুরুষ নিম্কিয় তাই 
শিব শব হয়ে আছেন। আর, পুরুষের যোগে প্রকীতি সমস্ত কাজ করছে, হনন- 
পালন করছে। এক ছাড়া আর নেই। যা পুরুষ তাই প্রকাতি। যা বিদ্যুৎ তাই 
বৈদ্যুত শান্ত । রাধাকৃষের যুগল মৃর্তিরও মানে এঁ। এ যোগের জন্যেই তো বাঁঙ্কম 
ভাব। 

মনোমোহন মাত্তরের বোনকে বিয়ে করেছে রাখাল । রাখালের বয়েস তখন আঠারো । 
বিয়ের পর ভগ্নীপাঁতিকে নিয়ে দক্ষিণে*বরে এসেছে মনোমোহন। 

এ কে? রাখালকে দেখে রামকৃষ্ণ তো অবাক। 

ভাবমুখে থেকে মাকে এক দন বলোছল রামকৃষ্ণ, 'মা গো, বিষয়ী-সংসারী লোকের 
সঙ্গে কথা বলতে-বলতে জিভ জবলে গেল।, 

মা বললেন, 'ভয় নেই। শুদ্ধসত্ত ত্যাগী ভন্তেরা আসছে একে-একে। 

এক জনকে সঙ্গী করে দাও আমার মত। আমার তো সন্তান হবে না, কিন্তু 
মা, ইচ্ছা করে, একটি শহদ্ধভন্ত ছেলে আমার সঙ্গে থাকে। সেইরূপ একটি ছেলে 
আমায় দাও ।, 

এর কিছু দিন পরে ভাবচক্ষে রামকৃষ্ণ দেখতে পেল, বটতলায় একট ছেলে দাঁড়য়ে 
আছে। কেন, ও ওখানে কেন? এ 'কি কাণ্ড ? 

হৃদয়কে বললে সেই দর্শনের কথা। হৃদয় আনন্দ করে উঠল। বললে, 'মামা, 
নিশ্চয়ই তোমার ছেলে হবে। তাই দেখেছ।, 

'সে কি রে? চমকে উঠল রামকৃষণ। 'সে কি রে? আমার যে মাতৃযোন। আমার 
ছেলে হবে কেমন করে ?, 

রামকৃ এক দন বসে আছে নিরালায়, হঠাৎ মা এসে তার কোলের মধ্যে একটি 
ছেলে ফেলে দিয়ে গেলেন। বললেন, 'ছেলে চেয়েছিলে না? এই তোমার ছেলে ।' 
সে কি? আমার আবার ছেলে কি? 

মা বাঝয়ে দিলেন, শরীরের পন্ত্র নয়, মানস পৃন্তর। 

রাখালের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল রামকৃষ্ণ । এ যে সেই ছেলে! 

“তোমার নামাঁট কি? তাষত কর্ণে জিগ্গেস করলে রামকৃফণ। ৃ 
শ্রীরাখালচন্দ্র ঘোষ । 

সমস্ত হৃদয় দুলে উঠল। সমস্ত সৃষ্টি ভরে গেল বাঁশির সরে । নীল যমুনার 
জলে। 'সেই নাম! রাখাল, ব্রজের রাখাল! ভাবে ডুবে গেল রামকৃষ$। আর কোনো 
কথা নেই। আর শুধু একা মান্ত্র স্নেহস্বর : 'এখানে আবার এক 'দিন এস। আবার 
এক 'দন।, 


&০ 


আর রাখাল কাঁ দেখল? এ কে? দিব্যদীপ্তি অঙ্গে নিয়ে এ কে বসে আছে তার 
চোখের সামনে £ রাখাল দেখল মা বসে আছে । মা, তার মা। জীবজগতের মা। 
তার পর আরো কণদন পর কলেজের ছুটির শেষে এক দিন একা-একা চলে এসেছে 
রাখাল। 

'তোর এখানে আসতে এত দেরি হল কেন? আকুল হয়ে ডাকল রামকৃষ্ণ : 'আয় 
আয়, তুই আমার রাখাল, তুই আমার গোপাল, তুই আমার কৃফণ।, 

রাখালের মনে হল সে যেন তিন-চার বছরের ছেলে । আর তার সামনে বিশ্রামশান্ত 
কোল পেতে তার মা বসে আছেন । মা কালী, মহাকালা । শ্যামন্ত্রীতে স্নেহস্রী। 
রামকৃষের কোলের মধ্যে গিয়ে বসে পড়ল রাখাল। রামকৃষ্ণ সস্নেহে হাত বুলুতে 
লাগল সর্বাঙ্গে। আর রাখাল নিঃসঙ্চোচে রামকৃষের স্তনপান করতে লাগল । 
রামকৃষই মা। রামকৃষই মাতৃসাধনার চরম। 

তাই তো মা বলে ডাকি। মা বলে যখন ডাক তখন তোমাকেই ডাকি। আমরা 
কি কালী চিনি না দুর্গা চিনঃ আমরা শুধু তোমাকে চান। আমরা মা বলে 
ঢাকলে আর কেউ সাড়া না দিক, তুমি দেবে । তোমার ডাক, তুমিই তো ভালো 
চন। তুমিই তো সংসারের কানে দিয়ে গেছে এই ডাক। এই সংক্ষিপ্ত একাক্ষর 
মন্ল। তাই তোমার সাধ্য কি, তুমি থাকো নিশ্চল হয়ে। 

তার পর এক দন নিজের ডাকে যাঁদ নিজে সাড়া দাও, প্রভূ, তবে আর আমাদের 
কালীই বা কি, ব্রহমই বা 'কি। 






দ্ধ? তা ছাড়া আবার কি। হোক দলাদাঁল, হোক রেষারোঁষ, হোক বাদ-বিতণ্ডা, 
রা সতীর্থ। তারা এক তীর্থের যাত্রী । যারা সমানতীর্থসেবী তারাই সতীর্থ। 
এক গুরুর ছান্র। এক পাঠশালার পড়ুয়া । তাদের দুজনের একই ঈশ্বর- 


৯ 


শান্তপুরে প্রভু অদ্বৈতাচার্ষের বংশে বিজয়কৃষ্ণের জন্ম । বাপের নাম আনন্দ- 
শোর গোস্বামী । নিত্যপূজার শালগ্রাম শিলা গলায় বেধে এক দিন হঠাং 
পুরীর দিকে যাত্রা করলেন আনন্দকিশোর। বাসনা জগন্নাথ দর্শন। যাত্রা করলেন 
পায়ে হেণ্টে নয়, বুকে হে্টে। গণ্ডি কেটে-কেটে। পুরী পেশছযতে এক বছর 
লাগল। মাটির ঘষায় বুকে-পায়ে ঘা হয়ে গেছে তবু হটছেন না আনন্দাকশোর। 
ঘায়ের উপর ন্যাকড়া জাঁড়য়ে নিয়েছেন। 

ভন্তের যাঁদ ন্যাকড়াও না জোটে, তবু ভন্ত ন্যাকড়ার আগদুন। 

জগন্নাথ স্বখন 'দিলেন। 'তুই বাঁড় যা, আমি পূত্র হয়ে তোর ঘরে আসব।' 

পূত্রঃ দু-দুবার বিয়ে করেছিলেন আনন্দাকশোর, দুই স্তীই গত হয়েছেন 
নিঃসন্তান অবস্থায়। প্রায় পণ্টাশ বছর বয়স হল, এখন আর তবে পত্র কি! কিন্তু 
স্বপ্নবাক্য কি নিষ্ফল হবে ? 

তৃতীয় বার বিয়ে করলেন আনন্দকিশোর। বিয়ে করলেন নদীয়া জেলার গৌর 
জোদ্দারের মেয়ে স্বর্ণময়বীকে। 

সোঁদন ঝুলন-পার্ণমার রাত। পার্ণমার চন্দ্র, কিন্তু সবাই বলে কৃষণচন্দ্ু। 

কিন্তু গোরাপ্রসাদের ঘরে সোঁদন বিপদ উপাঁস্থত। পরের দুঃখে মন কাঁদে, কোন 
এক দেনদারের জামিন হয়োছলেন গোরাপ্রসাদ। সেই দেনদার হঠাৎ ফেরার 
হয়েছে। তাই জামনদারের বিরুদ্ধে ক্রোকী পরোয়ানা বোরয়েছে আদালত থেকে৷ 
অস্থাবর ধরবার পরোয়ানা, আদালতের পেয়াদা চড়াও হয়েছে বাঁড়তে। 

সে সব দিনে আদালতের পেয়াদা মানে কৃতান্তের অননচর। বাঁড়র মেয়েরা পেয়াদা 
দেখে যে যোঁদকে পারল ছুটে পালাল। স্বর্ণময়ী পালাল বাঁড়র পিছনে টু 
গাছের নিচে ঘন কচুবনের মধ্যে । 

স্বর্ণময়ী আসন্নপ্রসবা। 

ক্রোকের হাঙ্গামা চুকে গেল, বাঁড়র মেয়েরা সব একে-একে ফিরল বাঁড়তে। কিন্তু 
স্বর্ণময়ী কোথায়? স্বর্ণময়ী কোথায় গেল? 

খঃজতে-খজতে পেল তাকে কছুবনে। এ ফি! তার কোলে প্রসম্লহাস 'হরণ্ময়বপু 
শিশু । 

বিপদ কোথায়! বিপদের দিনে বিপদভঙ্জন। বিপন্নপালক। 

এই শিশুই 'বিজয়কৃ্ণ। 

নিম গাছের নিচে জন্মেছিলেন শ্রীচৈতন্য। শ্পিট্টীল গাছের নিচে জন্মালেন 
বিজয়কৃফ। 

আর আমাদের প্রভু রামকৃফ জন্মালেন ঢেশকশালে। জন্মেই উন্‌নের ছাই মেখে 
বিভূতিভূষণ হলেন। 

রামকৃফের রঘ্‌বাীর, বিজয়কৃফের শ্যামসংন্দর | 

ভোর বেলা, মন্দিরের দরজা বন্ধ। পূজারী এসে দরজা খুলবে। 

শিশু বিজয়কৃষ সেই দরজা ঠেলছে প্রাণপণে । কাঠের রঙিন বল্‌ নিয়ে সে 
খেলছিল, সে-বল সে খুজে পাচ্ছে না। খুজে পাচ্ছিস্‌ না তো এখানে ফি! 

৫২ 


এই শ্যামস্যন্দরই আমার বল্‌ নিয়ে পাঁলয়ে এসেছে । ও-ও যে খেলাছল আমার 
সঙ্গে।” 

কে শোনে কার কথা! দরজা যখন খুলতে পারছে না গায়ের জোরে, তখন কাকুাঁতি- 
মিনতি করছে। দাও না আমার বল্‌ । কেন বসে আছ দোর এটে? বাইরে বেরিয়ে 
এস না। 

দাঁড়াও। কতক্ষণ বন্ধ হয়ে থাকবে? শিশু বিজয়কৃষ এক লাঠি নিয়ে এসেছে। 
পূজারী এসে দরজা খুললেই দেখে নেব তোমাকে । কে তখন তোমাকে বাঁচায় 
দেখব। 

দরজা খোলা হলেও মন্দিরে তাকে ঢুকতে দেওয়া হল না। তার যে এখনো পৈতে 
হয়ান। 

সারা দন উপোস করে রইল বিজয়। মা এসে কত সাধ্যসাধনা করলেন, নরম 
হল না এতটুকু। শ্যামস্‌ন্দরের উপর প্রাতশোধ না নিয়ে অল্লজল গ্রহণ করবে 
নাসে। 

মা ঘরে ভাত রেখে শুয়ে পড়লেন। খদের কাছেও যে হার মানে না সে কেমনতরো 
ছেলে! 

মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে গেল স্বর্ণময়ীর। বিজয় যেন কথা কইছে কার সঙ্গে। 
'যাক, ঘাট মানলে । তাই ছেড়ে 'দিলাম। নইলে দেখাতাম একবার মজা । 

গলার সর বদলাল 'বিজয়। 

'আমি না হয় তোমার উপর রাগ করে খাইনি । কিন্তু তাই বলে তুমি কেন 
খেলে নাঃ, 

দ্বর্ণময়ী তো বাক্যহশীন। 

বেশ, বেশ, দুজনে একসঙ্গে খাই এস।' 

ঢাকা তুলে ভাত খেতে লাগল বিজয়। তার সঙ্গে আরো এক জন কে খাচ্ছে। 
শকারপুরের পাঠশালায় ভার্ত হয়েছে বিজয় । ভীষণ কলেরা লেগেছে শান্তিপুরে। 
চক্ষের পলকে বহু লোক নিশ্চহু হয়ে গেল। তার মধ্যে অনেকগুলো বিজয়ের 
সমপাঠী। 

বিজয়ের বেদনার চেয়ে বিস্ময় বোশি। যে মাদুরে তারা বসত সে মাদুর আছে, 
যে বই তারা পড়ত সেই বই আছে, ষে জিনিস নিয়ে খেলাধূলো করত সেই 
জিনিসগুলো আছে। অথচ তারা নেই। এ কখনো হতে পারে? এটুকু শিশু 
মহা সমস্যায় পড়ে গেল। যা একবার থাকে তা কি আবার না-থাকে 2 যা একবার 
হয় তা কি আবার না-হয় ? 

চিন্তায় হাবুডুবু খাচ্ছে শিশু। কে তাকে মীমাংসা করে দেবে? কে তার সেই 
খসএ ? 

এক 'দন ভাঁর মন নিয়ে চলেছে পাঠশালায় । হঠাৎ তার সেই মৃত সহপাঠীরা 
দর্শন দিলে তাকে, দিনের আলোয়, পথের মধ্যে। বলে উঠল সমস্বরে : ণবজয়, 
আমরা আছি। আমরা আছি ।, 


৩ 


আমরা আছি? আমরা যদি আছি, তবে নিশ্চয়ই তিনিও আছেন। 

পাঠশালায় চলে এল একছ_টে। পাঠশালার গুর্‌ ভগবান সরকার, তাঁকে বললে 
সব বিজয়। ভুতের গল্প বলে হেসে ডউীড়িয়ে দিলেন গুরুমশাই। বিজয় জেদ 
ধরল, আপাঁন একবার চলুন আমার সঙ্গে । সেই ঝোপের পাশে, পথের উপর। 
নেইআঁকড়ার পাল্লায় পড়েছেন গুর্ূমশাই। শেষে তিনি শন্ত হয়ে বললেন, “ঠক 
বলছিস? তাদের কথা তুই শোনাতে পারাবি 2' 

শনশ্চয়ই পারব।, 

সেই চেনা জায়গায় নিয়ে এল গুরুমশাইকে। কিন্তু কোথায় সেই ছেলের দল; 
কোথায় তাদের সেই কচি গলার কলস্বর ? 

ওরে তোরা কোথায় ঃ তোরা কথা ক। আমরা শুধু আমাদের কথা কইছি। তোরা 
তোদের কথা ক। তোদের কথাই তাঁর কথা। 

চার দিকে শুধু মৌনময় মুখরতা। এ কি গুরুমশাইদের কানে ঢোকে? তারা 
হীন্দিয়ের প্রমাণ চায়। বলে, দেখাতে পারো? শোনাতে পারো? 

'যত সব ফাজলামো--+ ভগবান সরকার মারতে উঠলেন বিজয়কে । 

হঠাৎ একসঙ্গে কতগ্দল ছেলে কলধবাঁন করে উঠল : 'গরুমশাই, মারবেন না 
বিজয়কে । 

উদ্যত হাত অসাড় হয়ে গেল। ব্যাকুল চোখে চার দিকে তাকাতে লাগলেন ভগবান 
সরকার । 

এই যে আমরা । এইখানে, এইখানে । সবখানে- 

বিজয়কে বুকে জাঁড়য়ে ধরলেন ভগবান সরকার। কে কার গুরু? যে দেখায় 
আর শোনায় সেই তো আচার্। 

সেই তো দ্রস্টা, শ্রষ্টা, শ্রোতা, ঘ্বাতা, রসাঁয়তা। 

পুরন্দর পূজারী মরে ব্রহমদৈত্য হয়েছে। থাকে গাছের উপর। আগে শ্যামসুন্দরের 
পূজারী ছিল। প্দজো করত আর জনিস সরাত। ভোগ-নৈবেদ্য শুধু নয়, আরো 
িছ_ মোটা 'জানিস। তারই পাপে এই গ্রাঁত। 

কিন্তু বিজয়ের উপর ভার টান। তার সর্বত্র অপদে গতায়াত, তাই আপদে-বপদে 
সব সময়ে সে বিজয়কে রক্ষা করে। থাকে তার সঙ্গে-সঙ্গে। কখনো দেখা দেয় 
কখনো বা দেয় না। 

যান্তা শনতে-শুনতে ঘ্াাময়ে পড়েছে বিজয়। আসর ভেঙে গিয়েছে । যে যার 
মনে কখন ফিরে গিয়েছে বাঁড়-ঘর। ফরাসের একধারে বিজয় শুধু একা ঘূমিয়ে। 
ঘুম ভেঙে চোখ চেয়ে তো তার চক্ষুস্থির। রাত ঝাঁ-ঝাঁ করছে, সঙ্গী-সাথী নেই 
কেউ ধারে-কাছে, এখন সে বাঁড় ফেরে কি করে? 

খড়মের শব্দ শোনা গেল চটপট । হাতে লণ্ঠন আর লাঠ, কে এক জন কাছে এসে 
দাঁড়াল। বললে, চল পেশছে দিয়ে আঁস। 

এমনি আরো কয়েক বার সে পেশছে দিয়ে এসেছে । 'বিপদে বা বিপথে পড়লেই 
লাঠি হাতে পুরন্দর এসে দেখা দেয়। 

£৪ 


'এ লোকটা কে রে?' এক দিন জিগগেস করলেন স্বর্ণময়ী। 

'কোন লোক 

'যে তোকে বাড়ি পেশছে দিয়ে যায় ? 

'বা আমি তো জানি তুমিই পাঠিয়ে দাও ওকে । আমাকে ডেকে নিয়ে আসবার 
জন্যে বুঝ লোক রেখেছ। তবে-_; 

'শোন, ওর সঙ্গ করাব নে। ও ব্রহমদাত্য।, 

হোক ব্রহম়দৈত্য। দৈত্য থেকেই ক্মে এক 'দন ব্রহেম্ন নিয়ে পেশছুব। 

বিজয় না চাইলে 'কি হবে, পরন্দর তাকে ছাড়ে না। বলে, আমি যতাঁদন আছি, 
ততদিন তোকে আগলে যাব। 

কিন্তু মা বলেছে, গয়ায় যাঁদ তোমার পণ্ড দিই ?, 

ব্যস, তা হলেই বন্ধন মুন্তি। তাহলেই উধ্বযাত্রা। ক্লমোন্নয়ন। 

গকন্তু, দেখো, তোমরা যেন গয়ায় মরে ভূত হয়ো না।' হেসে উঠল পুরন্দর। 
সোঁদন গান শুনে বাড়ি ফিরতে বেজায় দের হয়ে গিয়েছে । 

পুরন্দর বললে, “এই পোড়ো বাঁড়র আঙিনার ভেতর 'দয়ে গেলে তাড়াতাঁড় 
যাওয়া যাবে । গাছে বাঁদর আছে, ডালপালায় ঝূপঝাপ করলে ভয় পেয়ো না।' 
অমনি গাছের উপর থেকে কে একজন বলে উঠল ব্যঙ্গ করে : 'বেশ বলেছ যা 
হোক। গাছে খন আছি তখন বাঁদর ছাড়া আর 'কি। “কিন্তু ছেলেটার কাছে 
আসল কথাটা ফাঁস করে দেব না 'কি?' 

তার মানে ছেলেটাকে ভয় দেখাবে । পুরন্দর তেড়ে এল। বললে, 'এ যে বলেছে 
মরলেও স্বভাব যায় না তোদের হয়েছে তাই-_ 

ঝগড়া বাধে দেখে বৃক্ষস্থ আরেক জন মধ্যস্থতা করতে এল। গম্ভীর গলায় 
বললে, 'পরলোক দেখ! পরলোক দেখ! 

শুধু পরলোক নয়, পরম লোককে দেখব । যা প্রেত ও প্রাস্থত তাই এক 'দিন 
মহা-স্থিতের কাছে পেশছে দেবে । সেই তো আঁদ বাঁড়। সেখানেই তো আসল 
উপনয়ন। 

ন বছর বয়সে উপনয়ন হল বিজয়ের। টোলে গিয়ে ঢুকল। এক বছরে মগ্ধবোধ 
মুখস্ত করে ফেললে । তার পর নিয়ে পড়ল সাংখ্য আর বেদান্তদর্শন। 

ণিন্তু যতই পড়ো আর লড়ো, তার মুখে শুধু এক বাঁল। সে বালির নাম 
'হারিবোল”। বিজয়কৃষ গোস্বামী হরি-ভোলা সংসারে বাস করে না, বাস করে 
হার-বোলা সংসারে। 

দ্বাক্ষণে*বরে খন আসে তখনই মূখে ধান করে : “হে শ্রীহরি-_ 

এই শ্রীহার ডাকাটই পর-পর তিন বার তিন রকম সুরে সে উচ্চারণ করে। এমন 
করুণ এমন আর্দ্র সেই স্বর যে তপ্ত চিত্ত শীতল হয়, তৃষিত চিত্ত তৃপ্তিতে ভরে 
ওঠে। মনে হয় সর্বতীশর্থময় হরি যেন বাস করছেন এই দক্ষিণেশ্বর তাঁর্ধে। 
নামাপ্নিতে দশ্ধভূত হয়ে যাচ্ছে-_বিজয়কৃফকে চিনতে পারল রামকুফ। 

বিধৌত হয়ে যাচ্ছে পরমপাবনণ ভান্ততে। এসেছে সেই ক্ষমা, বৈরাগ্য আর মান- 


৫৫ 


শূন্যতা । সেই আশাবদ্ধসমুৎকণ্ঠা, ভগবানকে পাবার জন্যে বেগবতী আশা আর 
না পাওয়ার জন্যে এঁকান্তিকী কাতরতা। সেই নামগানে সদারূচি। আসান্তস্তং- 
গুণাখ্যানে, প্রাঁতিস্ততবসাতস্থলে। বিজয়ের সর্বাঙ্গে সেই ভাবকদম্ব পরিস্ফু্ট। 
ঠাকুরের তখন হাত ভেঙে গেছে, খুব কষ্ট পাচ্ছেন। 

একজন ব্রাহন্ন ভন্ত বললে, 'আপাান তো জীবন্মুস্ত, এই কম্টটুকু ভুলতে পাচ্ছেন 
না?' 

ঠাকুর বললেন, 'তোদের সঙ্গে কথা বলে ভুলব? তোদের বিজয়কে আন। তাকে 
দেখলে আম আপনাকে ভুলে যাই।, 





কলকাতায় এসে সংস্কৃত কলেজে ভার্ত হল 'বিজয়কৃষণ। রামচন্দ্র ভাদুড়ীর মেয়ে 
যোগমায়াকে বিয়ে করলে । বিজয়ের বয়স আঠারো আর যোগমায়ার ছয়। 
শবজয়ের দুই বজ্ধু রামময় আর কৃষময় খুম্টান হয়ে গেল। 

বিরান্ততে বিভ্রান্ত হল না বিজয়, বেদনায় ভাবতে বসল। 'হন্দুধর্মের অনুষ্ঠানে 
তুলসী-বিজ্বপন্রের সঙ্গে অনেক আগাছা এসে ভিড়েছে। তাই লোকে আস্থা 
হারাচ্ছে। রাস্তা হারাচ্ছে । উন্মার্গগামী হচ্ছে। 

এখন উপায় কি। 

রংপুরে শিষ্যবাঁড় গিয়েছিল, শিষ্য মন্ল আওড়ে পা-্পুজো করলে। বললে, তুমি 
জ্কানবার্তকা জেহলে অজ্ঞানের চক্ষুরুন্মীলন করেছ, তোমাকে প্রণাম । 

ছাই করোছ। কিছু কাঁরান। আমার 'নজের চোখ কে খুলে দেয় তার ঠিক নেই, 
আমি গোছ পরের চোখ খুলতে । একেই বলে গয়ায় মরে ভূত হওয়া । করব না 
আর কপটাচরণ। 

যজমানগার ছেড়ে 'দিয়ে স্বাধীন ভাবে খেটে খাব কলকাতায়। পড়ব মোঁডকেল 
কলেজে। 

রংপুর থেকে বগুড়ায় এল বিজয়কৃষণ। বগুড়ায় 'তিন জন ব্লাহননভন্তের সঙ্গে দেখা 
হল। এরা তো চমৎকার। যেমন শুনোছলাম তেমন তো নয়। মদও খায় না, 
স্বেচ্ছাচারও করে না। শুধু ঈশ্বরের কথা হয়। সেই তো 'অমৃতস্য পরং সেতু?! 
বাক্যে তাঁর প্রকাশ হয় না অথচ বাক্যই তাঁর প্রকাশ। 

৬ 


কলকাতায় এসে ব্রাহন্সমাজে হাঁজর হল এক দিন। সোঁদন দেবেন ঠাকুর বন্তৃতা 
দিচ্ছেন। বন্তৃতার বিষয়--পাপার দুদ্শশা ও ঈশ্বরের করুণা" । বন্তুতা শুনে বিজয় 
আভিভূত, দ্রবীভূত হয়ে গেল। নিজেকে হঠাৎ মনে করল নিরাশ্রয় বলে। নিন, 
নিঃসহায় বলে। প্রার্থনা করতে বসল। “এইমাত্র শুনলাম তুমি অনাথের নাথ, তুমি 
দীন জনের বন্ধু। তবে আমাকে তুমি নাও, আমাকে তুমি রাখো । তোমাকে যে 
পায়নি তার মত আর দীন কে! তুমি আমার, এই নিকট অনুভূতি যার নেই সেই 
তো অনাথ। আম আর কোথাও যাব না, আর কোথাও ঘুরব না, এই তোমার 
দুয়ার ধরে পড়ে রইলাম, 

তাঁর দরজায় তান যে আমাকে পড়ে থাকতে দেবেন এই তো তাঁর অনেক দয়া । 
1ভখারীকে দোরগোড়ার স্থানটুকুই বা কে দেয়! 

শুধু শরণাগাতিতেই শান্তি। সর্বসাধনস্তম্ভর্পা শরণাগাঁত। 

'শান্তিরেব শান্তিঃ, সা মে শান্তিরোধি।' যা আপনাতেই শান্তি সেই শান্তিই 
আমার হোক। 

ঠাকুর বললেন, "কাঠ পোড়া শেষ হলে আর শব্দ থাকে না- উত্তাপও থাকে না। 
সব ঠান্ডা । শান্তি শান্তি শান্তিঃ।' 

মেডিকেল কলেজের বাংলা বিভাগে পড়ছে বিজয়কৃষ্ণ। সাহেব অধ্যক্ষের সঙ্গে 
ছান্রদের সংঘর্ষ বেধেছে । বিজয় সেই ছান্রদলের পাণ্ডা। 

ব্যাপার কিঃ 

এক ছান্রকে ওষুধচুরর অপবাদ দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছেন অধ্যক্ষ । শুধু 
তাই নয়, জাত তুলে বাঙালীদের গাল দয়েছেন। আর যায় কোথা! বিজয়ের নেতৃত্বে 
ছাত্রেরা সব কলেজ ছেড়ে 'দিলে। 

এই নিয়ে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে দেখা বিজয়কৃফের । 

বিজয়কে দেখে বিদ্যাসাগরের আনন্দ ধরে না। দুই তেজস্বা চক্ষু সত্যের আলোতে 
জবলছে। দৃপ্ত ব্যান্তত্বে অবক্র নিভভঁকতা। শুধু তাই নয়, সঙ্গে তান্র 
ঈশবরানূরাগ। 

বিজয় বললে, 'আপনার বোধোদয়ে সবই তো লিখেছেন, কিন্তু সাঁত্যকার বোধোদয় 
হয় যাঁকে আশ্রয় করে, তাঁর কথাই কিছু নেই।, 

কোনো উত্তর খজে পেল না বিদ্যাসাগর । বিদ্যার সে সাগর বটে 'কিল্তু তার নামের 
প্রথমেই যে ঈশ্বর তার 'দকেই বুঝি তার চোখ পড়োন। * 
বোধোদয়ের পরের সংস্করণে ঈশ্বর এল। নতুন পাঠ। কিন্তু নব-নবায়মান রস। 
পৈতে ফেলে 'দিয়ে ব্রাহন হল বিজয়কৃফণ। প্রেসিডোন্স কলেজের সামনে দাঁড়য়ে 
বন্তুতা করতে লাগল। শুধু বন্তৃতা নয়, প্রচারণা । চাই ব্লহমাবদ্যা, পরা বিদ্যা। 
জড় ধর্ম থেকে মত্ত হয়ে ভগবানকে লাভ করার সারমমহি হচ্ছে ব্রাহনধর্ম। 

এই সময় কেশব সেনের সঙ্গে আলাপ হল বিজয়ের। আলাপের সঙ্গে-সঙ্গেই 
গভীর বন্ধৃতা। একে অন্যের দর্পণ হয়ে দাঁড়াল। এ দর্পণে পরস্পরের মুখ দেখে 


না, পরাবরের মুখ দেখে। 
৫ 


মোঁডকেল-কলেজের শেষ পরীক্ষা কাছে, বিজয় বললে, পরীক্ষা দেব না, ব্রাহমধর্ম 
প্রচার করব। দেশে-দেশে দিকে-দিকে ঈশ্বরের নাম গেয়ে বেড়াব এই ব্যাকুলতাই 
আমার জীবনের আকর্ষণ। জাবকার চেয়ে জীবন বড়। জীবনের চেয়ে 
জাঁবনবল্লভ। | 

কিন্তু প্রচার মুখের কথা নয়। কেশব বললে, দস্তুরমতো পরাক্ষা দিয়ে পাশ করতে 
হবে। 

“তাই করব।" পড়াশোনা করে পাশ করলে সহজেই । ধর্মের বৈজয়ল্তী নিয়ে বিজয় 
বেরুল দিগ্বিজয়ে। 

'এ যে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো ।' আপান্ত করল বন্ধুরা । “পেট চলবে 
কি করে? 

“যান মরুভূমিতে ঘাস বাঁচিয়ে রাখেন, তাঁনই রাখবেন ।, 

মহর্ধ বললেন, ণনার্দস্ট কিছ: বৃত্ত দেওয়া যাক তোমাকে ।, 

প্রবৃন্তর বৃত্ত করতে আসাঁন। ঈশবরই আমার উদ্যম, ঈশবরই আমার উদ্দেশ্য! 
তাঁর উপরে যাঁদ সাত্য আমার 'নর্ভর থাকে তা হলেই আম অভীঃ। 

সংসারে তার জায়গা হয়নি, তাই বলে সংসারকে ত্যাগ করোনি বিজয়কৃফ। শান্তিপূর 
তাকে তাঁড়য়েছে কিন্তু বিজয় চলেছে আসল শা্তিপ্‌রে। 

তার গাঁত দুর্গাঁবঘাঁতিনী, তার বাণী অপরাজ্মুখী। 

কলকাতা ব্রাহন্নসমাজের উপাচার্য হল 'বিজয়। 

বূধবার, উপাসনার 'দন। প্রলয়ংকর ঝড়বৃম্টি হচ্ছে। পথঘাট ডুবে গেছে, গাছ 
পড়েছে অনেক, গাঁড়-ঘোড়া জনমানবের চিহ নেই। জলম্োতে মৃতদেহ ভাসছে। 
ঘোর অন্ধকার । কার সাধ্য রাস্তায় বেরোয় এই দুঃসময়ে ? 

বিজয়ের সাধ্য। প্রথমে হাঁটূজল থেকে গলাজল। তার পরে সাঁতার । পথনদী পার 
হয়ে শেষ পর্যন্ত পেশছুল মান্দরে। কিন্তু হা হতোহস্মি, এক জনও আসেনি, 
ব্যাকুলতার ঝড়ে ভান্তুর নদ সাঁতরে। বিশ্বাসের ভেলায় ভেসে । অশ্রুজলের 
বর্ষণে। 

মান্দরের চাকরকে পাঠাল আচার্ষের কাছে। আচার্য মানে দেবেন ঠাকুরের কাছে। 
তান লিখে পাঠালেন : প্রকৃতির আজ করালমৃর্ত, আজ এর মধ্যেই পরমেম্বরের 
লীলা দর্শন করো। 

একাই উপাসনায় বসল 'বিজয়। বিজয় একাই একশো । 

কতক্ষণ পরে কেশব এল পালাঁকতে করে। বসে পড়ল উপাসনায়। নীরম্ধ্র অন্ধকারে 
দুটি নিম্কম্প দীপদ্যাত-কেশব আর 'বিজয়। স্বস্থ, শান্ত, স্পন্দনাবরাহত। 
ব্রহননিষ্পন্ন । 

ণবজয়ের দিন কাটছে অর্ধাশনে, কখনো অনশনে । চাঁদার খাতায় চার আনা আট 
আনা 'ভিক্ষে করে । কখনো বা দেড় পয়সার মুড়ি খেয়ে। বাঁড়র প্রাঙ্গণে কাঁটানটে 
শাক ফলেছে অজন্্, তাই 'দিয়ে ভাত মেখে । তাও না জোটে তেকতুলগোলা 'দিয়ে। 
তবু ঈশবরস্খলন নেই, নেই স্বভাবচ্যাতি। 


৬ 


কণ্ঠকৃপে ক্ষএখাপপাসা নিবৃত্ত এই কাম্যকমন্রয় বিজয়ের । 'অল্ন চিন্তা চমৎকারা'_ 
এ যেন বিজয়ের পক্ষে খাটে না। সে জানে তৃফাসূত্র 'ছন্ন না হওয়া পর্যন্ত জীবের 
সমস্তই দ?ঃখ, তৃফাচ্ছেদ থেকে যে কৈবল্য তাই একমান্র আনন্দ। বিজয় আছে 
সেই বৃহদানন্দে, জগদানন্দে। যাঁদ সে পোত্তালকতা বন করে থাকে তবে সে 
সুখ-শান্তি অর্থআরাম ষশ-মান_সমস্ত উপাধিই বর্জন করবে। উপাধিরই 
বিকার, উপাধিরই মৃত্যু, আত্মা স্থির, নিবিচল। 
আত্মা প্রকাশক, জড় প্রকাশ্য। কেবল উপাধির যোগেই ভাব আত্মাই বাঁঝ কর্তা, 
আত্মাই বুঝি ভোত্তা। আবদ্যার বশেই নিজেকে দেহবান মনে করি। মন মায়া, 
আভাস মান্র। আমাদের আসল আঁধচ্ঠান চৈতন্যে। ঈশ্বর মায়ার অতাঁত। ঈশ্বর 
চৈতন্যস্বরূপ ৷ 
বিজয় সেই চৈতন্যের দ্যোতনা । 
কেশব আর বিজয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পারছে না পাঁদুরা। খৃষ্টধর্মে আর আকৃষ্ট 
হচ্ছে না বাঙাল, ব্লাহনধমেই পাচ্ছে তাদের 'িপাসার পানীয়। 
এখন কি করা! পাঁদ্ররা ঠিক করল তকসভায় ব্রাহম-প্রচারকদের আহ্বান করা যাক। 
তাদের তর্কে পরাস্ত করতে পারলেই বিদ্বংসমাজ কৃতনিশ্চয় হবে যে খচ্টধর্মই 
শ্রেষ্ঠধর্ম। 
তখন কেশব বিজয় আর প্রতাপ এলাহাবাদে। উপাসনার পরে মান্দরে এক 'দিন 
এসেছে এক পাঁদ্র। মহাজ্ঞানী আর তর্কবীর বলে প্রখ্যাত। খোদ বিলেত থেকে 
এসেছে খঙ্টান মিশনের প্রাতানাধ হয়ে। আগে পাদ্র, পরে বেনে, শেষকালে 
সৈন্য। এই ইংরাজী কূটনীতি । আগে মিন্টি বাল, পরে টাকার টুং-্টং, শেষ- 
কালে অস্বের ঝঞ্চনা। সাদরে অভ্যর্থনা করল কেশব। 
“তোমরা খস্টধর্ম প্রচারে বাধা 'দিচ্ছ। সে বিষয়ে খোঁজ করতে এসেছ আমি। 
ধর্ম সম্বন্ধে আমি বিচার করতে চাই তোমাদের সঞ্গে। কি তোমাদের বন্তব্য, কি 
বা তার ভাব__ 
চার দিকে তাকাল পাদ্র। কার সঙ্গে কথা কইব? কে তোমাদের মধ্যে উপযস্ত ঃ 
যাকে ইচ্ছে তাকেই বেছে নাও । কিন্তু তোমাকে কে বাছল, তাই ভেবে পাচ্ছি না। 
'এ যে এক জন বসে আছে স্থির হয়ে, উপাসনা শেষ হয়ে যাবার পরেও যে নড়ছে 
না, ওর নাম কি?' 
“বিজয়কৃষ গোস্বামী ।, 
'ওর সঙ্গেই আম কথা কইব। ওকে বলো না, চেয়ারে এসে বসবে, ও ভাবে পা 
মুড়ে বসবার আমার অভ্যেস নেই ।, 
বিজয়ের ধ্যান ভাঙল। জানল সাহেবের আভিপ্রায়। 
বললে, “সাহেব, পাণ্ডিত্য তো অগাধ সণ্টয় করেছ। আমার পঁচিটি প্রশ্নের উত্তর 
আগে দাও। প্রশ্ন থেকেই বুঝে নাও ভারতবর্ষের জিজ্ঞাসার গভীরতা । ধর্ম কি? 
তার উৎপান্ত কোথায় 2 আত্মা কাকে বলে আর তার স্বরূপ কি? সত্য 'ি জিনিস ? 
কাকে মায়া বলেঃ পাপ কি, কেন?, 

৬৯ 


'পাদ্রু সাহেব এ পাশ ও পাশ তাকাতে লাগল, বললে, এ সব প্রশ্ন তো কই শুনিনি 
কোথাও। এ আবার কি কথা। আমরা তো শুধু বাইবেল জান, বাইবেলই 
পড়েছি-_ 

“সাহেব, এ দেশের নাম ভারতবর্ষ । কেশব বললে, এ দেশ থেকেই ধর্ম আর সভ্যতা 
গ্রীস হয়ে ছাড়িয়ে পড়েছে তোমাদের ইউরোপে । এ দেশকে জানো, বোঝো, তবে 
এসো এ দেশকে ধর্মে দীক্ষা দিতে। প্রশ্নের উত্তর তুমি যাঁদ নিজে দিতে না 
পারো, তোমার দেশে ফিরে যাও, সেখান থেকে উত্তর নিয়ে এস। 

সৃষ্টর প্রথম প্রশ্নের ভারতবর্ষই শেষ উত্তর। 

ভারতবর্ষ বৃক্ষ, আর সব ছায়া। একে সেবা করো, উচ্ছন্ন কোরো না। আমাদের 
সেবা মঙ্গলরুপিণী। 'সোঁবতব্যঃ মহাবৃক্ষ2। 

যখন তানি দূরে তাঁকে আরাধনা কার আর যখন 'তনি কাছে তখন তাঁকে সুখে 
সেবা কার। তিনি সৃখসেব্য দুরারাধ্য। তান গৃহ্যগভীরগহন হয়েও সহজ-সন্দর। 
তুমি, সাহেব, বুঝবে না এ তত্ব । আগে শ্রদ্ধা দিয়ে বাদ্ধকে বিশুদ্ধ করো । পরে 
দেখ ভারতবর্ষকে। 

আর বাক্যস্ফুট না করে চম্পট দিলে পাঁদ্র সাহেব। 

শুদ্ক জ্ঞানে মন ভরে না বিজয়ের । মন ভান্ত চায় প্রীতি চায়। প্রণীতই একমান্ন ! 
মাধূ্যাবষায়ণী। আর ভাগবতাঁ প্রতিই ভান্ত। ভান্ততেই সমস্ত জ্ঞানের 
অবসান। 

ব্রাহম ধর্ম প্রচার করতে-করতে বিজয় ব্ন্দাবনে এসেছে । উপাসনার মধ্যে হঠাং 
কৃষ্ণের গোম্ঠলীলার বর্ণনা শুরু করে দিলে। ব্রাহমরা যারা শুনাছল তারা চণ্চল 
হয়ে উঠল। এ কি পথস্থলন! 

“কে জানে! স্পন্ট চোখের উপর দেখলাম কৃষ গোঠে গর নিয়ে যাচ্ছে।' 

শুধু তাই নয়, উপাসনায় বসে মাঝে-মাঝে 'মা' মা" করে ওঠে। 

এ কা হচ্ছে! ক্ষুপ্ন হয় ব্রাহমরা। এ কি ভগবতাঁ না জগদ্ধান্রীর আবাহন ? কিন্তু 
সেই অধীর আর্ত স্পর্শ করে সবাইকে । এ তো বৈধ+ ভান্ত নয়, এ রাগানুগা 
ভন্তি। শাস্রের শাসনে এ*বর্যবানে যে ভন্তি তা বৈধা ভান্ত আর মাধূর্যময়ী 
স্বভাবরুচির ভীন্তই রাগানুগা ভন্তি। বৈধা ভান্ত পিতা, রাগানুগা ভন্তিই আ। 
'জয় জয় বিজয়ের জয়! কেশব চিঠি লিখছে বিজয়কে : ঈশ্বরকে একমান্র নেতাজ্ঞানে 
উচ্চকণ্ঠে তাঁর নাম কীর্তন কর। বৈরাগী হয়ে পদানত কর সংসারকে। উৎসাহের 
উত্তাপ 'দিয়ে জাগাও প্রসুপ্তকে, এক প্রীতির বন্ধনে সবাইকে বেধে ফেল। যারা 
নিজেদের দারিদ্র বলে বোধ করছে, তাদের ভগবং-বিত্তে সম্রাটের চেয়েও ধনবান কর। 
দেশে-বিদেশে আমাদের রাজ্য বস্তৃত হোক ।' 

বাইরে প্রচার হচ্ছে আর এদকে ঘরের মধ্যে চেশ্চামোচ। 'বধবা-ীবয়ে, অসবর্ণ বয়ে, 
ব্লাহননমতে শ্রাদ্ধ _এই সব নিয়ে । তৃমূল হট্টগোল। কেশবকে সবাই খঙ্টান বলতে 
শুরু করে দিয়েছে । শুধু তাই নয় দিচ্ছে তাকে আরো অপকৃষ্ট অপবাদ। বইছে 
শনধ্‌ ঈর্ষার বিষবায়ন। 


খ৬০ ক 


বিজয়ের মন বিমুখ হয়ে উঠল। আছ শ্রীপাদপদ্ম বিষাঁয়ণী ভান্ত নিয়ে, এ সব আবার 
ক সংস্কারের উৎপাত! যেন অধিম্ঠানের চেয়ে অনুষ্ঠান বড়! বিজয় চলে এল 
কালনায়, ভগবান দাস বাবাজীর আশ্রমে । 

জল খেতে চাইল বিজয়। বললে, আমি ব্লহমজ্ঞানী, আমাকে কিল্তু আলাদা পান্রে 
জল দেবে । বাবাজী বললে, যার জ্ঞান তারই তো ভান্ত। ভান্ত বাদ 'দয়ে কি জ্ঞান 
সম্ভব? আমার 'িপাসাও আজ চাঁরতার্থ করব। আমার কমণ্ডলুতেই জল খান।" 
বাবাজীর পান্রেই জল খেল 'বিজয়। 

এক ঢোঁকে বাকি জল খেয়ে নিলেন বাবাজী । কমণন্ডল মাথায় ঠেকালেন। 

(এ কি করলেন? ইনি যে র্লাহন্ন।' কে এক জন চেশচয়ে উঠল : 'এ+র যে পৈতে 
নেই।। 

“আমার অদ্বৈতেরও ছিল না। ব্রাহমসমাজে গেছেন, কিন্তু সেখানেও আমার গোঁসাইই 
আচার্য ।, 

'আহা, আচার্ষের কি বাহার! গায়ে জামা, পায়ে জুতো, আহা ফিটফাট ফুলবাবৃঁটি! 
ব্যঙ্গ করে উঠল সেই অভভ্ত। 

প্রভুকে আমার পাঁরপাটি করে সাজাও।' ভগবান দাস উচ্ছ্বাসত হয়ে উঠলেন : 
'আম দেখতে পাচ্ছি, আমার প্রভুর ললাটে তিলক, শিরে জটাজ্‌ট ও গলায় তুলসীর 
মালা। সর্বাঙ্গে বৈষব চিহ্ন ।, 

ব্রাহনমন্দিরে কীর্তন ঢোকাল বিজয়। 


কর্ণের ভূষণ আমার সে নাম শ্রবণ, 
নেত্রের ভূষণ আমার সে রূপ দর্শন, 
বদনের ভূষণ আমার সে রূপ কথন, 
হস্তের ভূষণ আমার সে পদ সেবন, 
(ভূষণের কি আর বাকি আছে) 
আম কৃষচন্দ্রহার পরেছি গলে ॥, 


কেশবকে কীর্তনে দক্ষিত করলেন ঠাকুর । কেশব গলায় খোল ঝোলালো । মাঝখানে 
ঠাকুরকে রেখে সকলে নাচছে । কেশবও শুরু করলে নাচতে । 

কেশব যেমন আসে তেমাঁন ঠাকুরও যান কেশবের বাঁড়তে। 

নিমাই সন্ন্যাস দেখতে কেশবের বাঁড়তে গিয়েছেন ঠাকুর। কেশবের এক খোশাম্‌দে 
শিষ্য কেশবকে বললে, কলির চৈতন্য হচ্ছেন আপনি ।' 

কেশব ঠাকুরের 'দিকে তাকাল । হাসতে-হাসতে বললে, 'তাহলে ইনি কি হলেন ?, 
ঠাকুর বললেন, 'আম তোমার দাসের দাস। রেণুর রেণু 

কেশবকে বড় ভালোবাসে রামকৃষ্ণ। তার সঙ্গে তার অন্তরের মাখামাখি 

কিন্তু কাস্তেন খড়াহস্ত। সে বলে, কেশব ভ্রম্টাচার, সাহেবের সঙ্গে খায়, 'ভন্ন 
জাতে মেয়ের বিয়ে দিয়েছে । 'আমার সে সবে দরকার কি? কেশব হাঁরনাম করে, 
দেখতে যাই, শুনতে যাই। আমি কুলটি খাই, কাঁটায় আমার কি কাজ? 


৬৯. 


কাপ্তেন ছাড়ে না তব। কেশব সেনের ওখানে যাও কেন তুমি 2" 

'আমি তো টাকার জন্যে যাই না। আমি হরিনাম শুনতে যাই। আর তুমি লাট 
সাহেবের বাড়তে যাও কেমন করে? তারা তো ম্লেচ্ছ__-' 

তবে নিবৃত্ত হল কাগ্তেন। 

কেশবকে লক্ষ্য করে রঙ্গরসের গান গায় রামকৃষ্ণ : 


'জানি ওহে জান বধু 
তুমি কেমন রাঁসক সুজন, 
বাল, আর কেন কর প্রাণ জবালাতন। 
নেচে ঘদরে ঘরে 
আঁভমানে মুখ ফিরায়ে 
বধু, আর কেন কর প্রাণ জবালাতন ॥ 
রমণীর মন ভুলাতে 
নাতি হয় আসতে-ষেতে 
কেন এলে 'নাঁশ প্রভাতে 
ওহে, মদনমোহন বংশীবদন ॥” 


বিজয়কে কবে গান শোনাবে রামকৃষ্ণ ১ কবে তাকে নাচতে শেখাবে? কবে দেখবে 
তার গোরকবাস সর্বত্যাী সন্ব্যাসী মার্ত? 

আর, বিজয়কৃষ্ণ কবে এসে রামকৃষ্ণের পদতলে পড়বে? বক্ষে ধারণ করবে সেই 
পাদপচ্ম ? 

আর, সেই তো পরং পদং, পরা কান্ঠা। 





ব্রাহমধর্ম প্রচার করছে বিজয়, আবার সেই সঙ্গে চিকিৎসাও করছে। চার দিকে 
এত রুগী, চুপ করে বসে থাকলে চলে কি করে? যেটুকু জ্ঞান ভাণ্ডারে আছে তা 
পরিবেশন না করে শান্তি কই? 

দর্শনী [ঠিক করল আট আনা। কিন্তু শুধু রোগ তো নন, রোগের সঙ্গে নিচ্ভ্রতম 


৬ 


রোগ- দারিপ্র্য। তাই গরিব রুগীদের ওষুধ আর পথ্য জোগাতে গিয়ে দর্শন 
অদৃশ্য হয়ে গেল। দর্শনা নেই বটে কিন্তু হতে লাগল অপূব দর্শন। 

রাত্রে প্রায়ই স্ব্ন দেখে বিজয় । দেশনেতা সুরেন বাঁড়ুয্যের বাপ দুর্গাচরণ বাঁড়ষ্যে 
নামজাদা ডান্তার। তিনি গত হয়েছেন বটে, কিন্তু স্বগ্নে প্রায়ই দেখা দেন বিজয়কে । 
কঠিন সব রোগের ব্যবস্থাপত্র দিয়ে যান। বিজয় তাই বিছানায় কাগজ ও পেন্সিল 
নিয়ে ঘুমোয়। স্বঙ্নে-পাওয়া প্রেসকুপশান ভোরে উঠেই টুকে রাখে । সে অন্ধকারে- 
ঢিল-ছোঁড়া ওষুধ নয়, সে একেবারে বিশল্যকরণা। 

শুধু ভান্তার হিসেবে ? 

শান্তিপুরের ওপারে গ্নীপ্তপাড়া। সেখানকার এক রুগী এসেছে বিজয়ের হাতে। 
সকালে একবার দেখে এসেছে, এখন আবার বিকেলে গিয়ে খোঁজ নেওয়া দরকার । 
শুধু খোঁজ নেওয়া নয়, নতুন আরেক দফা ওষুধ দিতে হবে। কিন্তু যায় ক করে? 
বর্ষাকাল, নিদারুণ ঝড়-বৃষ্ট শুরু হয়েছে। খেয়া বন্ধ, পানী রাজী নয় নৌকো 
ছাড়তে । তবে, উপায় উপায় জগধাঁপতা । কাপড়ের পাগাঁড় করে ওষ্‌ধের শাঁশ 
মাথায় বাঁধল বিজয়, বর্ষার ভরা নদ পার হয়ে গেল সাঁতরে। 

রুগী চোখ চেয়ে দেখল, দুয়ারে ধন্বন্তার দাঁড়য়ে। 

সেই দ:র্গাচরণই শেষে আরেক দিন স্বগ্ন দেখালেন। বললেন, 'তুমি কি শুধু 
দেহের .চিকিৎসা করেই দিন কাটাবে £ অন্তরের চিকিৎসা করবে না? তুমি শুধু 
আয়দুবেদী নও, তুমি ভবরোগবৈদ্য। 

ডান্তারি ছেড়ে দিল বিজয়। থাকে বন্ধু ব্রজস্‌ন্দর মিত্রের বাঁড়তে। তাকে উদ্দেশ্য 
করে চিঠি লিখল তক্ষযনি : 'ভাই, আমার 'ভাঁখারর ঘরে জল্ম, তাই আবার 'ভিক্ষের 
ঝাল কাঁধে তুলে নিলাম। ব্যবসা করা আমার পোষাল না। তাই তোমার 
আশ্রম ছেড়ে চললাম আবার নিরুদ্দেশ । ঈশবরের পায়ে নিজেকে বহু দিন বেচে 
দয়োছি, তাই তানি আর আমাকে ত্যাগ করতে পারবেন না। ব্রাহনধর্মের জয় 
হোক। আমার শোঁণত পোষণ করুক ব্রাহমধর্মকে। ব্রাহমধর্মহই আচরণীয়। 
প্রচরণীয়।' 

শান্তপুরে নিঞ্নে এসে বাস করছে বিজয়। শুধু স্থানের নিনে নয়, 
গূহাশয়ী মনের নিজনে। হঠাৎ এক দিন সেখানে দেখা দিল শ্যামসুন্দর। বজয় 
তাকে ত্যাগ করেছে বটে, কিন্তু শ্যামসনন্দর যে ত্যা্গীকেও ত্যাগ করে না। ছাড়তে 
শাখয়েও যে ধরে থাকে । পথহারা করিয়েও যে পথ দেখায়! 

“তোকে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে এলাম, নিয়ে এলাম মন্দির থেকে মত্ত প্রাঙ্গণে, 
বললে শ্যামস্‌ন্দর : 'আবার তুই এসে সেই ঘরে ঢুকৌঁছস? ঢুকেছিস সংকীর্ণ 
গশ্ডির মধ্যে? বোরয়ে আয়, বোরিয়ে আয় আগল ভেঙে, 

কে শোনে কার কথা! বিজয় ভাবলে ছলনা । নিরংশ জ্ঞানের জগতে ভাবের 
কুজ্ঝাটিকা। 

আরেক দন গভীর রাত্রে ব্রহত্রনাম সাধন করছে বিজয়, মনে হল র্দ্ধ দরজায় কে 


চে ৬৩ 


ঘা মারছে বাইরে থেকে । ভাবতন্দ্রা ঘুচে গেল বিজয়ের । প্রশ্ন করলে : 'কে?, 
কোনো উত্তর নেই। শুধু দ্রুত করশব্দ। মনে হল এক জন নয়, বহু লোকের 
সমাগম হয়েছে বাইরে। 

খুলে দল দরজা । এক দল জ্যাতিম্ময় পুরুষ ঘরে ঢুকল একসঙ্গে । জ্যোতির 
প্লাবনে ভরে গেল গহাঙ্গন। 

তাদের মধ্য থেকে এক জন এল এঁগয়ে। বললে, 'আম অদ্বৈত আচার্য। আর 
চেয়ে দেখ, হীন মহাপ্রভু, ইনি নিত্যানন্দ, ইনি শ্রীবাস- 
প্রয়তন্ময়তায় বিহবল হয়ে রইল 'বিজয়। 

“তোমার ব্লাহমসমাজের কাজ শেষ হয়েছে। বললে অদ্বৈত আচার্য : “এবার 
মহাপ্রভুর শরণাপন্ন হও। স্নান করে এসো চট করে। মহাপ্রভু দীক্ষা দেবেন 
তোমাকে । নাম দেবেন।' 

কুয়োর ধারে চলে এল বিজয়। নিশীথ রান্রে স্নান করলে । মহাপ্রভু তাকে দীক্ষা 
দিয়ে সদলবলে অন্তাঁহত হলেন। 

পরাঁদন সকালে কুয়োতলায় ভিজে কাপড় দেখে যোগমায়া তো অবাক। স্বামীর 
দিকে জিজ্ঞাস চোখ তুলতেই বললে সব বিজয় । শুধু স্ত্রীকেই নয়, কেশব সেনকেও 
বললে চুপিচুপি । 

কেশব বললে, 'কাউকে বোলো না আর এ-কথা। কেউ বিশ্বাস করবে না। 
তোমাকে পাগল বলবে ।, 

নিজেরই পাল বঙ্গে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে স্ব্জাল। প্লাহধর্মে তার ভাত 
অচলা কি না তাই পরীক্ষা করবার ভৌতিক ফড়যন্ত্র। কতগুলি প্রেতলোকবাসী 
আত্মা এসোছল হয়তো, তাকে একটু দেখে গেল বাঁজয়ে। দেখে গেল মন টলে 
1 না। খাঁট কি না সে তার ব্লহৈমক্যবাদে। 

শাবজয় আছে বজ্জ্রব্ধনে । তার ব্রাহমী 'স্থাত নিশ্চল স্থাত। সে টলবার পান্ত 
নয়। 

ব্রাহ্নধর্ম প্রচারে কাশশীতে এসেছে বজয়। এসে ন্ৈলঙ্গ স্বামীর সঙ্গে দেখা । শুধু 
দেখা নয়, সাহচর্য । সঙ্গে-সঙ্গে থাকে আর দেক্জে তার কাণ্ড-কারখানা। নৈকট্যের 
তাপ নেয়। নেয় যোগামৃতরসের স্বাদ। 

তখনো স্বামীজী অজগরবৃন্তি নেনান, কিন্তু মৌনাবলম্বন করে রয়েছেন। সারা 
দিন ধরে ঘুরছে-ফরছে দৃজনে, খাওয়া নেই। এক সময় হঠাৎ ইশারায় 'জিগগেস 
করলেন স্বামজশ, কিছ খাবে? বিজয় হ্যাঁ করল। অমান স্বামীজী ইশারা করলেন 
আরেক জনকে, বিজয়ের জন্যে কিছ খাবার নিয়ে এস। খাবার এসে গেল তক্ষুনি, 
গকল্তু পাঁচ-সাত জনের খাবার। বিজয় বললে, এত আম খেতে পারব না। আপান 
ণকছ খাবেন ঃ 

খাব। স্বামীজণ হাঁ করলেন। ইশারায় বললেন, মুখের মধ্যে ফেলে দাও। 
আস্তে-আস্তে সমস্ত খাবারই নিঃশেষ হবার যোগাড়। গ্রাস আর রুদ্ধ হয় না 
িছুতেই। 


৬৪ 


বিজয় দেখলে, সমূহ বিপদ । তার ভাগে আর থাকে না বুঝ এক মূঠ। তাড়াতাড় 
সে তার ভাগটা সারয়ে রাখল চালাকি করে। ঠিক চোখে পড়েছে স্বামীজীর। 
স্বামীজী হাসলেন, লিখে দিলেন মাঁটিতে-_বাচ্চা সাঁচ্চা হ্যায়। 

এক দিন এক কালামন্দিরে নিয়ে গেলেন বিজয়কে । প্রন্ত্রাব করে কালীর গায়ে 
ছিটিয়ে দিতে লাগলেন। বিজয় তো হতভম্ব। জিগ্গেস করলে, এ কি? 

মাটিতে লিখে দিলেন ত্রলঙ্গ স্বামী : গঞ্গোদকং।' 

শকন্তু গঙ্গাজল ছিটিয়ে দেবার মানে? 

'পুজা-পজা করছি। 

'এ পূজার দক্ষিণা ?ক ? 

'দক্ষিণা? দাক্ষিণা যমালয় ।, 

অর্থাৎ দক্ষিণ দিকে যমালয়। 

মন্দিরের পুরোত-পুজারীদের কাছে ব্যাপারটা প্রকাশ করে দিল বিজয়। তারা 
বন্দুমান্র বিচালত হল না। বললে, 'তা তো ঠিকই । এ*র প্রশ্রাব তো গঞ্গোদকই। 
ইনি যে সাক্ষাৎ 'বি*বনাথ।' 

এক দিন ভ্রৈলগ্গ স্বামী মৌনভঙ্গ করলেন। দশা*বমেধ ঘাটে এসে বললেন, 
'আস্নান করো।, 

নিজের হাতে ধরে স্নান করালেন বিজয়কে । বললেন, 'তোকে দীক্ষা দেব।' 
বিজয় পাঁরহাস করে উঠল : “আর রাজ্যে লোক নেই, আপনার কাছ থেকে দীক্ষা! 
আপনার গঞ্গোদকের যে নমুনা তাতে ভন্তি উড়ে গেছে।' পরে গম্ভীর হয়ে 
বললে, 'আমি ব্রহনজ্ঞানী। গুরুবাদ মান না। মাপ করুন, পারব না দীক্ষা 
নিতে ।, 

'বাচ্চা পাঁচ্চা হ্যায়- এবার মুখর হয়ে ঘোষণা করলেন স্বামীজী। পরে বললেন, 
শোন, তোর গুরু আম নই-সে আসবে ঠক সময়ে । আমি শুধু তোর শরীর 
শুদ্ধ করে দেব। আমার উপরে তাই ভগবানের আদেশ 

কানে মন্ত্র দিল বিজয়ের। বিজয় ভাবল একাকিনী গঙ্গা দিয়ে বুঝি হবে না। 
গঙ্গাকে এসে মিশতে হবে বমনন্মর সঙ্গে। জ্ঞানকে এসে মিলতে হবে ভক্তির 
নির্মল ম্যান্ততে। জ্ঞান আত্মানন্দ, ভান্ত বিশ্বানন্দ। ভগবং-তত্তের প্রকাশকারিণশ 
শান্তর নামই ভান্ত। ভন্তই ভগবৎ-আঁফ্তত্বের প্রমাণ। ভান্তই 'বিশবাত্মতা। 

দেহ-গেহে ভান্তই প্রীতি-প্রদীপ। ভান্ত ছাড়া সবই অন্ধকার। 

গাহোরে এসেছে বিজয়, প্রচারের কাজে। হঠাৎ খবর পেল, তার মা, স্বর্ণময়ী 
পাগল হয়ে গেছেন। পাগল হয়ে কোন দিকে যে চলে গেছেন কেউ জানে না। 
তক্ষুনি বাঁড় ফিরল বিজয়। কিন্তু কোথায় মা! কে এক জন কাঠ্খরে বললে, 
'বাঘের গায়ে শিয়র দিয়ে ঘুমোচ্ছেন।, 

বনগাঁয়ের কাছাকাছি দূভেঁদ্য বন। মা'র খোঁজে সেখানেই ঢুকল বিজয়। এমন 
স্থান নেই যা বিজয়ের কাছে অজেয়। 


ঠিকই বলেছে কাঠুরে। বাঘের গায়ে মাথা রেখে মা ঘুমোচ্ছেন। মা'র বসন নেই, 
৫ (৬৮) উঠে 


বাঘের নেই হিংসে । মা'র চোখ বোজা, কিন্তু বাঘ চেয়ে আছে মা'র দিকে। 
বশাতার তীপ্তিতে। 

লাকজন জড়ো করল বিজয়। বাঘকে তাঁড়য়ে মাকে সাঁরয়ে আনতে হয়! কিন্তু 
কে এগোয়-কী নিয়ে এগোয়! 

গোলমালে তন্দ্রা ভেঙে গেছে স্বর্ণময়ীর। 

বাঘকে জিগগেস করছেন, 'বাঘ, তুই কার?, 

দুই চোখে ভয়ঙ্কর স্ঘৈর্য নিয়ে স্তব্ধ হয়ে আছে বাঘ। 

'বল্‌ সত্য করে, তুই আমার? আমার যাঁদ হোস, আমাকে তবে তোর পিঠে কর 
দিকিনি ?, 

নিশ্চল হয়ে বসে রইল বাঘ। একটা শুধু হাই তুলল। 

'বঝেছি, তুই আমার নোস। 'ি করেই বা আমার হাবিঃ আম যে উলঙ্গ কালী। 
আমি তো দশভূজা নই। দশভুজা দুর্গা যাঁদ হতাম, তুই তবে আমায় পিঠে 
চড়াঁতিস।, 

বাঘ তেমান প্রশান্তদৃন্টি। 

'দাঁড়া, তোর জন্যে কিছু খাবার নিয়ে আঁসি।' বলেই স্বর্ণময়ী বেরুলেন বন 
থেকে । ছুটলেন নক্ষত্রগাতিতে। চক্ষের পলকে বিজয় তাঁর পায়ে পড়ল। 

'কে তুই ?* থমকে দাঁড়ালেন স্বর্ণময়ী। 

'আমি আপনার দাস।, 

'দাস হওয়া কি মুখের কথা? ধিন্তু দোখ তোর মুখখান! কেমন যেন চেনা- 
চেনা মনে হচ্ছে। 

'আপাঁন চিনবেন নাঃ বিশ্বভুবনের সমস্ত আপনি চেনেন, আর আমাকে 
[চিনবেন নাঃ, 

“কে কাকে চেনেঃ কিন্তু তোকে কোথায় এর আগে দেখোছ বল্‌ তো? দেখোছ 
তো, আবার দোঁখাঁন কেন? কোথায় ছিলি? সেখান থেকে আবার এল কি করে 
এখানে ?, 

মাকে স্নান করাল বিজয় । পাঁরয়ে দিল নতুন কাপড়। বাঁড়তে এনে তুলসী তলায় 
আসন পাতলে। সে-আসনে মাকে বাঁসয়ে বললে, 'মা, আহিক করো ।' 

“আহক কাকে বলে ?, স্বর্ণময়ী যেন আকাশ থেকে পড়লেন। 

"সে ক কথা? আহিনক তোমার মনে নেই? আম বলে দেব 2 

মৃদ-মৃদু হাসলেন স্বর্ণময়ী। 'বল্‌ তো-শাঁন।, 

কোন বাল্যকালে মল্ম 'দিয়ৌোছলেন মা, তাই মা'র কানে উচ্চারণ করলে বিজয়। 
শোনামান্রই স্বর্ণময়শীর চোখ অশ্রুতে আচ্ছন্ন হয়ে এল। ভাীন্তর অশ্রু, আনন্দের 
অশ্রু! বিজয় এখনো তা হলে ভোলোন। মান্তর পথে বেরুলেও এখনো তার 
মাকে মনে আছে! আর, ভান্তই তো মীন্তর মা। 
6০আবখঞ্খর সূচনাই ভান্ত সমাপ্তিই প্রেম। সেই ভান্তর আভাস কি এখনো 
জাগবে না বিজয়ে? 

৬৬ 


তিমায় কি শুধু শিলা? মন্ত্রে কি শুধু অক্ষরযোজনা ; শুদ্ধ চেতনার চেয়ে 
গানুরাগ কি বড় নয়ঃ শনুদ্ক একটা বিদ্যমানতার বোধে বুক ভরে কই? 

সেই বোধের বস্তুতে নিয়তচিত্ত থাকবার জন্যে চাই আতীব্র অনুরাগ । সুখকর 

অনুসরণ । সেই ঈশ্বরপ্রীতি-প্রার্থনাই ভান্ত। ভান্তই জাগাতিক ক্ষুধানাশক। 

না, বিজয় আছে নির্বিশেষ জ্ঞানের স্বরাজ্যে। ঈশ্বরের অগ্াধবোধে। 

তাই তার অসহ্য মনে হল যখন শুনল কেশব সেনকে ব্রাহনরা কেউ-কেউ অবতার 

বলে খাড়া করতে চাইছে। ঈশ্বরজ্ঞানে কেশবের পায়ের ধুলো নিচ্ছে; শুধু তাই 

নয়_জল দিয়ে পা ধুয়ে দিচ্ছে নিজের হাতে। এ কী পোত্তীলক তামাসকতা! 

খেপে গেল বিজয়। সরাসার গিয়ে পাকড়াও করল কেশবকে। 

'এ সব কি হচ্ছেঃ তুমি আর-সবাইর পুজো নিচ্ছ?, 

'তার আম কি জানি!” কেশব পাশ কাটাতে চাইল কথাটার। বললে, 'লোকে কি 

করে না করে তাতে আমার কি যায়-আসে! অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার 

আমার অধিকার কোথায় 2, 

উত্তর মোটেই মনঃপৃত হল না বিজয়ের। লোকে তোমাকে নিয়ে যদচ্ছা নাচবে, 

আর তুম বলবে ক না স্বাধীনতা! বিজয় লেখনীতে কশাঘাত শুরু করলে। 

সংবাদপত্রের কালো কালি লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। কেশবের দলের লোকেরা 

বিজয়কে নাস্তিক বলে গাল দিলে । কেউ-কেউ বা মারের ভয় দেখালে । বিজয়ের 

দল নেই । কোনো বন্ধনে সে বন্দীভূত নয়। 

হতশ্ত্রী কোলাহল শুর হয়ে গেল চার দিকে । কেশবের নিজেরই কেমন খারাপ 

লাগতে লাগল । আতিশয্যের মাঝে আর দেখতে পেল না এশবর্য। সর্বত্র অভ্যাসের 

শুদ্কতা। 

কে এক ভভ্ত পায়ে ধরে কাঁদছে। 

'এখানে কি ?' ধমকে উঠল কেশব । 'আমার কাছে কাঁদলে কি হবে 2 ঈশ্বরের কাছে 

গয়ে কাঁদুন।, 

আপনিই তো সেই ঈশ্বরের অবতার ।' 

মিথ্যে কথা । আম এক জন সামান্য মানূষ।, 

সামান্য মানুষ? ভন্তের দল চটে গেল। কেশবকে গাল পাড়তে শুরু করলে। 

বললে, ভণ্ড, মিথ্যেবাদণী। 

বজয়ের সঙ্গে হাত মেলাল কেশব। আমরা কেউ কারু নিজের জয় চাই না। 

শুধু ঈশ্বরের জয় হোক। জয় হোক ব্রাহনরধর্মের । 

ন্তু সে বারের ঝগড়া বুঝ আর মেটে না। 

কেশবের আন্দোলনে ব্লাহমবিবাহ আইন পাশ হয়েছে। সে আইনে অনান বয়স 
হয়েছে, ছেলের পক্ষে আঠারো আর মেয়ের পক্ষে চৌদ্দ। বেদী থেকে ঘোষণা 

'করল কেশব, এ বাঁধ কেবল রাজবাধ নয়, এ ঈশ্বরের 'বাঁধ। 

'কন্তু ঘটল 'বিধি-বিড়ম্বনা। কুচবিহারের রাজার সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়ে ঠিক 

কিরেছে কেশব। কিন্তু মেয়ের বয়স চৌদ্দ হয়নি এখনো। তাতে কি! রাজার 


৬৭ 


সঙ্গেই মেয়ের বিয়ে দেবে। আইন লম্ঘন হয় হোক, কেশব মানবে না সে-আইন। 
আবার ঘোষণা করল কেশব, এ "বয়ে ঈশ্বরের আদেশ । ঈশ্বরের আদেশের কাছে' 
আবার আইন কি! 

এ হচ্ছে সংকীর্ণ সুবিধাবাদীর ব্যবস্থা । বিজয় খেপে গেল। ফুলের চেয়ে মে 
মদ, হোক, সে আবার বজ্রের চেয়েও কঠোর। ক্ষমায় সে পৃথিবীর সমান হোক] 
কিন্তু তেজে সে কালানল। | 

তীব্র প্রাতবাদ করে উঠল। শুধু লেখনীতে নয়, বন্তৃতায়। অন্যায় ও অসত্যের 
প্রতিবাদ না করা পাপ। আর নিজের যা স্খলন বা বিচ্যুতি তা ঈশ্বরের উপর 
আরোপ করা ঘোরতর দদত্কীত। 

তুমূল লড়াই শুরু হল। এ যাঁদ মারে ঢিল ও ছোড়ে কাদা। শেষ পযন্ত 
বিজয়ের স্তী যোগমায়াকে ভয় দেখিয়ে 'চাঠি। বিজয়কে ক্ষান্ত করুন, নইলে বিপদ 
অনিবার্। 

চিঠি পড়ে হাসল 'বজয়। বললে, 'কেশব কি আমার সৃষ্টকর্তা না পালনকর্তা 
যে ও আমাকে বিপদে ফেলবে? আসক বিপদ, তবু সত্যের অপমান আম সইতে 
পারব না।* | 

মেয়ের বিয়ে শেষ পর্যন্ত হন্দমতেই ?দতে হল কেশবকে। আহত ভূজগ্গের 
মত সে ফ+সতে লাগল। 'নবাবধান' নাম দিয়ে সে নতুন ব্রাহন্রসমাজ চালু করলে। 
বিজয়ের দলে শিবনাথ শাস্ত্রী, আনন্দমোহন বস; আর দর্গামোহন দাশ। তার|| 
স্থাপন করলে “সাধারণ ব্লাহমসমাজ ।, 

অসাধারণ ঝগড়া । আকাশ রইল আকাশের মনে, ঘট নিয়ে মারামার। 

কিন্তু কেশব যখন একবার রামকৃষ্ণের দেখা পেল তখন আর আবার ঝগড়া কি! 
কিসের বিবাদ-বচসা, কিসের মতভেদ! মনের মালন্য মুছে গেল এক ম্যহূ্তে 
বইতে লাগল প্রসন্নতার মনন্তবায়়। চোখের সামনে জবলছে মার্তমান ব্রহযজ্ঞানাণগন! 
এ আগ্দনের কাছে আবার শন্-মিন্র কি, মান-অপমান কি, নিন্দা-স্তাত কি! শুধু 
'নির্গালত আনন্দ। অমৃতায়িত নির্মলতা। 

এ আর কেউ নয়__জাজ্জবল্যদর্শন রামকৃষ্ণ। সর্বকামদ কল্পতর। অহেতুকদয়ানিধি। 
৪৬৯৮ কপ টপ 
সে একবার দেখে যাক রামকৃষকে। 

তই কেশব িখে পাঠাল : বন্ধ, একবারাট দেখবে এস। এমনাট তুমি আর] 
দেখাঁন। বিজয় ছুটে এল খবর পেয়ে । এসে কী দেখল? 

কি দেখল কে জানে! রামকৃষের দুই পা বুকের মধ্যে চেপে ধরল। স্পর্শাতীতের| 
জগতের স্পর্শমণিকে খজে পেয়েছে। 

দেখল, সমস্ত জিজ্ঞাসার উত্তর বসে আছে। সমস্ত প্রম্নের সমাধান। সমস্ত তকে 
নষ্পাত্ত। সমস্ত জটিলতার মীমাংসা । সমস্ত যাত্রার উত্তরণ। 

নরপ্‌জার বিরদ্ধে এক দন প্রাতবাদ করোছল বিজয়। কিন্তু, এখন এ সব কাঁ| 
হচ্ছে? 

৬৮ 














র কোথায়? এ যে নরাকারে নিরাকার! 

ইচ্ছাবশে মায়াময় রূপ ধরে অবতীর্ণ হয়েছেন সংসারে । 

যম রাজ্যের সম্রাট হয়েও আছেন হদয়েশ্বর হয়ে। খেলার সাথী হয়ে, 
শ্রম্ভের সখা হয়ে। স্নেহে মাতা পালনে পিতা হয়ে। দশাঁদগন্তব্যাপণ প্রেমের 
দ্র হয়ে। 

বিজয়ের কণ্ঠে শুধু সেই শ্রবণলোভন আকৃতি, 'হে শ্রীহরি-_ 










[ধু বিজয়কে নয়, আরো অনেককেই কেশব ডেকে নিয়ে গেল একে-একে। 
কেশব শুধু নিমিত্ত। যান অন্তরে বসে ডাক দেবার 1তানই ডাক 'দলেন। 
এগারো নম্বর মধ রায় লেনে থাকে রামচন্দ্র দত্ত-সে গেল সকলের আগে । ক্যাম্বেল 
হলেও রামকুষের প্রাত অশ্রদ্ধাবান নয়। যখন কেশব বললে, যাঁশুখৃস্টের মত 
রামকৃষেরও '্রীন্স' হয়, তখন রাম দত্ত ভাবল, মিরাগ রোগ নিশ্চয়ই। 
'না হে, হাত-পা খেশ্চাখেশচ করে না। ধার-স্থর শান্ত হয়ে থাকে। আপনা-আপাঁন 
ভালো হয়। ডান্তার লাগে না কখনো ।, 
কি জান বা! এমনতরো কই পাঁড়নি বইয়ে। 
প্রগাতিবাদ ছেলে-ছোকরারা ব্যঙ্গ করে পরমহংসকে । বলে, গ্রেট গ্‌স। 
পানিহাটিতে বৈষবদের উৎসব হচ্ছে। যাকে বলে হরিনামের হাটবাজার । ভত্তদের 
নিয়ে ঠাকুর যাচ্ছেন সে উৎসবে । ভন্তদের মধ্যে স্তী-পুরুষ দুইই আছে। চার-চারটে 
পানাঁস ভাড়া করা হয়েছে। 
শ্রীমা যাবেন কি না- এক জন স্ব্ী-ভন্ত এসে জিগগেস করলে ঠাকুরকে । 
তোমরা তো সবাই যাচ্ছ__+ বললেন ঠাকুর, "ওর যাঁদ ইচ্ছা হয় তো চলুক--' 
ইচ্ছা হয় তো চলুক-_নিশ্যয়ই মন খুলে মত দিচ্ছেন না। প্রচ্ছন্ন সুরাঁট ঠিক 
ধরতে পেরেছেন শ্রীমা। যাঁদ মন খুলে সম্মাত দিতেন, তা হলে প্রফুল্ল স্বরে বলে 
উঠতেন, হ্যাঁ, যাবে বৈ কি। তার বদলে, ইচ্ছা হয় তো চলুক । একটু যেন কুণ্ঠার 
কুয়াশা আছে কোথাও । 
শ্লীমা গেলেন না। বললেন, 'অত ভিড়ে আমি যাব না। তোমরা যাও ।, 

৬৯ 


উৎসবশেষে ঠাকুর ফিরেছেন দক্ষিণেশ্বরে। ঠাকুর বলছেন, 'সাধে কি আর ও যায়নি; 
ও মহাবুদ্ধিমতঁ। ওর নাম সারদা ।, 

স্ত্ী-ভন্তরা ঠাকুরের দিকে তাকিয়ে রইল উৎসুক হয়ে। 

“ওখানে আমার ভাবসমাধি হচ্ছিল, তাই দেখে কেউ-কেউ রঙ্গ করছিল আমাবে 
নিয়ে।' ঠাকুর বললেন ক্ষমাময় স্নিগ্ধ হাস্যে : “ওকে সঙ্গে দেখলে নিশ্চয়ই বলং 
ঠাট্টা করে_ হংস-হংসাঁ এসেছে! 

তুমি যাঁদ মানসসরোবর, আমরা মানসযান্রী হংস। আমাদের সমস্ত প্রাণ তোমা 
দিকে উড়ে চলুক পাখা মেলে। দৈনিক জাবনযান্রার মধ্যে আমাদের সমাপ্ং 
নেই, আমরা তাই যান্লা করোছি তোমার 'দকে। পাঁরপূর্ণের দিকে । অপর্যাপ্ত 
দিকে। 

কলকাতা মোঁডকেল কলেজের সহকারী রসায়ন-পরাক্ষক হয়েছে রাম দত্ত । কুরা 
গাছের ছাল থেকে রক্তামাশায়ের ওষুধ বের করেছে। বিজ্ঞানের আওতায় এট 
নাঁস্তকতার নেশায় পেয়েছে। ঈমবর আছেন তার প্রমাণ কি? তাঁকে কি দেখ 
যায়? 

ব্রাহন্নসমাজে ঘোরে রাম দত্ত। তারা তো ঈশ্বরকে বিরাকার বলেই কাজ সেরেছে 
দেখবার আর দায় রাখোন। 

পর-পর এক মেয়ে আর দুই ভাগনী মারা গেল কলেরায়। "বিজ্ঞানে কুলোল না 
ডান্তারি ডান্তারকে উপহাস করলে। আস্থির হয়ে পড়ল রাম দত্ত। দগ্ধ মনে শান্তি 
ওষ্‌ধ দেবে এখন কোন ডান্তার ? 

হঠাৎ এক দিন দক্ষিণেশ্বরের দিকে রওনা হল। সঙ্গে দুই মিত্তি_ অনোমোহ 
আর গোপালচন্দ্র। দোখ রামকৃষ্ণ কি বলে! 

গিয়ে দেখে, দরজা বন্ধ। ভিতরে নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু কি বলে তাকে ডাকে 
দ্বিধা করতে লাগল রাম দত্ত। রামকৃষ্ণ মনের কথা টের পেয়েছে। অমনি খু 
দিল দরজা । 'নারায়ণ' বলে নমস্কার করলে। 

আমাদের মনের দরজার বাইরে দাঁড়য়ে আছে নারায়ণ। জেনে-শুনেও খাল 7 
দরজা । অর্গল এ'টে মনের অন্ধকারে বসে কাঁদি। 

বোসো।, 

বসল 'িতন জন। রাম দত্তের ?দকে হাত বাঁড়য়ে দিল রামকৃষ্ণ । বললে, হ্যাঁ গ 
তৃঁমি না “কি ডান্তার। আমার হাতটা একবার দেখ না। 

রাম দত্ত তো অবাক। কি করে জানলে ? 

এক মৃহূর্তে ফুটে উঠল অল্তরষ্গতার আবহাওয়া । একে যেন সব কিছু বর 
যায়, এ একেবারে ঘরের মানুষ । '্জগগেস করল রামচন্দ্র : ঈশ্বর কি আছেন ? 

শদনের বেলায় তো একাঁটি তারাও দেখা যায় না। তাই বলে কি বলবে তা. 
নেই?" বললে রামকৃফ। “দুধে মাখন আছে কিন্তু দুধ দেখলে 'কি তা ঠাহর হয় 
যাঁদ মাখন দেখতে চাও, দুধকে আগে দধি করো। তার পর সূর্যোদয়ের আ 


মল্থন করো সে দাধকে। তখন দেখতে পাবে মাখন । 
৭০ 


“কিন্তু কি করে তাঁকে দেখা যায় 2, 

'বড় পুজ্কারণীতে মাছ ধরতে চাইলে ক করো? আগে খোঁজ নাও। যারা সে 
পুকুরে মাছ ধরেছে তাদের থেকে খোঁজ নাও। কি মাছ আছে, কি টোপ খায়, 
কি চার লাগে । শেষে সেই পরামর্শানুসারে কাজ করো । ধরো সেই মনোনীত মাছ ।, 
একটু থামল রামকৃষ্ণ । বললে, ণকন্তু ছিপ ফেলামান্রই 'ি মাছ ধরা পড়ে? স্থির 
হয়ে অপেক্ষা করতে হয়। তবেই আস্তে আস্তে “ঘাই” আর “ফুট” দেখা যায়। 
তখন বিশ্বাস হয়, পুকুরে মাছ আছে--আর বসে থাকতে-থাকতে আমিও এক 'দিন 
ধরে ফেলব ।, 

ঈশ্বর সম্বন্ধেও তাই। গুরুর কাছে তত্ব করো। ভন্তি-চার ফেল। মনকে 
ছিপ করো। প্রাণকে কাঁটা। নামকে টোপ। তার পরে টোপ ফেল সরোবরে। 
ঈশ্বরের ভাব-রূপ “ফুট আর 'ঘাই' জানান দেবে। বসে থাকো তন্লিষ্ঠ হয়ে। 
টোপ গ্গিলবে মাছ। খোঁলয়ে-খোঁলয়ে ডাঙায়, মানে সংসারে তুলে নিয়ে আসবে। 
সাক্ষাৎকার হবে। 

তার পর? 

তার পর আর ি। সেই মাছ তখন ঝালে খাও ঝোলে খাও ভাজায় খাও অম্বলে 
খাও। 

শান্তি পেল রাম দত্ত। শোকে আঁস্থর হয়ে কাজকর্ম ছেড়ে দিয়েছিল, আবার 
ধার-স্থর হয়ে কাজ করতে লাগল। ঈশ্বর যাঁদ আছেন তবে সুরাহা এক দিন 
একটা হবেই। সমস্ত কাটাকুঁটি ও যোগ-বিয়োগের পর হিসেব এক 'দিন মিলবেই। 
মন খাঁটি করে রইল। 

কুলগুরুর কাছে দীক্ষা না নিয়ে রামকৃষণের থেকে দীক্ষা নিল রাম দত্ত। রাম 
দত্ত বৈষ্ণব, দীক্ষাদাতা শান্ত । পাড়ায় টি-টি পড়ে গেল। 'রাম ডান্তারের গুরু 
জুটেছে হে। এঁ যে দক্ষিণে*বরে থাকে-কৈবর্তদের পুজুরী। কেলেঙ্কাঁর করলে 
মাহীর. 

সবাই চটল। চটল কিন্তু ছয়ে গেল। পিছন থেকে চিপটেন কাটতে লাগল। 
এগিয়ে এল পাড়ার সুরেশ মান্তর, আসল নাম সুরেন মিত্তির। দুধর্ষ শান্ত। 
কেশব সেন যখন বিডন স্কোয়ারে ব্লাহমধর্মের বন্তৃতা দেয়, তখন তার খোলের 
চামড়া কেটে 'দয়েছিল ছার 'দিয়ে। 

'ওহে রাম, তোমার গুরুর কাছে একবার নিয়ে চল।” বললে সরেশ। “কেমন হংস 
একবার দেখে আস ।, 

রাম দত্ত হাসল। বললে, 'চল।, 

ণকল্তু এক কথা । তোমার হংস যাঁদ মনে শান্তি দিতে না পারে তবে তার কান 
মলে দিয়ে আসব 

সে যুগে 'কান মলে দেব' কথাটার বড় বোশ চল। অন্যের কানটা যেন হাতের 
কাছেই আছে এমান একটা আত্মদৃপ্ত উদ্ধত ভাব সকলের । 

1সমলে স্ট্রীটে থাকে। সদাগার অফিসের মৃৎস্ীদ্ধ। বৃদ্ধিতে পাটোয়ার। আর 


৭৯ 


ঈদে ট্‌পভূজগ্গ। গেল রাম দক্তের সঙ্গে । দেখল ভন্ত-পারবৃত হয়ে ভাবে বিভোর 
হয়ে বসে আছে রামকৃফণ। রাম দত্ত প্রণাম করল। এক পাশে সমরেশ বসল 'নার্লস্ত 
হয়ে। ভাবখানা এই, কান মলে যে দিইনি এই যথেষ্ট। 

বাঁদরের বাচ্চা না বেড়ালের বাচ্চা এই গল্পটাই তখন বলছিল রামকৃফ। 
'বাঁদরের বাচ্চা জোর করে মা'র কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে, মা ব্যাজার হয়ে ফেলে দেয়, 
পড়ে গিয়ে কিচামচ করে। কিন্তু মা-অন্ত প্রাণ বেড়ালছানা মা-ও মা-ও, কি না 
মা-মা বলে ডাকে। মা যেখানে রাখে সেখানেই সুখে থাকে। ছাইয়ের গাদায়ই 
হোক বা গাঁদাবছানায়ই হোক। একেই বলে নিভরের ভাব; 

অমৃতময় কথা। সরেশের সমস্ত জিজ্ঞাসার নিরসন হয়ে গেল। ভান্তভরে প্রণাম 
করল রামকৃষফকে। 

রামকৃষ্ণ বললে, 'কালী ভজনা কর যখন, মা'র উপর নিভ'র রাখ ষোলো আনা। 
তবে মাঝে-মাঝে এসো এখানকে, ভগবং-ভাবের উদ্দীপনা হবে! 

'ভাই, কান মলতে গিয়েছিলাম, কান মলা খেয়ে এলাম।” রাম দত্তের কানে-কানে 
বললে সূরেশ। 

নরেন্দ্রনাথেরও সেই কথা । 

নরেন্দ্রনাথ আরো দরুধর্ষ। সাধারণ ব্রাহন্সমাজে উপাসনায় প্রুপদ গায়। হার্বাট 
স্পেনসার, স্টুয়ার্ট মিল পড়ে। গলার জোরে গায়ের জোরে তর্ক করে। 
পাদরিদেরও ছাড়ে না। তেড়েফংড়ে কথা কয়। কথার দাপটে ভূত ভাগায়। 

তাকে এক দিন ধরলে রাম দত্ত। বলে, শোন" 

নরেন দাঁড়াল। 

দাঁক্ষণে*বরে এক পরমহংস আছেন দেখতে যাব? 

'সেটা তো মুখখু এক ফ:য়ে উড়িয়ে দিল নরেন। বললে, 'কী তার আছে যে 
শুনতে যাব? মিল স্পেনসার লাঁক-হ্যাঁমলটন এত পড়লুম, কোনো 'কিনারা হল 
না। এ একটা কৈবর্তের বামূন, কালীর পুজুরী--ও কি জানে ?' 

'একবার গিয়ে কথা বলেই দেখ না” 

ণক ভাবল নরেন। বললে, 'বেশ, যাঁদ রসগোল্লা খাওয়াতে পারে তো ভালো, নইলে 
কান মলে দেব বলছি। 

স্যার কৈলাস বসুও চেয়োছিলেন ঠাকুরের কান মলতে। 

রাম দত্তকে বললেন, "তুম বলছ, তাই যাচ্ছি একবার তোমার পরমহংসকে দেখতে । 
যাঁদ ভালো লোক হয়তো ভালো, নইলে তার কান মলে দেব বলে রাখাছ।, 
ঠাকুর তখন কাশশপুরের বাগানে, অসুস্থ । উপরে আছেন। চে বসে অপেক্ষা 
করছে কৈলাস। নিচের ঘরের অবস্থার বর্ণনা দিচ্ছে এই ভাবে : “আরে, গিয়ে 
দেখলুম নরেনটা 'বি-এ পাশ করে একেবারে বকে গেছে। নিচেকার হল-ঘরের 
কতগুলো ছোঁড়া নিয়ে এলোমেলো ভাবে বসে আছে আর রামের বাঁড়র সেই 
চাকর-ছোঁড়া লাট্‌-_ সেটাও বসে আছে ওদের সঙ্গে । আরে ছ্যা! 

উপর থেকে কে এক জন চলে এল 'নিচে। বললে, 'াকুর পাঠিয়ে দিলেন। বললেন, 
৭২ 





যে বাবাঁটি আমার কান মলে দেবেন বলেছেন তাঁকে ওপরে নিয়ে এস। তাই নিতে 
এসেছি । তিনি কে, কোনটি 2, 

কৈলাস তো স্তীম্ভত! সিমলেতে ঘরের মধ্যে বসে রামের সঙ্গে কি কথা কয়েছি 
কাশীপুরের বাগানে সে-কথা এল কি করে এখুনি? স্থালত পায়ে উঠে গেল 
কৈলাস। অস্র্যুত-পায়ে প্রণাম করলে। মানলে গুরু বলে, দিগদর্শক বলে। 
কল্তু গিরীশ ঘোষ আরেক কাঠি সরেস। তার থিয়েটারে গিয়েছেন ঠাকুর, মাতাল 
হয়ে তাঁকে বাপান্ত গালাগাল করলে গিরীশ। নেপথ্যে নয়, মুখের উপর। 
দক্ষিণে*বরে ফিরে এসে তাই বলছেন ঠাকুর : 'শুনেছ গা! গিরীশ ঘোষ দেড়খানা 
লুচি খাইয়ে আমায় যা না তাই বলে গালাগাল "দিয়েছে ।' 

'ওটা পাষণ্ড । ওর কাছে আপাঁন যান কেন?, 

যাই কেন! যাই বলে এই ব্যবহার! রাম দত্তের কাছে নালিশ করলেন ঠাকুর। 
কেন, বেশ তো করেছে । ঠিকই করেছে । গিরীঁশকে সমর্থন করল রাম দত্ত। 
'শোন, শোন, রাম কি বলে শোন। সে অমার মাতৃঁপতৃ উচ্চারণ করল, আর রাম 
বলে কি না- 

“ঠিকই বাঁল। কালীয়কে শ্রীকৃষ্ণ তাড়া করলেন, কি জন্যে তুমি বিষ উদগ্ীরণ কর 2 
কালীয় কী বললে? বললে, ঠাকুর, তুমি আমাকে বিষ 'দয়েছ, সুধা উদগীরণ 
করব কি করেঃ গিরীশ ঘোষকে আপান যা দিয়েছেন তাই দিয়ে সে আপনার 
পূজা করছে।, 

হাসলেন ঠাকুর । বললেন, 'যাই হোক, আর কি তার বাঁড়তে যাওয়া ভালো হবে 2" 
'কখনোই না।' অনেকে বলে উঠল একসঙ্গে। 

'রাম, গাঁড় আনতে বলো।” উঠে পড়লেন ঠাকুর। "লো তার বাঁড় যাই । 
সকলে তো লুপ্তবাক। 

তৃমিও চলো, রাম। তুইও চল, নরেন। পাঁতিতপাবন চললেন জীবোদ্ধারে। 





হে ঈশ্বর, তুমি তো জানো আমরা কত দুর্বল, কত অক্ষম, কত ক্ষণভঙ্গুর। 
মুখোমুখি তোমার সামনে গিয়ে যে দাঁড়াতে পার এমন আমাদের সাধ্য নেই। 
কি করে সইব তোমার সেই আলো, দি করে বইব তোমার সেই ভালোবাসা! 

৭৩ 


আমরা ক্ষুদ্র, আমরা ক্ষীণ, আমরা অল্পপ্রাণ। তা জানো বলেই তো আমাদের জন্যে 
তোমার এত কৃপা, এত অনুকম্পা। তাই তো তোমার ও আমাদের মাঝখানে তুমি 
অন্তরাল রচনা করেছ। তোমার চিরন্তন উপাস্থাতির উলঙ্গ উজ্জ্বলতা সইতে 
পারব না বলেই এই অন্তরাল। এই অল্তরালাটিই তোমার মায়া। এই অন্তরালের 
নামই সংসার। 

ছোট-ছোট বেড়া তুলে দিয়েছে আমাদের চার পাশে । ধনের বেড়া মানের বেড়া 
অহঙ্কারের বেড়া । তুচ্ছ আশা-আকাক্ক্ষার শুকনো খড়কুটো দিয়ে চাল ছেয়ে 
গদয়েছ মাথার উপরে । আশে-পাশে ছোট-ছোট সুখ-দুঃখের ঘুলঘ্ীল বাঁসয়েছ। 
মৃত্তকার মেঝেটি শীতল করে লেপে 'দিয়েছ স্নেহ-প্রেমের সিণ্চনে। এমাঁন করে 
অপাঁরসর ঘরের মধ্যে আমাদের ঢাাঁকয়ে দিয়ে তুমি দূরে সরে দাঁড়িয়েছ। সরে 
না দাঁড়য়েই বা করবে কি। তোমার কি দোষ! আমরাই যে অশস্ত, অসমর্থ । 
তোমার আলোর ছটায় আমাদের দু চোখ যে ধাঁধিয়ে যাবে, তোমার ভালোবাসার 
ভারে ভেঙে পড়বে যে আমাদের বুক। তাই তুমি কৃপা করে তোমার ও আমাদের 
মাঝখানে মায়ার ষবানকা ফেলে রেখেছ । রেখেছ এই রমণীয় ব্যবধান। এই মনোহর 
দূরত্ব । 

সংকীর্ণ পর্বতপথরেখা ধরে চলেছে রামসীতা, অনুগামী লক্ষমণকে সঙ্গে নিয়ে। 
সর্বাগ্রে রাম, রামের পিছনে সীতা, সীতার পিছনে লক্ষমণ। এই তাদের 
বনাভযানের চিরল্তন চিন্র। রাম আর লক্ষণের মাঝখানে অপরিহরণীয়া সীতা। 
লক্ষমণ ভাবছে, এত 'দিন চলেছি একসঙ্গে, রামকে দাদা ছাড়া আর কিছ বলে 
দেখতে পেলাম না কোনো 'দন। হনুমান তাঁকে নারায়ণ বলে সেবা করছে, 
বিভীষণও পূজা করছে 'বিষুজ্ঞানে, কিন্তু আমার কাছে তানি শুধু আমার সেই 
শাদাঁসদে দাদা, দশরথের জ্যেষ্ঠ পূত্র। আম তো কই তাঁকে কেন্টাবস্ট: বলে 
দেখতে পাচ্ছি না। দি করে পারবে? কি করে রামকে দেখবে তাঁর স্বভাব- 
মূর্তিতে ? লক্ষমণ আর রামের মধ্যখানে যে মায়ারূপিণী সীতা দাঁড়য়ে। মায়াই 
যে দেখতে দিচ্ছে না মায়াধীশকে। সীতা যতক্ষণ না সরে দাঁড়াচ্ছেন ততক্ষণ 
শ্রীরামদর্শন হচ্ছে না লক্ষণের । ততক্ষণ রাম শুধু দশরথের ছেলে, শুদ্ধ-ব্রহম়- 
প্রাৎপর রাম নয়। 

তেমনি, ঈশ্বর, এই মায়াময় সংসার সৃষ্ট করে তুমি আমাদের দৃম্টি থেকে নিজেকে 
আড়াল করেছ। তোমাকে ভুলে-থাকবার খেলায় অস্টপ্রহর মেতে আছি আমরা। 
কিন্তু তুমি তোমার নিজের খেলায় মেতে থেকেও আমাদের ভোলনি। যবানিকা 
সারয়ে মাঝে-মাঝে উপকঝতকি মারছ। আভাসে তোমার গায়ের বাতাস আমাদের 
গায়ে লাগছে । আমরা চমকে-চমকে উঠাঁছ, বুঝতে পারছি না, ধরতে পারাছ না। 
এমন একেকটা আনন্দ দিয়েছ, তোমাকে দেখবার জন্য ব্যগ্র হয়ে বাইরে ছুটে 
এসেছি। এমন একেকটা দুঃখ "দিয়েছ, ঘরের নিঃসঙ্গ অন্ধকারে কে'দোছ তোমাকে 
বৃকে নিয়ে। তব কই, তোমাকে দেখতে পাচ্ছি কই! রুদ্ধদ্ীষ্ট বাঁধর যবনিকা 
দুভে্দ্য বাধা মেলে দাঁড়য়ে রয়েছে চোখের সামনে। 

৭৪ 


এই যবনিকা উত্তোলন করো। উন্মোচিত করো এই নিষ্ঠুর অবগ্ণ্ঠন। তোমাকে 

দেখতে দাও। দেখতে দাও তোমার সম্পূর্ণ মুখচ্ছবি। তোমার নীরবতার মুখ, 

গ্ভীরতার মুখ, অতলতার ম্খ। পদ্ম যেমন সূর্যকে দেখে, তেমনি করে দেখতে 

দাও তোমাকে । তুমি অপাবৃত হও, উদ্ঘাঁটিত হও, দূর করে দাও এই আচ্ছাদনের 

কুহোল। | 

সারদা হঠাৎ ম?খের ঘোমটা খুলে দাঁড়াল রামকৃষের সামনে। আর রামকৃফ্ণ 

করজোড়ে স্তব করতে লাগল । 

বাঁল। 

এমনিতে সব সময়ে মুখের উপর ঘোমটা টানা সারদার। যখন রামকৃফের কাছে 

এসে দাঁড়ায়, তখন জড়পদস্তলন ছাড়া তাকে আর কি বলবে! যা-ও দু-একটা কথা 

কয়, তা-ও ঘোমটার ভিতর 'দিয়ে। কথার সঙ্গে-সঙ্জে মুখের ভাবাঁট কেমন হয় 

তা কে জানে! 

রামকৃষ্ণের তখন খুব অসুখ, সারদা থাকে দূরে, শম্ভুবাবূর সেই চালাঘরে। 

রামকৃষের সেবার তাই অসুবিধে হচ্ছে । কাশী থেকে কে একজন মেয়ে এসেছে, 

সেই সেবা করছে রামকৃষণের। সেই মেয়ের কি নাম, কোথায় বাঁড়, কবে এল কবে 

যাবে কেউ কিছু খবর রাখে না। 

এক 'দিন রানে সেই কাশনীর মেয়ে চালাঘর থেকে সারদাকে ধরে নিয়ে এল। ধরে 

নিয়ে এল সটান রামকৃষ্ণের ঘরের মধ্যে। রামকৃষ্ণ যেখানে বসে ছিল সেইখানে 

তার চোখের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। অনড় হয়ে দাঁড়য়ে রইল সারদা । মুখে 

তার সেই দীর্ঘ ও দুভের্দ্য ঘোমটা । 

কাশীর মেয়ে সহসা সবল হাতে সারদার সেই মুখের ঘোমটা খুলে ফেলল এক 

টানে । রামকৃষ্ণকে দেখাল সেই মুখ । 

রামকৃষ্ণ কী দেখল রামকৃষই জানে। 

করজোড়ে তৎক্ষণাৎ স্তব শুরু করল। কোথায় অসুখ, কোথায় সেবা, সমস্ত রাত 

ভগবং-কথা ছাড়া আর কথা নেই। ঠায় দাঁড়য়ে রইল সারদা । পটার্পিতের মত। 

কখন যে রাত পূইয়ে ভোর হয়ে গেল ধাঁরে-ধীরে, কেউ টের পেল না। 

এবারে কলকাতায় এসে সোজাসুজি দক্ষিণে*্বরে উঠল না সারদা । সঙ্গে প্রসন্নময়ী 

ছিল, উঠল প্রথমে তার বাসায়। পরদিন সকালে দাক্ষণেশ্বরে হাজির। সারদার 

শা শ্যামাস্মন্দরী সেবার সঙ্গে এসেছে, সারদা তাই একটু তটস্থ। মনে আশা, 

মাকে কেউ একটু সমাদর করুক। 'মিম্টি করে কথা বল:ক দুটো । 

বরং ঠিক তার উলটোটা ঘটল । হৃদয় এল তোরয়া হয়ে। শ্যান্মহ্হেখক লক্ষ্য 

করে বললে, এখানে কি! এখানে তোমরা কি করতে এসেছ 2 

শ্যামাসুন্দরী তো হতবাক। সারদা অগ্রস্তৃত। এমন কাণ্ড কে কবে দেখেছে! 

দরজায় পা 'দিতে-না-দিতেই গলাধাক্কা ! 

আর কাউকে কথা বলতে দিল না। নিজেই গজরাতে লাগল হৃদয় : “তোমাদের 
৭% 


এখানে আসবার কি দরকার! বলা নেই কওয়া নেই সটান এখানে এসে হাজর! 
এখানে মজাটা কিসের জানতে পাই £ 

শ্যামাসুন্দরী শওড়ের মেয়ে, হৃদয় তাই তাকে গ্রাহ্ই করলে না। উলটে অপমান 
করলে। সবাই ভাবলে রামকৃফ এর একটা প্রাতিকার করবে । কিন্তু হাঁনা কিছুই 
বললে না রামকৃফণ। বলতে গেলে গালমন্দ করে হৃদয় তাকে নাস্তানাবুদ করবে। 
হৃদয়ের মুখ তো নয় যেন বিষের হাঁড়। হৃদয়কে রামকৃষ্ের বড় ভয়। 

শেষকালে শ্যামাস্‌ন্দরী বললে, চল দেশে ফিরে যাই। এখানে কার কাছে মেয়ে 
রেখে যাব 2 

অন্তরে মরে গেল সারদা। মা'র মনের ব্যথাঁট গুমরাতে লাগল মনের মধ্যে। 
“তাই যাও মেয়ে নিয়ে। ওরে রামলাল, পারের নৌকো এনে দে।' 

রামলাল নৌকো নিয়ে এল। সেই দিনই মাকে নিয়ে ফিরে গেল সারদা । আর 
কোনো দিন আসব না এমন কোনো প্রাতিজ্ঞা করল না রাগ করে। বরং মা-কালীকে 
উদ্দেশ করে মনে-মনে বললে, 'মা, আবার যাঁদ কোনো দিন আনাও তো আসব।' 
হৃদয়কে নিয়ে রামকৃষণের বড় যল্ত্রণা ৷ বড় হাঁকডাক করে, কথায়-কথায় হৈ-হজ্জুত। 
এত শাসন-জুলুম ভালো লাগে না রামকৃষের। অথচ উচ্চ-বাচ্য করার যো নেই। 
কিছু বলতে গেলেই আবার তেড়ে আসবে । দাঁতে খড়কে দিয়ে বসে থাকে 
রামকৃফণ। 

শুধু কি তাড়না? ফোড়ন দিতেও ষোলো আনা ওস্তাদ । 

কাউকে হয়তো উপদেশ দিচ্ছে রামকৃষ্ণ, অমান হৃদয় চিপটেন ঝাড়ল : “তোমার 
ব্ীলগলি সব এক সময়ে বলে ফেল না! ফি বার একই বাল বলার মানে কি?, 
সর্বাঙ্গ জলে গেল রামকৃষের। ঝাঁজিয়ে উঠল তক্ষুন : 'তা তোর কি রে শালা ? 
আমার বুল, আম লক্ষ বার এ এক কথা বলব--তাতে তোর 'কি?' 

গালাগাল তো দেয়ই, আবার থেকে-থেকে টাকা-্টাকা করে। জাঁম-জায়গার ফিকির 
খোঁজে । হাটে যায় গরুদ কিনতে । এক 'দিন রামকৃষ্কে এসে বললে. একখানি 
শাল কিনে দাও দেখি। 

রামকৃ তো অবাক । আম কোথা শাল পাব ? 

'না দেবে তো নালিশ করব বলে রাখছি। হৃদয় চোখ রাঙালো। 

কর্‌ না। শেষকালে শালের বদলে শুল এসে না জোটে। 

শুধু চাওয়া আর চাওয়া! শুধু হৈচৈ। আশতোষের ঘরে কেউ নয়. সবাই 
অসন্তোষের ঘরে । বাজ পড়লে ঘরের মোটা জিনিস তত নড়ে না, শার্সই খটখট 
করে। 

রামকৃষ্ণ ঠিক করল কাশীবাসী হব। আর সহ্য হয় না জবালাতন। 

কিন্তু কাশ যে যাবে, কাপড় না-হয় নেবে, কোনো রকমে রাখবে না-হয় পরনে, 
কিন্তু টাকা নেবে কেমন করে? হাতে মাটি দেবার জন্যে মাটি নিতে পারে না 
রামকৃ্ণ। বটয়া করে পান আনবার যো নেই। কাশী যাবার টিকিট রাখবে 
কিসের মধ্যে? 


৭৬ 


আর কাশী যাওয়া হল না। 

িল্তু একটা ব্যবস্থা তো দরকার । 

ব্যবস্থা আবার কি! হৃদয় না হলে দেখবে-শুনবে কে, সেবা করবে কে? বর্ষার, 
দনে পেট-খারাপের সময় মাছের ঝোল আর শুক্‌তোর যোগাড় দেখবে কে 2 
তুমি তোমার কাজ করো না। হৃদয়কে থাকতে দাও না তার মোড়ীলর মণ্ডলে। 
তুমি এত বড় জগৎ-সংসারের মোড়াল করছ, হৃদয়ের এই সেবার প্রভুত্বে কেন বাদ 
সাধছ ? হৃদয় আর কাউকে তোমার পা ছঠুতে দেয় না, শুধু এ পা দুখান 'নজের 
নিভৃত বুকে ধরে রেখেছে বলে। 

তব; জীব-নিয়াতর বন্ধন তার গলায়। সে টাকা চায়, জাম চায়, স্মী-পুত্র-পারবার 
চায়। তোমার ও তার মাঝখানে চায় সে একাঁট সহন-শোভন যবাঁনকা। জীবনাটকের 
'বাচন্রিত পটপৃচ্ঠা। তুমি যাঁদ না তোলো, কার সাধ্য তা সরায়! তুমি যাঁদ না, 
খোলো, কার সাধ্য তা নড়ায়! 





অর্ধেক রাতে উঠে রামকৃষ্ণ কুটনো কুটতে লেগেছে । তা-ও 'দিগম্বর হয়ে। 

এমন কথা শুনেছে কেউ? হৃদয় খেপবে না তো কি! 

শুধু তাই নয়, কাল সকালের চাল-ডাল মশলা সব যোগাড় করে রাখছে রামকৃষ্ণ । 
তুমি তো বেশ লোক” খুট-খুট শব্দ শুনে ঘূম ভেঙে গিয়েছে হৃদয়ের । “চোখে 
ঘুম নেই বুঝি? মাঝ রাতে উঠে এই কান্ড 2, 

হৃদয়ের কথা রামকৃষ্ণ তো ভারি গ্রাহ্য করে! নিজের মনে কাজ করে চলেছে। 
কেন? ও সব কি সকালে হয় না? র 

তুই তার কি বুঝাঁব? ঘুম ভেঙে গেল, ভাবলুম বসে-বসে কি আর করি, কালকের 
রান্নার যোগাড় দেখি গে যাই সরল সহাস মুখে বললে রামকৃষণ। 

শকল্তু ও তোমার কি কাজের ছার! ঠিক একটা লোকের মত অজ্প-সল্প করে 
যোগাড় করছ। এটুকু তরকারিতে তোমার পেট ভরবে ?' হৃদয় ঝামটা মেরে উঠল : 
'আচ্ছা কি্পন যা হোক।, 

'তা তো বলাবই। তোদের কি! খুব খানিকটা বেশি-বৌশ করে অপচয় করতে 
পারলেই হল! আমার পেটের আটকোল যখন জানিস না তখন চুপ করে থাক-_ 


৭৫ 


“রাখো । তোমার মত গুনে-গুনে একশোটা ভাতের দানা রাখতে পারব না পাতে।' 

'শোন্‌, এই ভাতের জন্যই কুলীন বামুনের ছেলে হয়ে এখানে চাকার করতে 
এসেছিস। নইলে কোথায় শিওড় আর কোথা দক্ষিণে*্বর! যাঁদ দেশে তোর ধানের 
জম বা টাকা-পয়সা সচ্ছল থাকতো তা হলে কি আসতিস এখানে? শোন, 
লক্ষম ছাড়া হতে নেই, মিতব্যয়ী হাব ।, 

একজনকে একটা দাতিন-কাঠি আনতে বলল রামকৃফ্ণ। সোজা দু-তিনটে ডাল ভেঙে 
আনলে সে। 

শালা, তোকে একটা আনতে বললনম, তুই এতগ্দাল আনি কেন? 

লোকটা ভেবোছিল রামকৃফ বুঝি খাঁশ হবে অনেকগুলি দাঁতন পেয়ে। উলটে ধমক 
খাবে ভাবতে পারেনি । 

দু দিন পরে আবার সেই লোককেই বললে রামকৃষ্ণ : "ওরে একটা দাঁতিন দে না-_ 

সে আবার ছুট দিল বাগানের দিকে। 

'ওরে, কোথা যাচ্ছিস 2, 

“আজ্ঞে গাছ থেকে ভেঙে আনতে যাচ্ছি।' 

“কেন, সোঁদন যে অতগ্লি আনাল- নেই ?' 

*আছে।, 

“তবে আবার ডাল ভাঙতে ছ:টছিস যে ?' রামকৃষ্ণ শাসনের সুরে বললে, 'ও গাছ 
কি তুই সৃজন করেছিস যে মনে করলেই টপ করে ছু ডাল ভেঙে আনাঁব! যার 
সৃজন সেই জানে । বাঁদ্ধ-শ্দীদ্ধ আছে, বুঝে-সজে কাজ কর্‌। জিনিসের অপচয় 
করাব কেন? 

ঠিক-ঠিক উপদেশ মত চলতে চেম্টা করে রামলাল। রান্রে যত বার 'বাড় খায়, 
পোড়া দেশলাইয়ের কাঠ দিয়ে ধাঁরয়ে নেয় লণ্ঠন থেকে । ফালতু একাটও বাক্সের 
কাঠি খরচ করে না। 

'যত সব হাড়-কিপ্পন-- হৃদয়কে বাগানো যায় না কিছুতেই। 

খাটামটি বেধেই আছে রামকৃষের সঙ্গে। সামান্য বচসা নয় দস্তুরমতো লম্বাই- 
চওড়াই ঝগড়া । রামলাল বলে, সে সব ঝগড়া দেখবার মত । 

একেক সময় ভীষণ রেগে যায় রামকৃফণ। হৃদয়কে যা-তা গালাগাল দিয়ে বসে। এমন 
সব কথা বলে যা মুখে আনা যায় না। 

হৃদয় তখন চুপ করে থাকে । যখন অসহ্য হয়, বলে, 'আঃ, কি কর মামা । ও সব 
কথা কি বলতে আছেঃ আঁম যে তোমার ভাগনা ।, 

আমার গালাগাল দেওয়া নিয়ে কথা । কথার অর্থ দিয়ে আমার কী হবে? 

আমার পৃজা করা নিয়ে কথা । আমার স্তোন্রমন্্ দিয়ে কী হবে? 

আমার ভালোবাসা দেওয়া নিয়ে কথা । আমি রূপ-গুণ রত-বস্ব্ দিয়ে কী করব? 

একেক সময় গালাগালেও মেটে না। হাতের সামনে যা পায়, ঝাঁটা-জুতো, সপাসপ 
লাগিয়ে দেয় হৃদয়ের পিঠে। হৃদয় নীরবে সহ্য করে। 

মনে হয় এই বুঝি দুজনে ছাড়াছাঁড় হয়ে যাবে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার দুজনে 


৭৬ 


ভালোবাসা, আবার ঠাট্রা-ইয়ার্ক। আবার হৃদয়ের প্রাণ-ঢালা সেবা । পর্যন্তিহণন 
পরিচর্যা। তখন আবার হৃদয় হনকুম করছে রামকৃষকে। আর রামকৃষ্ণ তাই শুনছে 
চুপ করে। হৃদয়ের যখন প্রতুত্বের পালা তখন আবার সেই মান্রাজ্ঞানহীন কোলাহল। 
রামকৃষণের যল্ণার একশেষ। 
রামকৃষ্ণ ভাবল এ দেহ আর রাখব না। গঙ্গায় ঝাঁপ দেবার জন্যে পোস্তার উপর 
গিয়ে দাঁড়াল। 
দেহত্যাগ করতে হবে না রামকৃফকে। মা অন্য রকম ব্যবস্থা করে দিলেন। 
হৃদয়ের কি খেয়াল হল, কুমারী-পূজা করবে । কিন্তু কুমারী কোথায় £ মথুরবাবূর 
নাতনী- ত্রৈলোক্য বিশ্বাসের মেয়েকে পাকড়াও করলে হৃদয়। পায়ে ফুলচন্দন দিয়ে 
পুজো করলে। 
খবর শুনে নিদারূণ চটে গেল ভ্রিলোক্য। কে জানে কি অকল্যাণ হবে না-জানি 
মেয়ের । যত সব মূর্খ অঘটন। 
মন্দিরের কাজ থেকে ছাঁড়য়ে দিলে হৃদয়কে । হ্যাঁ এই মূহূর্তে চলে যাও মান্দির 
ছেড়ে। আর কোনো দিন ঢুকতে পাবে না এর ন্রিসীমায়। 
দারোয়ান এসে বললে, 'আপনাকে এখান থেকে যেতে হবে।' 
'আমাকে 2" রামকু্ণ চমকে উঠল : 'সে কি রে১ আমাকে নয়, হৃদুকে।' 
'না, বাবুর হহকুম, দারোয়ান বললে শাসনভঙ্গনীর কণ্ঠে : তাকে আর আপনাকে 
দুজনকেই যেতে হবে।' 
ব্যস, আর বিন্দুমান্র বাক্যব্যয় নেই, ক্ষণমান্র দ্বিধা-দ্বন্ নেই, রামকৃফ চাট পরে 
বেরিয়ে গেল। 
হাঁহাঁ করতে-করতে ছুটে এল ত্রৈলোক্য। ছুটে এসে হাতে-পায়ে ধরল রামকৃফের। 
“ও কিঃ আপনি যাচ্ছেন কেন? আপনাকে তো আম যেতে বালান ।' 
'তাই নাকি ?, কিছ আর না বলে ফিরে এল রামকুণ। 
ত্যাগেও বাঁজ নেই রামকৃষের। নালস্তি, ৪ না 
থাকতে বলো থাকছি এককোণে। আমার কোনো ইতরাবশেষ নেই । আমার যেতেও 
যেমন আসতেও তেমন । 
'ওরে হৃদ, তোকে একাই চলে যেতে বলেছে।' 
হৃদয় চলে গেল হেন্ট মুখে । রামকৃষ্ণ দেখল, মা-ই তাকে সরিয়ে দিলেন। 
এবার আবার হাজরাকে নিয়ে মুশাঁকল হয়েছে। ব্রহযন আর শান্ত ষে অভেদ এ সে 
কিছুতেই মানতে চায় না। 
তখন রামকৃষ্ণ মাকে ডাকতে বসল। বললে, 'মা, হাজরা এখানকার মত উলটে দেবার 
চেষ্টা করছে। হয় ওকে বুঝিয়ে দে, নয় ওকে সরিয়ে দে এখান থেকে ।, 
'হাজরার কথায় আপনার এত লাগল?" জিগগেস করল ভবনাথ। 
এখন আর লোকের সঙ্গে হাক-ডাক করতে পাঁর না। হাজরার সঙ্গে যে ঝগড়া 
করব এ রকম অবস্থা আর আমার নয়__' 
॥মা প্রার্থনা শুনলেন। 

৭৯ 


পর দিন হাজরা এসে বললে, হ্যাঁ, মানি। বিভু সকল জায়গায় বর্তমান ।, 
জীবের স্বভাবই সংশয়। হ্যাঁ বললেও, ঢোক গিলে বলে, কিন্তু__। বিশ্বাস .হতে 
হবে প্রহনাদের মত। স্বতগাসদ্ধ। স্বতঃস্ফূর্ত। “ক' দেখেই প্রহ্যাদের কান্না । 'ক' 
দেখেই দেখেছে কৃফকে। 

বালকের বিশ্বাস চাই। 

এক 'দিন ঘাসবনে 'কি কামড়েছে ঠাকুরকে । ভয় হল, যাঁদ সাপ হয়! তবে কি করা! 
ঠাকুর শুনেছিলেন, আবার যাঁদ সাপ কামড়ায়, তা হলে বিষ ঠিক তুলে নেয়। তখন 
সাপের গর্ত খুজতে লাগলেন ঠাকুর, যাতে আবার কামড়ায় দয়া করে। কিন্তু 
গর্ত ঠিক ঠাহর হচ্ছে না। একজন জিগগেস করলে, কি করছেন? সব বললেন 
তাকে ঠাকুর। লোকটি বললে, যেখানটায় আগে কামড়েছে ঠিক সেই জায়গায় 
কামড়ানো চাই। তখন উঠে পড়লেন ঠাকুর। 

আরেক দিন রামলালের কাছে শুনেছিলেন, শরতের হম ভালো । নাঁজর হিসেবে 
কি একটা শ্লোকও আওড়োছিল রামলাল। কলকাতা থেকে গাঁড় করে ফিরছেন 
ঠাকুর, গলা বাঁড়য়ে রইলেন বাইরে, যাতে সব [হমট.কু লাগে। 

তাই লাগল। তার পর অসুখ। 

গাঙ্গাপ্রসাদ আমাকে বললে আপানি রাত্রে জল খাবেন না। আমি এঁ কথা বেদবাক্য 
বলে ধরে রেখোছি। আম জানি সাক্ষাৎ ধন্বন্তার।, 

বিশ্বাসের কত জোর! সাক্ষাৎ পূর্ণব্রহন্ন নারায়ণ যে রাম তাঁর লঙ্কায় যেতে সেতু 
লাগল। কিন্তু শুধু রাম নামে বি*বাস করে লাফ দিয়ে সমুদ্র ডিঙোল হনুমান। 
তার সেতু লাগল না। 

তোমার-আমার বিরহের অন্তরালে আর কত সেতু বাঁধব? যে সমূদ্রে আম সে 
সমহদ্রে তুমিও । আমি যাচ্ছি ও-পার, তুমি আসছ এ-পার। মাঝসম:দ্রে দেখা হয়ে 
যাবে দুজনের । আমাদের হাতেহাতে সেতুবন্ধ। 

পিন্তু হৃদয় 'কি সাঁত্ই চলে গেল? রামকৃষ্ণের সঙ্গছাড়া হল ? 

ব্রীমা বললেন, 'তা ভালো জিনিস কি চিরাঁদন কেউ ভোগ করতে পায় ? 

ণকন্তু ঠাকুরকে অনেক কম্টও 'দিত। গাল-মন্দ করত।, 

“যে অত সেবা-পালন করেছে সে একট; মন্দ বলবে না? যে যত করে সে অমন 
বলে থাকে ।' শ্রীমার কণ্ঠস্বরে মমতার ফজ্গু। 

রামকৃষেরও সেই অন্তঃশীলা করুণা । বললে, 'অমন সেবা বাপ-মাও করতে 
পারে না।, 

ণিল্তু এখন তোমাকে কে দেবে সেবা-স্নেহ ? 

“দেবার সেই ঈশ্বর । বললে রামকৃষ্ণ : শাশুড়ি বললে, আহা, বৌমা, সকলেরই 
সেবা করবার লোক আছে, তোমার কেউ পা টিপে দিত বেশ হত। বউ বললে 
ওগো, আমার পা হার টিপবেন। আমার কারুকে দরকার নেই। সে ভন্তিভাবেই 
এঁ কথা বললে-_, 

তার মানে, আম যখন ঈশ্বরে সম্পূর্ণ নির্ভর করে আছি তিনিই সব ভারবহনের 


৮০ 


ব্যবস্থা করবেন। এ চাই, ও চাই, বলে তো বহন বাহানা করি, কিন্তু কণ বা কতট্‌কু 
আমার সাত্যকার চাইবার মত, তা কি আম জানি? মা জানেন, মা-ই ঠিক করে 
দেবেন। হয়তো শয্যা পেলাম, নিদ্রা পেলাম না; বিষয় পেলাম, মামলা বাধল: 
প্রেয়নী পেলাম কিন্তু প্রেম হল অস্তমিত। কী পেলে আমার চলে, কিসে বা 
কতটুকুতে আমার শান্তি ও সমতা, তা বুঝি আমার সাধ্য কি। আমি লোভান্ধ, 
অল্পদৃষ্টি, স্বার্থপর । তাই তান বণনা 'দয়ে বাঁচান, আঘাত দিয়ে চেনান, বিচ্ছেদ 
ঘটয়ে নিয়ে আসেন নতুন পরিচ্ছেদে। রাজার বেটা যদি ঠিক মাসোয়ারা পায়, 
হরির বেটা ঠিক হরিসেবা পাবে। 

যান ক্লেশ হরণ করেন পাপ হরণ করেন মনোহরণ করেন তিনিই হরি। 
ন্িলোক্য নতুন এক 'হিন্দস্থানী চাকর রেখে দিল। হৃদয়ের বদলে সে-ই সেবা 
করবে রামকৃষের। 

কিন্তু শুদ্ধ সাত্বৃক লোক ছাড়া আর কারু ছোঁয়া সহ্য করতে পারে না রামকৃফণ। 
তাই কি করে চলে ও-সব হেটো চাকরে ? 

দু দিন পরে রাম দত্ত এসেছে দক্ষিণে*বরে। 

'তোমার সঙ্গে এই ছেলোঁট কে হে?" উৎসুক হয়ে জিগগেস করল রামকুফণ। 
'লালটু। আমার বাড়ির চাকর ।, 

'ওকে এখানে আমার কাছে রেখে দাও । ও বড় শুদ্ধসত্ব ছেলে।' 

এই লাটু মহারাজ । এই স্বামী অন্ভুতানন্দ। 

ঠাকুরের সন্ব্যাসী-শিষ্যদের মধ্যে প্রথমাগত। প্রথম-পরশ-ধন্য। 





আদ নাম রাখতুরাম। ছাপরা জেলার কোন এক গণ্ডগ্রামে জল্ম। খুব ছেলেবেলাতেই 
বাপ-মা মরে গিয়েছে। আছে খুড়োর সংসারে । খুড়োর ছেলেপিলে নেই। 
রাখতুরামকে সহজেই সে টেনে 'নিল বুকের কাছে। 

কিন্তু রাখতুরামের জন্যে নিভৃত পক্ষীনীড় নয়। ঝড়ের আকাশে তার নিমল্মণ। 
কোন এক সমদূদ্রগামী জাহাজের মাস্তুলে এসে সে বসবে। 

রাখতুরাম রাখালি করে । গোঠে-মাঠে ঘুরে বেড়ায়। প্রকৃতির পাঠশালায় পড়ে। 
খোলা মাঠ তার বই, আকাশ আর মেঘ তার শ্লেট-পেল্সিল, বৃষ্টি তার ধারাপাত। 
৬6৬৮) ৮৯ 


ঘরের পশু আর বনের পাখি তার সহপাঠী । 

আর গদ্রু 2 কে জানে! থেকে-থেকে গান করে রাখতুরাম : নয়া রে, সীতারাম 
ভজন কর লিজিয়ে।' 

মহাজনের খপ্পরে পড়েছে চাচাজী। খণের দায়ে নিলেম হয়ে গেল জাম-জমা। 
রাখতুরামকে নিয়ে চাচাজী পথে বসল। 

ভাগ্যের সন্ধানে কলকাতায় এল দুজনে । কিন্তু ইটের পর ইট, ওখানে শুধু 
মানুষ-কনটের বাসা। কোথাও স্নেহ নেই, কোমলতা নেই। আঁতাঁথকে ওখানে 
ভিক্ষুক মনে করে, ভিক্ষুককে মনে করে চোর। 

দেশের লোক কাউকে পাওয়া যায় কিনা, এখানে-ওখানে খঃজতে লাগল চাচাজী। 
পাওয়া গেল ফুলচাঁদকে । ফুলচাঁদ মৌডকেল কলেজে রাম দত্তের আরদালি। 
“আমার কাছে রেখে যা । দোঁখ বাবুকে বলেকয়ে রাজী করাতে পারি কিনা ।' 

'সব কাজ করবে । খুব বাধ্য ছেলে রাখতুরাম।' খুড়ো 'মনাতি করল। 

দেখেই কেমন পছন্দ হয়ে গেল রাম দত্তের । বেশ উজ্জল চোখ দুটো ছেলেটার। 
মুখে একটা অকাপট্যের ভাব। শরীরে কাঠিন্যের লাবণ্য । 

কাজ আর কি। বাজার করা, মেয়েদের বেড়াতে নিয়ে যাওয়া, মায়েদের ফরমাস 
খাটা আর আঁফসে রাম দত্তের টাফিন দিয়ে আসা । ি, পারাঁব তো? 

“কন্তু এক কথা । তোর অত বড় নাম আম বলতে পারব না। ছোট্ট করে বলব, 
লালটু ৷ ক, রাজন ?, 

লালট থেকে লাটু। ঠাকুর ডাকেন লেটো বলে। 

কুস্তি করে লার্টু। আশ্চর্য, তাতে পাড়ার গৃহস্থদের আপাঁত্ত। চাকর আবার কুস্তি 
করবে কি! কুস্তগীর চাকর হলে তো সর্বনাশ। 

রাম দত্তের কাছে নালিশ করে কেউ-কেউ। এতে নালিশ করবার কী আছে। শেষ 
কালে বললে রাম দত্ত : 'কুস্তি করা তো ভালো। কুস্তি করলে কাম কমে যায়, 
আপনা-আপনি বীর্য রক্ষা হয়। নজেরা যেমন দুর্বল, চাকরও তেমনি দূর্বল 
খোঁজো । 

কিন্তু তব নিবৃত্ত হয় না পড়শীরা। একজন এসে বললে, বাজারের পয়সা চুরি 
করে লাটু। 

“হ্যাঁ রে ছোঁড়া, হাঁক 'দল রাম দত্ত : ক পয়সা আজ চুরি করোছিস বাজার থেকে ?' 
রুখে দাঁড়াল লাট;। প্রতিবাদের ভঙ্গিতে ফুটে উঠল পালোয়ানের ভাব। জহলে 
উঠল প্রস্ফুট দুই চোখ । আধা 'হান্দর তোতলাম 'মাঁশয়ে বললে, 'জানবেন বাবু! 
হাম নোকর আছে, চোর না আছে! 

এই তো কথার মত কথা! জীবলোকে যত দীপ্তি আছে সবার চেয়ে শ্রে্ঠ হচ্ছে 
সত্দীপ্তি। 

রামকৃষণের থেকে দীক্ষা নিয়ে রাম দত্ত তখন ঈম্বরমদে মাতোয়ারা । সে মদের 
ছিটে-ফোঁটা পড়ছে এসে সংসারে । 'যাঁন সবমল্পপ্রণেতা তাঁরই বাণীবিন্দুর বর্ষণ 
রামের উদ্দীপনায় বাঁড়র সবাই কমবোশ উৎসাহিত হচ্ছে, কিন্তু একেকটা কথ 
৮২ 


নাটুর মনে নেশা ধরিয়ে দচ্ছে। কথার মানে সে ভালো বোঝে না কিন্তু একটি 
ইশারা মনের মধ্যে কেবল কে'দে-কে“দে বেড়ায় । একটা ভ্রমর যেন গুনগ্নিয়ে উড়ে 
বেড়াচ্ছে। তার মনের মধ্যে যে ফুলটি ফুটিফুটি করছে তার মধু খেতে। 
ভগ্রবান মন দেখেন। কে কি কাজে আছে, কে কোথায় পড়ে আছে, তা দেখেন 
না।' কথাটা বাজল একটা আশ*বাসের মত। পথহারা প্রান্তরে আলো-জবালা আশ্রয়ের 
মৃত । 
নিজনে বসে কাঁদতে হয় তাঁর জন্যে। তবে তো তাঁর দয়া হবে।' 
নুপুর বেলায় গায়ে কম্বল চাপা দয়ে শুয়ে আছে লাটু। মাঝে-মাঝে বাঁ হাত 
দয়ে চোখ মুছছে । পাশ ফিরছে খাঁনক বাদে । আবার চোখ মুছছে ডান হাত দিয়ে। 
কাকার জন্যে মন কেমন করছে রে লাটু *' রামবাবুূর স্ত্রী জিগগেস করলেন 
কাছে এসে। 
তাঁর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল লাটু। কার জন্যে কাঁদি তা কি আম 
গান? কেউ কি তা জানে? 
এক রোববার রাম দত্ত চলেছে দক্ষিণেশ্বরে, লাট০ এসে তার সঙ্গ 'নিল। বললে, 
হামাকে নিয়ে চলুন । 
সে কি, তুই কোথা যাঁব 2 
বার কথা আপ্দনি বলেন, সেই পরমহংসকে হামি দেখবে ।' 
কমন মায়া হল রাম দত্তের। সঙ্গে করে নিয়ে গেল লাটুকে। 
গালগাল বে"টেখেটে জোয়ান চেহারার চাকর। চাকর বলে ঘরে ঢুকতে সাহস 
নেই। রামকৃফের ঘরের সামনে পশ্চিমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে চুপ করে। দাঁড়য়ে 
মাছে কিন্তু হাত-জোড়। 
বাম দত্ত ঘরে ঢুকে রামকুষ্ষকে দেখতে পেল না। বাইরে থেকে রামকৃফ তখন 
মাসছে নিজের ঘরের দিকে । রাধিকার কঈর্তন গাইতে-গ্াইতে। তখন আমি 
_য়ারে দাঁড়ায়ে_। নিজের মনে আখর দিচ্ছে রামকৃফণ। কথা কইতে পেলুম না। 
মামার বধূর সনে কথা হল না। দাদা বলাই ছিল সাথে তাই কথা হল না।' 
বারান্দায় লাটঃর সঙ্গে দেখা। তুই কে রে? তুই কোথেকে এল তোকে এখানে 
ক আনল ? 
বামকৃফকে দেখেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে রাম দত্ত। 
এ ছেলেটাকে বুঝি তুমি সঙ্গে করে এনেছ? একে কোথা পেলে? এর যে সাধুর 
সক্ষণ |? 
রাম দত্তের দেখাদোৌখ লাটুও প্রণাম করলে রামকৃষকে। বুঝলে চোখের সামনে 
এই সেই নয়নাতীত। 
কন্তু ঘরে ঢুকেও বসছে না সবাইর মত। হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছে ঈবন্নত 
হয়ে। যেন রামের কাছে হনুমান । 
'বোস না রে বোস।' হুকুম করল রামকৃফ। তখন লাটু এক পাশে বসল জড়সড় 
হয়ে। 

৮৩ 


'যারা নিত্যসিদ্ধ তারা যেন পাথর-চাপা ফোয়ারা । জন্মে-জন্মে তাদের জ্ঞান-চৈতন্য 
হয়েই আছে। এখানে-সেখানে ওসকাতে-ওসকাতে যেই চাপটা সরিয়ে দিল মিস্‌, 
অমনি ফোয়ারার মুখ থেকে ফরফর করে জল বেরুতে লাগল--' বলেই রামকৃ 
হঠাৎ ছঃয়ে দিল লাটুকে। 

লাটুর গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল, ঠোঁট দুটো কাঁপতে লাগল ঘন-ঘন, আর | 
দেখতে-দেখতে দু চোখ ফেটে উলে উঠল কাল্না। 

সকলে অবাক। এক ঘণ্টার বৌশ হয়ে গেল, তবু কান্না থামে না লাটুর। 
“ছেলেটা কি এমনি সারাক্ষণই কাঁদবে না কি?” ব্যস্ত হল রাম দত্ত। 

রামকৃ আবার স্পর্শ করল লাটুকে। কান্না থেমে গেল তৎক্ষণাৎ। 

যে হাতে কাঁদাও সেই হাতেই আবার মুছে দাও কাল্না। খেলার আরম্ভে যেমনি | 
তুম, খেলার ভাঙার বেলায়ও তুমি । 

বাঁড় ফিরে এসে কেমন আনমনা হয়ে রইল লাটু। কাজে-কর্মে উৎসাহ নেই, 
মন যেন দেশান্তরী হয়েছে । দেহযল্ত্রটা ঠিক-ঠিক চলছে বটে, কিন্তু যন্ত্ের মধ্য 
থেকেও যে যন্ত্র নয়, সেই মনাটরই এখন যন্ত্রণা । 

পরের রবিবার দাঁক্ষণেশবরে কিছু ফল-মান্ট পাঠাবার কথা উঠল। কিন্তু কে 
নিয়ে যায় বয়ে। রাম দত্তের কোথায় কি কাজ পড়েছে, সে যেতে পারবে না। 
মনমরা হয়ে বসে ছিল লাটু। ঝটকা মেরে লাঁফয়ে উঠল। জোয়ার-আসা গাঙের 
মত খুশির ঢেউয়ে উলসে উঠল সর্বাঙ্গ। বললে, 'হামি যাবে। হামাকে 'দিন, 
হামি সব উখানকে লিয়ে যাবে । ঠিক পছন লিবে আমাকে । 

তাই গেল লাটু। দীর্ঘ পথ একটা বাঁশর সুরের মত বাজতে লাগল। এত দিন | 
গোচ্ঠে ফিরেছে লাটু, আজ চলল গোকুলে। 

দূর থেকে দেখা যাচ্ছে রামকৃষকে ৷ বাগানে দাঁড়য়ে আছে। বেলা প্রায় এগারোটা। 
দেখেই দৌড় মারল লাট। এক ছুটে হাজির হল পায়ের কাছে। লুটিয়ে পড়ে 
প্রণাম করলে। ণক রে, এসেছিস? আজ এখানে থাক ।' 

'শদুধু আজ নয়, বরাবরই ইখানকে থাকবে। হামি আর নোকার করবে না। আপনার | 
কাজ করবে” : 

রামকৃষ হাসল। বললে, "তুই এখানে থাকবি আর আমার রামের সংসার দেখবে | 
কে? রামের সংসার যে আমারই সংসার ।' 

এই বলে রামকৃষ্ণ তাকে বুঝিয়ে দিল 'কি করে চাকার করতে হয় মানবের বাঁড়তে। 
ক করে কর্ম করতে হয় সংসারে । মনিবের বাঁড়তে থাকবি আর মন পড়ে থাকবে 
দেশের বাঁড়তে। মানবের ছেলেদের “আমার রাম' 'আমার হার বলবি, কিন্তু 
মনে-মনে ঠিক জানাব ওরা তোর কেউ নয়। 

কিন্তু এখন কোন ধরনের প্রসাদ ?নাব তুই ? 

কালীবাঁড়র আমিষ প্রসাদ নিতে কুণ্ঠা ছিল লাটুর। রামকৃষ্ণ তা বুঝতে পেরেছে। 
বললে, ওরে, মা-কালীর আমিষ ভোগ হয় আর বিষণ মন্দিরে হয় নিরামিষ। সব | 
গঙ্গাজলে রান্না। প্রসাদে কোনো দোষ নেই।' 

৬৪ 














আমি অত-শত কি জানি!" লা শুধু জানে কোথায় তার আসল প্রসাদ । 'আপ্নি 
পাবেন হামনে তাই খাওয়া করবে। হামি তো আপনার প্রসাদ পাবে-_বাকি 

আর কুছ পাবে না।' 

রামলালের দিকে তাকিয়ে বললে রামকৃষ্ণ, 'শালা কেমন চালাক দেখোঁছস। আমি 

যা পাব শালা তাতেই ভাগ বসাতে চায়।' 

'বাচ্চা সাচ্চা হ্যায় ।' 

সারা বেলা কাঁটয়ে দিল লাটু। বুবিয়ে-সুঁজয়ে তাকে বাঁড় পাঠিয়ে দিল 

রামকৃষ্ণ । যাবার সময় বলে দিল, 'দেখিস বাপু এখানে আসবার জন্যে ষেন 

মনিবের কাজে ফাঁকি 'দিসান। রাম তোর আশ্রয়দাতা, তার যাঁদ কাজ না করাব 

তা হলে নেমকহারামি হবে। খবরদার, নেমকহারাম হাব না। যখন সময় হবে 

তখন আমিই তোকে এখানে ডেকে নেব।' 





বামকৃফকে এখন একবার দেশে যেতে হয়। এই প্রথম তার হদয়-ছাড়া দেশে 

বাওয়া। 

নাকে বলে হৃদয়কে নিজেই সাঁরয়ে দিয়েছে রামকৃষ্ণ । কায়মনে এত সেবা করে 

মথচ টাকার মায়া কাটাতে পারে না থেকে-থেকে কোথেকে সব বড়লোক এনে 

হাজির করে। বলে, এটা চাও, ওটা নাও, এদিক-ওদিক সুবিধে দেখ+ লছমীনারায়ণ 

াড়োয়ারীকে ওই ধরে এনেছিল না ঠিক কি। যখন বললে, টাকাটা হৃদয়বাবূর 

চাছে রেখে যাই, হৃদয়বাবুর স্ফৃর্ত তখন দেখে কে। 

এক কথায় নিরস্ত করে দিলে রামকৃষ্ণ । টাকা কাছে রাখাই মানে অহঞ্কারকে 

গইয়ে রাখা। 

াড়োয়ারী তখন আরেক কৌশল করলে । বললে, তোমার সমর নামে লিখে দি। 

[ামকৃষ্ণ ভাবল, মন্দ কি, জিগগেস করা যাক সারদাকে। 

নভূতে ডাঁকয়ে আনল। বললে, 'দশ-দশ হাজার টাকা! তোমাকে দিতে চাচ্ছে 

ছমীনারায়ণ। নাও না? নেবে? 

নার কথা বুঝতে পেরেছে সারদা । বললে, 'তা কেমন করে নিই? আমি নিলে 
৮৬ 


যে তোমার নেওয়াই হয়ে গেল। আম আর তুমি কি আলাদা ? তুমি যা নিতে 
পারো না তা আমিও নিতে পারি না। চলে গেল সারদা । 

হৃদয়ের মূখ ম্লান হল বটে কিন্তু হাঁপ ছাড়ল রামকৃফণ। 

টাকার যে এত অহঙ্কার কর, তোমার ক' হাঁড়ি আছে জিগগেস করি? তোমার 
যাঁদ আছে হাড়, ওর আছে জালা । তোমার যাঁদ আছে জালা, ওর আছে মটাঁক। 
আধক্যেরও আতিশয্য আছে। সন্ধের পর যখন জোনাকি ওঠে তখন সে ভাবে 
জগৎকে খুব আলো 'দিচ্ছি। 'কন্তু যেই আকাশে তারা উঠল, তার আঁভমান চলে 
গেল। তারারা ভাবতে লাগল, আমরাই আলো 'দঁচ্ছ জগৎকে । 'িছ পরে যেই 
চাঁদ উঠল, লজ্জায় মলিন হয়ে গেল তারারা। চাঁদ ভাবল জগৎ আমার আলোতেই 
হাসছে । দেখতে-দেখতে অরুণোদয় হল, সূর্য উঠলেন। তখন কোথায় বা চাঁদ, 
কোথায় বা কি। 

গোড়ায়-গোড়ায় রামলালও এক-আধটু হাত বাড়াত। ঠাকুরের অসুখের সময় 
মহেন্দু কবরেজ দেখতে এসেছে সেবার। যাবার সময় পাঁচটি টাকা দিয়ে গেল 
রামলালের হাতে। 

ডান্তার কই ভিজিট নেবে, সেই কিনা উলটে টাকা দেয় রুগীকে। 

1বছানায় ছটফট করছেন ঠাকুর। সারাক্ষণ কত হাওয়া করল লাটু, তবু কমছে 
না যন্ণা। বূকের মধ্যে যেন 'বাল্ল আঁচড়াচ্ছে। শেষে বললেন, 'যা তো, রামনেলোকে 
ডেকে নিয়ে আয় তো, সে শালা নিশ্চয় কিছ করেছে, নইলে চোখ বূজছে না কেন? 
রামলাল কাছে আসতেই ঠাকুর চেশচয়ে উঠলেন : “ঘা শালা যা, এখানকার জন্যে 
যার ঠেঙে টাকা নিয়েছিস তাকে শিগাঁগর ফিরিয়ে দিয়ে আয়।” 

রাত তখন প্রায় দুটো । লাটুকে সঙ্গে নিয়ে রামলাল গেল সেই কবরেজের বাড়। 
কবরেজকে ঘুম থেকে তুলে তার টাকা তাকে ফেরত 'দিলে। 

ঠাকুর ঠান্ডা হয়ে দুচোখ একত্র করলেন। 

“ওরে রামলাল,” ঠাকুর বলেছিলেন এক দিন স্নেহস্বরে : যাঁদ জানতুম জগংটা সাতি, 
তবে তোদের কামারপুকুরটাই সোনা 'দিয়ে মুড়ে ?দয়ে যেতুম। জানি যে, ও স্ব 
কিছ নয়, একমান্র ভগবানই সাত্য। 

ওরে, সে যে আনন্দং নন্দনাতীতং। প্রেয়ঃ পূল্লাৎ প্রেয়ো 'বিভ্তাৎ, প্রেয়োনাস্মাং 
সর্বস্মাং। তার মত ভালোবাসার জিনিস আর কিছু নেই। 

শ্রীমতী বললে, 'সাঁখ, চতুর্দক কৃষময় দেখাঁছ।, 

তা তো দেখবেই। তুমি যে অনুরাগ-অঞ্জন চোখে 'দিয়েছ। 

সখীরা বললে, 'রাধে, এ দেখ কৃফ এসেছে । তোমার সর্বস্ব ধন হ'রে নিতে 
এসেছে-+ 

ওরে, নিক হরণ করে। ওই তো আমার সর্বস্ব। 

কেশব সেন যখন আসে দাঁক্ষণে*বরে, হাতে করে কিছ নিয়ে আসে । হয় ফল নয 
'মাষ্ট। রামকৃষের পায়ের কাছে বসে কথা কয়। একেক 'দিন বা বন্তৃতা দেয়। 


সোঁদন বড় ঘাটে গঞ্গার 'দকে মুখ করে বন্তুতা দিলে কেশব। 
৬৬ 


হৃদয়ের যেমন মুরদাব্বয়ানা করা অভ্যেস, গম্ভীর মুখে বললে, 'আহা, কী বন্তৃতা! 
মুখ 'দিয়ে যেন মল্লিকে ফুল বেরুচ্ছে!" 

কন্তু বন্তৃতার মধ্যেই উঠে গেল রামকৃষণ। যারা জমায়েত হয়েছিল বলাবাঁল করতে 
লাগল, লোকটা মুখখ7 কিনা, মাথায় কিছু ঢোকে না, তাই কেটে পড়ল। 

কিন্তু কেশবের মনে ডাক 'দিল, কোনো ত্রুটি হয়েছে নিশ্চয়ই। তাড়াতাঁড় কাছে 
এসে জিগগেস করলে রামকৃষকে, ণকছন কি অন্যায় করে ফেলোছ ?, 

শনশ্চয়ই। তুমি বললে, ভগবান, তুমি আকাশ দিয়েছ বাতাস 'দিয়েছ-_কত-ি 
'দয়েছ। তাঁর জন্যে যেন তোমার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। ও সব তো ভগবানের 
'বভাতি। বিভূতি নিয়ে কথা কইবার দরকার কি? এ কি তুমি বলে শেষ করতে 
পারবে? তা ছাড়া, এ সব বিভীতি যাঁদ 'তান নাই দিতেন, তা হলেও কি তানি 
ভগবান হতেন না? একটু থামল রামকৃষ্ণ । বললে, 'বড়লোক হলেই কি তাঁকে 
বাপ বলবে? যাঁদ তিনি গাঁরব হতেন, নিঃস্ব ও নির্ধন হতেন, তা হলে দি তাঁকে 
বাপ বলবে নাঃ 

কেশব চুপ করে রইল । 

হৃদয়কে জিগগেস কার, এখন এ কোন ফুল বেরুচ্ছে মুখ 'দয়ে ? 

নকলে বলাবাল করতে লাগল, “সাঁত্য বড়লোক হলেই ক বাপ হবে? গাঁরব হলে 
সে আর বাপ নয় 


এরই নাম ভালোবাসা । ভগবান আমাকে কিছ দিন বা না-দিন, আমার দিকে 
তাকান বা না-তাকান, তবু আমি তাঁকে ভালোবাসি। আম ভাকিয়ে আছি তাঁর 
দকে। 


শাক্ষণেশ্বরের পাগলা বামূন কেশব সেনের মাথা ভেঙে দিয়েছে । এই নিয়ে শুরু 

হল হৈ-চৈ। বলে কিনা, বড়লোক না হলে বাপ কি আর বাপ হবে না? সন্ত 

কি গাঁরব বাপকে ডাকবে না বাবা বলে ১ 

তার পরে যখনই কেশবকে বন্তৃতা দেবার জন্যে অনুরোধ করেছে রামকৃষ্ণ, কেশব 

সলজ্জ হাস্যে বলেছে, 'কামারের দোকানে আমি আর ছঃচ বেচতে আসব না। 

আপাঁনই বলুন, আমরা শুনি ।' 

হৃদয়ের মাতব্বরী করার দিন ফ্রিয়ে গেল। দক্ষিণেশ্বর ছেড়ে চলে যাবার সময়ও 

নরম হল না। বললে, 'মামা, তৃমি এদের ছাড়ো । দু-চারটে বড়মানুষ ধরো, দেখবে 

কত বাগানবাঁড় তোমার হবে।' 

প্রেলোক্য তাড়া দিচ্ছে বোরয়ে যাবার জন্যে। 

তুমিও আমার সঙ্গে চলো, মামা।' হৃদয় এক মৃহূর্ত তাকাল পিছন 'ফিরে। 

বললে, “তোমায় যাঁদ পেতুম, দেখতে কত বড় কালাবাড় জাঁঁকিয়ে তুলতুম! ইট 

চুন সৃরকির মন্দির নয়, একেবারে সোনার মা্দর।, 

চলে গেল হৃদয় । রামকৃষ্ণ নিঃসগ্গ। একা-একা গেল কামারপুকুর। 

বালক লাটু একা-একা চলে এসেছে দক্ষিণেশ্বরে। কিল্তু এসে দেখছে, সমস্ত 

ফাঁকা, রামকুষ্ণ নেই, তার ঘর বন্ধ। তখন কি করে লাটু, গঞ্গার ঘাটে বসে 
৮৭ 


অঝোরে কাঁদতে বসল। ডাকতে লাগল আকুল হয়ে, তুমি কোথায় ? একবার দাঁড়াও 
আমার চোখের সামনে । 

আর কত কাঁদবি? এবার বাড়ি যা। আজই তাঁর ফেরবার দিন নয়। 

ফেরবার দিন নয় মানে? তিনি কি কুথা গেছেন নাক? তিনি ইখানকেই 
আছেন। 

এখানেই আছেন 'কি রে? তিনি দেশে গেছেন। 

আপুনি জানেন না। ইখানকেই আছেন। হাম তার সাথে দেখা না কোরে যাবে 
না। 

তবে থাক বসে। কতক্ষণে দেখা পাস দ্যাখ । 

মন্দিরে সন্ধ্যারীত হচ্ছে। ও'দকে লক্ষ্য নেই লাটুর। গঙ্গার পরপারে তাকিয়ে 
আছে একদু্স্টে। 

কে একজন বুঝি তাকে প্রসাদ দিতে এল। এসে দেখল লাটু যেন প্রাণ ঢেলে 
কাকে প্রণাম করছে। সামনে লোকজন কেউ নেই, তব প্রাণ-ঢালা প্রণাম। 
অনেকক্ষণ পর মাথা তুলল লাটু। অপাঁরচিত লোক সামনে দেখে থ হয়ে গেল। 
বললে, 'সে কি! পরমহংসমশায় কুথায় গেলেন! এই যে ছিলেন এতক্ষণ 
ইখানকে।' 

রাম দত্তকে জিগগেস করলে রামকৃষ্ণ : ক মধ পেয়ে ছোঁড়াটা এখানে পড়ে থাকতে 
চায় বলো তো! আমি তো কিছু বাঁঝ না।' 

রাম দর্তও বোঝে না। তার স্ত্রীও বোঝে না। 

রাম দত্তের স্ত্রী বলে, 'ওখানে তোকে খাওয়াবে কে? কাপড়চোপড় দেবে কে?" 
শক রকম অবুঝের মতন তাকায় লাটু। খাওয়া? কাপড়চোপড় ? দাক্ষিণে*বরের 
সংসারে এও আবার একটা জিজ্ঞাস্য নাক ঃ জোটে জুটবে না জোটে না জুটবে। 
সে যে দক্ষিণ-ঈশবর। 

তবু বিনা মাইনেয় নোকরি করতে হবে কম্ট সয়ে! এরই বা অর্থ ক 2 
কালবোশেখীর দুর্যোগ, তবু নরেন চলেছে দক্ষণে*বর। বাবা বললেন, যাঁদ 
একান্তই যাব, ঘোড়ার গাঁড়তে যা। কেন 'মাছিমিছি পয়সা নম্ট! শেয়ারের 
নৌকোতেই চলে যাবে দাক্ষণেশ্বর। নৌকো যাঁদ ডোবে তো ডুববে! 

একেই বলে ডানাঁপিটের মরণ গাছের আগায়। কোনো সুবৃদ্ধির সে ধার ধারে না। 
'এসোছিস ?' ডাক 'দিয়ে উঠল রামকুফণ। 

পর মুহূর্তেই গম্ভীর হবার ভান করে বললে, 'কেন আঁসস বল তো? আমার 
কথা যখন শৃনিস না তখন আসিস ক করতে 2 

তুমি আবার শোনাবে 'কি! তুমি কি কিছু জানো? নিজে কি কিছ পেয়েছ ষে 
তাই পরকে দেবে ?' নরেনের কণ্ঠে স্পস্ট অস্বীকার । রে প্রত্যাখ্যান । 

“বেশ তো, জানি না কিছু পাইনি কানাকড়ি।' রামকৃষ্ণ স্নেহকরুণ চোখে তাকাল 
নরেনের দিকে : 'তবু যার থেকে কিছুই শেখবার নেই, যাকে তুই 'নিস না, মানিস 
না, তার কাছে এই ঝড়দাপটে তুই আসিস কেন 2" 


৮৮ 


আসি কেন?' হাসল নরেন : “তোমাকে ভালোবাসি বলে দেখতে আসি ।' 
রামকৃষ্ণ জড়িয়ে ধরল নরেনকে। বললে, 'সকলেই স্বার্থের জন্যে আসে । নরেন 
আসে আমাকে শুধু ভালোবাসে বলে।, 

একেই বলে ভালোবাসা! 





দ্বরবর্ণ হয়ে গিয়েছে । এখন লাটুকে ব্যঞ্জনবর্ণ শেখাচ্ছে রামকুষ্ণ। 

সামনেই বর্ণপাঁরচয় খোলা। 

রামকৃফ বললে, 'বল্‌, “ক” 

লাট; উচ্চারণ করলে, “কা”_ 

'ওরে “কা” নয়, “ক” | বল্‌, “কিল 

আবার লাটদ বললে, “কা” 

কিছুতেই পশ্চিমী জিভ সজুত করতে পারছে না। রামকৃষ্ণ যত বলছে “ক”, 
লা তত বলছে “কা”। 

ঝলসে উঠল রামকৃষ্ণ : "শালা, “ক”কেই যাঁদ “কা” বলাবি তবে “ক”*-এ আকারকে 
কি বলবি? যা শালা, তোর আর পড়ে কাজ নেই ।' 

ছাট মিলে গেল লাটুর। তাকে আর পাশের পড়া পড়তে হল না। 

ঠাকুর বলেন, "পাশ করা, না, পাশ পরা! 

লেখা-পড়া না শাঁখস, নেশা-করাটা শিখে নে। 

কিসের নেশা? 

মদ-ভাঙের নেশা নয়। এ একেবারে রাজা নেশা । ব্রহন্ন-নেশা। 

বহ পড়ে কি জানাব? যতক্ষণ না হাটে পেশছুনো যায়, দূর হতে শুধু হো-হো 
শব্দ। হাটে পেশছুলে আরেক রকম। তখন দেখতে পাব, শুনতে পাবি স্পন্ট। 
দেখতে পাবি দোকানিকে । শুনতে পাব, আলু নাও, পয়সা দাও! 

বড়বাবুর সঙ্গেই আলাপের দরকার। তাঁর কখানা বাঁড়, কটা বাগান, কত 
কোম্পানির কাগজ, এ আগে থেকে জানতে এত বাস্ত কেন? কেন এ-দোর ও-দোর 
ঘোরাঘঁর করা? চাকরদের কাছে গেলে দাঁড়াতেই দেয় না, তারা বলবে কোম্পাঁনর 


কাগজের খবর! কিন্তু যো-সো করে বড়বাবুর স্চগে একবার আলাপ কর্‌, তা 
৮৯ 


ধাক্কা খেয়েই হোক বা বেড়া ডিঙিয়েই হোক- তখন একে-একে সব জানতে পাঁব। 
কত বাঁড় কত বাগান কত কোম্পানির কাগজ তিনিই সব বলে দেবেন। বাব্‌র 
সঙ্গে আলাপ হলে চাকর-দারোয়ানরা সব সেলাম করবে। 

'এখন বড়বাবুর সঙ্গে আলাপ হয় কিসে? একজন কে জগগেস করলে। 

'তাই তো বালি, কর্ম চাই।” বললে রামকৃষ্ণ : ঈশ্বর আছেন বলে বসে থাকলে 
চলবে £ যো-সো করে তাঁর কাছে গিয়ে পেশছুতে হবে 

ক করে পেশছুই ?, 

“শনজনে তাঁকে ডাকো, প্রার্থনা করো। দেখা দাও বলে কাঁদো ব্যাকুল হরে, 
কামিনীকাণ্চনের জন্যে তো পাগল হয়ে বেড়াতে পারো, একবার তাঁর জন্যে একট, 
পাগল হও দেখি । লোকে বলুক, অমুকে ঈশবরের জন্যে পাগল হয়েছে । 
একটু নিজজনে যা। নির্জন না হলে মন স্থির হবে না। নিজনে বসে একট; ধান 
কর। বাঁড়র থেকে আধ পো অন্তরে ধ্যানের জায়গা কর। নিজনে গোপনে তীর 
নাম করতে-করতে তাঁর কৃপা হয়। তার পরেই দর্শন। 

দর্শন 2 চমকে উঠল কেউ-কেউ। 

হ্যাঁ, দর্শন। যেমন ধরো, জলের ভিতর ডোবানো বাহাদুরী কাঠ আছে_তীরে 
শকল 'দয়ে বাঁধা । সেই শিকলের এক-এক পাপ ধরে-ধরে গেলে, শেষে বাহাদুর: 
কাঠকে স্পর্শ করা যায়, 

কেন সংসার কি দোষ করল? আমরা জনক রাজার মত 'নার্লপ্ত ভাবে সংপব 
করব। 

'মুখে বললেই জনক রাজা হওয়া যায় না। জনক রাজা হেণ্টমুণ্ড হয়ে উধর্বপ 
করে কত তপস্যা করোছলেন। তোমাদের হেস্টমুণ্ড বা উধর্বপদ হতে হবে না 
িন্তু সাধন চাই। নিজ্নে বাস চাই। দই 'নিজনে পাততে হয়। ঠেলাঠোঁঃ 
নাড়ানাঁড় করলে দই বসে না।' 

সবাইর মুখভাব একটু কঠিন হয়ে উঠল। কোমলকে পাবার জন্যে সাধনা চাঃ 
কাঠন। বন্ধুর পথাঁট বন্ধুর হয়ে রয়েছে! 

'এ তো ভালো বালাই হল! রামকৃষ্ণ কথায় একটু 'বদ্রুপের টান দিল : 'ঈশ্বরবে 
তুমি দোঁখয়ে দাও আর উনন চুপ করে বসে থাকবেন। দুধকে দই পেতে মল্থ 
করলে তো মাখন হবে! তুমি মাখন তোর করে গুর মুখের কাছে তুলে ধরো 
ভালো বালাই-_তুঁমই মাছ ধরে হাতে দাও? 

ওরে, রাজাকে দেখতে চাস? রাজা আছেন সাত দেউঁড়র পারে। প্রথম দেউী 
পার না হতে-হতেই বলে, রাজা কই? যেমন আছে, এক-একটা দেভীড় তো পা; 
হতে হবে। যেতে হবে তো এগিয়ে । 

রাম দত্তকে বলে লাটুকে রেখে দিয়েছে রামকৃষ্ণ। এমন শহদ্ধসত্ত ছেলে আর দ্যা 
হতে নেই। 

গাড় ছ'তে পারে না রামকুফ। শৌচে যখন যায় গাড়; নিয়ে দাঁড়য়ে থাকে লাটু 
জপে বসেছে লাটু হঠাৎ জপ ছুটে গেল। কে যেন ছুটিয়ে 'দিলে। 


৭১০ 


ওরে, তুই যার ধ্যান করছিস, সে এক গাড়? জলও পায় না।' সামনে দাঁঁড়য়ে 
রামকৃষ্ণ । বলছে, “এ রকম ধ্যানে কী ফল হবে রে? 

গাড় হাতে সঙ্গে-সঙ্গে চলল লাটু। 

'যার সেবা করবি তার কখন কি দরকার হঃশ রাখাঁব। তবে তো সেবার ফল পাবি।' 
শোন, কাজের মাঝেই তাকে ধরাব। কিন্তু সব সময়ে জানাব তুই যন্ল 'তাঁন যল্নশ। 
তুই চক্র, তিনি চক্রী । তুই গাঁড় তিনি হীঞ্জীনয়র। 

পাতাটি নড়ছে সেও জানবি ঈশ্বরের ইচ্ছে। সেই তাঁত কি বলোছল জানিস না? 
ভাঁতি বললে, রামের ইচ্ছেতেই কাপড়ের দাম এক টাকা ছ আনা, রামের ইচ্ছেতেই 
ডাকাতি। রামের ইচ্ছেতেই ধরা পড়ল ডাকাত, রামের ইচ্ছেতেই আমাকে ধরে নিয়ে 
গেল, আবার রামের ইচ্ছেতেই ছেড়ে দিলে । 

ওরে ঘোলেরই মাখন, মাখনেরই ঘোল। খোলেরই মাঝ, মাঝেরই খোল। 

এক দিন লাটুকে জিগগেস করলে রামকৃষ্ণ : “ওরে লেটো, বলতে পারিস ভগবান 
ঘুমোয় কি না? প্রশ্ন শুনে লাটুর তো চক্ষুস্থির! বললে, 'হামনে জানে না।' 
'ওরে, জীবজগতে সকলেই ঘুমের অধান, কিন্তু ভগবানের ঘৃমোবার যো নেই। 
তিনি ঘুমূলে সব অন্ধকার! সারা রাত সারা দিন জেগে তান জীব-জন্তুর সেবা 
করছেন। তিনি জেগে আছেন বলেই জীবজন্তু নিভয়ে ঘুমুতে পারছে ।' 

শুধু কি তাই 2 ঘুমে বা জাগরণে কে কখন কেদে ওঠে, তান না জেগে থাকলে 
বসে থাকেন শিয়রে। 

অধর সেন দাক্ষণেশ্বরে এসে প্রায়ই ঘুমিয়ে পড়ে। 

এক 'দিন ঠাকুরকে এসে শুধোলেন, 'তোমার কি-কি 'সম্ধাই হয়েছে বলো তো? 
'মায়ের ইচ্ছেয় সে সব ভিপাঁটকে ঘুম পাঁড়য়ে রাখি ।' 

তারই জন্যে ক অধর দাঁক্ষিণে*্বরে এসে ঘুমোয় ? 

এ কেমন হানব্দ্ধি! ভাগ্যবলে দক্ষিণেশ্বরে এসেছিস, শবলনডং' না দেখে বরং 
গঙ্গা দ্যাখ, মাকে দ্যাখ, ঠাকুরকে দ্যাখ_তা নয়, গা ঢেলে লম্বা ঘুম! সবাই 
নিন্দে করতে লাগল অধরের। নিতান্তই পাশবদ্ধ জীব, ব্রিনাথের এলাকায় এসেও 
বাণ নেই। 

কিন্তু ক্লান্তিহরণের কণ্ঠে অপূর্ব করুণা । স্নেহশাল্ত স্বরে বললেন ঠাকুর, 'তোরা 
কি বুঝার রে? এ মায়ের ক্ষেত্র, শান্তি-ক্ষেত্র। ওরা এখানে এসে বিষয়-কথা না 
বলে ঘুমুচ্ছে, সে অনেক ভালো । তব্‌ একট? শান্তি পাচ্ছে! 

কৃষধন নামে এক রাঁসক ব্রাহন্ণ আসে দক্ষিণে*্বরে। সারাক্ষণ কেবল ফম্টি-নছ্টি' 
করে। 

“ক সামান্য এীহক বিষয় নিয়ে তৃমি রাত-দিন ফচ্টি-নন্টি করে সময় কাটাচ্ছ ? 
এঁটি ঈশ্বরের দিকে মোড় ফিরিয়ে দাও । শোনো, যে নূনের হিসেব করতে পারে, 
সে মিছরিরও হিসেব করতে পারে । 


৯৯, 


কুষফখন সহাস্য বললে, আপনি টেনে লিন ।' 

'আমি কি করব! তোমার চেম্টার উপর সব শির করছে । এ মন্ম নয়, এ মন তোর! 
ণকি করতে হবে বলদন-- 

“সামান্য রসিকতা ছেড়ে ঈশ্বরের পথে এগিয়ে পড়ো। ঈশ্বরই সব চেয়ে বড় রাঁসক, 
তাঁর তর্তটিই হচ্ছে সব চেয়ে বড় রাঁসকতা । সেই রাঁসকতার সন্ধান করো। শুধ্‌ 
এগিয়ে পড়ো-_ 

“এ পথের আর শেষ নেই-_- 

শকন্তু চলতে-চলতে যেখানেই শান্তি, সেখানে “তিষ্ঠ”। সেখানেই বিশ্রাম করে 
নাও।' 

আহা, অধর সেন এখানে এসে শান্তিতে একট. "বিশ্রাম করছে! ওকে জাগাস নে। 
ওকে ঘুমুতে দে একট; ঠাণ্ডা হয়ে! 

কিন্তু যে সেবা করতে এসেছে তারই সেবায় লাগল নাঁক রামকৃষ্ণ ? 

লাটুকে শিবমান্দরে ধ্যান করতে পাঠিয়েছে রামকৃফণ। ঢুকেছে সেই দুপুর বেলা, 
বিকেল হয়ে এল, লাটুর এখনো বেরুবার নাম নেই । কি করছে দেখে আয় তো রে। 
রামলালকে খোঁজ নিতে পাঠাল। রামলাল এসে বললে, এক গা ঘেমে আছে। 
নিথর পাথর! একখানা পাখা নিয়ে আয়। পাখা নিয়ে চলল রামকৃষ্ণ । আর, 
শোন্‌, এক গ্লাশ জল চাই ঠাণ্ডা। জল নিয়ে গিয়ে রামলাল দেখে, রামকৃ্ণ 
লাটুকে হাওয়া করছে। আর পাখার হাওয়ায় লাটর শরীর কাঁপছে, তুলো যেমন 
কাঁপে তেমান। 

“ওরে বেলা যে আর নেই। সন্ধে-টন্ধে কখন সাজাঁব ?' রামকৃষের আওয়াজে লাটুর 
ধ্যান ভাঙল । চোখ চেয়ে দেখল যাকে ধরবার জন্যে মহাশন্যে পাখা মেলোছিল 'তানিই 
পাখা হাতে করে পাশাঁটতে বসে আছেন। সম্নেহে বাতাস করছেন মা'র মত। 
বাস্ত হয়ে উঠতে চাইল আসন ছেড়ে। রামকৃষ্ণ বললে, 'আগে একটু সুস্থ হ, 
তার পরে উাঠস। দেখাঁছস না, গরমে কেমন ঘেমে গোঁছস।' 

“আপন এ কী করছেন! এতে হামার অকল্যাণ হবে।' 

হাসল রামকুষ্ণ। বললে, “তোর কে সেবা করছে? তোর মধ্যে যে শিব এসোছিলেন 
তাঁর সেবা করাছলম। গরমে যে তাঁর কম্ট হচ্ছিল। নে, এখন এই এক গেলাশ 
জল খা 'দাঁকাঁন-_ 

জড়ভরত রাজার পালকি বইছে । রাজা পালাক হতে নেমে এসে বললে, “তুমি কে 
গোঠ 

জড়ভরত বললে, 'আমি নৌতি।' 

'সৈ আবার কিঃ, 

'আমি শুদ্ধ আত্মা।” 

যেমন বাতাস। ভালো-মন্দ সব গন্ধই বাতাস 'িয়ে আসে কিন্তু বাতাস 'না্লস্তি। 
যেমন প্রদীপ । প্রদীপের সামনে বসে কেউ ভাগ্রবত পড়ে, কেউ বা দলিল জাল 
করে। প্রদীপ 'নাললস্ত। যেমন সূর্য । শিন্টকেও আলো 'দচ্ছে দুষ্টকেও আলো 


৯১৭২ 


1 

দচ্ছে। ধোঁয়া যতই কালো হোক দেয়ালকে ময়লা করতে পারে, আকাশকে নয়। 
চামড়া-ঢাকা অখণ্ড খোলের মধ্যে খোঁজো সেই প্রাণস্বরূপে। হাড়মাসের খাঁচার 
মধ্যে ধরো সেই পলাতক পাখি! 





রাম দত্তের বাঁড়, মধু রায়ের গাঁলতে, রামকৃষ্ণ এসেছে। 

কলকাতাকে বড় ভয়, বড় সম্ভ্রম রামকৃষের। সব জ্ঞানী-গুণীর বাসা এখানে । 
রাজা-রাজড়া সুখী-ভোগশীদের আস্তানা । পাড়াগাঁয়ের আলাভোলা ছেলে আম, 
এখানে কি কলকে পাব £ আমাকে কি কেউ খাঁতির-যত্র করবে ? 

ঠাকুরের তখন হাত ভেঙেছে, দেবেন্দ্র মজুমদার দেখতে এসেছে দাক্ষিণেশ্বরে। 
পরনে লাল-পাড় কাপড়, ব্যাশ্ডেজ-বাঁধা হাত গলার সঙ্গে ঝোলানো, ঠাকুর বসে 
আছেন তন্তপোশে ৷ দেবেন্দ্রকে জিগগ্েস করলেন, 'কোব্খেকে আসা হচ্ছে ? 
'কলকাতা থেকে । 

কলকাতার নাম শুনে যেন শিউরে উঠলেন ঠাকুর। নিশ্চয়ই তবে একজন গান্যমান্য 
লোক। 

'কী দেখতে এসেছ? এমনি ?' বলে ঠাকুর হাতের পর হাত রেখে ব্রিভঙ্গবাঁঞ্কম 
কের ভাঁঙ্গ করলেন। 

'না, শুধু আপনাকে দেখতে এসেছি।' কণ্ঠস্বরে যেন ভান্তর সুরটি পাওয়া গেল। 
ঠাকুরের গলায় কাল্লা ফুটে উঠল : 'আর আমায় কী দেখবে বলো! পড়ে গিয়ে আমার 
হাত ভেঙে গিয়েছে! দেখ দেখ সাঁত্য ভেঙেছে কিনা! বড় যল্রণা। ক কার 2, 
হাতখানি বাড়িয়ে দেবার ইঙ্গিত করলেন । দেবেন্দ্র স্পর্শ করল সেই হাত। একট; 
বা টিপে-টপে দেখল । জিগগেস করল, “ক করে ভাঙল ? 

কাঁদ-কাঁদ মুখে ঠাকুর বললেন, ণক একটা অবস্থা হয়, তাইতে পড়ে গিয়ে ভেঙে 
গিয়েছে। ওষুধ দিলে আবার বাড়ে। অধর সেন ওষুধ দিয়েছিল, বেশি করে 
ফুলে উঠল। তাই আর কিছু দিইনি । হাঁ গা, সারবে তো, 

যিনি সকলের ব্যথা সারান তাঁরই কণ্ঠে ব্যথার জিজ্ঞাসা । 

'আজ্ঞে সেরে যাবে বৈ কি। নিশ্চয় সারবে । দেবেন্দ্র জোরের সঙ্গে বললে। 


আহনাদে শিশুর মতন হয়ে গেলেন ঠাকুর। আর সকলকে উদ্দেশ করে বলতে 
৯১৩ 


লাগলেন : “ওগো, ইনি বলছেন আমার হাত সেরে যাবে। আর ভয় নেই। ইনি 
যেমন-তেমন লোক নন। ইনি কলকাতা থেকে এসেছেন! 

কলকাতা সম্বন্ধে এত তাঁর ভয়-ভান্ত। সেই কলকাতায় তান এসেছেন 'বদ্বং 
সমাজে! বসেছেন তাদের বৈঠকখানায়। শেষে চাতরে না হাঁড় ভাঙে! 

মা গো, পাশে এসে বোস্‌। রাশ ঠেলে দে। 

রামকৃষ্ধের চোখের দিকে চেয়ে মা হাসেন মিটি-মিটি। 

রাম দত্তের হাঁপানি, তাই 'নয়ে সে ছুটোছনটি করছে। এসেছে সুরেশ মার, 
ভাবে বিভোর হয়ে টলছে মাতালের মত। গায়ে জামা নেই গলায় পৈতে, এক 
পাশে এসে বসেছে দেবেন মজুমদার । গ্যাস জব্লছে ঘরে । তাতে আর কতটুকু 
আলো হবে! রামকৃষ্ণের গায়ের আলোয় মধুরায়ের গাল ভেসে যাচ্ছে। আকাশের 
সুধাকর এসেছেন নগরের ধূলর নিকেতনে। 

ওরে, রাম দত্তের বাড়তে দাক্ষণে*্বরের সেই সাধদ এসেছে। চল দেখাব চল। 
রাস্তায় কর্পোরেশনের বাতি নেই, সাধূুই নাক সব অি-গাল আলো করে 
বসেছে! একি সহজস_ন্দর মানুষ৷ ঘরছাড়া হয়েও যেন ঘরের লোক । গালে একট;- 
একট কপচানো দাঁড়, চোখের পাতা অনবরত 'মিটমিট করছে-_ 

ওরে, ভালো করে চেয়ে দ্যাখ, কমলাঁবশদনেন্র র্লেশনাশন কেশব বসে আছেন। 
সর্ববান্ধবস্বরূপ দীনবন্ধু। 

কলকাতায় এসেছে, তাই গায়ে জামা পরে এসেছে । জামার আঁস্তন কনুই আর 
কাঁক্জর মাঝখানে । রাঁঙউন একাঁট বট_য়া সামনে । তারই থেকে একটু মশলা 'নয়ে 
মুখে দিচ্ছে মাঝে-মাঝে। কতক্ষণ আর থাকা যায় কঠোর ভদ্রলোক সেজে? গায়ের 
জামা খুলে ফেলল রামকৃষ্ণ । এমান যে আভা ছিল তার শতগুণ 'িভা বেরুচ্ছে 
গা থেকে। সুধাকরের বদলে নেমে এসেছে প্রভাতের 'দবাকর। নখজ্যোতিতেই 
যেন শরাঁদন্দুর দীপ্তি গায়ের আলো বহু দূর ছাঁড়য়ে পড়েছে । একাঁট 'স্থরস্ফুট 
বদ্যুং যেন চিরজীবী হয়ে আছে আকাশে । 

বহু? লোক এসে জমায়েং হয়েছে। ঘর ছাপিয়ে ভিড় করেছে রোয়াকে, রোয়াক ছেড়ে 
রাস্তায়। অথচ সবাই স্তব্ধ, অভিভূুত। বিস্ময়বিভোর। 

এ কে বল দেখঃ দরিদ্রের মধ্যে রাজরাজেশ্বর! মর্তধামে ন্রিলোকপালক! 'িনি 
শমশানে ভূতনাথ 'তানই আবার গৃহে জগদগুুরু। 

কথা ক' না! প্রশন কর্‌ । যার যা জিগগেস করবার আছে জেনে নে। 

কেউই প্রশ্ন করে না। প্রশ্ন করবার কথা মনেও হয় না কারুর । শুধু এই মনে 
হয়, অশেষ প্রশ্নের শেষ উত্তরাঁট যেন জীবন্ত হয়ে জলন্ত হয়ে বসে আছে । গভাঁর 
উপলব্ধির সহজ একটি উচ্চারণ। বসে আছে বাকপাতি, বিবুধেম্বর। বাক্য 'দিয়ে 
শুধু হারনামের মালা গাঁথা। তাই যা বাক্য তাই কাব্য। 

নজের মনেই বলে যাচ্ছে রামকৃফ। বলছে ঈশ্বরপ্রসঙ্গ। সতৃষকর্ণে তাই শুনছে 
সকলে । কোনো তর্ক-বিচার করছে না। যা বলছে তাই যেন চরাচরের চরম 


কথা। এর পরে আর বিষয় নেই, বর্ণনা নেই। পারাপার নেই। যা শুনছে 
৯৪ 


তাই নিঃসন্দেহে মানছে সকলে । ক যে শুনছে মনে ধরে রাখতে পারছে না, তবু 
নন বলছে এ অত্যন্ত খাঁটি কথা, এ কথার আর ওর নেই। 

কথা বলতে-বলতে মাঝে-মাঝে থামছে রামকৃষ্ণ। তখনই সবাই শ্রবণতৃষ্ণায় আস্থর 
হয়ে উঠছে। রামকৃষের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকছে নিষ্প্রাণের মত। কথা 
কও, তুমি সর্বমন্তরপ্রণেতা, তোমার কথায় নিশ্চল 'নিস্তব্ধতায় প্রাণসণ্টার করো। 
অথচ কী সরল কথা! পণ্ডিতাঁগাঁর ফলানো নেই এতটুকৃ। এতটুকু বন্তৃতা 
মরা নেই। লঘুতা-প্রগলভতা নেই। সহজের সংবাদাট সহজ করে পাঁরবেশন 
করছেন। 

'আগে শাদাঁসদে জবর হত, সামান্য পাচনেই সেরে ষেত। এখন যেমন ম্যালোরয়া 
জ্বর, তেমনি ওষুধও ডি-গুপ্ত! আগে লোকে যোগ-যাগ তপস্যা করত, এখন 
কাঁলর জীব, দন্র্বল, অন্নগত প্রাণ_এক হাঁরনামই তার সম্বল। হাঁরনামেই সে 
পোরিয়ে যাবে ভবনদী। নামও করো, সঙ্গে-সঙ্গে প্রার্থনাও করো, দুদিনের 
1জাঁনসের উপর থেকে ভালোবাসা যেন কমে যায়। দুদনের জিনিস মানে টাকা, 
মান, যশ, দেহসুখ। টাকার জন্যে যেমন ঘাম বার করো, হারনাম করে নেচে গেয়ে 
ঘাম বার করতে পারো তো বুঝ ।' 

এর পর গান ধরে রামকুক। 


'নামেরই ভরসা কেবল শ্যামা গো তোমার। 

কাজ কি আমার কোশাকুশি দে*তোর হাঁসি লোকাচার! 
নামেতে কালপাশ কাটে, জটে তা দিয়েছে রটে; 
আমি তো সেই জটের মুটে, হয়েছি আর হব কার ॥' 


এ তো গান নয়, শিবের জটা ছেড়ে গঙ্গার মর্তাবতরণ। 

'জানতে, অজানতে বা ভ্রান্তে যে কোনো ভাবেই হোক না কেন, তাঁর নাম করলেই 
ফল হবে।' আবার কথা শুরু করলে রামকৃষ্ণ : 'কেউ তেল মেখে নাইতে যায়, 
তারও যেমন স্নান হয়, যাঁদ কাউকে জলে ঠেলে ফেলে দেওয়া হয় তারও তেমনি 
স্নান হয়। আর কেউ ঘরে শুয়ে আছে, তার গায়ে জল ঢেলে দিলে তারও স্নানের 
কাজ হয়ে যায়। নিতাই তাই কোনো রকমে হরিনাম করিয়ে নিতেন। চৈতন্যদেব 
বলেছিলেন, ঈশ্বরের নামের ভার মাহাত্ম্য । তক্ষুনি-তক্ষুনি ফল না পেলেও এক 
সময়ে না এক সময়ে পাবেই। বাড়ির কার্নশে যাঁদ বীজ পড়ে, অনেক 'দিন পরে 
বাঁড় পড়ে গেলেও সেই বীজ মাঁটতে পড়ে গাছ হয়ে তার ফল হবে।' 

রাত হয়ে গেল কিন্তু বাঁড় ফেরবার কারু নাম নেই। খিদে পেয়েছে তেম্টা পেয়েছে 
এ অত্যন্ত তুচ্ছ চন্তা। এখন শুধ্‌ নয়নের তৃষ্কা। জীবনের রাত অনেক হয়ে 
গেল বটে কিন্তু গৃহ বলতে এরই পদাশ্রয়। রামকৃষকে ছেড়ে কোথায় আবার 
আমাদের ঘর-বাড়ি ? 

হঠাৎ রামকৃষের সমাধি উপস্থিত হল। 


৯৫ 


পাড়া-বেপাড়ার ভিড় করা শহুরে লোকেরা দেখুক তা চর্মচক্ষে। 

রামকুষ্ণের ডান হাতের মাঝের তিনটি আঙুল বে'কে গেল, শন্ত ও সিধে হয়ে 
গেল হাত দুখানি। মোটেই দেহবিকারের লক্ষণ নয়, বিদেহবিহারের লক্ষণ। 
রামকৃষ এখন দিব্য ভাবের দীপ্র মূর্তি। তার সঙ্গে ভাবনবনীর আময় লাবণা 
এ কি কর্পূরকুন্দেন্দুধবল শিব না রাজীবলোচন দনর্বাদলশ্যাম রাম! 

দেবেন্দ্র মজুমদারের মনের মধ্যে গুরুস্তোন্রের শ্লোক গুঞ্জন করে ফিরতে লাগল . | 





'মন-বারণ-শাসন-অঙ্কুশ হে, 
নরন্লাণ তরে হার চাক্ষুষ হে। 
গুণগানপরায়ণ দেবগণে, 
গুরুদেব দয়া করো দীন জনে॥' 


রামকৃষণের ভাবের হাওয়া লেগে সবাইর মন মাটি ছেড়ে উড়তে লাগল আকাশে । 
ঘোর-ঘোর নেশা আর কাটতে চায় না। মন যেন আর থা পায় না মাটিতে। 
সেই চিরকালের অধরাকে। 

দেবেন্দ্র তখন পেশছে গেছে শেষ শ্লোকে : 


'জয় সদগুরু ঈশ্বরপ্রাপক হে, 
ভবরোগ্াবকারবিনাশক হে। 

মন যেন রহে তব শ্রীচরণে, 
গুরুদেব দয়া করো দীন জনে॥ 





দাক্ষণেবরে যিনি আছেন তাঁর আরেক নাম দাঁক্ষণ-ঈশবর । 

রুদ্র, যত্তে দাক্ষণমুখং তেন মাং পাহ নিত্যম। 

উত্তরে-দাক্ষণে পৃবে-পশ্চিমে ডাক পাঠাচ্ছে রামকৃফ। কখনো নহবংখানা থেকে, 
কখনো বা কুঠির ছাদের উপর উঠে। আরাতির সময় ঘাঁড়-ঘন্টা বাজছে আর ডাকছে 
৯১৬ 


রামকৃষ্ণ : ওরে তোরা কে কোথা আছস চলে আয়। তোদের ছাড়া দিন আর 
কাটে না রে 
প্রথমে এল লাটু। দ্বিতীয় এল রাখাল। 
রামকৃ্ দেখল গোপাল এসেছে। পায়ে নূপুর বাজছে ঝুম-ঝৃূম। 'আয়, আয়-_' 
হাত বাঁড়য়ে দিল রামকৃষ্ণ । আর রাখাল দেখল স্নেহ-শান্তির সুধাসন্ত্ বাছয়ে মা 
বসে আছেন। ঝাঁপিয়ে পড়ল কোলের মধ্যে। 
কখনো তর গায়ে হাত বুলোয় রামকৃফ, কখনো বা স্তন্য পান করায়। গদগদভাষে 
কখনো বা ডাকে, গোপাল, গোপাল; কখনো বা যাঁদ দেখতে না পায়, গলা ছেড়ে 
কান্না ধরে, আমার ব্রজের রাখাল কোথায় গোল? 
যখন আসে ক্ষীর-ননী খাওয়ায়, কত খেলা দেয়, কখনো বা কাঁধে করে নাচে। 
পড়াশোনায় মন নেই, মানে না গুরুজনদের। সব চেয়ে আশ্চর্য, নতুন বিয়ে করেছে, 
অথচ *বশহ্রবাড়ি যায় না। কান্তিমতী কিশোরী স্লী, এতটুকু টান নেই। 'কোথায় 
যাস তুই রোজ-রোজ 2 বাপ হুঙ্কার করে উঠল। 
ব্রাহমসমাজে যেত খুব আগে-আগে । সেখানকার প্রাতিজ্ঞাপত্রে স্বাক্ষর করে এসেছে 
নিরাকার ও আম্বতনয় ব্লহমন ছাড়া আর কারু ভজনা করব না। এ সবে তত আপাতত 
ছিল না আনন্দমোহনের। কিন্তু তান তো জানেন কোথায় আজকাল ছেলের 
গাতাবাধ। ব্লাহমসমাজে মিশে কেউ তো আর 'বিবাগী হয় না, কিন্তু যেখানে 
এখন সে যাওয়া-আসা শুরু করেছে সেখানে যে এক বিশবভোলা বাউন্ডুলের 
বাসা । আজব কারখানা । ওখানে গেলে আর মানুষ হতে হবে না, রাখাঁলিই করতে 
হবে সারা জীবন। 
'খবরদার, আর যেতে পারাব না ওখানে !' ছেলেকে ঘরের মধ্যে বন্ধ করল আনন্দ- 
মোহন । বাঁসরহাটের শিকরা গাঁয়ের বলদৃস্ত জমিদার, অগাধ পয়সার মালিক, তার 
ছেলে কনা পথে-পথে ভেসে বেড়াবে! কখনোই না। থাক এঁ ঘরের মধ্যে বন্দী হয়ে। 
এদকে বংসহারা গাভীর মত কাঁদছে রামকুষ্ণ। ওরে রাখাল, কোথায় গেলি? 
তোকে না দেখে যে থাকতে পারাছি না। মা'র মান্দরে গিয়ে কাকুতি-মনাত 
করছে : মা, আমার রাখালকে এনে দাও । রাখালকে না দেখে বুক ফেটে যাচ্ছে-_ 
খাঁচায় পোরা বনের পাখির মত পাখা ঝাপটাচ্ছে রাখাল। বন্ধ ঘরে ছটফট 
করছে। 
সৌদন কি দয়া হয়েছে, আনন্দমোহন ছেলেকে বন্ধ ঘরে না রেখে নিজের চোখের 
সামনে বাঁসয়ে রেখেছে । নজরবন্দী করে রেখেছে । নিজে নিবিষ্ট মনে দেখছে 'কি 
সব নাঁথ-পন্ন। বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে জাঁটল মামলা, কাগজপন্নও পর্ব তপ্রমাণ। 
তৈরছা চোখে বাপকে একবার দেখল রাখাল । দেখল, কাগজের মধ্যে ডুবে আছেন, 
কাগজ ছাড়া আর কিছুতে লক্ষ্য নেই। টুপ করে সরে পড়ল আলগোছে। নিজের 
দেহের ছায়াটকে পরয্ত জানতে না 'দয়ে। পথে নেমেই দে-ছুট। একেবারে 
। 
৭ (৬৮) ৯৫ 


রাখাল, রাখাল-_' কান্নার স্বর দূর থেকে রাখাল শুনতে পাচ্ছে। 

“আমি এসেছি। আমি এসোছ। এই যে আঁম।' রামকৃষের প্রসারিত বাহুর মধ্যে 
ঝাঁপয়ে পড়ল রাখাল। 

এই মোকদ্দমায় আর জেতবার কোনো আশা নেই। নাথর থেকে মুখ তুলল 
আনন্দমোহন । এ কি! রাখাল কোথায় ? রাখাল কোথায় গেল। 

আর কোথায় গেল! ছাঁদন-দাঁড় খুলে দেবার পর বাছুর আবার যায় কোথায়! 
এখন কোর্টের বেলা হয়ে গেছে, এখন আর ছেলের 'পছ ছোটা যায় না দাঁক্ষিণেশ্বর। 
সন্ধের পর ব্যবস্থা করতে হবে । এবার ফিরিয়ে এনে সাত্য-সাত্য লোহার বোঁড় 
পারয়ে দেব। যৌবনের সোনার শৃঙ্খলে সে বশ মানেনি। 

কিন্তু মামলায় হঠাৎ উলটো রকম ফল হয়ে গেল। ঘূুণাক্ষরেও ভাবোনি, মামলায় 
ডাক্র পেল আনন্দমোহন । 

ছেলের সাধূসঙ্গের জোরেই ঘটেোন তো এই ফললাভ ? কে জানে! 

ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে দক্ষিণে*শবরের দিকে যাচ্ছে বটে আনন্দমোহন, কিন্তু 
মনের মধ্যে আর তাড়ন-পীড়নের তাপ নেই। তার প্রথম পক্ষের সন্তান রাখাল। 
কত ভোগাঁবলাসে মানুষ। তার 'কনা সইবে ও-সব অনাস্ান্ট 2 ভুলিয়ে-ভালিয়ে 
যেমন করে হোক মনের মোড় ঘ্ারয়ে দিতে হবে। ফারয়ে আনতে হবে এ 
বিপথগামনীকে। 

'ওরে রাখাল, এ তোর বাপ আসছে বুঝি ।' রামকৃষ্ণ যেন ভয় পাবার মত করে 
বললে । "দ্যাখ দেখি তাকিয়ে__' 

তা ছাড়া আবার কে! এ তো আনন্দমোহন । দূর থেকে ঠিক চিনেছে রামকৃ্ণ। 
বাপের আভাস পেয়ে রাখালের মুখ এতটুকু হয়ে গেল। বললে, আমি কোথও 
গায়ে লুকোই। নইলে বাবা আমাকে ঠিক ধরে নিয়ে যাবে। আর আসে 
দেবে না। 

ভয় কি! আসুক না!' রামকৃষ্ণ অভয় দিলে। “বাপ তো সাক্ষাং দেবতা । তাকে 
আবার ভয় কিসের! সামনে এলে বেশ ভাঁন্তভরে প্রণাম করাঁব। মা'র ইচ্ছে হলে 
কী না হতে পারে” ] 

আনন্দমোহনকে খুব সমাদর করে বসাল রামকৃষ্ণ । রাখালও দেহ-মন ঢেলে 
প্রণাম করলে। 

কত গুণ আমার রাখালের! কেমন 'দিব্যগন্ধময় তার সত্তা । সর্ব তর্ঘে তার স্নান 
সর্ব যজ্জঞে তার দঈক্ষা। ও হচ্ছে ব্রহয়শ্রোতা, ব্রহমমন্তা ছেলে। রাখালের প্রশংস 
করতে লাগল রামকৃষ্ণ । শুধু কি প্রশংসা? প্রাতাঁট কথার অন্তরালে সীমাহী 
স্নেহ। কৃলহীন ভালোবাসা । 

ছেলের মুখের ঈদকে তাকাল আনল্দমমোহন। আনন্দে জবলছে রাখালের চে: 
দুি। হয়তো ভালো করে খায়ান, কে জানে সারা দন উপোস করেই আছে কিনা 
তব যেন আনন্দের প্রাতিমার্ত। 

“বাবা, ক্যা ভোজন হয়া? এক সাধূকে জগগেস করলে একজন। 

১৮ 


'আজ মালিক নোহ মিলায়ে।' বললে সেই সাধু, 'আজ রামজশীক ইচ্ছাই হ্যায় 
-ভাম্তন মিলনে নোহ হ্যায়। আজ আনন্দই হ্যায় 

পর্বাবস্থায় সদানন্দ। এই আনন্দের হাট থেকে আমার তোলা বন্ধ করে দিও না। 
কেমন যেন হয়ে গেল আনন্দমোহন। ছেলেকে পারল না ফিরিয়ে নিতে। শুধু 
রামকৃষকে বললে, মাঝে-মাঝে এক-আধবার পাঠিয়ে দেবেন দয়া করে।' 

তাই সেই অনুরোধই এখন করছে রামকৃফ। ওরে, অনেক দিন হয়ে গেল, এখন 
একবার বাঁড় 'গিয়ে বাপকে দেখা দিয়ে আয়। যাঁদ একেবারে না যাস, কেলেঙ্কারি 
হবে, তোকে চিরাদনের মত আটকে রাখবে, আর তোকে আসতে দেবে না। 
তুইয়ে-তাইয়ে পাঠিয়ে দেয় বাঁড়তে। 

দু'ঁদন যেতে না যেতেই ফের ফিরে আসে । বাপের চোখের উপর দিয়েই ফিরে আসে । 
চানন্দমমোহনের কেমন ধারণা হয়েছে এ সাধুকে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। এর 
আস্তানায় অনেক গণ্যমান্য লোক যাতায়াত করছে। ওর এখন বিস্তর নামডাক। 
এর কৃপাতেই মামলাতে সফল হয়েছিল। বলা যায় না, লেগে থাকলে কোন না 
মাবার সবধে হবে! 

খালের খোঁজে নিজেও দু-এক 'দিন চলে আসে আনন্দমোহন । 

রমকৃষ। খুব খাঁতর-যত্র করে। আগে-আগে শুধু ছেলের প্রশংসা করত এখন 
ন্পরও প্রশংসা করে। বলে, 'যেমন ওল তেমাঁন মুখীঁটি তো হবে। গাছটি রসালো 
ব্লই তো ফলাট 'মঠে।' 

এমন করেই রাখালের বাবার মন খুশি রাখতেন।' বললেন একাঁদন শ্লীমা : 
শখালের বাবা এলেই যত করে এটি-ওটি দেখাতেন, খাওয়াতেন, কত কথা যে 
বলতেন তার শেষ নেই। মনে ভয়, পাছে রাখালটিকে ওখানে না রাখে, নিয়ে 
ঘায়। রাখালের সং-মা ছিল। সে যখন দাক্ষণে*বরে আসত, ঠাকুর রাখালকে 
নলতেন, ওরে গুকে ভালো করে সব দ্যাখা, শোনা, যত্ন কর্‌--তবেই তো জানবে 
হলে আমাকে ভালোবাসে ।' 

একবার রামলালাকে ধরেছিল, এখন ধরল বালগোপালকে। আগে ছিল অস্টধাতুর 
বিগ্রহ এখন সপ্তধাতুর মানুষ । আগে ছিল মনোমৃর্ত, এখন মানস-পনতর। 
'5র খিদে পেয়েছে ।' রাখাল বললে এসে রামকৃষকে। যেমন আবদারে ছেলে 
৮কে এসে বলে। খিদে পেয়েছে! কি সর্বনাশ, এখন তোকে খেতে দিই 'ি! 
রে খাবার নেই, দোকানও বা কই এখানে কাছে-ভিতে! এখন কাঁর কি, যাই 
কোথায়! আমার রাখালের যে খিদে পেয়েছে! উতলা হয়ে গঞ্গার ধারে চলে এল 
। গলা ছেড়ে কাল্লার সুরে ডাকতে লাগল : ও গৌরদাসাঁ, এস আমার 








র সন্ব্যাসনী এই গৌরদাসী। বলরাম বসুর কাছে শুনেছে রামকফের 
থা। সটান চলে এসেছে দক্ষিণেশবর। এসে দেখল রামকৃষ্ণ কোথায়, এ যে সেই 
গোৌরহার। সেই থেকে আছে তার পদচ্ছায়ে। 

, গৌরদাসী কি মেয়ে? রামকৃষ্ণ বলে, মেয়ে যাঁদ সন্ধ্যাসী হয় সে কখনো 
১৯ 


মেয়ে নয়, সে পুরুষ । গৌরদাসসও তাই পুরুষ । অদম্য কর্মশান্ত। অভঙ্গ বে] 
অসাধ্যসাধিকা। 

রামকৃণ বলে, 'আমি জল ঢালছি, তুই কাদা মাথ।' 

আম ভাব 'দ, তুই তাকে আকার দে। আমার রূপকে তুই রাঁতিতে নিয়ে য..! 
আমার বস্তুকে নিয়ে যা আস্বাদে। 

শ্রীমা যেবার রামে*্বর থেকে ফিরলেন, তাঁকে জিগগেস করলে মেয়েরা, শক দেখে | 
এলেন বলুন-_' 

“আমাকে তারা লেকচার দিতে বললে ।' শ্রীমা একটু হাসলেন। "বললাম আম 
লেকচার দিতে জানি না। যাঁদ গৌরদাসী আসত তবে 'দিত।' একটু থেমে আবার 
বললেন, 'যে বড় হয় সে একাই হয়। তার সঙ্গে অন্যের তুলনা হয় না। সে 
আমাদের গোরদাসশ । 

সেই গৌরদাসীকে লক্ষ্য করে কাঁদছে রামকৃষ্ণ । ওরে আয়, অসাধ্যসাধন করে দিয়ে | 
যা। ঘরে এক দানা খাবার নেই । আমার রাখালকে কিছ খাবার 'দয়ে যা শিগাগর' 
তুই না হলে এ অসম্ভব কে সম্ভব করবে ? 

চাঁদাীন ঘাটে নৌকো লাগল। কে তোরা কোথেকে আসছিস? পথে আমার 
গৌরদাসীকে দেখোছিস কেউ? নৌকোর মধ্যেই তো গৌরদাসী। সঙ্গে বলরাম 
বোস। আরো কয়েকজন ভন্ত। সবাই এসে পড়েছে এক ডাকে । একে-একে নামতে 
লাগল। গোৌরদাসীও নামল । গৌরদাসীর হাতে খাবারের পঃটলি। 

'ওরে রাখাল, আয়, ছুটে আয়, খাবার খাব আয়। তোর জন্যে খাবার নিয়ে 
এসেছে গৌরদাসাঁ।' ব্যাকুল হয়ে ডাকতে লাগল রামকৃ্ণ। 

রাখাল কাছে এসে মুখ ভার করে রইল । বললে, "খাব না।' 

'সে কি রেঃ এই না বলছিল খদে পেয়েছে! 

'বলোছলাম তো বলেছিলাম! তাই বলে চার দিকে ঢাক পেটাতে হবে নাকি? 

“আহাহা, তাতে কি হয়েছে ।' রাখালের পিঠে হাত বুলুতে লাগল রামকৃষ্ণ : 'তোর 
খিদে পেয়েছে, তোর খাবার চাই, এ কথা বললে দোষ কি! খিদে পাবার মধো 
লঙ্জা কিসের! আর, খিদে যখন পেয়েছে, তখন খেতে তো হবেই। এতে আবার, 
রাগের কথা কি! নে, এখন খা।' রাখালকে খাইয়ে দিতে লাগল রামকৃষ্ণ । 

বড় করে হাঁ কর্‌। ভালো করে খা। 

“ক অবস্থাই গেছে। মুখ করতুম আকাশ-পাতাল জোড়া আর মা বলতুম। যেন 
মাকে পাকড়ে আনাঁছ। যেন জাল ফেলে মাছ হড়-হড় করে টেনে আনা । 

সেই গানে আছে না-_ 





থাব খাব বলি মা গো, উদরস্থ না করিব, 

এই হূদিপদ্মে বসাইয়ে, মনোমানসে পূজিব। 

যাঁদ বল কাল খেলে কালের হাতে ঠেকা যাব, 

আমার ভয় কি তাতে, কাল বলে কালেরে কলা দেখাব ॥ 
১০৬ 





কামারপুকুরের লক্ষমণ পানকে 'দয়ে রামকৃষ্ণ খবর পাঠাল সারদাকে। 
'এখানে আমার কম্ট হচ্ছে। রামলাল মা-কালীর পূজারী হয়ে বামূনের দলে 
মশেছে, এখন আমাকে আর তত খোঁজ করে না। তুমি অবশ্য আসবে। ডুলি 
করে হোক, পালকি করে হোক, দশ টাকা লাগুক, বিশ টাকা লাগ্‌ক, আম দেব।' 
সারদার মন কেদে উঠল । ভাবল যাঁদ পার তো পাঁখ হয়ে উড়ে যাই। 
লক্ষণ পান আরো বললে। বললে, ঠাকুর ভাব-টাব হয়ে পড়ে থাকেন, সোঁদকে 
রামলালের খোঁজ নেই। তার মনের ভাবখানা হচ্ছে, কালীঘরের থাঁকয়ে পুজোরী 
হয়েছি, আর আমাকে পায় কে। এঁদকে মা-কালীর প্রসাদ শুকনো হয়ে রয়েছে, 
দেখেও দেখছে না। 
যেমন চালাও তেমনি চলি। যাঁদ দূরে রাখো, দূরে থাকি; যদি কাছে ডাকো, ডাক 
শোনবার জন্যে কান খাড়া করে থাক তোমার কাছে-কাছে। 
ছোট তন্তপোশে তাকিয়া ঠৈসান 'দিয়ে বসে আছেন ঠাকুর। মেঝেতে ভত্তদল। 
তব; তাঁর অনূডারে আমরা আছি।' 
[স্টার মশাই বলেন, 'সেই দিন থেকে অনডার কথাটি শিখলাম-_ 
ঠকুর। 
তেমনি আমি পড়োছি তোমার হাতে । আমি তগ্ঘার বাঁশ শৃন্য করে রেখেছি, 
হুম যেমন বাজাও তেমাঁন বাজব। 
দা চলে এল দক্ষিণেশ্বর। ঢুকল নবতে। 
ছাট এই একটুখানি ঘর। ঢোকবার দরজাটিও ছ্োট। ঢুকতে প্রায়ই মাথা ঠুকে 
য় সারদার। এক দিন তো কেটেই গেল রাঁতিমত। ক্লমশ অভ্যেস হয়ে এল। 
"রজার সামনে আপনা হতেই নুয়ে পড়ে মাথা । হে প্রবেশপথের দারুদেবতা, 
তাল্তমতীর প্রণাম নাও। 
নামনে একট; বারান্দা, দরমার বেড়া দেওয়া। এ তো ঘর, তার মধ্যেই সমস্ত 
"ংসার। রাজোর 'িনিসপন্ন। রাঁধবার সাজ-সরঞ্জাম, হাঁড়ি-কুঁড়, বাসন-কোশন। 
স্লের জালা, রামকৃষের জন্যে হাঁড়িতে মাছ জিয়োনো। শিকেতে ভন্তদের জন্যে 
বার-দাবার। 

১০৬ 


আবার লক্ষী এসেছে সঙ্গে । সেও থাকে এই নবতের ঘরে। রানে মাথার উপর 
মাছের হাড় কলকল করে, লক্ষমীর ঘম আসে না। 

শুধুই কি লক্ষী? কলকাতা থেকে স্ত্ী-ভন্ত যদি কেউ আসে সেই ঘরেই রাত 
কাটিয়ে যায়। গৌরদাসীর তো কথাই নেই। তার আবার সেই ঘরেই ভাব হয়। 
থেকে-থেকে ণনত্য কোথা" পধনত্যগোপাল কোথায় বলে নৃত্য করতে থাকে। 
“কে জানে তোমার নিত্য কোথায় ?' সারদার কণ্ঠস্বরে হয়তো ঈষৎ বাঁজ ফোটে: 
“দেখ গে, গঞ্গার ধারে-টারে ভাব হয়ে রয়েছে হয়তো । 

কলকাতা থেকে স্বী-ভন্তরা যারা দেখতে আসে, দরজার বাইরে দাঁড়য়ে বলে, 'আতা, 
ি ঘরেই আমাদের সীতা লক্ষী আছেন গো! যেন বনবাস গো! 

সাঁত্যিই সাীতা-লক্ষনী। পরনে কস্তা পেড়ে শাঁড়, সি'থে-ভরা সিপ্দুর। কালো 
ভরাট মাথার চুল প্রায় পা পর্যন্ত পড়েছে। গলায় সোনার কণ্ঠীহার। কানে 
মাকাঁড়। হাতে চুঁড়, যে চুঁড় রামকৃষ্ণের মধুর ভাবের সময় গাঁড়য়ে দিয়োছিলেন 
মথুরবাবু। 

তার উপরে আবার নাকে নথ। নিজের নাকের কাছে আঙল ঘুরিয়ে গোল চিহ 
দেখয়ে সারদাকে রামকৃষ্ণ বোঝায় ইশারায়। 

নবতকে বলে খাঁচা। লক্ষী আর সারদাকে শুকসারী। কালনঘরের প্রসাদ এলে 
রামলালকে বলে, "ওরে খাঁচায় শুকসারী আছে, ফলমূল ছোলাটোলা 'কছন ?দয়ে 
আয়।' 

বাইরের লোক যারা শোনে, ভাবে, খাঁচায় বাঁঝ সাত্য-সাঁত্য পাঁখ আছে রামকৃষের 
রাত্রে তো বোশ ঘুম নেই, অন্ধকার থাকতে-থাকতেই উঠে পড়ে রামকৃষ্ণ। বেড়াতে- 
বেড়াতে নবতের 'দকে চলে আসে । হাকি পাড়ে : "ও লক্ষী, ওঠরে ওঠ। তোর 
খাঁড়কে তোল রে। আর কত ঘুমুবি ? রাত পোহাতে চলল । মা'র নাম কর।' 
শীতের রাত। এক-এক 'দিন 'বিছানা ছাড়তে মন ওঠে না। লেপের ভিতরে কুণ্কড়ি 
স্কাঁড় হয়ে সারদা আস্তে-আস্তে লক্ষমীকে বলে, চুপ কর, সাড়া 'দিসান। 
নিজের চোখে তো ঘুম নেই! এখনো সময় হয়ান ওঠবার। কাক-কোকিল 
ডাকেনি এখনো" 

সাড়া না পেঞ্জে সরে যাবার লোক নয় রামকৃষ্ণ । দরজার ফাঁক দিয়ে জল ছিটোয় 
বিছানায়। 

নইলে এমানতে রাত চারটের সময় উঠে সারদা স্নান করে নেয় গঞ্গায়। 'বিকেছে 
নবতের সশড়তে যেটুকু রোদ পড়ে তাইতে চুল শুকোয়। যোগেনের চুল-বাঁধাটি 
ভার পছন্দ। যোগেন এলেই বলে বেধে 'দিতে। 

যোগেনকে বলতে হয় না। সে নিজের থেকে বসে সেই চুলের কাঁড় নিয়ে। পাঁচ 
আঙুলে চুলের গোছা সামলাতে পারে না। 


রা দে কিন্তু আসলে ভূবনেশ্বরা 


(যার ধ্যান করছে সে তো চোখের সামনে । লাটু আসন ছেড়ে উঠে পড়ল। 

“শোন, এ নবত-ঘরে সাক্ষাৎ ভগবতাীঁ আছেন, তাঁর রুটি বেলে দে গে।' 

(বিবেকানন্দের ভাষায়, জ্যান্ত দুর্গা। আমোরকা থেকে শিবানন্দকে চিঠি লিখছেন 

স্বামীজী : দাদা, বিশ্বাস বড় ধন। দাদা, জ্যান্ত দুর্গা পূজা দেখাব, তবে আমার 

নাম। তুমি জম কিনে জ্যান্ত দুর্গামাকে যোঁদন বাঁসয়ে দেবে সেই দিন আম 

একবার হাঁপ ছাড়ব। তার আগে আর আমি দেশে 'ফরাছ না।' 

কল-মিম্টি দেদার বিলোচ্ছে সারদা । লোকদের বিলিয়ে দিতে পারলে আর তার 

কথা নেই। তার এই সদারত দেখে রামকৃষ্ণ ঈষৎ বিরন্ত হল বোধ হয়। বললে, 

'মত খরচ করলে কি চলবে 2, 

একটু বুঝি আভমান হল সারদার। তার সমৃখ থেকে চলে যাবার ভাঁঙ্গাঁটতে 

বুঝি সেই ভাবই ফুটে উঠেছে। 

ব্যস্তসমস্ত হয়ে উঠল রামকৃষ্ণ। রামলালকে ডেকে পাঠাল। 

'ওরে তোর খাঁড়কে গিয়ে শান্ত কর।' 

শক হয়েছে ? 

'বোধ হয় রেগে গেছে।' একটু থামল রামকৃষ্ণ । বললে, 'ও রাগলে আমার সব 

দট হয়ে যাবে।, 

রমকৃ্ণ আঁশ্ন, সারদা দাঁহকা। রামকৃষ্ণ জল, সারদা শীতলতা । রামকৃষ্ণ ব্রহম, 

দারদা কালী । 

রাখালের বাঁলিকা-বউকে নিয়ে এসেছে মনোমোহনের মা। মনোমোহনের মা মানে 

লখালের শাশাঁড়। রাখালের *বশুরবাঁড় রামকৃষ্ণের ভন্ত-পারবার। কন্তু তাই 

“লে রাখালের বউকে নিয়ে আসার মানে কি ? রামকৃষ্ণের বুকের ভিতরটা ধক করে 

উঠল। রাখালকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার আঁভসান্ধ নয় তো? 

না, ব্যস্ত কি, রাখালই ফিরে-ফিরে যাবে সংসারে । তার ভোগের এখনো একটু 

বাকি আছে। 

'কন্তু স্লীর সংস্পর্শে রাখালের ঈশ্বরতন্তির হানি হবে না তো? 

মায় তো মা, আয় তো এঁদকে, তোকে একবারটি দেখি। 

িম্বে্বরী এগিয়ে এল রামকৃষের কাছে। রামকৃষ্ণ তাকে দেখতে লাগল খংটয়ে- 

খটয়ে। সূলক্ষণা, সুভৃষণা মেয়ে। 

সর্বঅঙ্গে দেবীশান্ত। ভয় নেই এতট;ুকু, স্বামীর ই্টপথে বিঘ] হবে না। 

বললে, 'নবতে যাও, তোমার শাশুড়িকে প্রণাম করে এস।' 

সারদাকে নবতে বলে পাঠাল রামকৃফণ : 'টাকা 'দিয়ে যেন পুরবধূর মুখ দেখো । 

গসপততে বেণী পালের বাগানে রাখালকে সঙ্গে করে বেড়াতে গিয়েছে রামকৃফ্ণ। 

কথা আছে, রাতটা থাকবে সেখানে । 

সন্ধ্যের পর বাগানে একা-একা বেড়াচ্ছে রামকুফ। সেখানে কতগুলো ভূতের সঙ্গে 

দেখা। 

তূমি এখানে এসেছ কেন?” ভূতগুলো কাতরাতে লাগল : 'তোমার হাওয়া 
১০৩ 


আমাদের সহ্য হচ্ছে না। আমরা জলে গেলুম, জবলে গেলুম। তুমি চলে যাও 
এখান থেকে ।' 

খাওয়া-দাওয়ার পরেই গাঁড় আনতে বললে রামকৃফণ। 

সে কি কথা, আপানি না রাত্রে এখানে থাকবেন বলেছিলেন ? 

তা থাকা হল না। শুধু জাঁবিতের নয়, মৃতেরও আর্তি আছে। 

“কন্তু এত রাতে গাঁড় পাব কোথায় ?' 

তা পাবে, দেখ গে।' 

গাঁড় পাওয়া গেল সহজেই সেই রাতেই ফিরে এল দক্ষিণেশ্বর। 
জাগ-প্রদীপাঁটর মতই জেগে আছে সারদা । গাঁড়র শব্দ পেয়ে চমকে উঠল । কান 
পেতে শুনল রাখালের সঙ্গে কি কথা বলছে রামকৃষ্ণ । ওমা, কি হবে, যাঁদ না 
খেয়ে এসে থাকেন, কি খেতে দেব এত রাতে? অন্য দিন কিছু না কিছ ঘরে 
থাকে, অন্তত একটু সুঁজ। কখন কি খেয়ালে খেতে চেয়ে বসেন ঠিক 'ি। কিন্তু 
আজ কণ হবেঃ যাঁদ বলেন, খিদে পেয়েছে ? 

রাত একটা, মান্দরের ফটক বন্ধ হয়ে গেছে কখন। ?ক করে কে জানে ফটক 
খুলয়ে নিল রামকৃষ্ণ । হাততালি 'দিয়ে ঠাকুর-দেবতার নাম করতে-করতে এগুতে 
লাগল। সঙ্গে-সঙ্গে তাল 'দয়ে-দয়ে রাখালও নাম করছে। 

ঝি ষদুর মাকে তোলাল সারদা । ও যদুর মা, কি হবে, উাঁন যে ফিরে এলেন! 
যঁদি বলেন, খাইনি কিছ খেতে দাও ? 

মনের আকুলতাট বুঝতে পেরেছে মনোহারী। নিজের ঘর থেকেই ডেকে বললে, 
তোমরা ভেবো না গো, আমরা খেয়ে এসেছি ।' 

পরাঁদন সকালে রাখালকে বললে সেই ভূতের গল্প। 

«ও বাবা, ভাগ্যস তখন বলোনি সেই রাত্তির বেলা, তাহলে আমার দাঁত-কপাঁটি 
লেগে যেত। শুনে এখান বুক কাঁপছে; 

স্্ী-তন্তদের কাছে সেই গল্পটাই সোঁদন বলছেন শ্ত্রীমা, আর রাখালের ভয়ের কথা 
ভেবে হাসছেন মদু-মৃদ। “ভূতগুলো তো বড় বোকা ।' বললে একজন স্নী-ভন্ত। 
ঠাকুরের কাছে কোথায় মুন্তি চাইবে, তা নয়, চলে যেতে বললে।' 

ঠাকুরের যখন একবার দর্শন পেলে তখন ম্বান্তর আর বাকি রইল কি মা!' শ্রীমা'র 
চোখ দুটি প্রসন্নতায় ভরে উঠল : 'জানো না বাঁঝ আমার নরেনের কাণ্ড? 
সেবার মাদ্রাজে গিয়ে ভুতের পন্ড দিলে। পিশ্ড দিয়ে মুস্ত করে দিলে 
প্রেতাত্মাদের 1 

কলকাতার রাস্তায় লাটর সঙ্গে নরেনের দেখা । 

“তোদের ওখানকার খবর কি?" জিগগেস করলে নরেন। 

“কাল উখানে কত উৎসব হল, আপুনি ষান নাই কেন? হামার সঙ্গে আজ উখানে 
চল:ন-: 

'আমার বয়ে গেছে! সামনে একজামিন। এখন এক পাগলা বামুনের সঙ্গে বসে 
আন্ডা দেবার আমার সময় নেই।, 

১০৪ 


পাগলা বামন! হতব্দদ্ধির মত তাকিয়ে রইল লাটু। 'পাগলা বামূন আপন 
কাকে বলছেন ?' 
'আর কাকে! কোমরে কাপড় থাকে না, হাত-পা তেউরে যায়, নাম শুনলেই ধেই- 
ধেই করে নাচে, মান-ইজ্জত নেই, যেখানে-সেখানে খাল গায়ে যাওয়া-আসা করে! 
তার পর আবার ভেলাক দেখানো আছে-_' 
'ভেলাক!' 
তা ছাড়া আবার কি! সেই গান আছে না? নিতাই কি ভেলাঁক জানে, নিতাই কি 
যাদু জানে! শুকনো কাঠে ফল ধরালো, ফুল ফোটালো পাষাণে! 
'হাঁ রে, রাখাল ওখানে যায় 2' 
যায় বই কি। শুধু যায় না, কখুনো দু-তিন রাত্তির থেকেও যায়। ঠাকুর তাকে 
"ছলে বলেন। মাকে বললেন, এই নাও গো তোমার ছেলে এসেছে।' 
'রাখালকে তাঁর ছেলে বললেন ?' 
'সাচ বলছি, তাই শুনেছি ।' 
পাখাল যাঁদ ঠাকুরের ছেলে, নরেন শ্রীমা'র। 
৮, এই একশো আট বিল্বপন্র ঠাকুরকে আহি দিয়ে এল্‌ম, যাতে মঠের জাম হয়। 
£ কর্ম কখনো বিফলে যাবে না। ও হবেই এক 'দিন।' নরেনের কণ্ঠে বঞ্জের 
াষণা। 
তার পর মঠের জাম কেনা হলে চতুঃসীমা ঘাঁরয়ে-ঘুরিয়ে দেখাল শ্রীমাকে । বললে, 
'মা তুমি তোমার আপন জায়গায় আপন মনে হপি ছেড়ে বেড়াও ।' 
একদিন খুব ব্যস্ত-্রস্ত হয়ে এসেছে নরেন। বললে, মা আমার আজকাল সব 
ওড়ে যাচ্ছে। সবই দেখাছ উড়ে যায়।' 
«মা হাসলেন। বললেন, 'দেখো, আমাকে কিন্তু উঁড়য়ে দিও না।' 
নরেন বললে, "মা, তোমাকে উীঁড়য়ে দিলে থাক কোথায় ? যে জ্ঞানে গুরুপাদপদ্ম 
টাড়য়ে দেয় সে তো অজ্জ্রান। গুরুপাদপদ্ম উীঁড়য়ে দিলে জ্ঞান দাঁড়ায় কোথায় 2' 
কষ নাম বিষ নাম দু-অক্ষর হলেও কঠিন। বানানেও কঠিন উচ্চারণেও কঠিন। 
শব বলতে তিনটে “স'-এর মধ্যে একটাকে বাছতে হয়। তার চেয়ে হার আর 
রাম সোজা। বর্ণপাঁরচয়ের সময় যখন জল-খল অজ-আম শিখেঁছিলি সে সময়েই 
শেখা যেত হরি নাম। তেমনি সরল, শিশুবোধ্য। কিন্তু তা-ও দু-অক্ষর। তোকে 
একাক্ষর মন্ল দিচ্ছি। সব চেয়ে কম, সব চেয়ে ছোট, সব চেয়ে সোজা-সেই 
একাক্ষর। ৩ নয়, হ্ীং-ক্রণং নয়। একেবারে ভলের মত তরল, শিশিরের মত 
ঠান্ডা । সেই শব্দটি শিখেছিস সকলের আগে, ভয়ে পড়ে মাটি পাবার সঙ্গে- 
সঞ্গেই। কান্নার স্বর, আনন্দের স্বর, আঁর্তর স্বর, আকুলতার স্বর । সেই একাক্ষর 
মন্টর নাম হচ্ছে মা। 
মা আমার জগৎ জুড়ে। আর আমিও তো জগৎ ছাড়া নই। তাহলেই তো মা 
মামাকে ধরে আছেন, ঘিরে আছেন। তাহালে আর জামার ভয় কি। 
মা-ই আমার অভয় মল্র। 

্ ১০৫ 





সুরেশ মিত্তর 'কারণ' করে জপ করে। তার পর ছাদের পাঁচিলের পাশে বসে 
নিচু গলায় শ্যামার গান গায়। আস্তে-আস্তে গলা চড়তে থাকে । ক্লমে-রুমে সে-গলা 
কান্নায় গলে পড়ে। 

আর সে কা কান্না! আর্তনাদের মত কানে লাগে। আশে-পাশের বাঁড়গ্দল 
সচকিত হয়ে ওঠে। 

“সুরেশ মীত্তর মদ খায়।' এক 'দিন রাম দত্ত এসে নালিশ করল রামকৃষের কাছে। 
"ওকে বারণ করুন ।' 

'তাতে তোর কি?" রামকৃষ্ণ ঝলসে উঠল : “ওর ধাত আলাদা, ও নিজের পথে যাবে। 
তাতে তোর কণ মাথাব্যথা 

কারণ” করে কোনো দিন যাঁদ আনন্দে পায় সুরেশকে, তখন আর কথা নেই, 
সর্বক্ষণ তার মূখে শুধু রামকৃষের কথা । 

তুই কত্তামো কারস নে।' রাম দত্তকে বললে এক দিন সুরেশ । চল প্রভূর কাছে 
যাই। তান যেমন আদেশ করেন তেমনি করব, 

নবতখানার পাশে বকুলতলায় দাঁড়য়ে আছে রামকৃ্ণ। প্রণাম করে দাঁড়াল দুজনে 
মনোবাসী টের পেয়েছে মনের কথা । বললে, ও সরেন্দর, মদ খাবি তো খা না। 
ধিন্তু দেখিস পা যেন না টলে, মা'র পাদপদ্ম হতে মন যেন না টলে। 

এখানেও আশ্বাস, এখানেও প্রশ্রয়! মন যাঁদ মস্ত থাকে, পায়ের বন্ধনে কি এসে 
যাবে! 

জানিস না সেই দুই বন্ধুর গজ্পঃ দুই বন্ধ-এক জন গেল বেশ্যালয়ে, আরেক 
জন গেল ভাগবত শুনতে । প্রথম জন ভাবছে, ধিক আমাকে! বন্ধু হারকথা 
শুনছে, আর আমি এ কোথায় পড়ে আছি! "দ্বতাঁয় জন ভাবছে, ধিক আমাকে! 
বন্ধ কেমন ফৃর্ত করছে, আর আম শালা ক বেকুব! দুজনেই মলো। প্রথম 
জনকে বিষ্ুদূতে নিয়ে গেল- বৈকুণ্ঠে। দ্বিতীয় জনকে নিয়ে গেল যমদৃতে_ 
নরকে । 

শুধু মন নিয়ে কথা । মনেতেই বদ্ধ মনেতেই মুস্ত। মনেতেই শুদ্ধ মনেতেই 
অশুদ্ধ। 

মন ধোপাঘরের কাপড়। লালে ছোপাও লাল নীলে ছোপাও নীল । গেরুয়ায় 


ছোপাও গেরুয়া। যে রঙে ছোপাও সেই রঙে ছপবে। 
১০৬ 


জপ 


'ওরে মদে বিষও আছে মধও আছে। সুরেশ মীত্তরকে বললে রামকৃষ্ণ। 'মদ 
থাস কেন 2 এঁ মধ্দর জন্যেই তোঃ কিন্তু এ বিষ তুই ধারণ করতে পারাবঃ না, 
তুই চাস তাই ধারণ করতে? 

রেশ মিত্তির চুপ। | 

'শোন, মদ খাবার আগে এ বিষটকু তুই মাকে নিবেদন করে দে। বল, মা তুমি 
এর বিষটুকু খাও আর সুধাটুকু আমাকে দাও।' 

তাই ভালো। ঝামেলা গেল! মা-ই বিষ খাক। আমার সুধাপানের কথা, সুধাই 
খাব পরোপদার। 

খাবার আগে মদের গ্লাশ মাকে নিবেদন করে দেয় সুরেশ । বলে, বিষট;কু টেনে 
নে মা, সুধাটুকু আমার জন্যে রেখে যা। বলে গান ধরে মুস্তকণ্ঠে : 


লোকে বলে বলবে পাগল হলো : 
ভালো মন্দ দুটা কথা 
ভালোটা না করাই ভালো। 


'কন্তু সন্তান হয়ে মাকে কত দিন সে বিষ দিতে পারবে হাতে ধরে 2 সরেশের 
মনে খটকা লাগল। ঠাকুর তাকে ধোঁকায় ফেলেছেন। নিজে মধুটুকু খেয়ে মাকে 
কি ছেলে বিষ দিতে পারে £ কতটুকু পারে? কত দিন পারে ? মদের "লাশ নামিয়ে 
রাখলে সুরেশ। 
অচলানন্দ এসে রামকৃষ্ণকে বলে, একটু কারণ খাও। 
সে সব কী দিনই গেছে! যে দলের সাধকই হও না কেন আমাকে দেখাও তোমার 
ঈশ্বরসাধন। তোমার রীত-নীত। তোমার আকার-প্রকার। আম শুধু দেখব আর 
আনন্দ করব। কত রকম ভোগ্য, কত রকম ভজনা! 
মথুরবাবুকে বললে, 'সব সাজপাট যোগাড় করে দাও ।' 
ভান্ডারী মথুর কাণ্ডারী হল। বললে, 'সব যোগাড় করে দিচ্ছি। কার কি লাগবে 
বলো। তোমার যাকে যা খাঁশ তাই দিয়ে দাও স্বচ্ছন্দে ।' 
সাধুদের জন্যে শুধু চাল ডাল ঘি আটা নয়- যোগাড় হল কম্বল-আসন লোটা- 
কমণ্ডল্‌-_যার যা নেশার সরঞ্জাম । সিদ্ধি গাঁজা কারণ চরস। আদা পেশ্মাজ মুড়ি 
কড়াই-ভাজা। 
তান্সিক অচলানন্দের দারুণ জেদ। বলে, কারণ খেতেই হবে তোমাকে । 
রামকৃফকে চক্রে নিয়ে বসে। কখনো বা চক্রেশবর সাজায়। বলে, খাও না একটু 
কারণ। রামকৃষ্ণ বলে, ওগো, আমার নাম করলেই নেশা হয়ে যায়।' 
আমার নেশা জিভে মেশা। বাইরের কোনো পৃথক বস্তুর দরকার হয় না। যেমাঁন 
একটু নাম করব অমান সমস্ত সত্তা পীষূষে স্নান করে উঠবে। আমার হচ্ছে 
নাম-সূধার নেশা। 

১০৭ 


অচলানন্দ ছেড়ে 'দল। শেষকালে শুধু বললে, “চক্রে বসলে কারণ গ্রহণ করতে 
হয়-নইলে সাধনার অঞ্গহানি ঘটে।' 

রামকৃফ তখন কারণ নিয়ে কপালে ফোঁটা কাটে বা ঘ্রাণ নেয়। বড় জোর আঙুলে 
করে ছিটে দেয় মুখের উপর। পান্রে-পান্রে ঢেলে সবাইকে পারিবেশন করে। 
একেক 'দন ভীষণ তর্জন করে অচলানন্দ। বলে, 'স্্ীলোক নিয়ে বীরভাবে সাধন 
তুম কেন মানবে নাঃ শিবের কলম মানবে নাঃ তল্দম লিখে গেছেন শিব, তাতে 
সব ভাবের সাধন আছে । বীরভাবের সাধনও বাদ পড়েনি-_' 

“কে জানে বাপু, রামকৃফের মুখে সরল সমর্থন : “আমার শুধু সন্তানভাব )' 
মধ; রায়ের গলিতে গাড়ি ঢোকে না, দাঁড়ায় পুবের বা পাঁশ্চমের বড় রাস্তায়। 
সভা-শেষে হেটে চলেছে রামকৃষ"_গাঁলটুকু পোঁরিয়েই গাঁড়তে গিয়ে উঠবে । কিন্তু 
ঈশ্বরানন্দে এমন মাতোয়ারা হয়ে আছে, মেপেমেপে পা ফেলতে পারছে না। 
টলমল করছে, এখানকার পা ওখানে গিয়ে পড়ছে-_ 

রাখাল বুঝ এখন সঙ্গে নেই। তার কাজই হচ্ছে ঈশবরাঁবভোর রামকৃষকে ধরে- 
ধরে ঠিকমতো পথ দেখানো । এইখানে 'সপড়, এইখানে উদ্চু, এইখানে গর্ত, এমান 
বলে-বলে নিজের জায়গায় টেনে নিয়ে যাওয়া। যখন রাখাল না থাকে তখন 
বাবুরাম আছে। 

ভন্তরা দু দিক থেকে ধরে রামকৃষ্ণকে নিয়ে যাচ্ছে গাঁড়র দিকে । আস্তে-আস্তে 
নিয়ে যাচ্ছে। রামকৃষ্ণ টলছে, হেলছে-দুলছে, পা রাখতে পারছে না 'স্থর হয়ে। 
গলির মোড়ে দাঁড়য়োছিল কারা । বলে উঠল, “কী দারুণ টেনেছে হে!' 

'বাবাঃ একেই বলে পাঁড় মাতাল! একেবারে বেহ*স। 

লোকে তাই দেখে চর্মচক্ষে। একেই বলে দর্শনোন্দ্রিয়ের প্রমাণ! দঁড়কে সাপ 
দেখে, ছায়াকে ভূত! আবার তেমান ঈশ*বররসময়কে বলে কি না সরাপানে 
জ্ঞানশন্য! 

ওরে সুরাপান কর না আমি, সুধা খাই জয় কালী বলে। আমার মন-মাতালে 
মাতাল করে মদ-মাতালে মাতাল বলে। 

আহাহা, চেয়ে দ্যাখ ঈশ্বর যেন উর্ণনাভ। মাকড়সা কি করে? নিজের শরাঁর 
থেকেই লূতাতন্তু সৃম্টি করে নিজের আনন্দে জাল বোনে । আবার সেই জালের 
আশ্রয়েই নিজের আনন্দে বাস করে। তেমাঁন আমাদের ঈশ্বর। সমস্ত জগতের 
উপাদান 'তাঁন, 'তাঁনই আবার সমস্ত জগতের উপলক্ষ্য। আবার এই জগতের 
মধ্যেই তাঁর বাসা। এই জগংই আবার তাঁর লীলাগৃহা। 

রামকৃষ্ণ গেছে কালশঘরে ভবতারিণীকে দর্শন করতে । সারদা তার ঘরখানি 
ঝাঁটপাট দিয়ে রাখছে । পেতে রাখছে বিছানা । তার পর পান সাজতে বসেছে 
এক কোণে। 

ঘরের কাজ চটপট সেরে চুপিচুপি বোরয়ে যাবে সারদা, দরজ্ঞার মুখে রামকুষের 
সঙ্গে দেখা । 


ণকল্তু এ তাঁর কী চেহারা! যেন পুরোদস্তুর মাতাল! চোখ দুটো লাল, 
৯১০৮ 


এখানকার পা ওখানে পড়ছে, কথা এড়িয়ে গেছে, কী সব ষেন বলছেন জাঁড়য়ে- 
গাঁড়য়ে! 

ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবে কিনা এক মুহূর্ত ভাবল সারদা । 

এক মহন্ত । 

মাতালের মত সারদার গা ছেলে দিল রামকৃষ্ণ । বললে, “ওগো, আম ফি মদ 
খেয়েছি 

সারদা আনন্দে লহর দিয়ে উঠল । বললে, 'না, না, মদ খাবে কেন?' 

'তবে কেন এমনি টলাছ ? তবে কেন কথা কইতে পাচ্ছ নাঃ আম কি মাতাল 2" 

সারদা একবার দেখল বাঁঝ পাঁরপূর্ণ চোখে । বললে, 'না, না, তুম মদ কেন খাবে; 
তুমি মা-কালীর ভাবামৃত খেয়েছ।' 





'তোদের বংশের কেউ সন্বেসী হয়েছে 2' নতুন কোনো ছান্র ইস্কুলে ভার্ত হতে 
এলেই নরেনের এই প্রথম জিজ্ঞাসা : 'ধন-মান স্তী-পুত্র ঘর-বাঁড় ছেড়ে চলে 
গিয়েছে বিবাগী হয়ে 2, 

মেক্রোপালটান ইস্কুলের সব চেয়ে নিচু ক্লাশের ছান্ত। মাত্র সাত বছর বয়েস। 
নতুন ছাত্র অবাক হয়ে চেক্জে থাকে । রাজারাজড়ার খবর নয়, কে কবে কোথায় 
ভিক্ষের ঝুল নিয়ে পথে বেরিয়েছে, এ নিয়ে এত জাঁক। সন্বেসী হওয়া মানে 
যেন কত বড় এক দিকপাল হওয়া । 

স্রান্তা ছেলেরা কেউ-কেউ িস্পনি কাটে । তোর বাবা তো মস্ত এটার্ন, আছস 
সবাই রাজার হালে, সখের পায়রা সেজে । তোদের বংশে আবার সম্বেসী! 

'ছাই জানিস।" গর্জে ওঠে নরেন : 'আমার ঠাকুরদা দূর্গাচরণ দত্ত সম্বেসী 
হয়োছলেন-__ 

মাত্র পণঁচশ বছর বয়েস, স্তর ও তিন বছরের শিশুপুতর বিশ্বনাথকে ত্যাগ করে 
দুর্গাচরণ চলে গেলেন প্রব্রজ্যা নিয়ে। 

বিশ্বনাথ তখন আট বছরের, তাকে নিয়ে তার মা কাশী চললেন। উদ্দেশ্য 
িশ্বনাথ-দর্শন। নৌকোয় যেতে দেড় মাস লাগল । যানি স্বামী হয়ে ত্যাগ করেছেন 


ও প্র হয়ে পূর্ণ করেছেন তাঁকে একবার দেখে আসবেন স্বচক্ষে । 
১০৯ 


বৃষ্টি হয়ে বিশ্বনাথের মান্দরের সমুখটা ছল হয়েছে। 1সপড় 'দিয়ে নামতে 
গিয়ে পড়ে গেলেন। 'মায় গির গিয়া বলে এক সাধু ছদ্টে এসে তাঁকে তুলে 
ধরল । 

কে এ সন্নেসী? সিশড়তে সযর়ে শুইয়ে দিতে যাবে চোখে-চোখে চাঁকত সংস্পশ' 
হয়ে গেল! এ যে দনর্গাচরণ! 

'মায়া হ্যায়, এ মায়া হ্যায় বলে উল সন্বেসী। দ্রুত পায়ে অন্তর্ধান করলে। 
সেই সন্বেসীরই নাতি নরেন্দ্রনাথ। 

বলে, 'এই, দেখ, তোর হাত দেখি।' 

যেন কতই পণ্ডিত, এমনি ভাবে সহপাঠীদের হাত দেখে । বলে, ছাই, কিচ্ছু নেই। 
তোর কিচ্ছ? হবে না_সম্বেসী হওয়া নেই তোর অদৃজ্টে।' 

সন্র্যাসী হওয়া মানে নরপাঁত হওয়া। আর, নরপাঁতর আরেক নামই নরেন্দু। 

'এই দ্যাখ, আমার হাতে কত বড় চিহ। আম নিঘঘাত সম্বেসী হব।' 

এ যেন প্রায় বিলেত যাওয়ার মত। আর সব ছেলেরা আবম্টের মতন চেয়ে 
থাকে। 

সন্বেসী হবার কি মজা, তাই তখন সবাইকে গল্প করে। তোরা ফিছুই জানিস নে, 
বড়-বড় সাধুরা সব 'হিমালয়ে থাকে, গভীর জঙ্গলের মধ্যে। কৈলাস পাহাড়ের 
উপর রোজ মহাদেবের সঙ্গে তাদের দেখা হয়। যাঁদ সম্নেসী হতে চাস, তবে 
প্রথম যেতে হবে সেই জঙ্গলে, সাধদের পায়ে মাথা খুড়তে হবে। ঘযাঁদ তাঁদের 
পরতে পাঁব গেরুয়া। 

কিসের পরীক্ষা? কেমনতরো পরাঁক্ষা 2 

পরীক্ষা খুব কঠিন। প্রত্যেককে একখানা করে বাঁশ দেবে । আর, সেই একখানা 
বাঁশের উপর শুয়ে ঘুমুতে হবে সারা রাত। পড়ে গেলেই ফেল। যাঁদ না পড়ে 
রাত কাটাতে পারিস তবেই সন্বেসী। তারপরেই একাঁদন কৈলাসে 'শিবদর্শন। 
মা ভুবনেশ্বরী প্রত্যহ শিবপুজা করেন। চারচারটি মেয়ে, দুটি আবার গত হয়েছে, 
একটিও ছেলে নেই। বীরেশবর শিব 'কি তাঁর মনের ইচ্ছাটি পূর্ণ করবেন না ? 
ইচ্ছা হয়ে 'যাঁন মনের মধ্যে ছিলেন। তাঁনই আঁবির্ভীত হলেন। অপূর্ব ্বঙ্গন 
দেখলেন ভুবনেশ্বর । যেন যোগীশবর শিব যোগনিদ্রা ছেড়ে পূত্ররূপে তাঁর দুয়ারে 
দাঁড়য়ে। 

বারো শো উনশত্তর সালের পৌষসংক্রান্তির দিন বিশ্বনাথের ছেলে হল। মা নাম 
রাখলেন বীরে*বর। সেই থেকে দাঁড়াল শবলে'। 

এ তো হল ডাক-নাম। ভালো নামের তলব পড়ল অন্নপ্রাশনের সময়। 

নাম দাও নরেন্দ্র। নরের মধ্যে ষে ইন্দ্র, তার নাম আবার কী হবে? এ হচ্ছে 
নরেম্বর, নরোত্তম। এ হচ্ছে নরাঁসংহ। 

দূর্দান্ত ছেলে। অস্টগ্রহর তার সঙ্গে-সঙ্গে ঘোরবার জন্যে দৃ-দুটো 'ঝি রেখে 
দিয়েছে বিশ্বনাথ । যাঁদ একবার রাগ হয় 'জনিসপন্র সব ভেঙে-চুরে ছারখার করে 
১১০ 


দেবে। তাকে শান্ত করা তখন এক বিষম সমস্যা। কিন্তু আভনব এক উপায় বের 
করেছেন ভুবনেশ্বরী! শব" বলে মাথায় একটু জল ছিটিয়ে দিলেই নাশ্চন্ত। 
ফুসমন্তরে ঠাণ্ডা। 

এক টুকরো গেরুয়া কাপড় কোপাীনের মত করে পরেছে নরেন। 

'এ কি? চমকে উলেন ভুবনেশ্বরী। 

'আঁম শিব হয়েছি।, 

চোখ বুজে ধ্যান করলেই মাথায় জটা গজায়, আর সেই জটা বটের শেকড়ের মত 
মাটির ভেতরে গিয়ে সেধোয়। এমনি চমৎকার একটা কাহিন কে বলেছে নরেনকে। 
তাই সে শিরদাঁড়া টান করে চোখ বুজে বসে খাঁনকক্ষণ আর থেকে-থেকে চোখ 
মেলে দেখে, জটা কত দূর নামল পিঠ বেয়ে। 

'মা, এত ধ্যান করাঁছ, জটা হচ্ছে কই ?' 

মা বলেন, 'জটা হয়ে কাজ নেই।, 

বাবা 'জগগ্েস করেন, বিড় হয়ে কি হবি রে বিলে?' 

'নর্বিতকণ উত্তর নরেনের : “কোচোয়ান হব।, 

চাবুক মেরে ঘোড়া ছুটিয়ে গাঁড় চালাব। চেতনার চাবুক । কর্ম আর ধর্ম দুই 
ঘোড়া । আর, জাড্য আর তামাঁসকতার গাঁড় । 

'ত্যাগ্ণ না হলে তেজ হবে না।" ব্রহমানন্দকে লিখছে বিবেকানন্দ : 'আমরা 
অনন্তবলশালী আআ-দেখ দিকি কি বল বেরোয়। কিসের দীনা-হীীনা? আম 
ব্রহম়ময়ীর বেটা । কিসের রোগ, কিসের ভয়, কিসের অভাব £ দীনা-হীনা ভাবকে 
কুলোর বাতাস 'দয়ে বিদেয় করো 'দিকি।...বীর্যমাঁস বীর্যং, বলমাঁস বলম,, 
ওজোহাস ওজঃ, সহোহসি সহো, মায় ধোহ। তুমি বীর্যস্বরূপ, আমাকে বীর্ধবান 
করো। তুমি বলস্বরূপ, আমাকে বলবান করো। তুমি ওজঃস্বরূপ, আমাকে 
ওজস্বী করো। তৃমি সহ্যশান্ত, আমাকে সহনশীল করো। রোজ ঠাকুর পুজোর 
সময় যে আসন প্রাতিষ্ঠা-আত্মানং অচ্ছিদ্রুং ভাবয়েং_ আতকে আঁচ্ছদ্র ভাবনা 
করবে__ওর মানে কিঃ ওর মানে, আমার ভেতরই সব আছে-আমার ইচ্ছা হলেই 
সমস্ত প্রকাশিত হবে।, 

ইচ্ছাঁটকে চাবুক করে মারো তোমার গাঁতহীন জড়ত্বের স্থূল 'পিন্ডে। বেগবান 
ঘোড়া ছাাটয়ে দাও! রজোগ্ণের ঘোড়া । 

আস্তাবলের সাহসের সঙ্গে ভাব করল নরেন। কিন্তু বিয়ে করে সাহসের বড় 
কণ্ট। 'বয়ের মত ঝকমার আর কিছ নেই। সারা জীবন সে ঝকমারির মাশুল 
যোগাতেই প্রাণান্ত। বালক নরেনের কানে মন্ত্র দিলে সহিস। আর, নরেনের কাছে 


সাহসই সর্বজ্ঞ। 
মনের মধ্যে ধাক্কা খেল আচমকা । এ বলে কী! যে রামসীতাকে নরেন এত ভক্তি 
করে তারা যে বিয়ে করেছে! রামসীতার ভালোবাসার কত গল্প শুনেছে সে 


মা'র কাছে! তবে সাহস যখন বলছে, বিয়ে খারাপ, তখন রামসীতাকে কি করে 
আর ভান্ত করা যায়? রামসীতার দুঃখে কাঁদিতে লাগল নরেন। মা কাছে আসতে 
১১১ 


তাঁর বুকের মধ্যে মুখ লুকয়ে আরো ফ:াপয়ে উঠল। মা বললেন, “তাতে কি: 
তুই শিবপুজো কর।, | 
বুকটা হালকা হয়ে গেল। ছাদের ঘরে উঠে রামসীতার মূর্ত সে তুলে নিয়ে এল: 
ছংড়ে ফেলে 'দিল রাস্তায় । রামসীতার আসনে বসাল শিবমৃর্তি। 


শহদ্ধস্ফ টিকসম্কাশ চন্দ্রশেখর । আদিমধ্যান্তশন্য শ্বেতশিখা। 
নরেন নিজে কী! 


'ও হচ্ছে পাতালফোঁড়া শিব। ও বসানো শিব নয়।' বললেন ঠাকুর : কারু পদ্ম 
দশদল, কারু ষোড়শদল, কারু বা শতদল। কিন্তু পদ্ম মধ্যে নরেন্দ্র সহম্্দল ।' 
আর নরেন্দ্র কী বলছে? 

দাদা, না হয় রামকৃষ্ণ পরমহংস একটা মিছে বস্তুই ছিল, না হয় তাঁর আশ্রিত 
হওয়া একটা বড় ভুল কর্মই হয়েছে, কিন্তু এখন উপায় কি? একটা জন্ম নয় 
বাজেই গেল, মরদের বাত কি ফেরে? দশ স্বামী কি হয়? তোমরা যে যার 
দলে যাও, আমার কোনো আপান্ত নেই, কিছুমাতও নেই, তবে এ দুনিয়া ঘুরে 
দেখাঁছ যে, তরি ঘর ছাড়া আর সকল ঘরেই “ভাবের ঘরে চুরি।” তাঁর জনের 
উপর আমার একান্ত ভালোবাসা, একান্ত বি*বাস। কি করব ? একঘেয়ে বলো বলবে, 
কল্তু এট আমার আসল কথা৷ যে তাঁকে আত্মসমর্পণ করেছে, তার পায়ে কাঁটা 
ি'ধলে আমার হাড়ে লাগে ।...তাঁর দোহাই ছাড়া কার দোহাই দেব? আসছে 
জন্মে না হয় বড় গুরু দেখা যাবে, এ জন্ম এ শরীর সেই মূর্খ বামুন কিনে 
নিয়েছে । 

জাত কাকে বলে বালক নরেন বড় ফাঁপরে পড়েছে । জাত না মানলে কাঁ হয়ঃ 
ছাদ-দেয়াল ক ভেঙে পড়ে £ জাত যে যায়, কি করে যায়, কোন পথে? ও কি 
টাকা-কঁড় যে চুর যায়? না, জামা-কাপড় 'ছ্ড়ে যায়ঃ একবার দেখলে হয় 
পরীক্ষা করে। 

নানারকম মন্কেল আসে বি*বনাথের বৈঠকখানায়। জাত মেনে আলাদা-আলাদ৷ 
হঠকো। বৈঠকের উপর সার-সার বসানো । এটা শহম্দুর এটা বামুন এটা মসলমান। 
মুসলমানের হঠকোতেই আগে টান 'দিল নরেন। 

"ও কি হচ্ছে রে? বাবা কখন হঠাৎ এসে পড়েছে ঘরের মধ্যে। 

“দেখাঁছ কোনখান 'দয়ে জাত যায়ঃ যাকে ছোট করে রেখোঁছি তাকে ছলে কী 
হয়? 

কী হয়? সে হাতে হাত দিয়ে পাশে এসে দাঁড়ায়। জাতটা নিমেষে বড় হয়ে ওঠে। 
দেশ দুশো কদম এগিয়ে যায়। 

'বলি, শশীবাবূকে মালাবারে যেতে বোলো ।” রাখালকে চিঠি লিখছে নরেন : 
“সেখানকার রাজা সমস্ত প্রজার জাম ছিনিয়ে নিয়ে ব্রাহন্ণগণের চরণার্পণ করেছেন, 
গ্রামে-গ্রামে বড়-বড় মঠ, চর্বচোষ্য খানা, আবার নগদ ।...ভোগের সময় ভ্রাহনণেতর 
জাতের স্পর্শে দোষ নেই- ভোগ সাঙ্গ হলেই স্নান।...পয়সা নেবে, সর্বনাশ করবে, 
আবার বলে ছঃয়ো না ছংয়ো না। আর কাজ তো ভাঁর-__আলুতে-বেগ্‌নে যাঁদ 
১১৯২ 





পরঘপুর্ষ শ্রীশ্রারামকৃফ ২য় খ" নরেন্দুনাথ 


এঠাকা্জাক হয়, তা হলে কতক্ষণে ব্রহমাণ্ড রসাতলে যাবে!...মহা দক সামনে-_ 
লবধান, এঁ দ'কে সকলে পড়ে মারা যাবে_এঁ দক হচ্ছে ষে "দুর ধর্ম বেদে 
-ই, পুরাণে নাই, ভক্তিতে নাই, ম্যান্ততে নাই-ধর্ম ঢূকেছেন ভাতের হাঁড়িতে। 
“হস্দুর ধর্ম বিচারমার্গেও নয়, জ্ঞানমার্গেও নয়, ছঠংমার্গে। আমায় ছঃয়ো না, 
শ্রামায় ছঃয়ো না। এই ঘোর বামাচার ছ:ংমার্গে পড়ে প্রাণ খুইও না। "আত্মবং 
সবভুতেষ্ূ” কি পধথতে থাকবে নাকি? যারা এক টুকরা রুটি গাঁরবের মূখে 
“নতে পারে না তারা আবার মাস্তি কি দিবে! 

নরেন্দ্র সভায় থাকলে আমার বল।' বললেন তাই ঠাকুর : 'ও বড় ফুটোওলা বাঁশ। 
ধুব আধার-অনেক জিনিস ধরে। 

₹ণগুল্মের দেশে মাঝে-মাঝে বিস্ময়কর বনস্পাতির দেখা মেলে। নরেন্দ্রনাথ 
বনস্পাঁতর দেশে দেবতাত্মা নগ্রাঁধরাজ। 

সার সেই যে হিমালয় তার উধের্ বিরাজত যে মানস-সরোবর--নিবাত-নিচ্কম্প 
শলকান্ত প্রশান্ত অমৃত-হুদ, তিনিই শ্রীরামকৃষ্ণ । 





₹"ট সৈন্য সঙ্গে নিয়ে পথ চলে নরেন। তারা হচ্ছে-কি আর কে, কবে আর 
'নাথায়, কেন আর কেমন করে 2 সব সঙিন-ওচানো সাল্লী। 

কউ একটা কিছ বলবে আর তখুনি ঘাড় কাং করে মেনে নেবে এমনাট কখনো 
হবার নয়। যদ থাকে তো দেখাও । বেশ তো, কোথায় ? চলো আমার সঙ্গে। কেন 
*বরকে ডাকবো 2 কেন মানবো তোমাকে 2 তুমি কেট ঈশ্বরই বা কি? যাঁদ 
টবোই উপরে, কেমন করে উঠবো ? 

'শব চাঁপাফুল ভালোবাসে । তাই নরেনও ভালোবাসে চাঁপাফুল। 

পড়ার কোন এক ছেলের বাঁড়তে চাঁপা গাছ আছে, যখন-তখন তার ডালে বসে 
শেল খায় নরেন। গাছ তো ভাঙবেই, ডানাপটে ছেলেটাও জখম হবে। 

ও গাছটায় উঠো না।' বাঁড়র বুড়ো মালিক ভারিক্ধি গলায় বারণ করলে। 

ক হয় উঠলে? 

এখন শুনে মালিক চমকে উঠল। ভাবলে শান্ত কথায় হবে না, ভয় দেখাতে হবে। 
বললে, 'ও গাছে ব্রহয়দাত্যি থাকে ।' 

৪1৬৮) ১১৩ 


চে 


সি 


4 


“ক রকম দেখতে ব্লহমদাত্য ?' 

ওরে বাবাঃ, ভয়ঙ্কর দেখতে । নিশাত রাতে শাদা চাদর মুড়ি দিয়ে ঘরে 
বেড়ায়। 

“ঘুরে বেড়াক না।' নরেনের মুখে নিটোল নার্লাপ্তি : তাতে আমার কি!' 
'তোমার কি মানে 2 যারা এঁ গাছে চড়ে তাদের সে ঘাড় মটকে দেয়।' 

রাত করে চুঁপ-চুপি চলে এসেছে নরেন। বড় ইচ্ছে শাদা চাদর-পরা রহমদৈতার 
সঙ্গে দেখা হয়। সহপাঠী ছেলে বাধা দিতে এল নরেনকে। বললে, 'না ভাই 
অমন কাজ কারস নে। নিঘঘাত তবে তোর ঘাড় মটকাবে।' 

নরেন হেসে উঠল উচ্চরোলে। 'লোকে একটা কিছু বললেই বিশ্বাস করতে হবে; 
পরাক্ষা করে দেখব না নিজে?" বলেই সে গাছের ডালে চড়ে বসল। 

নিজে যাচাই করে দেখব । যাচাই করে দেখব বুদ্ধির কামন্টপাথরে যান্তর সোন 
ঘষে-ঘষে। বইয়ে লেখা আছে বলেই সত্য, ভালোমানুষের মত তা মানতে পারব 
না। নিজে পরীক্ষা করব। সত্য কি এতই সোজা 2 বিলেত আছে, এ বললেই হবে: 
যেতে হবে বিলেতে। পরের মুখে ঝাল খেতে পারব না। ঝালের প্রমাণ চাই। 
'ঈশবর মানুষ হয়ে আসেন এ বললেই হবে ?' নরেন্দ্র গে উঠল : প্রমাণ চাই । 
গিরীশ ঘোষ বললে, ব*বাসই প্রমাণ। এই জানসটা যে এখানে আছে তার প্রমাণ 
কিঃ বিশ্বাসই প্রমাণ ।' 

'আমি প্রুথ চাই- প্রুফ চাই ।' নরেন্দ্র আবার হুঙ্কার ছাড়ল। 'শাস্তই বা বিশ্বাস 
কার কেমন করে; একেক জন একেক বলছে । যার যা মনে এসেছে তাই-_' 
ঠাকুর বললেন, 'গীতা সব শাস্বের সার। সন্নেসীর কাছে আর কিছু থাক না থাক, 
ছোট একখান গতা অন্তত থাকবে ।' 

একজন ভন্ত গদ্গদ হয়ে উঠল : 'আহা, গীতা- শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন__ 

'্রীক্ণ বলেছেন, না ইয়ে বলেছেন-__' ঝাঁজয়ে উঠল নরেন। 

হাতি যখন দোঁথনি, তখন সে ছঃচের ভেতর 'দয়ে যেতে পারে না কেমন করে 
জানব ?' বললে ভবনাথ। 'ঈম*বরকে যখন জানি না তখন তিনি মানুষ হয়ে অবতার 
হতে পারেন কিনা কেমন করে বুঝব বিচার করে ?' 

নরেন বললে, 'আম 'বচার চাই। ঈশ্বর আছেন, বেশ; 'কন্তু তান কোথাও 
ঝূলছেন এ আম মানতে পারব না।' 

“সবই সম্ভব।' বিস্ময়-সৃস্মিত মুখে বললেন ঠাকুর, শতাঁন ভেলাক লাগিয়ে 
দেন। বাজকর গলার ভেতর ছার চালায়, আবার বার করে। ইট-পাটকেল খেয়ে 
ফেলে।' 

তবু বাঁজকরই সত্য। আর সব ভেলকি। 

বাঁজকর আর তার বাঁজি। ভগবান আর তাঁর এমবর্য। বাবু আর তার বাগান: 
বাঁজ দেখে লোকে অবাক, কিন্তু বাঁজ ক্ষাণকের, এই আছে এই নেই-বাজিকরই 
সত্য। এ্বর্য দুদিনের, ভগবানই সত্য । বাগান দেখেই ফিরে যেও না, বাগানের 
মালক-বাবুর সন্ধান করো। 

৯১১৪ 


বনের বয়স তখন এগারো, গঙ্গার ঘাটে ইংরেজের মানোয়ারী জাহাজ এসেছে। 
7 দেখে আসি। 

£কন্তু ঘাটের বড় সাহেবের দস্তখতা ছাড় চাই। ওরে বাবা, গিয়ে কাজ নেই। 
ক দাঁড়াবে ওই লালমুখো জাদিরেলের কাছে ? কথা কইবে কে? ঘরের ছেলে ঘরে 
1ফরে চল্‌। 

সামনের 1সশড়তে প্রত্যক্ষ বাধা । 'পছনের দিকে লোহার আরেকটা সরু 'সশড়। 
দেই সিপড় দিয়েই সটান উঠে গেল নরেন। একবার উঠি তো উপরে, তারপরে 
ঠিক ধরে ফেলব সাহেবকে । যা ভেবোছিল নরেন। পর্দা-ফেলা ঘরে সাহেব বসে 
আছে। পদ্ণ সরিয়ে সটান ঢুকলো নরেন। সাহেব তো অবাক। অবাক যখন হয়েছ 
তখন অবাক থেকেই আলগোছে সই করে দাও একটা । 

পাশ নিয়ে সামনের পড় দিয়েই বুক ফ্যালয়ে নেমে এল নরেন। প্রহরী তো 
দবাক। জিগ্গেস করলে, "তুম ক্যায়সে উপরমে গিয়া 2" 

নরেন শুধু বললে, 'হাম জাদু জানতা ।, 

বাবার সঙ্গে রায়পুর যাচ্ছে নরেন- নাগপুর পযন্তি স্রেনে গিয়ে, সেখান থেকে 
গরুর গাঁড় । গরুর গাঁড়র রাস্তা প্রায় পনেরো দিন। তাই চলেছে নরেন। চলেছে 
বন্ধ্যাচলের গা ঘে'ষে। ঘন অরণ্যের পথ বেয়ে। একখানা গরুর গাঁড়তে নরেন 
একা । অন্য গাঁড়তে তার মা আর ছোট ভাইয়েরা । 

চর দিকে বিরাটের রূপ। যে দিকে তাকাও সেই দিকেই বিরাট আসন পেতে 
বসেছেন। বসেছেন পর্তশৃঙ্গে, বসেছেন গহন অরণ্যানীতে । তা ছাড়া সেই মহা- 
শল্পীর সূক্ষ্ম কারুকাজও ছাড়িয়ে রয়েছে এখানে-সেখানে । পন্রে-পুজ্পে, কঠিনের 
গয়ে কোমলের আলিম্পনে। হঠাৎ একটা মৌচাক নরেনের চোখে পড়ল । পাহাড়ের 
5ড়া থেকে শুরু করে প্রায় মাটি পর্যন্ত দীর্ঘ এক ফাটল জুড়ে বরাট মৌচাক। 
কত তিল-[তিল পারশ্রম, কত িন্দু-ন্দু মধু_-আঁদ-অন্তের ইয়ন্তা করা যায় না। 
ননন্তের ভাবে তলিয়ে গেল নরেন। 

তাকাও তেমান একবার এ অন্তরীক্ষে। রান্রির তারকাময় আকাশে । সমুদ্রতটের 
ললুকণার মত জ্যোতির কাঁণকা। একেকটা কণিকা দেদীপামান সূর্যের চেয়ে বড়। 
এমান কত যে স্ফাঁলঙ্গ, বিজ্ঞানের কোনো ল্যাবরেট্যারিতেই গণনা করা যায়নি । 
তার মধ্যে এক কণা ধূলির মতো এই পাঁথবী। এ সবের মানে কি! তাও কি 
সবাই 'স্থর হয়ে আছেঃ ছটেছে দুর্দান্ত বেগে । সে যে কত বড় মহাশুন্য কে 
তার সীমাসীমান্ত খুজে পায়! কেন এই জ্যোতিরিষ্গন 2 কেন এই সর্বতশ্চক্ষু 
মাকাশ 2 রান্রর পৃন্ঠায় সের হইীঞ্গতঁটি সে ছিলখে রেখেছে স্পন্টাক্ষরে 2 
কেন? কার জন্যে? 

সেই মৌচাক দেখে প্রথম ধ্যানাবিষ্ট হল নরেন। 

এন্ট্রান্স পাশ করে ঢুকল এসে কলেজে । নড়ে-ভোলা ছেলে নয়, দুঃসাহস, 
চ্রাহাঁবাজ ছেলে । এঁদকে আবার স্ফৃর্তবাজ, রঙ্গাঁপ্রয়। অপাঁরমিত জীবনের 
উজ্জ্বল উচ্ছবাস। সব মলে আবার নির্মলতা আর পাবন্রতার দীস্ত 'িগ্রহ। 


১১৫ 


শুধু তাই? গান গায় নরেন। মৃদঞ্গ বাজায়। নৃত্য হচ্ছে বীরোচিত কলা। নাচে 
তাই স্বচ্ছন্দে। স্বভাবসৌন্দর্যে । তাশন্ডবাপ্রয় ?শব যেন মেতেছেন উদ্ধত নৃত্যে। 
ফাস্ট আর্টস পাশ করে বি-এ পড়তে লাগল নরেন। কিন্তু পড়ার উদ্দেশ্য কি: 
শুধু পরীক্ষা পাশ করা ? না, জ্ঞানার্জন 2 কিন্তু জ্ঞানই বা বলে কাকে? 

মাস্তজ্ক-প্রসৃত কোনো তত্বের এক কণামান্র-তাও খাঁট জিনিস নয়- সেই 'চন্তার 
বদহজম খানিকটা ক্রমাগত আওড়াচ্ছ, আর তোমাদের প্রাণমন সেই 'তাঁরশ টাকার 
কেরাণীগারর দিকে পড়ে রয়েছে । না হয় খুব জোর একটা দুষ্ট ডাকল হবার 
মতলব করছ। এই ভারতাঁয়গণের সর্বোচ্চ দুরাকাত্ক্ষা। আবার প্রত্যেক ছাত্রের 
আশে-পাশে একপাল ছেলে-তাঁর বংশধরগণ- বাবা খাবার দাও, খাবার দাও করে 


উচ্চ চীৎকার তুলেছে । বাল, সমুদ্রে কি জলের অভাব হয়েছে যে তোমাদের বই 
গাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপ্লোমা প্রভাতি সমেত তোমাদের ডুবিয়ে ফেলতে 
পারে না? 


ব-এ-তে দর্শন 'ছিল নরেনের। এক 'দকে হাবাঁর্ট স্পেনসার, কান্ট আর মিল, 
অন্য 'দকে ভারতবর্ষ-_হন্দুদর্শন। তত্ব আর তক য্যান্ত আর কল্পনা । কি হবে 
দর্শনে 2 দর্শন পড়ে কী দর্শন করব? সত্য-দর্শন চাই। 

সত্যমেব জয়তে নানৃতং, সত্যেনৈব পন্থা বততো দেবযানঃ। 

“যৌবন ও সৌন্দর্য নশ্বর, জীবন ও ধনসম্পান্ত নশ্বর, নাম-যশ নশ্বর, এমন কি 
পর্বতও চূর্ণবিচূর্ণ হইয়া ধূলিকণায় পারণত হয়, বন্ধৃত্ব ও প্রেমও অচিরস্থায়ী, 
একমান্ত্র সত্যই চিরস্থায়ী । হে সত্যর্পী ঈশ্বর, তুমিই আমার একমান্র নিয়ল্তা 
হও ।...এই মুহূর্ত হইতে আম ইহামূত্রফলভোগাববাগন হইলাম-ইহলোক এবং 
পরলোকের যাবতীয় অসার ভোগানিচয়কে পাঁরত্যাগ কারলাম। হে সত্য, একমাত 
তুমিই আমার পথপ্রদর্শক হও। আমার ধনের কামনা নাই, নাম-যশের কামনা নাই, 
ভোগের কামনা নাই । ভা্গিন, এ সকল আমার নিকট খড়-কুটা__' 

শুধু গুরণ্বিচার করে চলেছি। শুধু বর্ণনা আর অনূমান। শুধু কীর্তন 
আর কল্পনা । আগে দেখি, পরে গুণ-বিচার করব। আগে দর্শনধারী পিছে 
গুণ-বিচার। 

দেবেন ঠাকুরের কাছে উপস্থিত হল নরেন। বললে, “আপনি ঈশ্বর দেখেছেন ?' 

চোখ বুজে ধ্যান করাছলেন মহার্ধ। এক উত্তোজত উন্মাদ কণ্ঠে তাঁর ধ্যান 
ভাঙল । চেয়ে দেখলেন, নরেন। ষে ব্রাহমসমাজে যাতায়াত করছে, নাম 'লাঁখয়েছে 
খাতায়, যোগ-ধ্যানের ক্লাশে ভার্ত হয়েছে ক' 'দিন। 

"দেখেছেন আপনি ঈশ্বর ?' 

যেন ভাগবত দীপ্ততে জবলছে। হাঁ-না উত্তর দিতে পারলেন না মহার্ধ। শুধু 
বললেন, তামার চোখ দুটি কী উজ্জ্বল! যেন যোগনীচক্ষু।, 


তা দয়ে আমার কী হবে! যে অন্ধকারে আম তাঁকে খুজছ সেখানে ক করবে 
৯১৯১৬ 


চর্মচক্ষু ; আলোয় আলোকময় করে কি তিনি দেখা দেবেন ষে চোখ মেলেই তাঁকে 
দেখব? দেখব তাঁকে পাতায়-ফুলে ঘাসে-শাশিরে আকাশে-তারায়, প্রতিটি মানুষের 
মুখে! 

কেশব সেনকে প্রকাশিত করেছেন মহার্ষ, উদ্ভাঁসত করেছেন। যে ছিল মৃত্প্রদীপ 
তাকে করেছেন ভাস্বতাঁ শিখা । মহাকাব প্রকীতিকে মানবায়িত করে, মহার্ধ মানুষকে 
ঈ*বরায়ত করেছেন। কেশব যাঁর কীর্ত, তিনিও দেখেনান ঈশ্বরকে ? 

বড় হতাশ হল নরেন। মনের আকাশে যে ঝড় উঠেছে তাতে মুছে যাচ্ছে আকাশের 
শাশবতী স্থাত। তবে কি তিনি নেই? তবে কি তিনি দর্শনের অগোচর ? 

কেন এসোছল সে দর্শনের সংস্পর্শে ? ধর্মের অনুসন্ধানে ? সে কি এই মেঘজালের 
মধ্য থেকে পথ পাবে নাঃ সে কি জ্যোতির তনয় নয়ঃ 

'বশবাস, বিশ্বাস, সহানুভঁতি-আগ্নময় বিশ্বাস, আগ্নময় সহানুভাঁত।' পাবে 
নাকি সে সেই তপ্ত তাঁড়ত স্পর্শ? এমন কি কেউ নেই যিনি তাকে বলবেন 
নরল সত্যের সহজ স্ফৃর্তিতে : 'তাঁকে দেখোছি বই ি। তোকে যেমন দেখাছি 
চোখের উপর, তেমনি । স্পন্ট, স্থূল, সাবয়ব।' 

'দেখেছ 2" চমকে উঠবে নরেন, কিন্তু এমন প্রাণময় সারল্যের সঙ্গে 'তাঁন বলবেন 
বে নরেন তাঁকে বিশ্বাস করবে। সে আগনময় আন্তারকতার কাছে তার সংশয়ের 
ফণা সে নত করবে। 

'শুধু দেখোছি ? তাঁর সঙ্গে খেয়েছি, কথা কয়োছ, শুয়োছ একসঙ্গে ।' 

'বলো 'ক, দেখাতে পারো আমাকে ?2' লাফিয়ে উঠবে নরেন। 

'আমাকে দেখাতে হবে না। তুই নিভেই দেখতে পারবি ।' বলবেন সেই সর্বানুভূ : 
'"তার এমন চক্ষু তুই দেখাব নে 2" 

কোথায়, কোথায় তান £ 





ওরে অন্তরে আয়, ঘুচে যাবে সব অন্তরায়। 
রাম দণ্ডের বাঁড়তে রামকৃষের বসবার জন্যে একখানা বিলিতি গালচে হয়েছে। 
হয়েছে তাকয়া। ডান হাতের কাছে কাঁচের গেলাশে জল। এড়ানশ পাখা 'দিয়ে বাতাস 
করছে কেউ। 

১১৭ 


কোঁচার কাপড় ফেটি করে কোমরে বাঁধা । জামাটি কখনো গায়ে আছে, কখনো বা 
কতক্ষণ পরেই খুলে ফেলছে । কখনো বা কোচাটি খুলে লম্বা চাদরের মত করে 
কাঁধের উপর ফেলা। 

রাম দন্ত আর মনোমোহন প্রথম আরম্ভ করল কার্তন। খোল-করতাল নেই। 
মাঝে-মাণ্ডে শুধু রামকৃষ্ণ হাততালি দেয়। সেই হাততালিই যেন সূর্যচন্দের 
করতাল। 


'মন একবার হার বল হার বল, 
জলে হার থলে হরি, অনলে-আনিলে হরি__- 


ভাবাবেশে কখনো দাঁড়য়ে পড়ে রামকৃষ্ণ। নৃত্য করে। সে নরনূত্য নয়, অমর-নৃতা' 
স্পন্দনের সঙ্গে স্থৈর্য। যাকে বলে 'সাম্যস্পন্দন'। কতক্ষণ পরে একেবারে সমাধি। 
শরীর থেকে শান্ত বেরুচ্ছে, সূর্যের যেমন বিভা । সমস্ত ঘর-দালান ভেসে যাচ্ছে। 
জানলা 'দয়ে বোরয়ে ঢেউ খেলছে গাঁলতে। 

একবার বিজয় গোস্বামীকে বলোছল নাগ-মশাই : এখানে এসে চোখ বুজে বসেছ 
কেন? দেখতে এসেছ, চোখ খুলে দেখ প্রাণ ভরে। এখানে জপধ্যানও বন্ধন। 
শুধু উন্মীলনই মুক্তি ।' 

চোখ খুলল বিজয়। 

'ঈশবরকে লাভ করতে হলে, তাঁকে দর্শন করতে হলে, শুধু ভান্তি হলেই হয়? 
জগগেস করল বিজয়। 

“হ্যাঁ, পাকা-ভন্তি, প্রেমা-ভান্তি, রাগ-ভান্ত।' বললেন ঠাকুর, 'সোজা কথা, ভালোবাসা। 
যেমন ছেলের মা'র উপর ভালোবাসা । যতক্ষণ না এই ভালোবাসা জন্মায় ততক্ষণ 
ফটোগ্রাফের কাঁচে কালি মাখানো হয় না। ফটোগ্রাফের কাঁচে কাল মাখানো থাকলেই 
যা ছাব পড়ে তা রয়ে যায়। কিন্তু শুধু-কাঁচের উপর হাজার ছাঁব পড়ুক, একট?ও 
থাকে না__একটু সরে গেলেই যেমন কচি তেমনি কাঁচ।, 
"ভালোবাসা এলে কী হয়? 

“ভালোবাসা এলে স্মী-পুন্ন আত্মীয়-স্বজনের উপর সে মায়ার টান থাকে না, দয়া 
থাকে । সংসারকে বিদেশ বোধ হয়, শুধু একটা কর্মভাঁম, রঙ্গভামি ছাড়া ছা 
না- কেবল একরাশ কাঠিই লোকসান হবে। বিষয়াসন্ত মনই ভিজে দেশলাই-_ 
তাই শ্রীমতী যখন বললেন, জগৎ-সংসার আম কৃষময় দেখাছ, তখন সখারা বললে, 
ভুমি এ কাঁ প্রলাপ বকছ! কই আমরা তো তাকে দেখতে পাচ্ছি না। শ্রীমতাঁ 
বললেন, সাঁখ, নয়নে অনুরাগ-অঞ্জন মাখো, তাকে দেখতে পাবে। 
অনুরাগের এম্বর্ধ কি কি? 

অনুরাগের এঁশ্বর্য বিবেক, বৈরাগ্য, জীবে দয়া, সাধু সেবা, সাধু সঙ্গ, ঈশ্বরের 
নাম-গুণকীর্তন, সত্য কথা-_এই সব। 

১১৮ 


এই সব লক্ষণ দেখলে ঠিক বলতে পারা যায়, ঈম্বরদর্শনের আর দৌর নেই। 
ববু কোনো খানসামার বাড়ি যাবেন এরূপ যাঁদ ঠিক হয়ে থাকে, তাহলে সেই 
খানসামার বাড়ির অবস্থা দেখেই ঠিক-ঠিক বুঝতে পারা যায়। প্রথমে বন-জঙ্গল 
কাটা হয়, ঝূলঝাড়া হয়, ঝাঁটপাট দেওয়া হয়। বাবু নিজেই সতরাঁণ গুড়গাঁড় এই 
সব পাঁচ রকম জিনিস পাঠিয়ে দেন। এই সব আসতে দেখলেই লোকের বুঝতে 
বক থাকে না, বাবু এই এসে পড়লেন বলে।' 

কিন্তু হাজার চেম্টা করো, তাঁর কৃপা না হলে কিচ্ছু হবার নয়। তান কৃপা না 
করলে তাঁকে দেখা তোমার সাধ্য কি। 

'সাজনি সাহেব রাত্রে আঁধারে লণ্ঠন হাতে করে বেড়ায়-তার মুখ কেউ দেখতে 
পায় না। কিন্তু এ আলোতে সে সকলের মুখ দেখে, আর-সকলেও পরস্পরের 
মুখ দেখে। যাঁদ কেউ সাজনকে দেখতে চায়, তাহলে তাকে প্রার্থনা করতে হয়। 
বলতে হয়, সাহেব, কৃপা করে একবার আলো নিজের মুখের উপর ফেরাও, 
তোমাকে একবার দোখি।' 

একটা মাতাল এসেছে রাম দত্তের বাড়িতে । নাম বিহারী ঘোষ । 

'রাম দাদা, বলতে ক, চাটের পয়সা জোটে না, শুধু মদ খেয়ে বেড়াই 

'আজ সম্ধ্যের সময় আঁসস। তোকে লুচি আলুরদমের চাট খাওয়াবো ।' 

সেই সন্ধ্যের সময় এসেছে বিহারী । দেখলে বৈঠকখানায় ভিড়, কাকে ঘিরে 
উত্তোজত স্তব্ধতা । 

ও সব বুঝি না। আমাকে আমার লুচি আলুরদমের চাট কখন দেবে £ বকতে লাগল 
বিহারী। 

কে একজন বললে, 'যা, পরমহংসদেবকে প্রণাম কর্‌ গিয়ে- 

মাতালের কি খেয়াল হল ঘরে ঢুকে প্রণাম করলে। 

সেই হল তার চরম চাট খাওয়া । 

এখন শুধু অঝোরে কাঁদে আর বলে, 'ভাই, শুধু তাঁর কথা বলো। আর কিছু 
ভালো লাগে না। মাতাল ছিলুম, লুচি আলুরদমের চাট খেতে চেয়েছিলুম, কিন্তু 
তিনি কী করে দিলেনঃ তাঁকে ছাড়া আর কিছু মনে আসে না। হায়, এমন 
অমূল্য রতন হাতে প্বেয়ে তখন কিছু বুঁঝান-লুচি আলুরদমের চাটকেই 
জীবনের সার ভেবেছিলুম-_' 

সেসব দিনের নিমন্ণে তরকাঁরতে নুন দেওয়া হত না। আলূনি তরকারির 
শে আলাদা করে নূন থাকত পাতে। রামকৃষকে নিয়ে সকলে যখন পাত 
ভোজনে বসছে, তখন চলবে নূন-দেওয়া তরকার। রাম দত্তের বাড়িতেই প্রথম 
নিয়মভগ্গ হল। একসঙ্গেই আহার চলল সকল শ্রেণীর। রামকৃষ্ণ এক ফ:য়ে উড়িয়ে 
দিল জাতাজাতি। বললে, 'ভীন্তর মধ্যে আবার জাত 'কি? সব একাকার ।' 

বন্যার জল যখন এসে পড়েছে তখন কে আর আল-পথ খুজে বেড়ায়? 
মেয়েরাও আসছে দলে-দলে। এ এক অভিনব ব্যাপার । মূন্ত অঙ্গনে জ্যোতির্ময়কে 


দেখবার 'িপাসায় বোরয়ে আসছে পর্দার ঘেরাটোপ থেকে । আরো আশ্চর্য, কেবা 
১১৯ 


পুরুষ কেবা স্ী-কারুই কোনো দেহজ্ঞান নেই। সবাই একদুস্টে তাকিয়ে থাকছে 
মুখের দিকে। রামকুষ্ণের সঙ্গে-সঙ্গে আর সবাইও যেন বিদেহ হয়ে গিয়েছে। 
হাঁটু দুটি উষ্চু করে আসনখানির উপর বসে আহার করে রামকৃষ্ণ । স্মী-পুরুষ 
কাতার দিয়ে দাঁড়য়ে তাই দেখে। 

'আগে কাপড় ঠিক থাকত না, বেভুল বে-এন্তিয়ার হয়ে থাকতাম । এখন সে ভাবটা 
প্রায় গেছে-+ বলতে-বলতেই কখন 'দিগ্বসন হয়ে গেল রামকৃষ্ণ । 'বিরন্ত হয়ে 
বললে, 'আরে ছ্যাঃ, আমার ওটা আর গেল না-- 

ণকল্তু যারা দাঁড়য়ে আছে সামনে, সবাইর অতীন্দ্রিয় ভাব। মেয়েরা পর্যন্ত 
ধনঃসঙ্কোচ। একটি ছোট শিশু যাঁদ উলঙ্গ হয়ে যায় তবে মা কি কুশ্ঠিত হন £ 
“আমি মাঝে-মাঝে কাপড় ফেলে আনন্দময় হয়ে বেড়াতাম।' বললেন ঠাকুর। 
শম্ভু এক দিন বলছে, 'ওহে তুমি তাই ন্যাংটো হয়ে বেড়াও-বেশ আরাম! আম 
এক 'দন দেখলাম ।' 

কাছেই দাঁড়য়ে ছল সুরেশ মীত্তর। বললে, 'আফস থেকে এসে জামা চাপকান 
খোলবার সময় বাঁল- মা, তুমি কত বাঁধাই বে'ধেছ ।' 

'অম্ট পাশ আর 'তন গুণ "দিয়ে বেধেছে" 

রামকৃষ্ণ শিশু। 

'মাইীর, কোন শালা ভাঁড়ায়-- বালকের মতই শপথ করে মাঝে-মাঝে। 

'বিষয়ী লোকদের সঙ্গে কথা বলতে কম্ট বোধ হত বলে হৃদেকে 'দয়ে পাড়ার 
ছোট-ছোট ছেলেদের ধরে আনতুম। খাবার-খেলনা দিয়ে ভুলিয়ে খেলা করতুম 
তাদের সঙ্গে। বেশ খেলছে, যাই একবার বললে, মা যাব, শালার ছেলেকে আর 
কে ধরে রাখে! তখন আবার হৃদেকে 'দয়ে তার মা'র কাছে পাঠিয়ে 'দিই। 
মানুষের যাঁদ এমান টান হয় ভগবানের উপর, তাহলে কেউ আর তাকে রুখতে 
পারে না।' 

কঁটর বসনখানি কখন বগলের নিচে চলে এসেছে। যুবক ভস্তদের লক্ষ্য করে 
বলছেন ঠাকুর, 'তোরা সব ইয়ং বেঙ্গল আসা অবাধ আম এত সভ্য হয়োছ যে 
সব সময়েই কাপড় পরে থাকি । 
“এই আপনার কাপড় পরা 2" 
'মাইর আমি সভ্য হয়েছি-_”" 
তখন তাঁর গা ছঃয়ে দেখানো হল তিনি সাঁত্যই দিগবসন। 

করুণ স্বরে বললেন ঠাকুর, মনে তো কার সভ্য হব কিন্তু মহামায়া যে অঙ্গে 
বসন রাখতে দেন না। সে দি আমার অপরাধ 2 

প্রলয়পয়োধিতে বটপত্রের উপর শিশু নারায়ণ শুয়েছেন। তেমনি শয়েছে রামকৃ্ণ। 
দু পায়ের দু বড়ো আঙুল মুখের মধ্যে চুকিয়ে দিয়ে শিশুর মত আনন্দ করছে। 
বালক-ভাবের চরম। 

আবার কখনো শ্রীমতীর ভাব ধরে। অল্প পথ হে'টেই ক্লান্তিতে ঢলে পড়ে। 


রাখালের কাঁধে ভর 'দিয়ে আস্তে-আস্তে যেতে-যেতে গান ধরে রামকুফ্ণ। “আর 
১২০ 


চলতে নারি, চরণ বেদন যে হল সাঁখ! সে মথুরা কত দূর! 

সে মথুরা কত দূর! কোথায় সে প্রেমের অমরাবতী! 

সুবল একটা বাছুর বুকে নিয়ে জাটলার কাছে উপাঁস্থত। বললে, 'মা একটু 
জল খাব।' 

গোষ্ঠমলন গান হচ্ছে। গাইছে নরোত্তম কীর্তৃনে। 

জাঁটলা বললে-_গানের সুরে_-সুবল রে, তোর সবই গুণ ।' 

অমনি রামকৃষ্ণ আখর দিল : তবে কালার সঙ্গে বেড়াস, ওই যা দোষ-_' 
'পাকশালায় যাও, বধূর কাছে জল পান করবে ।' বললে জাঁটলা। 

'সুবল তাই তো চায়_' আখর দিল রামকৃ্ণ। 

বান্নাঘরে সুবল গিয়ে দেখে উনুনের ধোঁয়ার ছলে শ্রীমতণ কৃষ্ণ বিরহে কাঁদছে। 
সুবলকে দেখে চাঁকতে ব্যাপারটা বুঝতে পারল শ্রীমতী । সমরুপী সুবলের সঙ্গে 
তাড়াতাড়ি বেশ পাঁরবর্তন করল। বললে, গানের সুরে-'সৃবল, সবই হলো, আম 
যে নারী, কিরূপে বক্ষ ঢাক বলো।' 

রামকৃষ্ আখর দিচ্ছে, “চন্তা নাই, উপায় করে এসৌছ--বাছুয়াকে বুকে এনোছ-_ 
এ দেখ দ্বারে বেধে রেখোঁছ- এরে ব্‌কে করে তুমি চলে যাও-_" 

রে, তোরা আর কিছ না নিস, কৃষ্ণের প্রাতি শ্রীমতীর এই টানটুকু নে__ 
সুরেশ মিত্তির এসে বললে, 'এক দিন আমার ওখানে চলুন ।' 

'তোর ওখানে যে যাব, গাইবার লোক আছে?" জিগগেস করলে রামকৃফণ। 

'কত! গাইয়ের আবার ভাবনা!' কথাটা উড়িয়ে দিল সরেশ। 





একে? 

পাঁরধানে ব্রাাঘ্রচর্ম, নাগ-যজ্ঞ-উপবীতী। সর্বাঙ্গে বিভূতি, নাগালঞ্কার। ধূম, 
পাত, শ্বেত, রন্তু আর অরুণ--পণ বর্ণের পণ্চ মুখ। প্লিনয়ন, জটাজ্‌টধারশী। 
শিরে গঙ্গা, ললাটে চন্দ্রকলা। বামকরে কপাল, পাবক, পাশ, পিনাক আর পরশহ। 
দক্ষিণ করে শূল, বস্ত্র, অঙ্কুশ, শর আর বরমুদ্রা। লোচন আনন্দসন্দোহে উল্লাসত। 
কান্তি হমকুন্দেন্দুসদৃশ । কোটটচন্দ্রসমপ্রভ। বৃষাসনে বিরাজত। এ কেঃ এ তো 
সেই শিব-শান্ত উমাকান্তকে দেখাছ। 


১২১ 


সিমলে স্ট্রিটে সুরেশ 'মান্তরের বাড়তে এসেছে রামকৃফ। 

বেলফুলের গোড়ে মালা এনেছে সুরেশ। নিচের দিকে তোড়ার মত করা ফুলের 
থোপনা, মাঝে-মাঝে রঙিন ফুল আর জরির তবক। রামকৃষের গলায় মালাটি 
পরিয়ে দিয়ে পায়ের কাছে প্রণাম করল সুরেশ । কিন্তু সহসা রামকৃষণের এ ক 
হল? মালা গলা থেকে খুলে দূরে ফেলে দিল রামকৃষ্ণ। 

নিমেষে ম্লান হয়ে গেল সুরেশ। কী না-জান সে সেবাপরাধ করে বসেছে। কিন্তু 
জলের গ্লাশে শশীর যখন পা ঠেকে গিয়োছল তখন তো এত বিমুখ হয়নি 
রামকৃষ্ণ । সে-জল খেয়োছল শান্ত মুখে। 

সমাধি ভাঙবার পর এক ঢোঁক জল খায় রামকৃষ্ণ। যল্দচাঁলতের মত হাত বাড়িয়ে 
দেয়, আর তক্ষুনি জল-ভরা গ্লাশাঁট এগয়ে দেয় শশী। শশী মানে শাঁশভূষণ 
ভটচাজ, উত্তরকালের রামকৃষ্ণান্দ। সে দিন রাম দত্তের বাড়তে ফি হল, 
তাড়াতাড়িতে জলের গ্লাশে পা ঠেকে গেল শশীর। জল বদলাবার আর সময় নেই, 
রামকৃষ্ণ হাত বাঁড়য়ে দিয়েছে। 

সেই জলের গ্লাশই এগিয়ে ধরল শশী । রামকৃষ্ণ তাই খেল নাশ্চন্ত হয়ে। 
শশীর অপরাধ তো জানত অপরাধ । সুরেশ তো বুঝতেই পাচ্ছে না কোনখানে 
তার বিচ্যুতি হয়েছে। শশর যাঁদ ক্ষমা হয়, তবে তার কেন হবে না? 

এই জলের গ্লাশে পা ঠেকে যাওয়া নিয়ে চিরকাল আক্ষেপ করেছে শশী । কিন্তু 
ঠাকুর তো জানতেন তার অন্তরের স্বচ্ছতা । তাই তো তাকে ক্ষমা করলেন 
অনায়াসে । সুরেশের মন কি তেমনি পাঁরজ্কার নয় ? 

জ্যৈষ্ঠ মাসের দুপুরে কাট-ফাটা রোদ্দুরে শশী এসে হাঁজর। মূখ-চোখ লাল, 
এক হাঁটি, ধুলো। ঘাম ঝরছে গা বেয়ে। 'এ কি করোছস তুই?' ঠাকুর ক্ষিপ্র 
হাতে তাকে পাখা করতে লাগলেন । “এই রোদ্দুরে কেউ আসে 2, শশশ নিবৃত্ত করতে 
চায় ঠাকুরকে, ঠাকুর কোনো-কিছুই শুনতে রাজী নন। বোস একটু চুপ করে, 
আগে খানিক ঠান্ডা হ। গায়ের ঘাম মরেছে এতক্ষণে । বল এইবার ?ক বলাব। 
বলবার কিছু নেই। এই দেখুন বরানগরের বাজার থেকে আপনার জন্যে কিছ. 
বরফ কিনে এনোছি। চাদরের খট খুলে এক টুকরো বরফ বের করল শশশ। 
ঠাকুরের আনন্দ তখন দেখে কে। বললেন, “দেখ, দেখ। এই গরমে মানুষ গলে 
যায়, কিন্তু শশীর বরফ গলোন। কি করে গলবে 2 শশীর ভীন্তীহমে বরফ জমাট 
হয়ে রয়েছে। 

ভান্ত-হমে জল জমে যখন বরফ হয় তখনই ঈশ্বর সাকার। যখন জ্ঞান-সূর্ষে গলে 
যায় বরফ, তখন আবার যে-জল সে-ই জল, তখন আবার 'তাঁন নিরাকার । ভক্তের 
জন্যে তাঁর রূপ, জ্ঞানীর জন্যে অরুপ । কিন্তু দুয়ের জন্যেই সমান অপরুপ । 
তবে 'কি স্‌রেশের ভান্ত নেই? 

ভন্তমাল থেকে একটি গল্প বলল রামকৃষ্ণ। যে ভন্ত সে কশ মনোভাব নিয়ে দান 
করবে। তার মধ্যে আভমানের এতটুকু আঁশ থাকবে না। অহংকার ত্যাগ করলেই 
তবে ঈশ্বর ভার নেন। মালা যে 'দাল মালার মধ্যে ষে তোর একটু অহংকারের 
১২২ 


জবালা আছে । মালার মধ্যে যে অনেক চেকনাই। অনেক কেরামাত। তারই জন্য 
"তর মনের মধ্যে একটু অহংকারের জবর। 

অহংকার হচ্ছে উচ্চু ঢাঁপি। সেখানে কি জল জমে! জল জমে নিচু জমিতে, খাল 
্রামতে। সেই 1িপিকে খাল করে দাও। তবেই জমবে ভান্তর জল। 

নূরেশ কাঁদতে লাগল। 

লাটু ছিল উপাঁস্থত। সে তাজ্জব বনে গেল। ঠাকুরের রসদদারদের মধ্যে একজন 
এই সুরেশ 'মিন্তর, তবু তার দান তান গ্রহণ করলেন না! আর, চেয়ে দেখ, 
ভারই জন্যে কাঁদছে সুরেশ মাত্তর। 

না কাঁদলে হবে কেন? কান্না দিয়ে পথের ধুলো ধুয়ে দিলেই তো তিনি আসবেন। 
ভান্ত-প্রদীপের তেলাটই তো অশ্রুজল। 

এই যে বিশ্ব এ হচ্ছে বিস্তীর্ণ ব্যথার পত্রপট। ভন্তকে পাচ্ছেন না বলে ভগবানের 
কান্না। তাঁর অসীম শন্তির শুকনো রঙগ্াল তিনি প্রেমের অশ্রুতে গুলে-গুলে 
এই 'বাঁচন্র বর্ণবেদনার ছাব এ'কেছেন। মনের মধ্যে যাঁদ সেই কান্না না থাকে 
তবে এ চিঠির মর্মোদ্ধার করব কি করে2 এই চিঠির মধ্যেই তো আনন্দের 
সংবাদ। 

কীত্তনে নিয়ে এসেছে সুরেশ । নিজে গান গেয়ে রামকৃষ্ণ তাকে উচ্চভাবে উদ্দীপ্ত 
করে তুলল । অর্ধবাহ্যদশায় এসে হঠাৎ সেই ত্যন্তড মালা গলায় পরে উঠে দাড়াল । 
গান ধরল গলা ছেড়ে : 


'আর কী সাজাব আমায়-- 
জগৎ-চন্দ্র-হার আম পরেছি গলায়--' 


ফের আখর দিতে লাগল : 'আমি জগৎ-চন্দ্র-হার পরেছি। অশ্রুজলে সিন্ত-করা 
জগৎ-চন্দ্র-হার পরোছি। প্রেমরসের ভাবন দেওয়া জগং-চন্দ্র-হার পরেছি--” 
চোখের কান্না মুছে ফেলে চেয়ে দ্যাখ আমাকে । আম দূরে আঁছ যে বলে, সেই 
নিজে দূরে রয়েছে। আমাকে দেখতে আবার নতুন কী আয়োজন হবে! দেখব 
বলে তাকালেই দেখতে পাব চোখের উপর। 'ত্বমেব ভাল্তমনুভাতি সর্বং।' ইট 
কাঠ মাটি পাথর সব আঁম। আকাশ বাতাস আগুন জল পাঁখ পতঙ্গ । একটা 
গাছ দেখাছস সামনে? এ বক্ষরূপে তো আমিই দাঁড়িয়ে ।' সমস্ত কাল্লার পারে 
আমিই তো আনন্দ-তাঁর। 

কিন্তু সে দিন সূরেশের বাঁড়তে গাইয়ের যোগাড় নেই। 

রামকৃফ শুধোলো : 'ভজন গাইতে পারে এমন কেউ নেই তোমাদের পাড়ায় 2" 
আছে বৈ কি। সুরেশ বাস্ত হয়ে খজতে বেরুল। গৌর মুখুজ্জে লেনের 'বিশবনাথ 
দণ্ডের ছেলে নরেন। 

নরেন তখন গানের স্রোতে ভাসছে । ভগবান আছে কি নেই জানি না, কিন্তু দেহ- 


ভরা প্রাণ আছে, কণ্ঠ-ভরা গান আছে। আর, এই প্রাণ আর গান এ যেন আর 
১২৩ 


কার দানোচ্ছবাস। তাই নরেন গায়, 'অচল ঘন গহন গুণ গাও তাঁহার) ! 
কখনো বা: 


'মহাসংহাসনে বাঁস শ্বানছ হে বিশ্বশপিতঃ, 
তোমার রচিত ছন্দ মহান বিশ্বের গীতি। 
মর্তের মৃত্তিকা হয়ে ক্ষুদ্র এই কণ্ঠ লয়ে 
আমিও দুয়ারে তব হয়েছি হে উপনীত ॥, 


'ওরে বিলে, বাঁড় আছিস ?' দরজায় সুরেশ মিত্র দাঁড়য়ে। ভ্রস্ত-ব্যস্ত হয়ে 
কাছে এল নরেন। চল আমার বাঁড় চল। গান গাইবি।' 

একবার গানের নাম শুনলেই হল, নরেন উচ্ছলিত। কশদন বাদে একজামন, 
দুপুর বেলা হয়তো পড়ছে নরেন, বন্ধু এসে বললে, রাঁক্তরে পাঁড়স, এখন দুটো 
গান গা। তবে বাঁয়াটা নে- বলেই বই-্টই ঠেলে ফেলে নরেন তানপুরা "নিয়ে 
বসল। ইস্কুল-কলেজে টোবল চাপড়ে বাঁজয়েছে বলেই কি আর এখন বাঁয়া 
বাজাতে পারবে- গান শুনতে চেয়ে বন্ধ পড়ল মুশাঁকলে। মোটেই শন্ত নয়, এমাঁন 
করে শুধু ঠেকা 'দয়ে যা-বাজনার বোল বলে দিল নরেন। ঠেকার অভাবে ঠেকবে 
না, নরেন তানে-লয়ে তন্ময় হয়ে গান ধরল উদার গলায়। কখন দুপুর গাঁড়য়ে 
গেল আস্তে-আস্তে, কিছ; খেয়াল নেই--একটার পর একটা গান গেয়ে চলেছে 
অনবরত সন্ধ্যায় আলো 'দিয়ে গেল চাকর, তবু আসর ভাঙছে না। রাত দশটায় 
এল খাবার তাড়া, তখনই ব্াঝ প্রথম হঃস হল। 'দব্য ভূমি থেকে নেমে এল 
স্থূল ভূমিতে। 

গানই হচ্ছে একমাত্র জ্ঞান যে জ্ঞানের ওপারে একজন আছেন। জ্ঞানের ওপারে 
যান আছেন তাঁকে একমান্র গান দিয়েই স্পর্শ করা। 

অন্তরের কান্নাটও একটি গান। আকুলতাটিও একাঁট সুর। 

গানের নাম শুনেই কোমর বাঁধল নরেন । চলল সূরেশ 'মাত্তরের বাঁড়তে। 
রামকৃষ্ণের সঙ্গে নরেন্দ্রের প্রথম দর্শন হল- সূর্যের সঙ্গে সমুদ্রের । 

এ কে! চমকে উঠল রামকৃষ্ণ । এ যে তার সেই স্ব্নেদেখা সঞ্তার্ধ মণ্ডলের 
খাষ! 

সে এক অপূর্ব দর্শন হয়েছিল রামকৃষের। 

সমাধি অবস্থায় জ্যোতির্ময় পথ ধরে উধের্ব নভোমণ্ডলে উঠে যাচ্ছে রামকৃষ্ণ! 
পার হল পাঁথবী, পার হল জ্যোতি্কলোক। ব্লমেক্কমে চলে এল সূক্ষন্নতর 
ভাবলোকে। যতই উপরে উঠছে, পথের দুপাশে দেখতে লাগল দেব-দেবীরা বসে 
আছেন। সেখানেও উধর্বগাঁতি ক্ষান্ত হল না। উঠে এল ভাবরাজ্যের চরম চূড়ায়। 
সেখানে দেখল একটি জ্যোতির রেখা 'দয়ে দ্ঁট 'বশাল রাজ্যকে আলাদা করা 
হয়েছে। খণ্ড আর অখণ্ডের রাজ্য, দ্বৈত আর অদ্বৈতের দেশ। রামকৃষ্ণ 


অথণ্ডের রাজ্যে এসে ঢুকল। সেখানে আর দেব-দেবী নেই-_দিব্য দেহের 
৬১২৪ 


অধিকারী হয়েও এখানে আসবার আঁধকার নেই তাদের। অনেক 'নচে ভাবলোকে 
তাদের বাসা। সেই অখন্ডলোকে সাতটি ধাঁষ বসে আছে ধ্যানলীন হয়ে। প্রজ্ঞ, 
প্রবীণ ধাঁষ। আশ্চর্য হল রামকৃষ্ণ যেখানে দেব-দেবী আসতে পারে না সেখানে 
এই খাঁষরা এল 'কি করে ? বুঝল জ্ঞানে প্রেমে পৃণ্যে পাবন্রতায় এরা দেবদেবীকেও 
হার মানিয়েছে । এদের মহত্ৃচিন্তায় আভভূত হল রামকৃফণ। সহসা দেখতে পেল 
সেই অখণ্ডলোকের পারব্যাপ্ত জ্যোতিপ:ঞ্জের কিয়দংশ ঘনণভূত হয়ে একাট দেব- 
শিশুর আকার 'নিলে। একটি অমলকান্তি দেবাঁশশহ। দেবাঁশশুটি তার মৃদূল- 
কোমল বাহ? দুটি দিয়ে একজন খাঁষর গলা জড়িয়ে ধরল, তার ধ্যান ভাঙাবার 
জন্যে ডাকতে লাগল কলভাষে। ধ্যান ভাঙল খাঁষর, আনন্দময় আনমেষ চোখে 
দেখতে লগল শিশুকে । এ যেন তার কত কালের প্রিয়ধন, তার হৃদয়রতন। 'ি 
যেন বলবে বলে এসেছে! প্রসন্ন-প্রভাত চোখ দুটি তুলে শিশু বললে খাঁষকে, 
'আঁম চললুম তুমি এস।' কোথায় চললে 2 পাঁথবীতে। তুমিও এস আমার 
পিছু-পিছু। স্নেহস্নাত চোখে চেয়ে থাকতে-থাকতে খাঁষ আবার ধ্যানস্থ হল। 
রামকৃষ্ণ দেখল, খাঁষর সেই দেহ থেকে একটি অংশ "বিচ্ছিন্ন হয়ে জ্যোতিবার্তকা- 
রূপে নেমে গেল পাঁথবীতে। 

নরেন্দ্রকে দেখেই চমকে উঠল রামকৃঞ্ণ। এ যে সেই খাঁষ! 

তবে এ শিশুটি কে? শিশুটি স্বয়ং রামকৃফ। 

বিবেকানন্দ খাঁষ, রামকৃষ্ণ শিশু । তার মানে কিঃ বিবেকানন্দ পারপূর্ণ জ্ঞান, 
রামকৃষ্ণ পরিপূর্ণ প্রেম । বিবেকানন্দ সংহত তেজ, রামকৃষ্ণ বিগাঁলত সারল্য। 





একাঁট ভজন গাইল নরেন। উন্মনা হয়ে গেল রামকৃফণ। কাদের বান্ডর ছেলে 2 
কোথায় থাকে ? কোথা থেকে এসেছে ? কি করে পথ চিনল এ গলির ? 
আরো একখানা গান হল। 
এগিয়ে এল রামকৃষ্ণ । কাছে এসে নরেনের অঙ্গলক্ষণ দেখতে লাগল । বলল, কথার 
সুরে মিনাতি মাখিয়ে বলল, 'একবারটি দাক্ষণেশবরে এসো আমার কাছে। কেমন, 
আসবে 2 

১৭ 


উন্মনা হয়েই ফিরল দাক্ষণে*্বরে। তার নিঃসঞ্গতার অন্ধকারে। 

কে যেন নেই । কে যেন আসবে বলে আসোন। দেখা 'দয়েই চক্ষের পলকে পালয়ে 
গেছে। 

প্রতিক্ষণ উচাটন। প্রাতিক্ষণ তার পায়ের শব্দ শুনছে উৎকর্ণ হয়ে। সে যে আদে 
আসে আসে। পাঁথবীর সমস্ত সুরে-ছন্দে তার আগমনী বাজছে। কিন্তু সে 
আসছে কই? দেখা দিচ্ছে কই চোখের সামনে! কোথায় সেই চারু-হারী-রুচির- 
মনোহর ? রুচ্য রম্য কান্ত কাম্য? তাকে না দেখে কেমন করে থাকব ? 
অন্ধকারে তার গন্ধ টের পাচ্ছি, কিন্তু সে ক অন্ধকারে আমার কান্না শুনতে 
পাচ্ছে না? িশ্ববীণায় সে এত সুর বুনছে, সেখানে কি বাজছে না এই গীতহারা 
নীরবতা ? | 

'ওরে, তূুই কে জানি না। কী হবে জেনে? তবু তুই একবার আয়। তোকে না 
দেখে যে থাকতে পারছি না। তোকে ছাড়া সব অন্ধকার। একেবারে একা । 
নির্জনে গিয়ে ডাক ছেড়ে কাঁদে রামকৃষ্ণ । যেমন ভিজে গামছা 'নিংড়োয় তেমান 
করে বুকের ভিতরটা কে জোর করে 'িষ্পীড়ন করছে। চোখে ঘুম নেই, মুখে 
রুচি নেই, সব সময়ে কেবল ইতি-উতি তাকায়, ঘন-ঘন নিশ্বাস ফেলে, কিন্তু দে 
আসে না। 

সে শুধু আমে আসে আসে। 

শেষকালে মা'র কাছে কে“দে পড়ে রামকৃফণ। মা, একবারাঁট তাকে এনে দে। ওকে 
না পেলে কেমন করে থাকব! কার সঙ্গে কইব আমার প্রাণের কথা ? আম রাজ্য 
চাই না, স্বর্গ চাই না, মোক্ষ চাই না, তুই শুধু ওকে এখানে নিয়ে আয়। আম 
ওর কনককাণুনছবি আর একবার দোখ। 

রাত্রে শুয়ে আছে রামকৃষ্ণ, কে যেন তাকে তার গা ঠেলে তুলে দিল। বললে, 'আ'ম 
এসোঁছ।' রামকৃষ্ণ চেয়ে দেখল, নরেন। 

ধড়মড় করে উঠে বসল। এসোছস? এত রাত্রে, মধ্যরান্রে 2 তাতে কিঃ তাই তো 
আম আস, যখন চরাচর সান্দ্র-স্তব্ধ, সুষ্িতগত। কিন্তু কই, কই তুই ? 

কেউ নেই। 

এই তুই সাকার, আবার তুই নিরাকার। এই তুই ফুমূপাস্থত গান, আবার তুই 
পলায়মান সুর! আর কত তোর পথ চেয়ে বসে থাকব 2 আমার ঘর নেই আম 
পথই সার করোছি। তুই এসে আমাকে পথের খবর 'দয়ে যা। কোন পথে 'মলবে 
সেই পথপাঁতকে 2 . 

বয়ে গেছে*নরেনের আসতে! তার এফ-এ পরীক্ষা হয়ে গিয়েছে, বাবা তার জন্যে 
এখন পান্নী খজছেন। তার খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই, সে চলেছে দক্ষিণেশবর! ধাপ- 
ধাড়া গোঁবন্দপুর এর চেয়ে অনেক ভালো জায়গা । 

কিন্তু বাবা শুধু পান্রীই দেখছেন না, দেখছেন তার টাকার ওজনটা। মেয়োট 
শামলা, তাই তার দশ হাজার টাকা জাঁরমানা। তা ছাড়া ছেলে দেখুন। ছেলে 
আমার সোনা-বাঁধানো হাতির দাঁত। 


১৬ 


কিন্তু নরেন ঘাড়ে এক ঝাঁকরানি 'দয়ে সব নস্যাৎ করে দিলে। 

মেয়ে কালো বলে নয়, নয় বা বাবা পণ 'নচ্ছেন বলে। সে বিয়ে করবে না কেননা 
সে ঈশ্বরসন্ধানে হবে দন্গ্গমের যাত্রী, দুরারোহ ও দনরবগাহের। সে-পথ ক্ষূর- 
ধারের মত নিশিত-দস্তর। 

বিশ্বনাথের সংসারেই প্রাতিপালিত রাম দত্ত, তাকে তাই ধরলেন 'িশবনাথ। বললেন, 
শবলের ঘাড়ে একটু ঘি ডলো, কি এক গোঁ ধরেছে, বলছে বিয়ে করবে না-_" 

রাম দত্ত লাগল ঘটকালিতে। কিন্তু নরেন তো ঘট নয় যে কাল মাখাবে, নরেন 
আকাশ, তাতে লাগে না কিছ কামনার কাঁলমা। 

'যাঁদ সাত্য ধর্ম লাভ করতেই চাও তবে মিছে ব্রাহমসমাজে না ঘুরে দাঁক্ষণেশ্বরে 
যাও। মৃর্তমান ধর্মকে দেখে এসো? 

যেতে হয়তো যাব, তুমি বলবার কে! এমাঁনই ভাব নরেনের। তুমি বলবে বললেই 
যাব? তুমি কি আমার অভিভাবক ? তুমি কি আমার বিবেক ? আমার খুশি আম 
যাব না। 

নতুন গাঁড় হয়েছে সরেশের। দুশো টাকা মাইনে হয়েছে রাম দত্তের। হাঁসি 
পায়. সব নাকি ঠাকুরের কৃপায়। এতই যখন কৃপা, নরেন ভাবল মনে-মনে, জগৎ- 
সংসারের সমস্ত দহঃখ-দারিদ্রযু এক দিনে দূর করে দিক না। তবে বাঁঝ কেমন 
ঠাকুর! 

নতুন গাঁড় কিনে রামকৃষ্ণকে একাঁদন চড়াল সূরেশ। 

সুরেশের বাঁড় এলে রামকৃষকে ঘিরে আজকাল ছেলে-ছোকরারা ভিড় করে। 
ছোট ছেলেগুলোকে আপনি বকাচ্ছেন_+ সূরেশেরই বাড়তে থাকে এক উচ্চপদস্থ 
কর্মচারী, সে একদিন হঠাৎ রামকৃষ্কে আক্রমণ করলে। 

'তুমি কী করো?” শান্ত বয়ানে প্রশ্ন করল রামকৃফণ। 

'আমি আপনার মতো ছেলে বকাই না, আম জগতের হিত কার।' 

এঘনি এই বিশবজগৎ সৃষ্টি করেছেন পালন করছেন তিনি কিছ বোঝেন না আর 
তুম সামান্য মানুষ, তুমি জগতের হিত করছ? ঈশ্বরের চেয়ে তুমি বৌশ 
বুদ্ধিমান ?' চুপ করে গেল সরকারাঁ চাকুরে । 
77575788584 জগতের হিত 
করছ নাকি? কতটা হিত আজ করলে জগতের 2 

কৃষদাস পালকে জগগেস করলে রামকৃষ্ণ, উর হন 

কৃকদাস বললে, জগতের উপকার করব ।' 

'হ্যাঁ গা, তৃমি কে ?' বললে রামকৃ, 'আর, কী উপকার করবে? আর, জগং কতটুকু 
গা, যে তুমি উপকার করবে?, 

ঈশ্বরকে ভালোবাসাই জীবনের উদ্দেশ্য। ঈশ্বরে ভাব-ভান্তি মানেই ঈশ্বরে 
ভালোবাসা । নিম্কাম কর্ম করতে-করতেই ঈশ্বরে ভান্ত-ভালোবাসা আসে। আর 
এই ভন্তি-ভালোবাসা থেকেই ঈশ্বরলাভ। এই ঈশ্বরলাভই মানুষের কর্তবা। 


জগতের উপকার মানুষে করে না, তিনিই করছেন। যান চন্দ্র-সূর্য করেছেন, 
১২৭ 


িনি মা-বাপের বুকে স্নেহ দিয়েছেন, মহতের চিত্তে দয়া দিয়েছেন, ভন্তের প্রাণে 
ভান্ত দিয়েছেন__তানিই। বাপ-মা'র মধ্যে যে স্নেহ দেখ সে তাঁরই স্নেহ। দয়ালুর 
মধ্যে যে দয়া দেখ সে তাঁরই দয়া। তুমি কাজ করো আর না করো, তিনি কোনো 
না কোনো সূত্রে তাঁর কাজ করবেনই করবেন। তাঁর কাজ আটকে থাকবে না। 
জগতের দুঃখ দূর করবে তোমার স্পর্ধা কি? জগৎ কি এতটদুকু £ বর্ষাকালে 
গঙ্গায় কাঁকড়া হয় দেখেছ? তেমনি অসংখ্য জগৎ আছে-অফুরল্ত। 'যাঁন 
জগতের পাঁত তিনিই সকলের খবর 'িচ্ছেন। তোমার মিথ্যে মাথা ঘামাতে হবে 
না। তোমার কাজ হচ্ছে তাঁকে আগে জানা । তাঁর জন্যে ব্যাকুল হওয়া । শরণাগত 
হওয়া । ঈশ্বরদর্শনই জীবনের উদ্দেশ্য! 
এমন নরদেহ ধারণ করেছ একবার ঈশবরদর্শন করবে নাঃ এত ছু দেখলে, 
এত কিছ ধরলে, দেখবে-না-ধরবে-না শুধু ঈশ্বরকে ? জীবনে এত রোমান্ট খজছ, 
নেবে না একবার ঈশবর-শিহরণ ? 
গঙ্গার দিকে পশ্চিমের দরজায় কার ছায়া পড়ল। 
কে? চণ্ল হয়ে উঠল রামকৃষ্ণ । এ কার ছায়া ? কার আভাতি ? 
আর কার! চোখের সামনে নরেন। সপ্ত খাঁষর একজন। 
সুরেশ 'মাত্তরের গাঁড়তে করে এসেছে । সঙ্গে সুরেশ, আরো ক'জন সমবয়সী 
ছোকরা। কিন্তু সকলের চেয়ে স্বতন্ত্র এই নরেন্দ্রনাথ। সকলের থেকে 'বাচ্ছন্ন- 
বিষযন্ত। শরীরের দিকে লক্ষ্য নেই, বেশেবাসে উদাসীন, গায়ে ময়লা একখানা 
চাদর, বাইরের কোনো কিছুতে কৌতূহল নেই, সমস্ত কিছুর সঙ্গে অবন্ধন, 
সমস্ত কিছুই যেন তার শাথিল। শুধু ধ্যানের আবেশে চোখের তারা উপর 'দিকে 
উঠে আছে। ঘুমুলেও হয়তো সম্পূর্ণ বোজে না তার চোখ । চোখ সূমুখ ঠেলা। 
দেখলেই মনে হয় ভিতরে কিছু আছে। 
বিষয়ীর আবাস কলকাতায় এত বড় সত্ৃগুণী আধার এল কোথেকে ? সত্তবগুণই 
তো িশড়র শেষ ধাপ। তার পরেই ছাদ। 
এসেছিস ? আয়-_ 
মনের ব্যাকুলতা চেপে রাখল রামকৃষ্ণ। মেঝেতে মাদুর পাতা, বসতে বলল 
নরেনকে। যেখানে জলের জালা, তার কাছেই বসলঞ্জ্যরেন। তার সহচর বন্ধুরাও 
বসল আশে-পাশে কিন্তু তারা সব ডোবা-পুচ্কারণী। ডোবা-পুজ্কারণীর মধ্যে 
নরেন বড় দীঘি-যেন ঠিক হালদার পুকুর! 
চুম্বকের টানে লোহা আসে, না, লোহার টানে চুম্বক ছোটে-কে করবে এ রহস্োর 
সমাধান? "প্রয়তল্ময় দৃঁষ্টতে তাকিয়ে থাকে রামকৃষ্ণ । বলে, 'একটা গান ধর ।' 
গান তো নয়, মানস-যান্রী হংস। নরেনের সমস্ত শরীর যেন সরে-বাঁধা সমস্ত 
প্রাণ-মন ঢেলে ধ্যানার্ড হয়ে সে গান ধরলে : 

'মন চল 'নজ 'নকেতনে। 

সংসার বিদেশে 'বিদেশীর বেশে 

ভ্রম কেন অকারণে ॥, 
১২৮ 


আহা, কি গান' ভাবে উঠে গিয়োছল রামকৃষ্ণ, নেমে এসে বললে, 'আরেকখানা গা। 
যাবে ক হে দিন বিফলে চিয়ে- সুধা-ঢালা কণ্ঠে গান ধরল নরেন : 'আ'ছ 
নাথ, দিবানিশি আশা পথ নিরখিয়ে ॥: 

পাখির ওড়াই যেমন বিশ্রাম, নরেনের গানই যেন ধ্যান। ও স্বতঃাসম্ধ। 
নত্যসিদ্ধ। 

নিত্যাসদ্ধ হচ্ছে মৌমাছি । শুধু ফুলের উপর বসে মধু পান করে। তার মানে 
হরিরস পান করে, বিষয়-রসের দিকে যায় না। 

মা, তোর কী কৃপা! তুই এত দিন পরে নিয়ে এসোৌঁছস আমার মন-ঠাণ্ডা-করা 
আপন জন! 

কালীঘরের খাজাণ্ণ ভোলানাথ মুখুজ্জেকে জিগগেস করোছিল রামকৃষ্ণ : 'নরেন্দ্ 
বলে একটি কায়েতের ছেলে, তার জন্যে আমার মন এমন হচ্ছে কেন? সে 
আমার কে! 

ভোলানাথ বললে, "এর মানে ভারতে আছে। সমাধিস্থ লোকের মন যখন 'নচে 
আসে, তখন সত্ুগুণী লোকের সঙ্গে বিলাস করে। সত্তগূণ লোক দেখলে তবে 
তার মন ঠান্ডা হয়।, 

আম বিলাস করব। আম শঃটকে সাধ্‌ হব না। 





গান শেষ হওয়া মান্র নরেনের হাত ধরল রামকৃষ্ণ । হাত ধরে টেনে আনল উত্তরের 
বারান্দায়। বাইরে থেকে বন্ধ করে দিলে ঘরের দরজা । 

শশতকাল। উত্তরে হাওয়া আটকাবার জন্যে থামের ফকিগুলো ঝাঁপ 'দিয়ে ঘেরা । 
নিশ্চিন্ত, নিরাবালি জায়গা । ঘরের দরজা বন্ধ করে দেবার পর কারু সাধ্য নেই 
এখানে উপক মারে। 

নারাবীলতে কিছু উপদেশ দেবে বোধ হয় রামকৃষ্ণ, নরেন তাই কৌতূহল হয়ে 
রইল। কিন্তু এ কি, রামকৃষণের মুখে কোনো কথা নেই । রামকৃফণ কাঁদছে । আকুল 
হয়ে কাঁদছে। যেন কত দিনের গভীর পাঁরিচয়, বলছে তেমনি স্নেহস্বরে, 'এত 
দিন কোথায় ছিলি 2, 

নিঃশব্দ বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে রইল নরেন। 


৯ (৬৮) ১৭২৪) 


খতোর কি মায়া-দয়া নেই? এত দন পরে আসতে হয়! কত ক্ষণ থেকে দিন, দিন 
থেকে মাস, মাস থেকে বছর আমি তোর জন্যে বসে আছি-তোর তা খেয়াল 
নেই। তোর মনে পড়ল না আমাকে 2 নরেনের হাত ধরে বিলাপের মত করে 
বলছে, কিন্তু আসলে এ আনন্দ-প্রলাপ। এ দ?ঃখ প্রীতিকপ্টকিত দুঃখ । এ অশ্রু 
স্নেহাদ্রগাঢ় সুধাধারা। 

এ বাণী নবনীসমানা আময় বাণী। 

শববয়া লোকের কথা শুনে-শুনে আমার কান পুড়ে গেল। প্রাণের কথা আর 
কাউকে বলা হল না। বলতে না পেয়ে এই দ্যাখ আমার পেট ফুলে রয়েছে। 
এইবার তুই এসেছিস, এবার বাহির দুয়ারে কপাট লেগে ভিতর দঃয়ার খুলে 
যাবে। হরিকথারাতিভে কেটে যাবে 'দন-রাত। তুই এসোছস, তার মানে ভক্তের 
হৃদয়ে ভগবান বিশ্রাম করতে এসেছে । ভন্তের হৃদয়েই তো ভগবানের বিশ্রাম ।' 
নরেন চিন্রীলীখতের মত দাঁড়য়ে রইল। নিস্পন্দ, 'নিঃসাড়। 

মাকে সে দিন অনেক করে বললাম। কামিনী-কাণ্ুনত্যাগী শুদ্ধ ভন্ত না পেলে 
কেমন করে থাকব পাাঁথবীতে ? কার সঙ্গে কথা কইব? কাঁদতে-কাঁদতে ঘুমিয়ে 
পড়ল।ম। তারপর কী হল জানিস না বাাঁঝ ?' 

নরেন তাকিয়ে রইল উৎসুক হয়ে। 

'মাঝ রাতে তুই এলি আমার ঘরে। আমায় তুলাঁল গা ঠেলে। বলাল, আম 
এসোছি।' 

'কই আমি তো কিছ জানি না।' নরেনের মূখে হাঁসির একাঁট রেখা ফুটল। 
বললে, “আম তো আমার কলকাতার বাড়তে তখন তোফা ঘুম মারছি।' 
তুমি জানো না বৈ কি। তুমি যাঁদ না জানো, তবে আর কে জানে!' রামকৃষ্ণ 
সহসা হাত জোড় করল। দেববন্দনার ভগ্গিতে বলতে লাগল, শকন্তু আম জানি 
প্রভূ, তুমি সেই পুরাণ পুরুষ, তুমি মল্তদষ্টা খাঁষ, তুমি নররূপাী নারায়ণ। তুমি 
আমার জন্য রূপধারণ করে এসেছ । শুধু আমার জন্য নয়, সমস্ত জীবের জন্য 
এসেছ। এসেছ সমস্ত ভুবনের দৈন্যদুঃখদ্যারত দূর করতে- প্রণতজনের ক্লেশহরণ 
করতে-- 

কে এ উন্মাদ! নইলে আমি সামান্য বিশ্বনাথ দত্তের ছেলে, আমাকে এ সব কথা 
বলছে! কে এ বচনরচনপটু! এ সব 'কি আম প্রহোলকা শুনাছঃ আম আছি 
তো আমার মধ্যেঃ নরেন স্থান-কাল একবার যাচাই করে 'নিল। সব ঠিক আছে। 
শুধু পাই অগপ্রকাতিস্থ। লোকে যে বলে দক্ষিণে*বরে এক পাগলা বামুন 
আছে, ঠিকই বলে। 

পাগল নয় তো কি! পাগল না হলে ক মান্ষের মধ্যে ঈশ্বর দেখে! যাকে 
দেখা যায় না শোনা যায় না তার জন্যে অশ্রুবর্ষণ করে কেউ ১ এমন কাণ্ডজ্জান- 
শৃন্যের মত কথা বলে? 

গকল্তু পাগল বলে এক কথায় উীঁড়য়ে দেবার মত সায় পায় না মনের মধ্যে। পাগল 


কি এমন 'হরশ্ময় হয়? হয় কি এমন পুলফে্-ওছরবাজ্গ? বচনে কি এত 
৯১৩০ 


মধ; থাকে ? কথা কি হঙ্ন শ্রবণমঙ্গল £ এমন লোকার্তহর হাঁস কি তার মুখে 

থাকে? কণ্ঠে ও চাহনিতে, স্পর্শে ও কাতরতায় থাকে ক এমন মেদুরমেঘের 

মমতা, অমৃতবর্ষণ স্নেহ ? 

কে জানে! কী হবে বিচর-বিতর্ক করে? এ যেন এক ওকাঙনত, তত্বাতত 

অনুভূতি । শুধু দেখা যাক। শুধু শোনা যাক। নিরুদ্ধ নিম্বাসে থাক শুধু 

নিশ্চল হয়ে। 

তুই একটু বোস। তোর জন্যে খাবার নিয়ে আস।' দরজা ঠেলে ঘরের মধ্যে 

ঢুকল রামকৃকণ। 

চকিতে ফিরে এল খাবারের থালা নিয়ে। প্রায় পাগলের ব্যাকুলতায়। বদি এই 

ফাঁকে পালয়ে যায় ননচোর! যাঁদ অন্ধকারে অন্তর্ধান করে! 

না, চুপচাপ দাঁড়য়ে আছে নরেন। বর্তমান-ভবিষ্যং কিছুই নির্ণয় করতে পারছে 

না। শুধু ভাবছে, আমি কি সার্ধ-ভ্রিহস্ত পাঁরামত মাংসপিন্ডময় সামান্য একটা 

দেহ? না, কি আমি বিরাট, আম মহান, আমি অনন্তবলশালী পরমাত্মা ? 

থালায় কতগ্যাীল সন্দেশ, মাখন আর মিছরি। হাতে করে নরেনের মুখের কাছে 

খাবার তুলে ধরল রামকৃষ্ণ । বললে, খা, হাঁ কর।' 

'সে কি, আমার বন্ধূরা যে রয়েছে সঞ্গে।' মুখ সারয়ে নিতে চাইল নরেন। "দন, 

আমার হাতে দিন, ওদের সঙ্গে ভাগ করে খাই।' 

কে শোনে কার কথা । 

'হবেখন, ওরা খাবেখন পরে-_ আগে তুমি খাও।' জোর করে মূখে পুরে দিতে 

লাগল রামকৃষ্ণ । 

কৌশল্যা হয়ে রামকে খাইয়োছ, যশোদা হয়ে ননীগোপালকে । খা, এই নে আমার 

হৃদয়বেদ্য নৈবেদ্য। তুই জানিস না তুই কে? তুই সবিতৃমণ্ডলমধ্যবতাঁ 

নারায়ণ। 

জোর করে সবগুলি খাবার খাইয়ে 'দিলে। 

'বল, আবার আসাঁব। দেরি করাব না একেবারে! ঠিক তো রামকৃষ্ণ মিনতি 

দ্রানাল। বললে, স্বর নামিয়ে বললে, “কিন্তু দেখিস, একা-একা আসাব।' 

পাগল? কিন্তু এমন দরদী-মরমী হয় কি করেঃ কথা কি করে হয় এমন 

আময়জাঁড়ত ? 

'আসব।, 

“আর শোন, একটু বোৌশ-বোশ আসাঁব। প্রথম আলাপের পর বরং একটু ঘন-ঘনই 

আসে । কেমন, আসাঁব তো? 

'চেম্টা করব।' 

ঘরের মধ্যে ফের চলে এল দুজনে । একদৃ্টে নরেন দেখতে লাগল রামকৃফকে। 

পাগল কি এমন সদালাপ করে, পাগলের কি ভাবসমাধি হয়? পাগল 'কি ঈশ্বরের 

জন্যে পাগল হয় ঃ 

“লোকে স্বী-পুত্রের জন্যে ঘাঁট-ঘাঁটি চোখের জল ফেলে,” বলতে লাগল রামকৃষ্ণ, 
১৩৯ 


শকল্তু ঈশ্বরের জন্যে কাঁদে কে? কাশী যাওয়া কী দরকার যাঁদ ব্যাকুলতা না 
থাকে। ব্যাকুলতা থাকলে এইখানেই কাশী। এত তীর্থ এত জপ, হয় না কেন 
যেন আঠারো মাসে বংসর। হয় না তার কারণ, ব্যাকুলতা নেই। যাত্রার গোড়ায় 
অনেক খচমচ-খচমচ করে, তখন শ্রীকৃকে দেখা যায় না। তারপর নারদ খাঁষ 
যখন ব্যাকুল হয়ে বৃন্দাবনে এসে বীণা বাজাতে-বাজাতে ডাকে আর বলে, প্রাণ হে 
গোবিন্দ মম জীবন! তখন কৃষ্ণ আর থাকতে পারেন না। রাখালদের সঞ্চে সামনে 
আসেন আর বলেন, ধবলী রও ! ধবল রও! 

“দেখা যায় ঈশবরকে ?' কে একজন গজগগেস করলে । 

“তনি আছেন, আর তাঁকে দেখা যাবে না? যেকালে তিনি আছেন সেকালে প্রষ্টবা 
হয়েই আছেন।, 

“আছেন ?, 

'জগৎ দেখলেই বোঝা যায় তান আছেন। কিন্তু তাঁর বিষয়ে শোনা এক, তাঁকে 
দেখা আর-এক। কিন্তু দেখার উপরেও বড় কথা আছে, তাঁর সঙ্গে আলাপ করা। 
কেউ দুধের কথা শুনেছে, কেউ দেখেছে, কেউ খেয়েছে । দেখলেই আনন্দ, খেলেই 
বল-পু্টি।, 

সমস্ত যেন প্রত্যক্ষ করেছে এমান প্রজবলন্ত অনুভূতি । পাগল বলতে চাও বলে 
* কল্তু তার উজস্বান ত্যাগ দেখ । ঈশ্বরের জন্যে সর্বস্বত্যাগ। দেখ তার আয়সী. 
কঠিন পাঁবন্রতা। তার অমল-ধবল আনন্দ। তার অতল-গভীর শাল্তি। এ যাঁদ 
পাগল হয় তবে পাগলের আরেক নাম সাঁচ্চদানন্দ। 

নরেনের মনে হল পরম তর্থে বসে আছি। যার দ্বারা মানুষ দুঃখ থেকে পার 
হয় তার নাম তীর্থ । জল ন্রাণ করে না, উলটে ডুবিয়ে মারে। নৌকোই তীর্থ 
সেই উত্তীর্ণ করে দেয় নদ-নদী । রামকৃষ্ণ সেই ভবসাগরতারাঁণ। সকল তীরে 
সার। 

এবার উঠতে হয় নরেনের। 

প্রণাম করল। প্রেমস্মিতাস্নগ্ধহাস্যে তাঁকয়ে রইল রামকৃষণ। 

কোথায় আর যাব, কত দূর? তোকে এই তীর্থপ্রদ পাদসরোজপীঠে আসতে 
হবে বারে-বারে। তোকে 'নার্বতর্ক হতে হবে, নিঃসংশয় হতে হবে। অবগাহঃ 
করতে হবে এই করুণাঘন অগাধ সমূদ্রে। বেরুতে হবে জগল্জয়ের মশাল নিয়ে 
আজ যা। 

'আর কোন মিঞার কাছে যাইব না।' গাজীপুর থেকে লিখছে বিবেকানন্দ 
“এখন সিদ্ধান্ত এই যে- রামকৃষ্ণের জুড়ি আর নাই, সে অপূর্ব সাধ আর হে 
অপূর্ব অহেতুকী দয়া, সে ইন্টেন্স সিমপ্যাঁথ বদ্ধজীবনের জন্য- এ জগতে আ. 
নাই।...তাঁহার জীবদ্দশায় 'তাঁন কখনো আমার প্রার্থনা গরমঞ্জুর করেন নাই- 
আমার লক্ষ অপরাধ ক্ষমা কাঁরয়াছেন--এত ভালোবাসা আমার 'পিতা-মাতায় কখনে 
বাসে নাই। ইহা কাবত্ব নহে, আতিরজিত নহে, ইহা কঠোর সত্য এবং তাঁহা, 
শিষ্যমান্রেই জানে । বিপদে, প্রলোভনে, ভগবান রক্ষা করো, বাঁলয়া কাঁদিয়া সার 


১৩৭ 


হইয়াছি-কেহই উত্তর দেয় নাই-কল্তু এই অদ্ভুত মহাপুরুষ বা অবতার বা 
ধাই হউন, নিজে অন্তর্ধামত্বগ্ণে আমার সকল বেদনা জানিয়া নিজে ডাঁকয়া 
জোর করিয়া সকল অপহৃত কাঁরয়াছেন। যাঁদ আত্মা আবনাশী হয়-যাঁদ এখনো 
তিনি থাকেন, আমি বারংবার প্রার্থনা করি, হে অপারদয়ানিধে, হে মমৈকশরণদাতা 
রামকৃ্ণ ভগ্গবন, কৃপা করিয়া আমার এই নরশ্রেম্ঠ বন্ধুবরের সকল মনোবাঞ্থা পূর্ণ 
করো। আপনার সকল মঙ্গল, এ জগতে কেবল যাঁহাকে অহেতুক দয়াঁসম্ধু 
দেখিয়াছি, তিনিই করুন ।' 

আজ যা। আবার আসিস। দোখিস দের কারস নে যেন। 


'মনের কথা কইবো কি সই কইতে মানা 
দরাঁদ নইলে প্রাণ বাঁচে না। 

মনের মানুষ হয় যে জনা 

নয়নে তারে যায় গো চেনা 

সে দু-এক জনা। 

সে যে রঙ্গে ভাসে প্রেমে ডোবে 

করছে রসের বেচাকেনা ॥ 

মনের মানুষ মিলবে কোথা 

বগলে তার ছে্ড়া কাথা, 

ও সে কয় না কথা। 

মনের মানুষ উজান পথে করে আনাগোনা ॥' 


কেশব সেনকে বললে রামকৃষ্ণ : 'জগদম্বা তোমাকে একটা শান্ত, মানে বন্তুতা-শস্তি, 
দিয়েছেন বলে তুমি জগৎংমান্য হয়েছ, কিন্তু মা দেখাচ্ছেন নরেন্দ্রের ভিতরে 
আঠারোটা শান্ত আছে। নরেন্দ্র খানদান চাষা, বারো বছর অনাবৃম্টি হলেও চাষ 
ছাড়ে না।' 

নরেন্দ্র খাপখোলা তরোয়াল। 

মাছের মধ্যে নরেন্দ্র রাঙাচক্ষু বড় রূই_-আর সব পোনা, কাঠিবাটা। অনোরা কলসাঁ- 
ঘট, নরেন্দ্র জালা । 

'ওর মন্দের ভাব-_পুরুষভাব; আর আমার মেদি ভাব- প্রকাতিভাব ।' 

ওরে, আয়, দেখা দে। সেই যে আসাঁব বলে গেলি, আর এলি না। আম যে তোর 
জন্যে পথ চেয়ে বসে আছি। তুই এলে আম িহবল হই, 'বিবশ হয়ে পাড়; জানি, 
সব জানি, তব্‌ তুই আয়। 


১৩৩ 





বাঁড় ফিরে এল নরেন। ফিরে এল তার নিভৃত ঘরের অন্ধকারে। 
চক্ষু মেলে কী দেখে এল সে দাক্ষণেমবরে! বৈরস্য ও নৈরাশ্যের মরুভূমিতে এ কে 
সজলতা ও সরসতার আভষেক! দৈন্য ও মাঁলন্যের মাঝে এ কে প্রসাদপাবনধ 
আনন্দ! ধৃল ও গ্লানির রাজ্যে নির্মলশ্যামল নির্মান্ত! নিত্য অভাবের দেশে 
অমৃতপ্দাঞ্জত পাঁরপূর্ণতা! স্বপ্ন দেখে এল না কি নরেন? না কি রহঙ্গমণ্টের 
£ 
যাই বলো, পাগল ছাড়া ছু নয়। পাগল না হলে বলে কি না ঈশ্বরকে দেখা 
যায় স্বচক্ষে? কি করে দেখবে? যে 'নার্বকার 'িরাধার গুণাতীত লোকাতীত, 
যে অবাঙউমনসগোচর, সে কখনো ধরা দেয় চোখের সমহখে £ তুমি দাঁড়াও, আমি 
দোথ- বললেই সে কি আকারিত হয়ঃ যে অকায়, তার আবার আকার কি! যে 
অসঙ্গ তার আবার সীমা কোথায়! যে অরুপ সে তো 'দিগদেশ-কালশনন্য। 
নরেন পড়েছে, যা আত্মা তাই ঈশ্বর। আত্মা অজ, তার জন্ম নেই। অমর, তার 
মৃত্যুও নেই। নিরবয়ব বলেই অজ । 'নার্বকার বলেই আঁবনাশী। এ হেন যে আত্মা 
সে আবার মূর্ত ধরবে কিঃ মার্ত ধরলে কোন মাার্ত ধরবে? যে ব্যাপী তার 
পাঁরচ্ছেদ কোথায়, পৃথকত্ব কোথায় 2 
'ল্তু এমনভাবে বললেন, ডীঁড়য়ে দেওয়া যায় না। সেই 'স্থর-স্নগ্ধ উজ্জল 
দুই চক্ষের আলোয় কোথাও যেন এতটুকু ছায়া থাকে না সন্দেহের । দেখা যায় 
ঈশ্বরকে এ যেন চোখের সামনে এই দেয়াল দেখার মত। ভোরে উঠে সূর্য দেখার 
মত। রানে উঠে অন্ধকার দেখার মত। কথার মধ্যে এতটুকু গায়ের জোর নেই, 
এ যেন সরল জল-ভাত। এ যেন 'বি*বাসের পাষাণে আন্তারকতার 'শলালাঁপ। 
সত্যের কাঁন্টপাথরে সারল্যের স্বর্ণাক্ষর। 
কিন্তু কি হলে, কি করলে দেখা দেবেন ঈশ্বর? খুব করে বিনতি-মিনাত 
করব- স্তুঁতি-চাট;ন্তি করব? তা হলেই কি ঈশ্বর কান পাতবেন? মিথ্যে কথা। 
আমাকে যাঁদ কেউ খোশামোদ করে, আমি তো বেজায় চটে যাই। যা আমার 
কাছে বিরন্তিকর, তাই ঈশ্বরের কাছে সুখকর হবে? আর, নিজেকে যে অত্যন্ত 
ছোট বলে ভাবব সেটাও তো মিথ্যে ভাবা হবে। আমিই তো দীনের দীন হীনের 
হশন নই-_আমার চেয়েও তুচ্ছ, আমার চেয়েও অধম লোক আছে অনেক সংসারে । 


তাই মিথ্যে কথায় বাজে কথায় ঈশ্বর মুস্ধ হবেন এ ক্ষুদ্রতা ষেন আমার না হয়! 
১৩৪ 


তা ছাড়া আমার চেয়ে অনেক যান বোশ বোঝেন, তান আমারই আদেশ- 
অনুরোধের অপেক্ষা করছেন, এ ব্যাদ্ধ স্পর্ধার নামান্তর। [তান কি করবেন 
নাকরবেন তা আমার বলা না-বলায় ঠিক হবে না। তাই যতই কেননা 'দেখা 
দাও 'দেখা দাও" বলে দেয়ালে মাথা ঠাক, মাথাই ভাঙবে, দেয়াল নড়বে না 
একচুল। | 
ঈশ্বর কি একটা বস্তু? একটা দ্যাতঃ একটা দ্যোতনা? তাঁকে ক করে দেখা 
যাবে ? 

তাঁকে দেখা যায় না। তিনি কি শিলা, না দারু, না ভঁমিঃ তিনি কি কাঠ-খড়, 
না তাম্র-পিত্তল ? 

আর, তাঁকে দেখেই বা আমার কী লাভ! তাঁকে দেখলেই কি আমার তাপ-্রয় ঘুচে 
যাবে? তাই যাঁদ হত, তবে এত যাঁর করুণা আর এ*্বর্য, তিনি দর্শন দিয়ে সমস্ত 
জাীঁব-জগংকে একযোগে মুস্ত করে দিতেন। লোকের শোক-্রন্দন দৈন্-অনুনয়ের 
জন্যে বসে থাকতেন না। 

কে বলে তানি প্রত্যক্ষীভূত নন? 'বল দোখ রে তরুলতা, আমার জগজ্জীবন 
আছেন কোথা ?'-এ কান্নার প্রয়োজন কি! তান তো হাতের কাছেই আছেন, 
এই আমার চোখের কাছে। তাঁকে আবার দেখব কি, পাব কি! তাঁকে তো 
প্রাতিক্ষণেই দেখাছ, প্রাতক্ষণেই তো ডুবে রয়োছ, মিশে রয়োছ তাঁতে। যান 
সবন্রস্থ, তাঁর আবার দূর-নিকট কি-াঁন সর্বব্যাপী, তিনি তো অন্তরে-বাহিরে 
সমান বর্তমান। তিনি তো আমার মধ্যেও আছেন। চমকে উল নরেন। মনে 
পড়ল দক্ষিণে*্বরের সেই স্তববাণী : “তুমিই সেই পুরাণ পুরুষ, তুমিই সেই 
নররূপণী নারায়ণ-_, 

আঁমই সেই 2 

“চদানন্দর্পঃ শিবোহহং শিবোহহং 2" আমিই কি সেই ওঙকারগম্য সঙ্গহটীন শিব ? 
মনোবাগতাত প্রকাশস্বরূপ ? নিরাকার, অত্যুজ্জবল, মতত্যুহান ? 

কে বলে? 

উন্মাদ! যে বলে সে উন্মাদ ছাড়া আর কিছু নয়! কিন্তু যদি সে উল্মাদ তবে 
সে এত ভালোবাসে কেন 2 চেনে-না-শোনে-না, নিজেকে লৃকিয়ে-রাখে-সরিয়ে-বাখে, 
অথচ আলো-বাতাসের মত আপ্রাণ ভালোবাসে, সে কি উন্মাদ ? 

দূর ছাই, ভাবব না তার কথা । কিন্তু না ভেবে থাকো তোমার সাধ্য কি। থেকে- 
থেকেই সে লোক কেবল উপকঝ*কি মারে । বলে, যাঁদ তুমি আছ তা হলে আমিও 
আছি। 

যাঁদ আম আছি তা হলে তুমিও আছ! এই 'তুঁমিশটর কি কোনো মানস মূর্তি 
নেই? নেই কোনো মানূষ মুর্তি? থেকে-থেকেই ঠাকুরের মোহন মূর্তি দেখা দেয় 
চোখের সামনে । দয়াঘন আনন্দকল্দ জগদ্বন্ধু। 

দূর ছাই, যাই আরেকবার দক্ষিণেশ্বর। তাঁকে আরেকবার দেখে আসি। 

এ কি শুধু অলস কৌঁত্‌হল, না, আর কোনো অনিবার্ধ আকর্ষণ ? বদি আকর্ষণই 


১৩৫ 


হয় তবে এর পেছনে যাুন্ত কি? চুম্বক লোহাকে টানে, সূর্ষেচন্দ্রে জোয়ার-ভাটা 
খেলে এর মধ্যে সঙ্গত ব্যাখ্যা কোথায়? আর যারই উদ্দেশ্য-উপলক্ষ থাক, 
ভালোবাসা অহেতুক। তিনি যে ভালোবাসেন। তাঁর ভালোবাসায় ষে হিসেব নেই, 
জিজ্ঞাসা নেই । 

সর্ষের আলোতেই যেমন সূর্যকে দৌখ তেমানি তাঁর করুণাতেই তাঁকে দেখব। 
মাস খানেক পরে আবার এক দিন হাজির হল দক্ষিণেশ্বরে। পথ যেন আর শেষ 
হতে চায় না। কে জানত এত দূরের রাস্তা আর এত কম্টকর! সোঁদন সুরেশ 
'মাত্তরের গাঁড়তে করে এসোঁছল বলে বৃঝতে পারোন। যাই, ফিরে যাই। বৃথা 
এই সন্ধান-ক্রান্তি। পথশ্রমের হয়তো শেষ আছে কিন্তু পন্ডশ্রমের শেষ কই। 
কিন্তু, যাই বলো, নেই আর ফিরে যাওয়া । চুম্বকের টানের কাছে লোহা নিরুপায়, 
সূর্যচন্দ্রের কাছে নদী ইচ্ছাশন্য। এ গাঁত নিরঙ্কুশ। এ গাঁতি কৃফাকষণ। 
দাক্ষণে*শবর কোন দিকে যাব বলতে পারেন ? 

আরো উত্তরে যাবে। সেখানেই আছেন সেই লোকোন্তর। উত্তর দেবেন সংদাঁক্ষণ 
বলে। 

সোঁদনের মতই ছোট তন্তপোশাঁটতে বসে আছে রামকৃফ্ণ। যেন কার জন্যে অপেক্ষা 
করে বসে আছে। ঘরে লোক-জন নেই। যেন কথা কইবার লোক নেই সংসারে। 
উদাস, নিরালম্বের মত চেয়ে আছে শূন্য চোখে। যেন উৎকর্ণ হয়ে শুনছে কার 
পদধবনি। 

তুই এসোঁছস? নরেনকে দেখে আহনাদে ফেটে পড়ল রামকৃষ্ণ । আয়, আয়, বোস 
আমার পাশাটতে । মুখখানি শুঁকয়ে গেছে দেখাছি। কিছু খাঁব 2 

একটু দূরে কুশ্ঠিত হয়ে বসল নরেন। রামকৃষ্ণ সরে আসতে লাগল । তোর কুণ্ঠা, 
কিন্তু আমার অজন্্রতা। তুই দূরে বাঁসস আর আম সরে-সরে আ'স। চুম্বকই 
শুধু লোহাকে টানে না, লোহাও ডাকে চুম্বককে। 

পাগল না-জানি অদ্ভুত কি করে বসে তারই ভয়ে সঙ্কুচিত হল নরেন। ঠিক 
তাই, রামকৃফ তার ডান পা নরেনের গায়ের উপর তুলে দলে । মৃহূর্তে কী যে 
হয়ে গেল বোঝা গেল না। মনে হল দেয়াল-দালান সব যেন মহাবেগে উড়ে 
চলেছে, বিরাট আকাশের ব্যাপ্তির মধ্যে মিশে যাচ্ছে এই ক্ষুদ্র আমত্বের আঁষ্তত্ব। 
আতঙ্কে বিহবল হয়ে পড়ল নরেন। আমিত্বের নাশই তো মৃত্যু । সেই মৃত্যুই বুঝি 
এখন উপাস্থিত। 

চেশচয়ে উঠল নরেন : “ওগো, তুমি আমার এ কী করলে ১ আমার যে মা-বাপ 
আছেন ।' 

খল-খল করে হেসে উঠল রামকৃ্ণ। তাই আছে না কি? যখন তোর সঙ্গে প্রথম 
দেখা হয়েছিল, জিজ্জাসাও কারান, তোর বাপের নাম 'ি১ তোর বাপের কখানা 
বাঁড়? আয়-আদায় কত ? 

আমার মদ খাওয়া নিয়ে কথা । যেখানে আমার এক বোতলেই কাজ হয়ে যায়, সেখানে 


শংঁড়র দোকানে কত মণ মদ আছে সে হিসেবে আমার দরকার কী! 
১৩৬ 


নরেনের আর্তস্বর কি রকম যেন লগল বুকের মধ্যে। তার বুকে হাত বুলিয়ে 

দতে লাগল রামকৃক। স্লেহস্নাত করদণকোমল হাত। 

'তবে থাক, এখন থাক, একেবারে কাজ নেই। কালে হবে। আস্তে-আস্তে 

হবে।' 

অমনি নিমেষে আবার সব স্বাভাবক হয়ে গেল। সেই ঘর সেই দেয়াল- সেই সব 

এখানে-ওখানে। তবে এটা কাঁ হয়ে গেল চাঁকতের মধ্যে ভোজভাঁজ 2 এই ফি 

মন্্-তন্ম-হন 

না,কি এই জীবনেই জন্মান্তর ঘটে গেল নরেনের ? 

কিছু না, কিছ? না। হিপ্নাটিজম জানে লোকটা, তারই প্রভাবে সহসা সম্মোহত 

করে ফেলেছে। 

তাই বা মেনে নিতে মন সায় দিচ্ছে কই? আম এমন একজন দঢ়কায় লোক, এত 

আমার মনের জোর, আমিই এত সহজে আঁভভূত হয়ে পড়ব? যাকে পাগল বলে 

ঠাউরোছি, হব তারই হাতের পৃতুলঃ কে জানে কি শান্ত ধরে লোকটা, দরকার 

নেই তার কাছে এসে, ভেলাক লাগয়ে কি অঘটন ঘটায় তার ঠিক কি! 

অমান পরমূহূর্তেই মন আবার রুখে দাঁড়াল। পালিয়ে যাবার কোনো মানে 

হয় না। লোকটা যাঁদ পাগলই হয় তবে প্রমাণ করতে হবে সেই পাগলামি । কঠিন- 

কঠোর পাথরকে যে এক নিমেষে এক তাল কাদা বানাতে পারে এক কথায় তাকে 

পাগল বললেই তার ব্যাখ্যা হয় না। শিশুর অধিক সারল্য, মা'র অধিক ভালোবাসা 

আর ফঃলের অধিক শুচিতা-এদের সমাহারে পাগলামর জন্ম হয় এ কখনো 

শাঁননি। না, 'বিচার-বিশ্লেষণ করে একটা শান্ত 'সদ্ধান্তে এসে পেশছুতেই হবে। 

দাঁড়াতে হবে এ প্রশ্নের মুখোমুখি, করতে হবে এ রহস্যের উন্মোচন । প্রহেলিকা 

বলে পালিয়ে যাব না। কুহেলিকা বলে আচ্ছন্ন হতে দেব না নিজেকে । আয়ন্তা- 

তীতকে আনতে হবে ইয়ন্তার মধ্যে। সংশয় থেকে আসতে হবে সংকল্পে। হয় 

এসপার নয় ওসপার। হয় প্রত্যাখ্যান নয় সমর্পণি। 

তাই ঠাকুর যখন এক দিন বললেন, 'নরেন্দ্র, তুই কি বলিস! সংসারী লোকেরা 

কত 'কি বলে! কিন্তু দ্যাখ, হাত যখন চলে যায়, পেছনে কত জানোয়ার কত রকম 

চীৎকার করে, কিন্তু হাতি ফিরেও চায় না। তোকে যাঁদ কেউ নিন্দা করে, তখন 

তুই কী মনে করাঁব?, 

নরেন্দ্র বললে, 'আমি মনে করব কুকুর ঘেউ-ঘেউ করছে।' 

না, পালিয়ে যাব না। যে যাই বলুক, একটা হয়-নয় করে যাব। এই পরম- 

অদ্ভুতের স্বরূপ বুঝব ঠিক-ঠিক। হটে যাব না, ছেড়ে দেব না, শানের উপর 

আছড়ে-আছড়ে টাকা বাজিয়ে নেব। দেখব এতে কতটা খাদ, কতটা ভেজাল, কতটা 

মোক। 

সব আবার সহজ হয়ে গেল। দুজনে যেন সৌভাগ্যের দিনের আত্মীয়, নিঃসঙ্গ- 

বাসের বন্ধু। 

কত অন্তরঞ্গ কথা, কত রঙ্গ-রস, কত হাস্য-পারহাস। তার পর আবার কাছে 
১৩৭ 


বসে খওয়ানো। গায়ে হাত বুলিয়ে দেওয়া। ছেড়ে 'দতে মন-কেমন-করা। আসন্ন 
সন্ধ্যা তো নয়, ঘনায়মান 'বষন্নতা। ও আবার চলে যাবে। ওর আবার বাঁড় আছে, 
বাপ-মা আছে-- 

রামকৃষের চোখ ছলছল করে এল। 

আর-সব কিছুরই হয়তো সমাধান মেলে, মেলে না শুধু ভালোবাসার । সূর্যের 
আলোর হয়তো ব্যাখ্যা হয় কিন্তু চন্দ্রের কেন এত ভুবনপ্লাবন জ্যোৎস্না ? 
এবারে তবে উঠি। 

“কন্তু আবার শিগাগর আসাব বল-যেমন নতুন পতি ঘন-ঘন আসে তেমনই 
আসাঁব বোশ-বোশ। ওরে, তোকে যখন দৌখ, তখন আম সব ভুলে যাই।, 
আসব। 

প্রাতশ্রাতি আদায় করে নিল রামকৃফণ। 

হাজরা বললে, “তুম ছোকরাদের কথা এত ভাবো কেন? যাঁদ নরেন-রাখাল নিয়েই 
ব্যস্ত থাকো তবে ঈশ্বরকে ভাববে কখন ?, 

বলরাম বোসের বাঁড় যাচ্ছে রামকৃষ্ণ, মহা ভাবনা ধরলো । সাঁত্য, কথা তো ভুল 
বলোন। ওর পাটোয়ার বাদ্ধ, ওর চুল-চেরা হিসেব । সাঁত্যই তো, যখন থেকে 
রাখাল-নরেন এসেছে তখন থেকে ওদের কথাই তো বুক জুড়ে রয়েছে। মায়ের 
কথা ভূলে আছি। 

মাকে তাই বললে রামকৃষ্ণ। মা, এ কেমনতরো হল 2 তোমাকে ছেড়ে এখন যে কেবল 
ছোকরাদেরই চিন্তা করছি। হাজরা মুখের উপর কথা শুনিয়ে দিলে । 

মা বাঁঝয়ে দিলেন। বাঁঝয়ে দিলেন গতানই মানুষ হয়েছেন। শুদ্ধ আধারে 
তাঁরই বিশদ বিকাশ । ঘোল ছেড়ে মাখন পেয়ে তখন বোধ হয় ঘোলেরই মাখন, 
মাখনেরই ঘোল। 

সমাধি-দর্শনের পর হাজরার উপর রাগ হল। শালা আমার মন খারাপ করে 
দয়েছিল। 

তার পর আবার ভাবলে, হাজরার দোষ কি। সে জানবে কেমন করে ? 

তাঁকে দেখার পর সবতাতেই তাঁকে দেখা যায়। মানুষে তাঁর বোঁশ প্রকাশ । তার 
মধ্যে যারা আবার শম্ধসত্ত তাদের মধ্যে তানি আরো উচ্চারিত। সমাধিস্থ ব্যান্ত 
যখন নেমে আসে তখন কিসে সে মন দাঁড় করাবে? তাই তো সত্তুগুণণী ভক্তের 
দরকার। ভারতের এই নজর পেয়ে তবে বাঁচল রামকৃফ। 

ভাবসমূদ্র উৎলালেই ডাঙায় এক বাঁশ জল। নদী 'দিয়ে সমুদ্রে আসতে হলে 
এ'কে-বে'কে আসতে হয়। বন্যা এলে আর ঘুরে যেতে হয় না। তখন নদণীতে- 
সমুদ্রে একাকার। তখন ডাঙার উপর দিয়েই সোজা চলে যাবে নোঁকো। 
ভগবানের লীলা যে আধারে বোঁশ প্রকাশ সেখানেই তাঁর বিশেষ শান্ত। জাঁমদার 
সব জায়গায় থাকেন, কিন্তু অমুক বৈঠকখানায়ই তাঁর বিশেষ গাঁতাবধি। তেমনি 
ভন্তই ভগবানের বৈঠকখানা। ভন্তের হৃদয়েই তাঁর বিশেষ শান্তর উদ্ভাসন । যেখানে 
কার্য বৌশ সেখানেই বিশেষ শান্তর রূপচ্ছটা। 


১৩৮ 


'বুঝলে হে” কেশব সেনকে বলছে রামকৃ : "যান ব্রহনন তিনিই শান্ত। যখন 
'নাক্য় তখন ব্রহন, পুরুষ । যখন কর্মময়ী তখন শান্ত, প্রকাতি। যিনিই পুর্ষ 
(তিনিই প্রকৃতি । আনন্দময় আর আনন্দময়ী।' 

একটু থেমে আবার বললে, 'যার পুরু্ষ-জ্ঞান আছে তার মেয়ে-জ্ঞানও আছে। যার 
বাপ-জ্ঞান আছে তার মা-জ্জানও আছে।' 

কেশব একট হাসল। 

'যার সুখ-জ্ঞান আছে তার দুঃখ-জ্ঞানও আছে। যাঁদ রাত বুঝি তবে দিনও 
বুঝেছি। যাঁদ বাল আলো তবে আবার বলব অন্ধকার তুমি এটা বুঝেছ 2 
হ্যা, বঝোছ। 

'মা মানে কি? মা মানে জগতের মা। যিনি জগং সৃন্টি করেছেন, পালন করছেন, 
[তানি। যান সর্বদা রক্ষা করছেন তাঁর ছেলেদের। আর যে যা চায়, ধর্ম অর্থ 
কাম মোক্ষ, সব দিচ্ছেন দু হাতে । ঠিক যে ছেলে সে মা ছাড়া থাকতে পারে না। 
তার মা-ই সব জানে। ছেলে খায়-দায় বেড়ায়-_অত-শত জানে না। কি, 
বুঝেছ £, 

কেশব ঘাড় নাড়ল। আজ্জে হ্যাঁ, বুঝোছ। 





ব্রাহম ভন্তদের সথ্গে স্টিমারে করে বেড়াতে গিয়েছে রামকুফণ। 

ব্রহনর্প সমূদ্রে যখন বান ডাকে তখন তার অনাশ্রয় আত্মাকে তা ভাঁসয়ে 'নিয়ে 
যায়। সমুদ্র হচ্ছে নিরাকার ঈ*বর আর তার লহরা হচ্ছে সাকার। 

ভাবমশ্ন হয়ে বসে আছে রামকৃষ্ণ, একজন একটি দূরবীন নিয়ে তার কাছে এল। 
বললে, 'এর ভিতর দিয়ে একবার দেখুন ।' 

এর ভিতর 'দিয়ে তাকালে কী এমন আর দেখা যাবে, যিনি অণু হতে অণায়ান 
তাঁকে বিশালতম করে দেখছি । ধিনি দবিচ্ঠ তাঁকে দেখছি অন্তিকতম করে। 
ব্রহত্রকে দেখতে দূরবীন লাগে না। তাঁর তো দূরের বাঁণা নয়, তাঁর হচ্ছে অন্তরের 
বীণা। 

সৌঁদন আবার এক স্টিমার এসেছে দক্ষিণেশ্বরে। স্টিমারে রেভারেন্ড কুক আর 


মস িগট। ব্রাহনরভন্তরা নিয়ে এসেছে তাদের। ধর্ম বিষয়ে বড় একজন বস্তা 
১৩৯ 


এই কুক সাহেব-রামকৃকে দেখতে বড় সাধ । রামকৃককে দেখতে মানে মৃর্তিমান 
ভারতবর্ষকে দেখতে । ভারতবর্ষের সনাতন ধর্মকে দেখতে। 

খবর পেয়ে রামকৃষ্ণ নিজেই এল নদীর ঘাটে। 

সকলের পাঁড়াপশীড়তে উঠে গেল স্টিমারে। উঠে গেল গভীর ভাবাবেশের মধ্যে। 
পশ্চিমের জ্ঞান বিমুগ্ধ হয়ে দেখল এই ভারতীয় ভান্ত। ভান্তর পায়ের কাছে 
জ্ঞান মাথা নোয়ালো। উপলব্রির কাছে স্তব্ধ হল বন্তৃতা। 

তোমাদের কেবল লেকচার দেওয়া আর বুঝিয়ে দেওয়া। তোমাকে কে বোঝায় 
তার ঠিক নেই। তুম বোঝাবার কে হে? যাঁর জগৎ তিনি বোঝাবেন। তান এত 
উপায় করেছেন, আর এ উপায় করবেন নাঃ বেশ করাছ, আমি মাটির প্রাতমা 
পূজা করছি। এতে যদ কিছু ভুল হয়ে থাকে, তা তিনি কি জানেন না যে তাতে 
তাঁকেই ডাকা হচ্ছে? 

নিশ্চয়ই হচ্ছে। যে মাকে লক্ষ্য করে গান বা প্রার্থনা করছে রামকৃষ্ণ সে মা যেন 
চোখের সামনে জলজীয়ন্ত দাঁড়য়ে। কথা বা গানের ভাষাও প্রাণতপ্ত। কে বলে 
সে শুধু মৃতমৃর্ত, কে বা বলে সে শুধু শুন্যর্পা? সে মা সর্বসাম্রাজাদায়নী 
মহামায়া । আতাঁবস্তদর্ণকান্তি কাননকুন্তলা পাঁথবী। 

আপান শুতে জায়গা পায় না, শঙগ্ুকরাকে ডাকে । নিজে জান না, পরকে বোঝাই। 
এ কি অঞ্ক না ইতিহাস না সাহত্য যে পরকে বোঝাব £ এ যে ঈশবরতত্ব। নুনের 
পুতুল হয়ে যেই গেছে সমুদ্র মাপতে সেই গলে গেছে । যে গলে যায় সে আবার 
ফিরে এসে বলবে কি! 

আবার জাহাজ এসেছে দক্ষিণে*্বরে। ঘরে বসে বিজয় গেস্বামী আর হরলালের 
সঙ্গে কথা কইছে রামকৃষ্ণ । জাহাজে কেশব এসেছে- ব্রাহননভন্তরা এসে বললে। 
চলন একটু বোঁড়য়ে আসবেন আমাদের সঙ্গে । 

এক কথায় রাজী! কেশব যখন আছে তখন আবার কথা কি! বিজয়কে নিয়ে 
নৌকোয় উঠল রামুকৃ্ণ। নৌকোয় উঠেই সমাধস্থ। 

নৌকো থেকে জাহাজে তোলাই মৃশাঁকল। কেশব ব্যস্তসমস্ত হয়ে সব তদারক 
করছে । অনেক কম্টে বাহ্যজ্ঞান আনতে পারলেও ঠিক-ঠিক পা ফেলতে পারছে না 
রামকৃষ্ণ । ভ্তের গায়ের উপর ভর দিয়ে আসছে। 

ক্যাবনে আনা হল। বসানো হল চেয়ারে। কেশব লুটিয়ে পড়ে প্রণাম করলে। 
সঙ্গে-সঞ্জে অন্যান্য ভন্তরা। যে যেখানে পেল বসে পড়ল মেঝেতে । বিস্তর ভিড় 
চারাদকে। যারা ঢুকতে পায়ান তারা শুধু এখানে-ওখানে উপকঝঠাক মারছে। 
স্পর্শন না পাই শুধু একট: দর্শন হোক । ষাঁদ দর্শনও না জোটে পাই যেন তার 
একট অমতবর্ষণ। 

ঘরের জানলাটা খুলে দিল কেশব। বিজয়কে দেখেই সে অপ্রস্তুত হয়ে গেল। 
যে একাঁদন অত্যাগসহন বন্ধু ছিল সেই আজ বিরুদ্ধ-বৈরাঁ। অথচ ছায়াসম্ধানে 
দুজনেই এক তরুমূলে সমাগত। একই নদীর ঘাটে এসে অঞ্জালতে করে একই 
পপাসার বাঁর তুলে 'নিয়েছে। 


১৪০ 


সমাঁধ ভেঙেছে রামকৃষ্ণের। তব এখনো ঘোর রয়েছে ষোলো আনা। মাকে বলছে, 
মা, আমাকে এখানে তুই আনাঁল কেন? বেড়ার ভিতর থেকে ক পারব এদের 
রক্ষা করতে ?, 
এদের যে সব কাম-কাণ্চনে হাত-পা বাঁধা। বেড়ার মধ্যে সব বোঁড় পরে বসে আছে। 
ওদের কি পারব আম মুস্ত করতে ? 
গাজীপুরের নীলমাধববাব; আছেন। গাজীপুরের সেই সাধু পওহারী বাবার কথা 
উঠল! পওহারী মানে পও-আহারা, অর্থাৎ কিনা বায়ুভুক সন্্যাসী। 
মাঁটতে বিরাট এক গর্ত খুড়ে তার মধ্যে ধ্যান করে পওহারী॥। উপরে ছোট 
একটি আশ্রম, সেখানে প্রেমাস্পদ-প্রভু রামচন্দ্রের পূজা আর নিজের হাতে বিরাট 
ভোগ রাল্না করে দারিদ্রের মধ্যে পারবেশন। এই তার সাধন-ভজন। নিজের খাবার 
বেলায় এক মো তেতো নিম পাতা নয়তো গোটা কয় কাঁচা লঙ্কা। তার পর 
গতেরি মধ্যে এক-এক সময় এত দীর্ঘ কাল সমাধস্থ হয়ে থাকে, লোকে ভেবে পায় 
না সাধু খায় কি? সাপের মত নিশ্চয়ই শুধু বাতাস খেয়ে থাকে । সেই থেকে তার 
নাম হয়েছে পওহারা। 
এরই আশ্রমে এক দিন চোর এসোছিল। পোঁটলা বেধে জানিস-পন্ন নিয়ে গগিয়োছল 
চুর করে। পওহারী বাবা দেখতে পেরে তার পিছু নিল। ভয় পেয়ে পোঁটলা 
ফেলে চম্পট দিল চোর। তবু পওহারী বাবা তার পিছু ছাড়ে না। জিনিস 
পেয়ে গিয়েছে তবু ছাড়ান-ছোড়ান নেই। চোর কি করে পারবে সাধুর সঙ্গে, 
জোরে ছুটে চোরকে ধরে ফেললে পওহারী। কোথায় চোর কাকুতি-মনাতি করবে, 
পওহারী বাবাই স্তুতি-বিনাতি করতে লাগল চোরের পদপ্রান্তে পোঁটলা নামিয়ে 
রেখে করজোড়ে ক্ষমা চাইলে । বললে, অনেক ব্যাঘাত ঘটিয়োছ প্রভু, তাই 'নাশ্চন্ত 
মনে পোঁটলাট তোমার নেওয়া হল না। আমাকে ক্ষমা করো । নাও এই সামান্য 
উপচার। এ পোঁটিলা আমার নয়, এ তোমার । 
'সেই পওহারা বাবা” বললে একজন ব্রাহননভন্ত, শনজের ঘরে আপ্ুনার ছবি টাঙিয়ে 
রেখেছে । 
নিজের দকে আঙল দেখালো রামকৃষ্ণ । বললে, 'এই খোলটার ! 
বালশ আর তার খোল-_তার মানে দেহ আর দেহ। বাইরেটা দেহ, অন্তরে 
দেহশী, তার মানে অন্তর্যামী। দেহের ছবি নিয়ে কি হবেঃ ছাপ নাও সেই 
অন্তরজ্ঞের। 
তান এক, তাঁর নাম আলাদা, রূপ আলাদা । একই ব্রাহম্রণ, যখন পূজা করে 
তখন তার নাম পুজার; যখন রান্না করে তখন রাঁধুনে। একই লোক, ধখন 
মা'র কাছে তখন ছেলে, যখন স্বর কাছে তখন স্বামী, যখন ছেলের কাছে তখন 
বাপ। একই জল, কেউ বলে জল, কেউ বলে পানি, কেউ বলে ওয়াটার। একই 
ভাব, নানান নামের টুকরোয় ফেটে পড়ে। একই শভ্রতা, রূপ নিয়েছে সাতরঙা 
রামধনু। 
'কালীর কথা বলুন ।' 'জিগগেস করল কেশব। 'কালী কালো কেন? 

১৪১ 


দুরে আছে বলে কালো দেখায়। জানতে পারলে আর কালো নয়। তখন আলো। 
আকাশ দূর থেকেই নীল, যাঁদ কাছে যাও দেখবে রঙ নেই- শাদা । সমনদ্রের জলও 
তাই-ূর থেকেই নীল, কাছে থেকে শাদা। 

মুন্ত করে দিতে পারেন তাই দেন না কেন? 

“তাও তাঁরই ইচ্ছে। তারি ইচ্ছে তিন এই সংসারের ছকে জীব-জন্তুর ঘঃট 
চেলে-চেলে খেলা করেন। ব্যাড়কে আগে থাকতেই ছয়ে ফেললে ছুটোছুটি 
হয় না। ছুটোছুটি না হলে খেলে সুখ কই? খেলা চললেই বুড়ির আহমাদ ।' 
তবে কি আমরা বুড়ির আহনাদের জন্যে কেবল ছনটোছনটি করব £ 

করলেই বা। মন্দ কি। খেলা চলছে এই তো বেশ। যে ছেলে ছুটোছুটি করে 
খেলছে আর যে ছেলে বসে আছে মা'র কোলে চেপে, এদের মধ্যে কোন ছেলেকে 
মা'র বোশ পছন্দ ? 

“সব ত্যাগ না করলে কি পাওয়া যাবে না ঈশ্বরকে? জিগগেস করলে এক 
ব্রাহমুভস্ত। 

'তা যাবে না। কন্তু ত্যাগ তো মনে। মন নিয়েই কথা । সংসার করছ করো কিন্তু 
মন রাখো ঈশ্বরের হাতের মুঠোয় ।' 

“সেই তো কঠিন।' 

'মোটেই কঠিন নয়। এক পাশে পাঁরবার, এক পাশে সন্তান নিয়ে শোওনি? 
দুজনকে আদর করোন দুভাবে ? দুই জন দুই ভাব, কিন্তু মন এক। মন নিয়েই 
সব। যাঁদ সাপে কামড়ায়, আর যাঁদ জোর করে বলো, বিষ নেই, বিষ ছেড়ে যায়। 
যদি বলো আম মান-হংষ মানুষ, যদি বলো আম ঈশ্বরের সন্তান, কে আমাকে 
বাঁধে, দেখবে তুমি ?নবন্ধিন, তুমি নিমুন্ড। তুম মহাবীর ।' 

রামকৃষ্ণ তাকাল কেশবের দিকে । বললে, 'তোমাদের ব্লাহমনসমাজেও কেবল পাপ 
আর পাপা । খঙ্ট্ীনদেরও তাই। যে রাত-দন কেবল পাপাী-পাপন করে সে পাপীই 
হয়ে যায়। যে কেবল বলে আমি বদ্ধ আর বদ্ধ সে বধ্যই হয়ে থাকে । বলো আম 
আমাকে ছোঁয় কে, আমাকে কে আটকায়! 

ভাটা পড়ে এসেছে । এবার ফেরা যাক। অমৃত কথা শুনতে-শুনতে কত দূর চলে 
এসেছে জল ঠেলে কারু খেয়াল নেই। 

কোঁচড়ে করে মাঁড় নারকেল খাচ্ছে সবাই। হঠাৎ বিজয়ের দিকে নজর পড়ল 
রামকৃফের। কেমন যেন আড়ম্ট হয়ে বসে আছে । তার পাশে আরেক চৈয়ারে কেশব 
বসে। সেও তেমনি জড়সড়। 'মটে গেছে ঝগড়া তবু যেন 'মিশ খাচ্ছে না। 
রামকৃষ্ণ তাকাল একবার 'বজয়ের দিকে, তার পর কেশবের দিকে । বললে, তোমাদের 
ঝগড়াবিবাদ যেন সেই শিব-রামের যুম্ধ। জানো তো, রামের গুরু শিব । দুজনে 
যৃদ্ধও হলো, আবার সন্ধিও হলো। কিন্তু শিবের চেলা ভূতপ্রেত আর রামের 
চেলা বানর- ওদের ঝগড়া-ীকাঁচিমাচি আর মেটে না।, 

১৪২ 


সবাই হেসে উঠল। 
মায়ে-ঝিয়ে আলাদা মঙ্গলবার করে, এও প্রায় তেমাঁন। মা'র মণ্গল আর মেয়ের 
মঙ্গল এ দুটো যেন আলাদা। এর মঞ্গলেই যে ওর মঙ্গল এ খেয়াল কারুর 
হয় না। তোমাদের ওর একটি সমাজ আছে এখন আবার এর একটি দরকার? 
আবার হাসির রোল। 
'তবে এ সব চাই। যাঁদ বলো ভগবান নিজে লীলা করছেন, সেখানে জটিলে- 
কুটিলের কী দরকার! জটিলে-কুটিলে না থাকলে যে লীলা পোম্টাই হয় না।' 
বুড়ি-ছোঁয়ার খেলাটও তাই জটিল-কুটিল। যাঁদ গোলকধাঁধার পথ না হত তবে 
জমত না খেলা, রগড় হত না। বলতেই বলে, দুশো মজা, পাঁচশো রগড়। 
ফ্তাহাজ এসে থামল কয়লাঘাটে। গাঁড় আনা হল। কেশবের ভাইপো নন্দলালের 
সঙ্গে গাঁড়তে উঠল রামকুফণ। 
উঠেই মুখ বাঁড়য়ে ব্যাকুল স্বরে ডেকে উঠল, কই, কই তিনি কই? 
কাকে রামকৃফ খঃজছে বুঝতে কারু দোর হল না। তাঁকে ডেকে আনল। হাসি- 
হাঁস মুখে কেশব এসে দাঁড়াল সামনে। ভূমিষ্ঠ হয়ে রামকৃষ্ণের পায়ের ধুলো 
নিল। 
ইংরেজটোলার মধ্য 'দয়ে গাঁড় যাচ্ছে। ঝকমক করছে রাস্তা, ঝকঝক করছে 
বাঁড়-ঘর। গ্যাসের আলো জবলছে অন্দরে-বাইরে। আকাশে আবার পার্ণমার 
গ্লাবন। পিয়ানো বাজিয়ে গান করছে মেমসাহেবরা। সর্ব যেন আনন্দভাতি। 
সব দেখে-শুনে রামকৃষ্ণ হাসতে-হাসতে চলেছে । হঠাং এক সময় বলে উঠল, 
আম জল খাব। তেম্টা পেয়েছে আমার। 
এখন ক হবে! রাস্তার মাঝখানে এখন ক করা যায়! 
নন্দলাল নামল গাঁড় থেকে । সামনেই ইন্ডিয়া ক্লাব। সেখান থেকে কাচের গ্লাশে 
করে জল নিয়ে এল। 
সানন্দে সেই জল খেল রামকুফণ। 
নবাগত শিশু যেমন কলকাতা দেখে তেমনি ভাবে মুখ বাড়িয়ে দেখতে লাগল 
গাঁড়-ঘোড়া, দোকান-দান, দেখতে লাগল শহরের ইট-পাথরের উপর জ্যোৎস্নার 
অকার্পণ্য। 
নন্দলাল নেমে গেল কলুটোলায়। গাঁড় এসে থামল সরেশ 'মান্তরের বাঁড়র 
সামনে। 
সুরেশ বাঁড় নেই। এখন গাঁড়ভাড়া কে দেবে? 
'ভাড়াটা মেয়েদের কাছ থেকে চেয়ে নে নান 
দোতলার ঘরে ঠাকুরকে এনে বসাল সকলে । ফরমাস দিয়ে নতুন একখানা ছবি 
আঁকিয়েছে সরেশ-ঠাকুর কেশবকে সকল ধর্ম সকল সম্প্রদায়ের সমন্বয় 
দেখাচ্ছেন। সেই ছবি দেয়ালে টাঙানো । মেঝেতে ফরাস পাতা, তার উপর 
আন। 

১৪৩ 


চাষারা হাটে গরু কিনতে যায়। গর বাছবার চিহ্ন ক ? ল্যাজের নিচে হাত দিয়ে 
দেখে । ল্যাজে হাত দিলে ষে-গরু শুয়ে পড়ে সে-গরু কেনে না। ল্যাজে হাত 
দিলে যে-গরু 'তাঁড়ং-মাঁড়ং করে লাফিয়ে ওঠে সেই গরু পছন্দ করে। নরেন 
আমার সেই গরুর জাত--ভিতরে জলন্ত তেজ। সে ি'ড়ের ফলার নয়, সে 
ভ্যাদ-ভ্যাদ করে না। র 

আহা, এখানে এক রকম, ওখানে আরেক রকম। দুরন্ত ছেলে বাবার কাছে 
যখন বসে, যেন জুজুর ভয়ে চুপ করে বসে, আবার যখন চাঁদানতে এসে খেলে 
তখন তার আরেক মুর্ত। এরা 'নিত্যসিদ্ধের থাক, সংসারে বদ্ধ হয় না কখনো। 
একট বয়স হলেই চৈতন্য হয়, আর ভগবানের দিকে চলে যায়। ওরে, কই, এখনো 
তো এল না নরেন্দর। 

নরেন এসেছে, নরেন এসেছে, রব উঠল চার দকে। রামকৃষধের আনন্দের আগুন 
দ্বিগুণ হয়ে উঠল। 

“আজ কেমন জাহাজে করে বেড়াতে 'িয়েছিলাম-_' বলতে লাগল নরেনকে, “সঙ্গে 
াজয় ছিল কেশব ছিল, এরা সব 'ছিল। এদের জিগগেস কর্‌, কত আনন্দ 
হল আজ । কেমন বিজয়-কেশবকে মায়ে-ঝিয়ে মঞ্গলবার শোনালুম, বললুম সেই 
জাঁটলে-কাটিলের কথা ।, 

নরেন শুনতে লাগল অতৃপ্য কর্ণে। 

ওরে আমার আনন্দের ভাগ তোকে কিছু না দলে আম যে একা-একা বইতে 
পার না। 





বেড়াতে গিয়ে রাখাল একাঁট পয়সা কুঁড়য়ে পেয়েছে । ভাবলে বাজে লোক যাঁদ 
পায় নির্ঘাত মেরে দেবে। তার চেয়ে কানা-খোঁড়া ভিক্ষুককে দিয়ে দলে সদ্ব্যয় 
হবে পয়সাটার। 

ঠাকুরের কাছে কথাটা গোপন করলে না। শিশু যেমন তার মাকে সব কথা খুলে 
বলে রামকৃফের কাছে রাখালের সেই রকম অনাবৃতি। 

'একটা পয়সা কুঁড়য়ে পেয়েছি। পথের ভিক্ষুক কাউকে 'দিয়ে দেব ।, 

ভেবোছিল ঠাকুর বোধ হয় খুশি হবেন, কিন্তু তিনি জলে উঠলেন। তোর 


১৪৪ 


দনের জন্যে বব-ভুবন বসে আছে। পয়সা তো আপনা থেকে তোর মূঠোর 
মধ্যে চলে আসেনি । তুই কুড়োতে গোল কেন ? 

বা, আমি যে যাঁচ্ছলুম ও-পথে। পথের মধ্যে পড়ে রয়েছে।' 

যে মাছ খায় না সে মাছের বাজারেই বা যাকে কেন? তোর যখন নিজের দরকার 
নেই, তখন কেন তুই ও-পয়সা ছ*তে গোল ?' 

দে ফেলে দে পয়সা। 
সোঁদন স্নানের আগে ঠাকুরকে তেল মাখাচ্ছে রাখাল। কি খেয়াল হল রাখাল 
একটা প্রার্থনা করে বসল। প্রার্থনা আর কিছুই নয়, ভাবসম।ধ চাই। রাখাল 
যত চায় রামকৃষ্ণ তত কঠিন হয়। 
রাখালও নাছোড়বান্দা। দতেই হবে আমাকে সেই ঈশবারক অনুভূতির উচ্চতর 
অবস্থা । 
রামকৃষ্ণ তখন কি করে, একটা নিদারুণ কথা বলে রাখালকে আঘাত করে বসল। 
সেই মর্মান্তিক আঘাতের যন্ত্রণা সইতে পারল না রাখাল। তেলের বাট হাত 
থেকে ছখ্ড়ে ফেলে 'দয়ে হন-হন করে ছুটে চলল । থাকবে না আর সে দাক্ষণেন্বরে। 
[ফিরে যাবে কলকাতা । 
কত দূর আর যাবে! ফটক পার হতে না হতেই পা দুটো তার অবশ হয়ে পড়ল। 
সধ্য নেই দাঁড়য়ে থাকে। বসে পড়ল সেইখানে । 
একেবারে নিরুপায়! এখন ক কার কোথায় যাই, যেন জলে পড়ল রাখাল। 
নরুপায়েরই উপায় আছে। জলেরই আছে আবার অ৭রাশ্রয়। ফটকের কাছে 
বামলাল। “ঠাকুর পাঠিয়ে দিলেন নিয়ে যেতে ।' 
ক্ষমায় একেবারে মাতা বসুন্ধরার মত। দীনপাবনী করুণার মুক্তধারা । 
রামলালের 'িছু-পিছু রাখাল চলে এল গাুঁট-সাঁট। অধোবদন হয়ে দাঁড়াল 
ঠকুরের সামনে। 
ক রে, পারলি £ পারাল গাণ্ড ছাঁড়য়ে যেতে ?' 
সন্ধ্যে বেলায় সেই রাখাল আবার বসেছে ঠাকুরের সামনে । 
'রাখাল-নরেনও আছে, আবার আছে হাজরা । হারা হচ্ছে শুকনো কাঠ। জপ 
করে, আবার ওরই ভেতর দালালির চেম্টা করে। সবাই বলে, ও এখানে থাকে 
কেন2 তার মানে আছে। জাঁটলে-কুটিলে না থাকলে লীলা পোম্টাই হয় না।' 
তার পর হঠাং রাখালের দিকে চোখ ফেরাল রামকৃষ্ণ । বললে, 'সকালে তখন 
তুই রাগ করোছালিঃ তাই নাঃ তোকে রাগাল্ম কেন? তার মানে আছে। 
ওষুধ ঠিক পড়বে বলে। পিলে মূখ তুললে পরই মনসার পাতা-্টাতা দিতে হয়। 
বুঝাল?, 

'ঈশ্বরীয় রূপ মানতে হয়। জগদ্ধান্রী রূপের মানে ভ্ঞানো2 যিনি জগৎকে ধারণ 
করে আছেন। তিনি না ধরলে জগৎ পড়ে যায়, নষ্ট হয়ে যায়। মন-করাঁকে যে 
বশ করতে পারে তারই হৃদয়ে জগদ্ধা্রীর উদয়।' 


১০ (৬৮) ৯১৪৫ 


রাখাল বললে, মন মত্ত-করা।' 

শসংহবাহিনীর সিংহ তাই হাতিকে জব্দ করে রয়েছে ।' 

আবার আরেক দিন অভিমান হল রাখালের। আবার ছেড়ে গেল দক্ষিণেম্বর। 
আবার ফিরে এল ঠাকুরের পদমূলে। 

'তুই রাগ করে দক্ষিণেশবর থেকে চলে গোল, আম মা'র কাছে গিয়ে কাঁদতে 
লাগলুম। মা গো, এরা তোর অবোধ সন্তান, এদের অপরাধ নিসান। তাই আবার 
ফিরে এীল। না এসে আর যাঁব কোথায় 2, 

অধর সেনকে এক দন বললেন ঠাকুর, এরা শ্রাবণ মাসের জল নয়। শ্রাবণ মাসের 
জল হুড়-হুড় করে আসে আবার হড-হড় করে বোরয়ে যায়। এরা থাকিয়ে 
জল। মাটি ফড়ে এদের আবিভভাব। 

ঠাকুরের পা টিপছে রাখাল, আর একজন ভাগবতের পাঁশ্ডত ভাগবতের কথা বলছে 
কাছে বসে। 

কথায় আর স্পর্শে রাখালের সেই প্রথম ভাব। থেকে-থেকে শিউরে উঠতে-উঠতে 
একেবারে নিশ্চল 'স্থির। 

ভাব তো নয়, ভাব-বিলাঁসতা! এই হল নরেনের ধারণা । এ সব ভাব হচ্ছে 
স্নায়ূদৌর্বল্যের ফল, মানাসক মৃগী রোগ। 

প্রাহমূসমাজের খাতায় নাম 'লাঁখয়েছে দুই জনে- নরেন আর রাখাল- ব্রাহমসমাজের 
সংকজ্প নিয়েছে । অথচ-_ 

এক দিন দক্ষিণে*বরে এসে নরেন দেখতে পেল ঠাকুরের 'িছদ-পিছ রাখালও 
চলেছে মান্দিরে। বিগ্রহের সামনে ঠাকুর ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করছেন, 'িছু-পিছ 
রাখালও প্রণাম করছে। 

দেখে তো পায়ের রন্ত মাথায় উঠল নরেনের। রাখালের এ কী বিমবাসভগ্গ ! কথা 
দিয়ে এসে সেই কথার প্রত্যবায় ! 

ধরল রাখালকে। অন্তরালে ডেকে 'নয়ে গেল। তীব্র ভর্থসনার সুরে বললে, 
তোমার কাঁ কান্ড? 

“কেন, কী হয়েছে 2 

'কী হয়েছে মানে? এটা মিথ্যাচার নয় 2, 

“কোনটা 2, 

«এই যে মান্দরে গগয়ে দেবদেবীকে প্রণাম করা 2' 

রাখাল চোখ নামাল। কথা কইল না। 

তুমি ব্রাহমসমাজের অহ্গীকার-পন্রে সই করে দিয়ে আসোনি? বলে আসোনি, 
ণনরাকার ব্রহন্ন ছাড়া আর 'িছ: ভজনা করবে না ? মানবে না দেবদেবী 2 

তবু চুপ করে রইল রাখাল। কি করে মনের কথা বোঝাবে নরেনকে 2 ঠাকুরের 
ছোঁয়ায় সংস্কারের পুরোনো গ্রল্খি সব খুলে গিয়েছে যষে। ব্রহেত্রর যে ইতি নেই, 
তাঁর যে লেখাজোখা হয় না। তিনি যাঁদ 'নরাকার হয়ে থাকতে পারেন, সাকার 
হয়েই বা থাকতে পারবেন না কেনঃ তানি যাঁদ সর্বব্যাপক সর্বাবরক হন তবে 


৯৪৬ 


তিনি শলা-মাত্তকাই বা আশ্রয় করতে পারবেন না কেন? গোঁড়ামির অন্ধক্‌প 
থেকে ঠাকুর তাকে নিয়ে এসেছেন আকাশের নিত্যানির্মল উদারতায়। 

কিন্তু কিছুই বলতে পারল না। এত যার তেজ ও দীপ্তি তার সঙ্গে রাখাল 
পারবে না তর্ক করে। 

তাই বলে নরেন ছাড়বার পান্র নয়। সে গিয়ে ধরল ঠাকুরকে। 

'রাখাল এই মিথ্যাচার করবে ? গড় হয়ে প্রণাম করবে দেবদেবী?' 

'করলেই বা। ভগ্ঘবান সব জায়গায় আছেন, শুধু মূর্তিতেই থাকবেন না? 
শকন্তু ও যে সই করে দিয়ে এসেছে ।' 

'তআই বলে ও মত বদলাতে পারবে না; চিন্তার জগতে থাকবে না ওর 
স্বাধীনতা ?' 

চিরস্বাধীন নরেন্দ্রনাথ থমকে গেল। কথা খুজে পেল না। 

'রাখালের এখন সাকারে বিশ্বাস হয়েছে। তা কি করবে বলো? যার যেমন ধাত। 
যার যেমন পেটে সয়। তোর নিরাকারের ঘর, রাখালের সাকারের। সকলেই কি 
আর গোড়া থেকে নিরাকারে মন দিতে পারে? সাকারণনরাকার যে কোনো একটাতে 
বিশ্বাস থাকলেই হলো।, 

নরেন ফিরে যাঁচ্ছল ঠাকুর ডাকলেন। বললেন, 'রাখালকে আর কিছু বাঁলসান। 
সে তোকে দেখলেই ভয়ে জড়সড় হয়।' 

সেই রাখালের অসুখ করেছে। সবাইকে উদ্বেগ জানাচ্ছেন ঠাকুর। বলছেন, 'এই 
দেখ আমার রাখালের অসুখ । সোডা খেলে কি ভালো হয় গা? 

শেষকালে যেন দৈববাণীর মতো বলে উঠলেন, 'যা, রাখাল, তুই জগন্নাথের প্রসাদ 
খা গে, যা।' 

দেখতে পেলেন নারায়ণ বালকের রূপ ধরে সামনে এসে দাঁড়য়েছে। ঠাকুরের 
প্রেমানুরাঞ্জত চোখ গোপালকে দেখে যশোমতীর যেমন স্নেহগদগদ দচ্টি। 
ধীরে-ধীরে সমাধিতে ডুবে গেলেন রামকৃষ্ণ । যে মা এতক্ষণ ব্যস্ত ছিলেন সন্তানের 
জন্যে, সে মা এখন কোথায় ? সাকার ছেড়ে ডুব দিয়েছেন নিরাকারের জলধিতে। 
নন্দনবাগানে ব্রাহমসমাজের উৎসবে নিমন্ত্রণ হয়েছে ঠাকুরের। ভন্তদের নিয়ে 
এসেছেন, সঙ্গে রাখাল। কিন্তু তাঁদের দিকে গৃহস্বামীদের লক্ষ্য নেই। উপাসনা 
শেষ হলে খাবার ডাক পড়ল। কিন্তু এঁদক পানে কেউ তাঁকয়েও দেখছে না। 
শুধু বড়লোক আর আত্মীয়-কুটমদের নিয়েই শশব্যস্ত। 

'কই রে কেউ ডাকে না যে রে!' ঠাকুর বললেন ভন্তদের। 

ভন্তরা আর কি করবে । এঁদক-ওাঁদক তাকায়, কারুরই চোখের দৃন্টি আকর্ষণ 
করতে পারে না। কে না কে এসেছে হেজিপোঁজ এমনি মনোভাব । 

ঠাকুরের কথা শুনে তেলে-বেগুনে জলে উঠল রাখাল। বললে, শায়, চলে 
আসুন।" 

রাখালকে বড় বি'ধছে এ অপমান। অন্যায় ওুদাসীন্য অপমান ছাড়া আর 'কি। 


কিন্তু চলে আসুন বললেই তো আর চলে যাওয়া যায় না। 
১৪৭ 


'আরে রোস,' রাখালকে নিরস্ত করলেন ঠাকুর : 'গাঁড়ভাড়া তিন টাকা দু. আনা 
কে দেবে? রোক করলেই হয় না। পয়সা নেই আবার ফাঁকা রোক। আর এত 
রাত্রে খাই কোথা ?, 

একসঙ্গে পাতা পড়েছে সকলের। অনেক পরে যখন ডাক পড়ল এ-দলের তখন 
গিয়ে দেখল, জায়গা নেই, সমস্ত আসন ভরে গিয়েছে। তখন এক পাশে নোংরা- 
মতন একটা জায়গায় ভন্ত সমেত ঠাকুরকে বসানো হল এক ধারে। নুন-টাকনা 
দিয়ে দাব্য লচ খেলেন ঠাকুর । 

ভন্তরা মুশ্ধ দৃঁন্টতৈে তাকিয়ে রইল ঠাকুরের 'দিকে। বিন্দুমাত্র আভমান নেই। 
নেই এতটুকু দোষদর্শন। কার্‌ণ্য আর সৌশীল্যের প্রাতিমূর্তি। উদারতা আর 
ক্ষমার সমাহার। লোককল্যাণকামনায় সর্বংসহ। 

পরের দোষ আর দেখব না। গর্বে আর পর্বত ভাবব না িনজেকে। 





এঁদকে, এর আগে, বিজয়ের কি হয়োছল একটু খোঁজ 'িনই। 

কেশবের সঙ্গে ছাড়াছাঁড় হয়ে গিয়েছে । কেশব করেছে 'নবাঁবধান' বিজয় করেছে 
'সাধারণ'। জয় হয়েও বিজয়ের শান্তি নেই। শুধু প্রচারে-িবচারে উপদেশে- 
উপাসনায় উষর মরু সজল হয় না। চাই শ্রাবণ-সণ্চন। তৃষ্ণা মেটে না শুধু জ্ঞানের 
খরতাপে। চাই ভান্তর বাঁরধারা। 

শুধু নিরাকারে শান্ত হয় না হাহাকার। 

মেছুয়াবাজার স্ট্রিট ধরে এক দিন হেটে যাচ্ছে বিজয়কৃষ্ণ, হঠাৎ এক হিন্দুস্থানী 
সাধুর সঙ্গে দেখা । সাধু-সন্বেসীর দিকে তাঁকিয়েও দেখোন কোনো দিন, অথচ 
এর 'দকে চোখ না ফেলে পারল না। যেমনি চোখ পড়ল অমাঁন থমকে দাঁড়াল। 
শুধু তাই নয়, যা ধারণার অতাত, পায়ের ধুলো নিয়ে প্রণাম করে বসল সাধূকে। 
ক লজ্জা, কেউ দেখতে পায়নি তো! 

ব্লাহন্নসমাজে বেদীতে বসে উপাসনা করছে বিজয়, চোখ চেয়ে দেখল এক কোণে 
সেই সাধু বসে। উপাসনার শেষে বেরিয়ে আসছে মান্দর থেকে, হঠাৎ পিছন 
দক থেকে এসে বিজয়ের হাত ধরল সেই সাধু । বললে, চলো! 

কোথায় 2 

৯৪৮ 


কোথাও নয়। এই রাস্তায়। অচেনা ভিড়ের নারাবাঁলতে। 

ফাঁকায় চলে এসে হঠাৎ জিগগেস করলে সাধু, 'তোম গুরু কিয়া?" 

বিজয় দস্বরে বললে, “আমি গুরুবাদ মানি না।' 

শিবনাথ শাস্মীও বলোছল সেই কথা। গুরু লাগবে কিসে? আত্মবলে ঈশ্বর 
লাভ করব। আম কি কিছু কম ? 

ঠাকুর একবার তাকালেন গঞ্গার দিকে । দেখলেন হাতের কাছেই সুস্পম্ট উদাহরণ । 
চলন্ত 'স্টমারের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা একটা গাধাবোট। 'স্টমারের সঙ্গে-সঙ্গে 
গাধাবোটও 'দাব্যি জল কেটে এঁগয়ে আসছে পারের দিকে। 

এ দেখ এঁ গাধাবোট। ওর সাধ্য ছিল আত্মবলে এত তাড়াতাঁড় এগিয়ে আসতে ? 
হয়তো এক বেলা লেগে যেত। ভাগ্যক্ুমে স্টিমারের সঙ্গে বাঁধা পড়োছিল বলেই 
এত বেগে বোঁরয়ে আসতে পারছে। গাধাবোটের পক্ষে পার পেতে হলে শুধু 
আত্মবলে চলে না, গুরূবল লাগে। 

জীবমান্রই গাধাবোট। শুধু লাগ ঠেলে-ঠেলে কত আর তুমি এগোবে- কত দিনে 
স্টিমার ধরো। ধরো গুরু । ধরো পারাপারের কর্ণধার। ঠিক তোমাকে পার করে 
দেবে। 

'গু" মানে অন্ধকার আর “রু' মানে আলোর দ্যোতক। অন্ধকার থেকে যান আলোকে 
নিয়ে যান তিনিই গুরু । অন্ধকারে যান আলোর সংবাদ দেন তিনিও। 

এত বড় যে বিদ্যা-বশারদ হয়েছ, বাল, বর্ণপারচয় শিখতে গুরু লাগোন 
কিল্তু মুখ গম্ভীর করে বিজয় বললে, 'মানি না আঁম গদরুবাদ ।' 

মৃদু-মৃদদ হাসল সেই সন্ন্যাসী । বললে, 'এই 1স ওয়াস্তে সব 'বিগড় গিয়া- " 
বিজয়ের বুকের মধ্যে কে ধাক্কা দলে । মুখ ঘুঁরয়ে বললে, "তুমি শুনে আমার 
উপাসনা? ও কিছ নয় ?, 

'ও সব তো বেদকা বাণী হ্যায়। ওস মে ক্যা হোগা? 

যেন সহসা কে টালয়ে দিল বিজয়কে । পথের মধ্যে বসিয়ে দিল। মনে হল 
গুরু নেই বলে সব পন্ড হয়ে যাচ্ছে। পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। সমস্ত চেস্টা নিষ্ফল 
চেল্টা। 

গুরু চাই। অগ্নমল্থন কাঠ প্রস্তৃত। শুধু একট ঘর্যণ দরকার । 

আপাঁন আমার গুরু হোন। ব্যাকুলতায় সমস্ত শরীর কেপে উঠল বিজয়ের । 
আমাকে দিন সেই চৈতন্যের স্ফুলিঙ্গ। যজ্ঞের কাঠ একবার জবলে উঠুক। 
'নেহি। তোমারা গুরু দোসরা হ্যায় 

ঠাকুর বললেন, 'তবে এবার এক বাঁঘনীর গল্প শোনোন' 

ছাগলের পালে এক বাঘিনী পড়েছিল। দূর থেকে তাক করে এক শিকারা 'ভাকে 
মেরে ফেললে । তখন সেটার প্রসব হয়ে ছানা হয়ে গেল। ছানাটি ছাগলের সঙ্গ 
মানুষ হতে লাগল। ছাগলেরা ঘাস খায়, বাঘের ছানাও ঘাস খায়। ছাগলদের 
মত বাঘের ছানাও ভ্যা-ভ্যা করে। আবার কোনো জ্ঞানোয়ার এলে ছাগলদের মতই 


ছুটে পালায়। এক দিন সেই ছাগলের পালে আর একটা বাঘ এসে পড়ল। 
ও ১৪৯ 


ঘাসখেকো বাঘটাকে দেখে তো সে অবাক! দোড়ে তখন ধরল সে ঘাসখেকোকে। 
সেটা প্রাণপণে ভ্যা-ভ্যা করতে লাগল । সেটাকে টেনে 'হণ্চড়ে জলের কাছে নিয়ে 
এল সেই বাঘ। বললে, দ্যাখ, জলের মধ্যে তোর মুখ দ্যাখ আমার যেমন হাঁড়র 
মতন মুখ, তোরও তেমান। আর এই নে খানিকটা মাংস, 'চাবয়ে দ্যাখ। বলে 
তার মুখের মধ্যে খাঁনকটা মাংস জোর করে পুরে দিলে । আর যায় কোথা! প্রথমে 
তো মুখেই তুলবে না, শেষে রক্তের স্বাদ পেয়ে খেতে লাগল। তখন বাঘ বললে, 
'এখন বুঝোছস? দ্যাখ চেয়ে, আমিও যা তুইও তা। এখন আয়, আমার সঙ্গে 
বনে চলে আয়।, 

বাঘ হল সেই গুরু । চৈতন্য এনে দিলে । জলে মুখ দেখালে--তার মানে, চিনিয়ে 
দিলে স্বরূপ। বনে ডেকে নিয়ে গেল। নিয়ে গেল স্বধামে। ঈশবরানকেতনে। 
গুরুর সন্ধানে বোৌরয়ে পড়ল বিজয়। তিনি যাঁদ নিজের থেকে না আসেন তাঁকে 
খঃজে বের করতে হবে। ভারতবর্ষের আঁতপাঁতি চষে দেখব। মাঁট খুড়ে হোক, 
পাহাড় ফেড়ে হোক, উদ্ধার করতে হবে সেই লূক্কায়তকে। 

কোথায় আমার সেই জল-দর্পণ! যার মধ্যে তাঁকয়ে আমি আমার স্বরূপকে 
চিনব! 

বিন্ধ্যাচল পাহাড়ে নাবিড় জগ্গলের মধ্যে পথ হাঁরয়ে ফেলেছে বিজয়। শুনেছিল 
কোথাকার কে এক সাধ আছে এই জঙ্গলে । রান্রর অন্ধকার নেমে এল, জনপ্রাণর 
দেখা নেই। শুধু লতাগুল্মের জাঁটলতা। খংজতে-খ*জতে পেল এক ভাঙা বাঁড়- 
ঠিক করল এখানেই রাত কাটাবে । তাই সই, পাঁরত্যন্ত ভাঙা বাড়িতেই ডেরা বাঁধলে। 
কিসের ডেরা-মাঝ-রাতে এক দল ডাকাত এসে হাঁজর। এটা সাধ্‌-সন্নেসীর 
ডেরা নয়, এটা ডাকাতের আস্তানা । কেটে পড়ো। সম্লেপীর পোশাক থাকলেই 
বা কি, বিজয়কে ওরা তাঁড়য়ে দলে। দূরে এক গাছতলায় গিয়ে বসল 'বিজয়। 
এ 'দিকে ভাঙা বাড়ির মধ্যে বসে লুট-করা মালের বখরা করতে লাগল ডাকাতেরা। 
বখরার পর যখন ঘুমুতে যাবে তখন বিজয়ের কথা ফের মনে পড়ল তাদের । 
সাধূটা গেল কোথায় 2 ও তো নির্ঘাত পুলিশে খবর দেবে। ওকে ধরো । সাবড়ে 
দাও এক কোপে। 

ডাকাতদের যে সর্দার সে আপাতত করলে। বললে, নিরীহ সম্নেসীমানূষ, ওর 
থেকে আমাদের কোনো ক্ষতি হবে এ আমার বিশ্বাস হয় না। ওকে মেরে কাজ 
নেই। 

রাখো তোমার সরফরাজি। ওকে না কেটে ফেললে পুলিশের হাতে ও সাবৃদ 


হবে। 

দুটো তরোয়াল নিয়ে দুটো ডাকাত এাগয়ে গেল সেই গাছতলার 'দিকে। কিন্তু 
এ ক সর্বনাশ! বিজয়ের সামনে অল্প কয়েক হাত দূরে প্রকান্ড একটা বাঘ বসে। 
যেন পাহারা দিচ্ছে বিজয়কে । সেই পুর্ষব্যান্রকে। 

এ দক থেকে মারা যাবে না দেখাছ। যেতে হবে পিছন দিকে । সে দিক থেকেই 


বসাতে হবে কোপ। সে 'দিকে শিয়ে দেখে, সে দকেও আরেক বাঘ। 'বিশাল 
১৫০ 


জিভ মেলে থাবা চাটছে বসে-বসে। কে মারে সেই ব্যাঘ্রমূর্তিকে! ডাকাত দুটো 
তরোয়াল নামিয়ে হেন্টমুখে সরে পড়ল। 
এবার এসেছে তিব্বতে। শুনোছিল দুর্গম অরণ্যের মধ্যে কোন এক গোফার ধারে 
এক বাঙালী মহাপুরুষ আছেন। অহোরান্রই নাঁক সমাধিস্থ। যেই থেকে শোনা 
সেই থেকেই তাঁর ঠিকানা খুজে ফিরছে। ঠিকানা মানে বরফ আর পাথর, জল 
আর জঙ্গল। তব বের করা চাই সেই মহাপুরুষকে । খাদ্য নেই, ঘুম নেই, না থাক, 
চাই শুধু সেই পরমান্ন, শুধু সেই অসঙ্গ-সঙ্গ। কোথায় সে! পথ চলতে-চলতে 
তিন দিনের দিন অজ্ঞান হয়ে পড়ল বিজয়। 
ঘোর অরণ্য। প্রাণস্পন্দনহাীন। কে তার খবর রাখে! 
1কন্তু যাকে সে খুজে বেড়াচ্ছে তিনি খোঁজ রাখেন। 
নগনদেহ কে এক সন্ন্যাসী সহসা তার সামনে এসে দাঁড়াল। স্পর্শ করতেই জেগে 
উঠল বিজয়। তার শিথিল হাতে কটি ছোট-ছোট বীজ গহডে দিলে সযাসণি। 
বললে, “বাচ্চা, এঁহ দানা লেও, ভুখ-পিরাস ছুট যায়েগা ।' 
সাত্যিই তাই। দদ-এক দানা মুখে দিতেই ক্ষুধাতৃষ্ণা মিটে গেল দিবগয়ের। টে 
গেল পথশ্রান্তি। 
কিন্তু শুধু দেহের ক্ষুধাতৃষ্ণা মিটিয়েই নিবৃত্ত কোথায়? শুধু এ হলেই মন 
কেন বলে না সব পাওয়া হয়ে গেল? কোথায় মানুষের সেই 'সবপেয়োছি"র 
দেশ ? 

নত গেলেও ক্ষান্তি আসে না কেন? আবার কেন সন্ধানের ইন্ধন জলে 2 
সেই সন্ন্যাস কোথায় অদশ্য হয়ে গেল। হল না বুঝ গুরুপ্রাপ্তি। অন্ধকার 
থেকে আলোতে আগমন । 
ঘুরতে-ঘুরতে গয়ায় এসেছে বিজয়। এখানে এসে শুনতে পেল আকাশগৎগা 
পাহাড়ে রঘুবর দাস এক মস্ত সাধু । আর কথা নেই, অমাঁন ছচ্টেল সেই আশ্রমে । 
বাবাজীর পায়ে পড়ে কাঁদতে লাগল বিজয় : 'বাবাজাী, কি করে উদ্ধার হব? কে 
আমার হাত ধরবে 2, 
এমন সাধু আর দেখোঁন রঘুবর। যেমন উত্তাল ভান্ত তেমাঁন উদ্দাম ব্যাকুলতা। 
আশার্বাদের ভঙ্গতে বললে, 'দয়াল রামজী তোমাকে আলবৎ কৃপা করেগা । দৈনা 
ছোড়ো ।' 
যতক্ষণ তার দেখা না পাই ততক্ষণ কি করে ছাঁড় এই দীন বেশ? 
সেখান থেকে আরেক সাধূর সন্ধানে চলল ব্রহযোনির পাহাড়ে। বিদ্দয়কে দেখে 
সেই সাধ্‌ তো আনন্দে আত্মহারা! বাহ? বাঁড়য়ে আলিঙ্গন করল বুকের মধ্যে! 
শুধু বললে, 'আনন্দে রহো। আনন্দে রহো।' 
যাই বলো, রঘুবর দাসের আশ্রমটিই বিজয়ের মনে ধরেছে। এই আশ্রমটিই যেন 
এক 'দন সে দেখোছল স্বগ্নে। এই পাহাড়, এই মন্দির, মন্দিরে এই মহাবারের 
মৃর্ত। কেন দেখেছিল কে জানে, কিন্তু জায়গাটি ভার প্রাণজুড়ানো। সঙ্তেতে- 
সঞ্গীতে ভরা। 


১৫১ 


একাদন রঘুবরের সঙ্গে বসে গল্প করছে বিজয়, এক রাখাল ছেলে এসে খবর 
দিলে, পাহাড়ের উপরে কে একজন মস্ত লোক এসেছেন। স্বপ্নে মহাবীর যেন 
এই পর্বতশীর্ষের দিকেই ইশারা করোছল। তাড়াতাঁড় ছুটে গেল দুজনে । দেখল 
এক অপূর্বকাল্তি তৈজস্বান মহাপুরুষ । মাথা ঘিরে জ্যোতিগ্গোলক। কিন্তু 
তাদের তানি কাছে ঘে*ষতে দিলেন না। ইশারায় বললেন চলে যেতে। 

ক আর করা! ম্লান মূখে ফিরে গেল বিজয়। কিন্তু মন রইল সেই পর্বতের 
নিজ'নতায়। 

1কিছ_ গাঁজা কিনল িজয়। ভাবল গাঁজা পেলে সাধ নিশ্চয় তাকে ফিরিয়ে দেবেন 
না। দুটো অন্তত কথা হইবেন। একা-একা চলে এল সে গুটি-গুটি। গাঁজা দিতে 
হল না, কথা কইলেন সাধু । িগগেস করলেন, ণক করো? 

ব্লাহমধর্ম প্রচার কারি। 

্লাহমধরম 2 ও হাম জানতা হ্যায়। কলকাতামে ব্রাহমসমাজ হ্যায়। রাজা রামমোহন 
একঠো বড় আদম থা। আগাঁড় ওাহ ব্লাহমধরম স্থাপন কিয়া । ওলোগ বেলায়েত 
গিয়া 

ণবজয় তো অবাক। পশ্চমী সাধু, বাঙলা দেশের এত খবর জানে কি করে? 
“দেবেন বাবু কেশব বাবু সব কোইকো হাম পছান্তা-; 

যত কথা বলেন সাধু ততই যেন বেহ:স হয়ে আসে বিজয়। তার আর নড়বার- 
চড়বার ক্ষমতা নেই। জিভও প্ন্ত অসাড় হয়ে গেছে। জ্ঞানহারা অবস্থায় নীরবে 
কঁদিতে লাগল। 

মহামানব তাকে টেনে নিলেন কোলের মধ্যে । দেহে শান্তি সন্টার করলেন। শুধু 
তাই নয়, কানে দক্ষামন্ত্ দিয়ে দলেন। লাফ দিয়ে উঠে বসল বিজয় । পায়ে লয়ে 
পড়ে প্রণাম করল। কৃপাঁসম্ধুর এ ক কৃপাবিন্দু ! একে-একে সাধন-প্রণালী 'শাখিয়ে 
দিলেন সাধু । শুধু সাধু নয়, বলো গুরুদেব । বলো আকাশগঞ্গার পরমহংস। 
কঠোর সাধনে লেগে গেল বিজয় । শুকনো কাঠে আগুনই শুধু জবলছে, 'িল্তু 
কোথায় সে হিরণ্যগভ 2 

গুরুদেব হঠাৎ এক দিন আবার দেখা দিলেন। বললেন, 'কাশী যাও। হাঁরহরানন্দ 
সরস্বতীর কাছে গিয়ে সন্ন্যাস নাও ।' 

তক্ষান কাশী ছুটল। বের করল সেই সরস্বতীঁকে। বললে, পৈতে ত্যাগ করে 
ব্রাহমধর্মে ঢুকৌঁছ। এখন প্রায়শ্চিত্ত কারয়ে আমাকে সন্ন্যাস দিন। 

তোমার এই উচ্চাবস্থায় প্রায়শ্চন্তের দরকার নেই । তবে তোমাকে আবার যথারীতি 
উপবাত গ্রহণ করতে হবে। তার পরে 'িতন দিন পরে 'িরজাহোমে শিখাসূ্রের 
আহ্নাত 'দয়ে সন্ন্যাসী হবে তুমি । 

তথাস্তু। আমি সন্ব্যাসী হব। সর্বপ্রকার কাম্যকর্ম ত্যাগ করে সমাকরূপে ভগবানে 
যে আত্মসমর্পণ করে সেই সন্ন্যাসী । পুরো দস্তুর সন্ন্যাসী হয়েই বিজয় ফিরে এল 
দাঁক্ষণেম্বরে। দক্ষিণে*বরের পরমহংসের কাছে। বললে, 'হে শ্রীহরি-_' 

যাঁদও এখানেই বিজয়ের সাধনার ইতি নয়- এখানে এক মহাস্বীকীতি। 


১৬২ 





বরানগরে বেড়াতে এসেছে মহেন্দ্র গুপ্ত। আটাশ বছর বয়েস, শ্যামবাজা: 
মেত্রোপাঁলটান ইস্কুলের হেডমাস্টার। বেড়াতে এসেছে ব ধু িদ্ধেশ্বর মজ্‌মদারে, 
বাঁড়। 

এপ্ট্রান্সে দ্বিতীয়, এফ-এ-তে পণ্ম, বি-এ-তে তৃতীয় হয়ে বেরিয়েছে প্রোসিডেল্সী 
কলেজ থেকে । আইন পড়বার শখ, সংসারের প্রয়োজনে চাকারিতে ঢুকেছে । প্রথমে 
কেরানাগাঁর, ইদানীং মাস্টার। গোড়ার দিকে যশোর নড়ালে, এখন কলকাতায়। 
'সাঁট স্কুল, এরয়ান স্কুল, মডেল স্কুল শেষ করে এখন এসেছে বিদ্যাসাগরের 
ইস্কুলে। সে ইস্কুলের শ্যামবাজার ব্রাণ্ডে। 

গঙ্গার ধারে চমৎকার একটি বাগান আছে, যাবে বেড়াতে 2 জিগগেস করলে 
[সদ্ধেশবর। 

প্রসন্ন বাঁড়য্যের বাগান দেখে ফিরছিল দুজনে । মাস্টার বললে, 'কার বাগান ?' 
'রাসমণির বাগান। সেখানে একজন পরমহংস আছেন। যাবে ?' 

'সে তো শুনেছি উল্মাদ।' 

'না হে, এখন আর তার সে অবস্থা নেই। সে এখন শান্ত সদানন্দ বালক । দেখলে 
চোখ জুড়োয়।' 

হাঁটতে-হটিতে চলে এল দুজনে । একেবারে ঠাকুরের ঘরে। 

এই প্রথম দর্শন! এ কে! এ ি মানুষ, না, শৃভ্র স্বচ্ছ অক্ষুগ্রানন্দ আকাশ ! একদুষ্টে 
তাঁকয়ে রইল তার দিকে । মনে হল সমস্ত জীবনের সুখ-দুঃখ-মল্থন-ধন যেন 
বসে আছে সামনে । 

কিন্তু এ কোথায় এলাম 2 কাঁসর-ঘণ্টা খোলকরতাল বেজে উঠেছে একসঙ্গে 
দেবালয়ে আরাঁত হচ্ছে বুঝি? 

চলো আগে দেখে আসি মান্দির। দ্বাদশ শিবর্মান্দর । রাধাকান্তের মন্দির। আর 
এই ন্লিভুবনজননী কারুণ্যপূর্ণেক্ষণা ভবতারিণী। 

বন্দেিঝ দাঁড়য়ে। জল-খাবারের জন্যে লুচি বরাদ্দ থাকে_ এই সেই বৃন্দেশঝি। 
মাঝে-মাঝে অসময়ে কোনো ভন্ত এলে যাঁদ তার বরাদ্দ লুচি খরচ হয়ে যায়, সে 
বকে অনর্থ করে। বলে, ওমা, কেমন সব ভদ্দরলোকের ছেলে গো, আমারি সব 


খেয়ে বসে আছে। সামান্য মাম্টটাও পাই নাঃ 
& ১৮৩ 


পাছে এই সব কথা ছেলেদের কানে যায়, ঠাকুরের দারুণ ভয়। এক 'দিন তেমনি 
খরচ হয়ে গেছে লুচি, ঠাকুর প্রমাদ গুনছেন। নবতে চলে এসেছেন শ্রীমা'র কাছে। 
বলছেন, 'ওগো, বৃন্দের খাবারাট তো খরচ হয়ে গেল! এখন চটপট রুটিলুচি যা-হয় 
কিছ; করে রাখো, নইলে এক্ষুনি এসে বকাবক করবে । দুজনকে পাঁরহার করে 
চলতে হয়” 

বন্দেকে দেখেই তো শ্রীমা'র মুখ চুন। বললেন, 'বোসো, তোমার খাবারটা তোর 
করে 'দ।, 

থাক। বুঝোছ। ঢের হয়ছে। গাঁরবের উপরেই যত অত্যাচার । 

'বোশক্ষণ লাগবে না। এখান তৈয়ের করে দিচ্ছি।' 

“আর তৈয়েরে কাজ নেই বাছা-এমনি দাও ।' 

শ্রীমা তখন 'সিধে সাঁজয়ে দিলেন। ঘি ময়দা আলু পটল--কত 'কি। 

সেই বৃন্দে-ঝি দরজায়। একটু বোধ হয় ঘাবড়ে গেল মাস্টার। বললে, হ্যাঁ গ৷. 
সাধুঁটি কি ভিতরে আছেন ?' 

ধভতরে থাকবে না তো যাবে কোথায় 2, 

“কত দন আছেন বলো তো এখানে ?' 

“আম কত দিন আছ ভার 'হসেব কে রাখে ঠিক নেই--অন্যের হিসেব রাখতে 
যাব! 

মাস্টার দ্বিধা করল, তবু জিগগেস না করে পারল না। 'আচ্ছা, ইনি কি খুব বইটই 
পড়েন? 

"ওসব তোমরা পড়ো ।” বৃন্দে-ঝি ঝামটা মেরে উঠল : “সব বই ও*র মুখে-মুখে ।' 
বই পড়ে না সে আবার কি রকম জ্ঞানী! 

গ্রন্থ নয় হে, গ্রান্থ_-গঁটি। শুধু পান্ডিত্যে মানুষ ভোলাতে পারবে, তাঁকে পারবে 
না। হাজার বই পড়ো, হাজার শ্লোক আওড়াও, ব্যাকুল হয়ে তাঁতে ডুব না দিলে 
তাঁকে ছঃতেও পারবে না। পন্ডিত খুব লম্বা-লম্বা কথা বলে, 'কিন্তু নজর কেবল 
পার্থব সুখে । যেমন শকুনি খুব উচ্চুতে ওঠে, কিন্তু নজর রয়েছে গো-ভাগাড়ে। 
শৃধু-পশ্ডিতগুলো দরকোচাপড়া। না এ দক না ও দিক। 

তাই সংক্ষেপে করো। পিশপড়ের মতো বাঁলটুকু ত্যাগ করে চিনিটুকু নাও। 
শব্দার্থ না খংজে মর্মার্থ খোঁজো । সাধূমুখে গুরুমুখে জেনে নাও সেই মর্ম 
স্থলের সংবাদ। এক জানার নাম জ্ঞান, অনেক জানার নাম অজ্জান। 

এক দৃষ্টে শুধু পাঁখর চোখ দেখ। লক্ষ্যভেদের সময় অর্জুনকে দ্রোণাচার্য কী 
িগগেস করলেন? জিগগেস করলেন, 'আমাদের সবাইকে দেখতে পাচ্ছ? এই 
সব রাজা-রাজড়া, গাছ, গাছের ডাল-পালা, তার উপরে পাঁখ- দেখতে পাচ্ছ সব? 
অর্জুন বললে, 'শুধু পাথর চোখ দেখতে পাচ্ছি।, 

যে শুধু পাখির চোখ দেখে, সেই লক্ষ্যভেদ করে। 

“বন্ধ ঘরে ইনি বুঝ এখন সন্ধে করছেন-_' বৃন্দে ঝকে 'িগগেস করল মাস্টার। 


ধতোমার বুদ্ধি ' কি গো! ঘরে ধূনো দিয়েছি। যাও না, ঘরে গিয়ে বোসো না।' 
১৫৪ |] 


ঘরে ঢুকে প্রণাম করে বসল দুজনে । মামুলী দু-চারটে প্রশ্ন করলেন ঠাকুর। 
কথার ফাঁকে-ফাঁকে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছেন। সেই তন্ময়তার মধ্যে 'শাথিল 
গদাসীন্য নেই, বরং রয়েছে আতীব্র একাগ্রতা । একেই বাঁঝ ভাব বলে। 
[সদ্ধেশবর বললে, “সন্ধের পর এমনি ওর ভাবান্তর হয়।' 

তবে আরেক দিন সকাল বেলা আসব । দেখব প্রভাত-আলোয়। 

শীতের সকাল। নাঁপত এসেছে, ঠাকুর কামাতে যাচ্ছেন। গায়ে র্যাপার, ধারগুলো 
শালু দিয়ে মোড়া, পায়ে হতো । 

'তুমি এসেছ £ আচ্ছা বোসো আমার কাছে।' 

দক্ষিণের বারান্দায় কামাতে বসলেন। কামাচ্ছেন আর কথা কইছেন। 

হঠাং বলে উঠলেন কাতর ভাবে। 'হ্যাঁগা, কেশব কেমন আছে বলতে পারো? তার 
বন্ড অসুখ ।" 

'আঁমও শুনেছি বটে।' 

'তার অসুখ হলেই আমার প্রাণটা বড় ব্যাকুল হয়। রান্রি শেষ প্রহরে উঠে আম 
কাঁদ। বাল, মা, কেশবের যাঁদ 'কছ হয়, তবে কার সঙ্গে কথা কবো।' 
মাস্টারের বুকের ভিতরটা কেমন করে উঠল। বললে, “এখন বোধ হয় ভালে 
আছেন।, 

'কেশবের জন্যে মা'র কাছে ডাব চিনি মেনেছি। কলকাতায় গেলে দয়ে আসব 
1সদ্ধে*বরীকে । বলে তাকালেন মাস্টারের দিকে । শুধোলেন, 'তোমার কি 'বিয়ে 
হয়েছে 2, 

'আজ্জে হ্যাঁ, হয়েছে 

যল্ণায় প্রায় চেশচয়ে উঠলেন ঠাকুর। "ওরে রামলাল! যাধ, বিয়ে করে ফেলেছে ।' 
মাথা হেন্ট করে বসে রইল মাস্টার। দিয়ে করা 'ক এতই দোষ ? 

আবার জিগগেস করলেন ঠাকুর, 'ছেলে হয়েছে 2 

বূকের মধ্যেটা টিপ-টিপ করছে মাস্টারের। ভয়ে-ভয়ে বললে, “আজ্জে, হয়েছে 
একটি।, 

'যাঃ, ছেলেও হয়ে গেছে । আবার কাতরোন্তি করে উঠলেন । পরে বললেন স্নেহস্বরে, 
“তোমার মধ্যে যে ভালো লক্ষণ ছিল। আম কপাল চোখ এ সব দেখে বুঝতে 
পারি 

জানো, মানুষের মন হচ্ছে সরষের পঃটাল। সরষের পংটাঁল ছাঁড়য়ে পড়লে কুড়ানো 
ভার হয়ে ওঠে। তেমনি কাঁমনী-কাণ্চনে মন ছাড়িয়ে পড়লে ছড়ানো মন কুড়ানো 
দায়। 

অনেকের কাছে স্ব একেবারে শিরোমণি । বলে, আমাকে কত ভালোবাসে, কত 
সেবা-যত্র করে, তাকে ছেড়ে যাই কেমন করে? শিষ্যকে গুরু তাই এক ফন্দি 
শাখয়ে দিল। একটা ওষুধের বাঁড় দিয়ে বললে, এইটে খেলেই মড়ার মত হয়ে 
যাব, তোর জ্ঞান থাকবে না। কিল্তু সব বেশ পাবি দেখতে-শুনতে। তার পর 
আমি এলে তোর চৈতন্য হবে । যেমন কথা তেমন কাক্ত। শষ্যের বাঁড়তে কান্নাকাটি 


১৫৬ 


পড়ে গেল। ওগো দিদি গো আমার কি হল গো, তুমি আমাদের কী করে 
গেলে গো বলে আছড়ে-আছড়ে কাঁদতে লাগল স্মঁ। লোকজন সব জড়ো হল। 
খাট এনে তাকে ঘর থেকে বার করবার যোগাড় করলে। কিন্তু বাঁড়র গুণে লাশ 
এ'কে-বে'কে আড়ষ্ট হয়ে যাওয়াতে দরজা 'দয়ে অ বেরুচ্ছে না সধোসাধি। তখন 
একজন একখানা কাটার নিয়ে এল। দরজার চৌকাঠ কাটতে আরম্ভ করলে। 
দুম-দুম শব্দ শুনে স্লী ছুটে এল আস্থর হয়ে। ওগো, কী হয়েছে গো! কী 
করছ গো! ইনি বেরুচ্ছেন না তাই দরজা কাটাছ। অমন কম্ম করো না গো! 
স্ত্রী চেচাতে লাগল। আমি এখন রাঁড়-বেওয়া হলুম, আমার আর দেখবার- 
শোনবার কেউ নেই। কাঁট নাবালক ছেলেকে মানুষ করতে হবে । এ দয়ার গেলে 
তো আর হবে না। ওগো, ও'র যা হবার তা তো হয়ে গেছে, ও"র হাত-পা কেটে 
বার করো। ততক্ষণে গুরু এসে িয়েছে। লাফিয়ে উঠল শিষ্য। হাঁক পাড়লে, 
তবে রে শালী, আমার হাত-পা কাটবে? এই বলে গুরুর সঙ্গে বোরয়ে গেল 
বাঁড় ছেড়ে। 

জানো না বাঁঝ, অনেক স্তর আবার ঢঙ করে শোক করে। কাঁদতে হবে বলে গয়না 
নং খুলে বাক্সের ভেতরে রেখে আসে । তার পর আছড়ে পড়ে কাঁদে_ওগো দাদ 
গো, আমার কী হলো গো-' 

এই স্লী! এই সংসার! 

“আচ্ছা তোমার পাঁরবার কেমন ? বিদ্যাশন্তি না আঁবদ্যাশান্ত 2" 
মাস্টার ভরসা পেয়ে বললে, 'আজ্ঞে ভালো, কিন্তু অজ্ঞান ।' 

যেন লেখাপড়া ?িখলেই জ্ঞান! 

ঠাকুর একট; বিরন্ত হলেন। বললেন, 'আর তুমি এক মস্ত জ্ঞানী !' 

অহঙ্কার চূর্ণ হয়ে গেল মান্টারের। 

শোনো, বারে-বারে শোনো, এক জানার নাম জ্ঞান, অনেক জানার নাম অজ্ঞান। 
চৈতন্যদেব দক্ষিণ দেশে ভ্রমণের সময় দেখলেন একজন গীতা পাঠ করছে, আর 
একজন একটু দূরে বসে কেদে বুক ভাসাচ্ছে। চৈতন্যদেব তাকে 'জিগগেস করলেন, 
তুমি এ সব কিছ বুঝতে পারছ ?£ সে বললে, ঠাকুর, আম শ্লোক ছুই বুঝতে 
পারাছ না, আঁম অজ£নের রথ দেখতে পাচ্ছি আর তার সামনে ঠাকুর আর অর্জন 
কথা কইছেন। 

জানতেও বই লাগে না, চিনতেও বই লাগে না। অক্ষরজ্ঞান ছাড়াও সম্ভব সে 
অক্ষর-জ্ঞান। 

কলকাতা যাবার পথে বিষুপুর ইস্টিশানে গাঁড়র অপেক্ষা করছেন শ্রীমা। হঠাৎ 
এক হিন্দুস্থানী কুলি তাঁকে দেখতে পেয়ে ছুটে এল। কাঁদতে-কাঁদতে লুটিয়ে 
পড়ল পায়ের কাছে। বললে, “তু মেরী জানকণ, তুঝে ম্যায় নে কিতনে 'দিনোঁসে 
খোঁজা থা। ইতনে রোজ তু কাঁহা থা" 

তুই আমার মা জানকী। তোকে কত 'দিন ধরে খজছি। তুই এত 'দিন কোথায় 
ছাল? 


১৫৬ 


মা তাকে শান্ত করলেন। বললেন, একাঁট ফুল 'নয়ে আয়। ফুল নিয়ে কি করতে 
হবে বলে দতে হল না কুঁলকে। মা'র পাদপদ্মে নিবেদন করলে। মা তাকে দিয়ে 
দিলেন ইম্টমন্ত। 

কেশবেরও বড় সাধ রামকৃষের পা দুখাঁন ফুল দয়ে পুজো করে। কিন্তু পাড়ার 
লোক, দলের লোক কি ভাববে এই ভেবে সাহস পায় না। 

সোঁদন রামকৃষের সঙ্গে ব্লহনজ্ঞানের কথা হচ্ছিল কেশবের। 

কেশব বললে, আরো বলদন। 

রামকৃষ্ণ হেসে বললেন, “আর বললে দলটল থাকবে না।' 

স্বাস্তর নিঃশ্বাস ফেলল কেশব। বললে, 'তবে আর থাক মশাই ।' 

এই দল-দল করতেই দলা পাকিয়ে গেল। তুমি দল-দল করছ আর এদিকে তোমার 
দল থেকে লোক ভেঙে-ভেঙে যাচ্ছে। 

'আর বলেন কেন মশাই । তিন বচ্ছর এ দলে থেকে আবার ও দলে চলে গেল। 
যাবার সময় আবার গালাগাল 'দয়ে গেল” 

রামকৃষ্ণ বললেন, 'তুমি লক্ষণ দেখ না কেন 2 যাকে-তাকে চেলা করলে 'কি হয়?" 
যতক্ষণ মোড়াল করছ ততক্ষণ মা আসে না। মা ভাবে ছেলে আমার মোড়ল হয়ে 
বেশ আছে। আছে তো থাক। 

যে ভাবছে, আমি দলপতি, দল করেছি, লোক শিক্ষা দিচ্ছি, সে কাঁচা আমি । ঘি 
কাঁচা থাকলেই কলকলানি করে। মধু যতক্ষণ না পায় ততক্ষণই ভনভনানি করে 
মাছি। তুমি এখন ও সব ছাড়ো। পাকা ঘ, পাকা আম হও। সালাশ মোড়াল 
ভো অনেক করলে, এখন তাঁর পাদপদ্মে বোৌশ করে মন দাও। বলে, কার দল কে 
করে। দল ভাঙে তো তোমার কি। বলে, লঙ্কায় রাবণ মলো, বেহুলা কেদে আকুল 
হলো। 

তুমি দলে নও, তুমি শতদলে। 

কিন্তু কিছুতেই পুরোপুরি হয় না কেশবের। 'সাদ্ধ মুখে নিয়ে শুধু কুলকুচোই 
করলে, পেটে ঢোকালে না। পেটে না ঢোকালে কি নেশা হবে? 

অহেতুক ভান্ত না হলে কি মিলবে ভগবানকে 2 

কেশব উপাসনা করছে । বলছে, হে ঈশ্বর, তোমার ভন্তিনদীতে যেন ডুবে যাই। 
রামকৃষ্ণ বললেন, 'ওগো, তুমি ভন্তিতে ডুবে যাবে কি করে? ডুবে গেলে চিকের 
ভেতর যারা আছে তাদের হবে কি! বোঁশ দূর এগোতে চেয়ো না-বেশি এগোতে 
গেলে সংসার-্টংসার ফক্কা হয়ে যাবে। তবে এক কর্ম কোরো । মাঝে-মাঝে ডুব 
দিয়ো, আর এক-একবার আড়ায় উঠো। 

রামকৃষ্ণকে বাড়তে নিয়ে এসেছে কেশব । অনেক ফুল নিয়ে এসেছে। অনেক ফল 
দয়ে পূজা করবে রামকৃষ্ণকে। প্রাণ ঢেলে পূজা করবে। 

তাই করলে কেশব । কিন্তু 

কিন্তু পূজা করবার আগে ঘরের দরজা বন্ধ করলে। বন্ধ করলে, পাছে তার পাড়ার 


লোক, তার দলের লোক টের পায়। 
১৫৭ 


মনে-মনে হাসলেন রামকৃফণ। বললেন, “ও যেমন দরজা বন্ধ করে পূজা করলে, 
তেমনি ওর দরজাও বন্ধ থাকবে!' 

কিন্তু বিজয়? মুস্ত অঙ্গনে সকলের চোখের সামনে ঠাকুরের পাদমূলে লুটিয়ে 
পড়ল। ঠাকুরের পা দুখানি ধরলে নিজের বুকের মধ্যে। রন্তমাখা প্রাণপুস্প অর্ধ 
[দলে ঠাকুরকে। 

মাহমা চক্রবর্তী জিগ্গেস করলে, 'বহ্‌ তীর্থ করে এলেন, দেখে এলেন অনেক 
দেশ, এখন এখানে কী দেখলেন বলুন ।' 

“ক বলবো ॥' অশ্রুভরভর বিজয়ের কণ্ঠস্বর : 'দেখাছি, যেখানে এখন বসে আছি, 
এখানেই সব। কেবল িছে ঘোরা । কোনো-কোনো জায়গায় এরই এক আনা, দু 
আনা, বড় জোর চার আনা-এই পর্যন্তি। এখানেই পূর্ণ ষোলো আনা দেখাছি। 
“দেখ বিজয়ের কি অবস্থা হয়েছে। লক্ষণ সব বদলে গেছে। যেন সব আউটে 
গেছে। আম পরমহংসের ঘাড় ও কপাল দেখে চিনতে পারি। বলতে পারি 
পরমহংস কিনা ।, 

নিজের কথা শুনবে না বিজয়। পরের কথা, একের কথা, প্রত্যক্ষের কথা শুনবে। 
বললে, “এখানেই ষোলো আনা ।' 

কেদার বললে, 'অন্য জায়গায় খেতে পাই না-এখানে এসে পেটভরা পেলুম।' 
মাঁহমা বললে, 'পেটভরা 'কি! উপছে পড়ছে ।' 

হাত জোড় করল 'বিজয়। বললে, 'বুঝেছি আপাঁন কে। আর বলতে হবে না।' 
ভাবারুঢ় অবস্থায় শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, 'যাঁদ তা হয়ে থাকে তো তাই।' 





রঙ্গন আর জুই ফুল দিয়ে মালা গেথেছে সারদা । সাত-লহর গোড়ে মালা। 
বিকেল বেলা গেথে পাথরের বাঁটতে জল 'দিয়ে রাখতেই কুশড়গঁল ফ;টে 
উঠেছে। মান্দরে পাঠিয়ে দিল। জগ্গদম্বার গলার গয়না খুলে রেখে পরানো হল 
ফুলের মালা। ূ্‌ 

রামকৃষ্ণ দেখতে এসেছে ভবতাঁরণকে। আহা এ কি রুপ! একদিকে 'নিকষের 
মতো কালো আকাশ, তার গায়ে সূর্যোদয়ের 'ছিটে-লাগা শাদা সমৃূদ্রের ঢেউ। 
ভাবে একেবারে বিভোর রামকৃফণ। 

১৫৮ 


সেই যে ছ-বছর বয়সে প্রথমে দেখেছিল সরু আল-পথ দিয়ে মাঠে যেতে-যেতে। 
কাজল কালো আকাশের কোলে সিতপক্ষ বকের বলাকা । 

'আহা, কালো রঙে কী স্দন্দরই মানিয়েছে! 

যেন জীবন-মৃত্যুর কোলাকুলি । মাঝখানে ঈশ্বরানূরাগের রান্তমা। 

'কে গে'থেছে রে এমন মালা 2" চারদিকে তাকালো রামকৃণ। 

'আর কে! পাশে 'ছল বৃন্দে-ঝি, টিপ্পান কাটল। 

রামকৃষ্কের বুঝতে আর বাঁক নেই, কে! সে ছাড়া আর কার এমন শভ্রতা, কার 
এমন চিকণ-গাঁথন। ভান্তর সুগন্ধে গদগদ হয়ে আছে সারল্যের হাঁসাঁট। 

'আহা, তকে একবার ডেকে নিয়ে এস।' স্নেহের আনন্দে উছলে উঠল রামকৃফণ। 
মালা পরে মায়ের কি রূপ খুলেছে একবার দেখে যাক।' 
বৃন্দেবঝি ডাকতে গেল সারদাকে। 

লঙ্জায় জড়িপঁট খেয়ে গেল। মান্দরে কেউ আর নেই তো এ সময়? 

নেই। তা ছাড়া ঠাকুর যখন ডেকেছেন-_ 

কন্তু মন্দিরের কাছে আসতেই দেখল সরেন 'মাত্তর, বলরাম বোস, আরো কে কে, 
আসছে এদিকে । হয়েছে! এখন তবে কোথায় যাই! কোথায় লুকোই। বৃন্দের 
আঁচল টেনে ধরে তাড়াতাড়ি নিজেকে ঢাকা দল সারদা । কোনো রকমে একটা 
আড়াল রচনা করে পিছনের 'সশড় দিয়ে উতে গেল। 

আশ্চর্য, ঠিক নজর রেখেছে রামকৃষ্ণ । বলে উঠল, 'ওগো ওদক দিয়ে উঠো না। 
সৌঁদন এক মেছুনি উঠতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে মরেছে। সামনের দক 'দিয়েই 
এস।' 

বলরাম বাবুরা সরে দাঁড়ালো । সারদা উঠে দাঁড়ালো। ভাবে-প্রেমে গান ধরল 
রামকৃষ্ণ । 

সেবার 'সিশঁড় দিয়ে উঠতে সাত্য-সাতিই কিন্তু পড়ে গিয়েছিলেন শ্রীমা। দূধের 
বাটি নিয়ে সিশড় দিয়ে উঠছেন- বাটিতে আড়াই সের দুধ । ঠাকুরের তখন অসুখ, 
মাছেন কাশীপুরের বাঁড়তে। হঠাং কি হল, মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন শ্রীমা। 
দুধ তো গেলই, পায়ের গোড়াঁলর হাড় সরে গেল। নরেন আর নাবূরাম কাছে 
পিঠে কোথাও ছিল, ছুটে এসে ধরলে মাকে। 

ঠাকুর শুনতে পেলেন। ডাকিয়ে আনলেন বাব্ুরামকে । বললেন, 'তাই তো- এখন 
তবে আমার খাওয়ার কি উপায় হবে?" 

ঠাকুর তখন মন্ড খান। সে-মন্ড তোর করে দেন শ্রীমা। রোজ উপরের ঘরে গিয়ে 
খাইয়ে আসেন ঠাকুরকে । 

'এখন তবে কে আমার মন্ড রাঁধবে 2 কে খাইয়ে দেবে 2 

প্রীমা'র পা বিষম ফুলে উঠেছে, নিদারুণ মল্তণা। ওঠা-চলা সম্ভবের বাইরে। 
গোলাপ-মা রে'ধে দিচ্ছে মন্ড। নরেন খাইয়ে দিচ্ছে নিজের হাতে। 

একদিন বাবূরামকে নিজের কাছটিতে ডেকে আানলেন ঠাকুর। নিজের নাকের 
কাছে হাত ঘুরিয়ে ঠারে-ঠোরে বললেন, "ওকে একবারটি এখানে নিয়ে আসতে 


১৫৯ 


পারিস ১' বাবুরাম তো অবাক। পা ফেলতে পারেন না মাঁটতে, িশড় বেয়ে 
আসবেন কি করে উপরে? 

ঠাকুর পরিহাস করে বললেন, 'একটা ঝ্াড়র মধ্যে ওকে বাঁসয়ে দিব্যি মাথায় করে 
তুলে নিয়ে আসাব। 

নরেন আর বাবুরাম উচ্চকন্ঠে হেসে উঠল। 

ব্যথাটা একটু কম পড়তেই উঠে দাঁড়ালেন শ্রীমা। নরেন-বাবুরামকে লক্ষ্য করে 
বললেন, 'আমাকে তোমরা ধন্ে-ধরে 1নয়ে যাও উপরে। হ্যাঁ, খুব পারব আম, 
গুকে নিজের হাতে খাইয়ে আসি । 

বাবুরাম আর নরেন মাকে নিয়ে চলল ধরে-ধরে। 

[কিন্তু সেবার যখন ঠাকুরের হাত ভেঙেোঁছল তখন কাঁ হয়েছিল ? 

জগন্বাথকে মধুর ভাবে আলিঙ্গন করতে গিয়েই ঠাকুর পড়ে গেলেন। ভেঙে গেল 
বাঁহাত। এর দু-একদিন আগেই সারদামাঁণ ফিরেছে দেশ থেকে । দাঁক্ষিণেশ্বতে 
ফিরতে না ফিরতেই এই অঘটন । 

'কবে রওনা হয়েছিলে?' জিগগেস করলেন ঠাকুর। 

'বেস্পাঁতিবার ।' 

'বেলা তখন কত ?' 

1হসেব করে দেখা গেল, বারবেলা। 

আর কথা নেই। ঠাকুর বললেন দস্বরে, "বিষুৎবারের বারবেলায় রওনা হয়ে 
এসেছ বলেই আমার হাত ভেঙেছে । যাও, যান্রা বদলে এস।' 

আর কথাটি নেই। সারদা ফিরে চলল দেশে । যান্রা বলে আসতে। 

তুমি যেমন বলো তেমান চাল। তোমার যাতে আরাম তাতেই আমার আনন্দ। 
বৃক্ষ হয়ে যাঁদ বসতে বলো, বাঁস। আকাশ হয়ে যাঁদ বলো ওড়ো, উড়ে বেড়াই। 
বৃক্ষ আর আকাশ, দুইই আমার আশ্রয়। 

মথুরবাবূর দেওয়া পিপড়তে রামকৃষ বসে আর সারদা তার গায়ে তেল মাখিয়ে 
দেয়। সারদা তন্ময় হয়ে দেখে, গা থেকে যেন জ্যোতি বেরুচ্ছে। আর কী রঙ! 
যেন হারতালের মত! বাহুতে সোনার ইন্টকবচ, তার সঙ্গে গায়ের রঙ যেন 
মশে গেছে। 

ঠাকুর তখন দেহ রেখেছেন, ঠাকুরের ইম্টকবচ তখন শ্রীমা'র হাতে । ট্রেনে বৃন্দাবন 
যাচ্ছেন শ্রীমা, দেখতে পেলেন জানলার বাইরে ঠাকুর দাঁড়িয়ে। শুধু দাঁড়িয়ে নয়, 
জানলা 'দয়ে মুখ বাঁড়য়ে দিয়েছেন ভিতরে । বলছেন, 'কবচঁট যে সঙ্গে-সঙ্গে 
রেখেছ, দেখো যেন না হারায় ।' 

মা'র যে হাতখানিতে কবচ ছল তা বোধ হয় জানলার উপরে অনাবৃত ছিল। 
দেখতে পেয়ে ঠাকুর তাই সাবধান করে 'দিলেন। 

আগে একবার সাঁত্যিই গিয়েছিল হারয়ে। সেই কবচ পুজো করতেন শ্রীমা। 
একবার ঠাকুরের এক তাঁথিপূজার দিন ফুল-বেলপাতার সঙ্গে তাকেও ফেলে 
দয়োছল গঞ্গায়। কারুর খেয়াল ছিল না। কিন্তু যাঁর কবচ তাঁর খেয়াল 


৯১৬০ 





পরুচািল য় ৪ বচকিধ শ্রী্রীসারদামপি 


আছে। ভাটায় জল যখন কমে গেল, তখন গঙ্গার পারে খেলতে গেল হাঁষ, 
বলরামের ছেলে। 'দাব্য পেয়ে গেল ইস্টকবচ। 

যা হারাবার নয় তা কে হরণ করে। নিশীথ রানে নিজের হাতে যাঁদ ঘরের আলো 
নবিয়েও ফেলি, বাইরে চেয়ে দোখ ধ্রুবতারার জ্যোতিটি তুম ঠিক জেহলে 
রেখেছ! 

পরনে ছোট তেল-ধ্ুতি, থস-থস করে গঞ্গায় নাইতে যায় রামকৃফ। কাচের উপর 
রোদ লেগে যেমন ঠিকরে পড়ে তেমন তার গা থেকে একটা আভা ছিটকে পড়ছে 
চারাদকে। যে দেখে তারই আর পলক পড়ে না। 

রামকৃষের জন্যে রাধে সারদা । যাঁদও পাঁরহাস করে বলে, শ্রীনাথ হাতুড়ে, তবু 
সারদার রাল্নাটিতেই রামকৃষ্ণের অন্তরের রুচি । সজনে খাড়া বা পলতা শাক যোঁট 
যখন রাঁধে সারদা, সোঁটই একান্ত মনের মতন হয়ে ওঠে। স্বাদ আর পুষ্টির 
স্বাভাবিক 'মতাঁল। রান্ধে দু-একখাঁন লুচি আর একটু স্াজর পায়েস। 
কাশীপুরে তুলোর মতন নরম করে মাংসও রে*ধে 'দয়েছেন শ্ত্রীমা। 

'আমি যখন ঠাকুরের জন্যে রাঁধতুম কাশীপুরে, কাঁচা জলে মাংস দিতুম। কখানা 
তেজপাতা আর অল্প খানিকটা মশলা । তুলোর মতন সেম্ধ হলে নাময়ে 
'নতুম।' 

থালার উপর 'টিপে-টপে ভাত বেড়ে দেয় সারদা । যাতে একটু কম দেখায় । বোঁশ 
ভাত দেখলে আঁতকে ওঠে রামকৃষ্ণ । তাই সরুটি করে দেয় টিপে-টিপে। দুধের 
বেলায়ও তাই। আধ সের করে রোজ-বাঁধা। কখনো-সখনো একটু বেশি দিয়ে 
যায় গয়লা। সেটাকে ফুটিয়ে ঘন করে রাখে । সর করে। সর ভালোবাসে রানকৃষণ। 
এমনি করে ভুলিয়ে-ভূঁলিয়ে খাওয়ায় সেই সদানন্দ শিশুকে । কিন্তু কিছুতেই 
লোভ নেই সেই শিশুর । একাদন একটা সন্দেশ মুখে পুরে দিতে গিয়েছিল 
নারদা, রামকৃষ্ণ বললে, ওতে আর কি আছে £ সন্দেশও যা মাঁটও তা।' 

শুধু নারকেলের নাড়ত? আর জলিপ্পির উপর একটু পক্ষপাত। 

'ঠাকুর নাড়কেলের নাড়ু ভালোবাসতেন ।' এক স্ত্ী-ভন্তকে বললেন এক দিন শ্রীমা : 
'দেশে গিয়ে তাই করে তাঁকে ভোগ দেবে ।' 

আশার জিলাপি 2 

দকশব সেনের বাড়তে খেতে বসেছেন ঠাকুর। খাওয়া হয়ে গিয়েছে হাত তুলে 
বসেছেন পাত থেকে । আর খাবেন না, শত সাধাসাধ করলেও না। এমন সময় 
'জাঁলাপ এসে উপাস্থত। আর যায় কোথা! ঠাকুর তুলে নিলেন 'জালাপ। 

এ হচ্ছে বড়লাটের গাঁড়। ঠাকুর প্রসন্ন চোখে হাসলেন। বড়লাটের গাঁড় দেখলে 
রাস্তা যেমন ফাঁকা হয়ে যায় তেমনি জিলাপি দেখে ভন্না পেট হালকা হয়ে যাচ্ছে। 
ক্রলাপর সঙ্গে কার কথা! 'জালাপ হচ্ছে অমৃতের লিপি! সেই শিশুকালের 
অকৃন্রিম সুস্বাদের সংবাদ । সেই কামারপুরের সত্য-ময়রার দোকান। 

খাবার জায়গা হয়েছে রামকৃষের। নহবত থেকে থালা হাতে নিয়ে আসছে সারদা। 


ভন্তরা সব এখন সরে যাও। সিশড় থেকে বারান্দায় পা 'দিয়েছে, কোথেকে এক 
১৯৬৮) ১৬৯ 


মেয়ে-ভন্ত হাঁহাঁ করে ছুটে এল। 'দাও মা আমাকে দাও।' বলে প্রায় জোর করেই 
সারদার হাত থেকে টেনে নিল থালা । রামকৃষের আসনের কাছে ধরে দিয়ে সরে 
গেল। সারদা বসল এক পাশে । রোজ এমানই এসে বসে । রামকৃষেের খাওয়া দেখে। 
খৈয়ে যে স্বাদ রামকৃষ্ণ পায় তারও চেয়ে সারদা আঁধকতর পায় না-খেয়ে। 
'তুমি এ কি করলে ?' আসনে বসেই বললে রামকৃষ্ণ, “আমার খাবার নিজে না নিয়ে 
ওর হাতে দলে কেন? তুমি কি ওকে জানো না? 

একটা কলগক 'ছিল মেয়েটির। সারদা বললে, 'জানি।' 

'জানো তো, দিলে কেন? এখন আমি খাই কি করে?' 

মেয়েটর হাতের সেই আকুলতাটি বাঁঝ মনে পড়ল সারদার। বললে, “আভকে 
খাও।' 

“তবে বলো, আর কোনো দিন আর কারু হাতে দেবে না আমার খাবার ' 
সারদা জোড় হাত করল। বললে, "ওটি আম পারব না। যে কেউ চাইলেই আম 
ছেড়ে দেব ভাতের থালা।' 

করুণাময়ীর এ আরেক অমৃত-পাঁরবেশন। আমার ভালোবাসার সঙ্গে আর যদ 
কেউ তার ভান্তর স্বাদাঁট 'মাঁশয়ে দতে চায় তা আম বারণ কার কি করে: 
“তবে চেস্ট করব খুব।' সারদা বললে গাদ্বস্বরে, 'যাতে আমিই বরাবর নিজের 
হাতে নিয়ে আসতে পার।' খুশি মনে খেতে লাগল রামকৃষ্ণ 

কাশীপুরে ঠাকুরের জন্যে শামূকের ঝোল ব্যবস্থা হল। ঠাকুরের ইচ্ছে শ্রীমাই ত 
রান্না করুন। শ্রীমা বললেন, 'ও আম পারব না।, 

“কেন ক হল?' 

“ওগুলো জীয়ন্ত প্রাণী, চলে বেড়ায়। ওদের মাথা আম ইট 'দয়ে ছেশ্চতে 
পারব না।' 

'সে কিঃ আম খাব, আমার জন্যে করবে ! 

তখন, কি আর করা, রোক করে করতে লাগলেন শ্রীমা। 

'মা, ঠাকুরকে অন্ন ভোগ দেব কি?" জগগেস করলেন এক স্ব্রী-ভন্ত। 

হ্যা, দেবে বৈ কি। তিনি শুকতো খেতে ভালোবাসেন। গাঁদাল, ডুমুর, 
কাঁচকলা-” | 

'মাছ ভোগ দেব 'কি?' কুণ্ঠা-ভরা জিজ্ঞাসা মেয়োটর। 

“হ্যাঁ, তাও দেবে। 'তাঁন সেদ্ধ চালের ভাত খেতেন, মাছও খেতেন। অন্তত শাঁন- 
মঙ্গলবারে মাছ ভোগ দেবে। আর যেমন করে হোক তিন তরকারি ছাড়া ভোগ 
দেবে না 

তারপরে পান সাজে সারদা। রামকৃষ্ণের মশলা এলাচ লাগে না। শাদাসধে. সাজা 
পানেই অন্তরঙ্গ স্বাদ। পান সাজছে নহবতে বসে। কতগুলো বেশ ভালো করে 
এলাচ-মশলা দিয়ে, কতগুলো শুধু শুপ্যার-চুন দিয়েই । যোগেন বসে 'ছিল পাশে। 
পজগগেস করলে, 'কই এগুলোতে মশলা-এলাচ দিলে না? ওগুলো বা কার, 
এগুলোই বা কার? 


১৬৭ 


সারদা বললে, যেগুলো ভালো, এলাচ-দেওয়া সেগুলো ভক্তদের। ওদের আপনার 
করে নিতে হবে, তাই একটু আদর-যত্রের ছিটেফোঁটা ওগুলোতে। আর এলাচ- 
গ্শলা ছাড়া এগলো- এগুলো গুর জন্যে। উন তো আপনার আছেনই।' 
তোমাকে ভালো ভাষায় ভোলাব না, তোমাকে ভালোবাসায় ভোলাব। তোমার জন্যে 
আমার কোনো সাজ-সজ্জা নেই, আমার এই সারল্যট্কুই আমার একমান্র ভূষণ। 
আমার তো ঘোষণা নয়, আমার আহ্বান। অকপট না হলে তোমার কপাটপাটন 
হবে না যে। 

আহারান্তে রামকৃষ্ণ ছোট খাটাটিতে এসে বসে। তামাক খায়। সারদা এসে পা৷ 
টেপে। শেষকালে, সারদার চলে যাবার আগে সারদাকে আবার প্রণাম করে 
রামকৃষণ। 

সন্ন্যাসী-স্বামীর একটি পরিত্যন্তা স্্ী এসেছে দক্ষিণেশ্বরে। একটু সাজগোজ 
করতে চায় বলে তার উপর তার শাশুড়ির বড় কড়া শাসন। শ্রীমা তাই বলছেন 
দুঃখ করে : “আহা ছেলেমানুষ বৌ, তার একট পরতে-খেতে ইচ্ছে হয় না? 
একটু আলতা পরেছে তা আর ক হয়েছে? আহা, ওরা তো স্বামীকে চোখেই 
দেখতে পায় না_স্বামী সন্ন্যাস নিয়েছে। আম তো তবু চোখে দেখোছ, সেবা- 
ত্র করোছি, রে'ধে খাওয়াতে পেরেছি, যখন বলেছেন যেতে পেয়েছি কাছে, যখন 
বলেনান, দু'মাস পর্ন্তি নামইনি নবত থেকে। দূর থেকে দেখে পেন্নাম 
করোছ-_” 

সাজতে সারদাও ভালোবাসে 

'কেন বাসবে না? ওরে, ওর নাম সারদা, ও সরস্বতাঁ। তাই তো ভালোবাসে 
সাজতে ।' বললে রামকৃষ্ণ । 'নিজে টাকা-কাঁড় ছ*তে পারে না, তাই ডাকালো হ্‌দয়কে। 
দ্যাখ তো, তোর সন্দূকে কত টাকা আছে। ওকে ভালো করে দু ছড়া তাবিষ্জ 
গাঁড়য়ে দে 'সন্দূক থেকে তিনশো টাকা বেরুলো। তাই দিয়ে তাবিজ হল সারদার। 
রামকৃফের মাইনে 'নিয়ে [হিসেবে [ি গোল করোঁছিল খাজান্টি। কম দিয়োছিল। তাই 
নিয়ে এক দিন বললে সারদা, “খাজাশ্টিকে গিয়ে বলো নান” 

রামকৃষ্ণ বললে, ণছ-ছি, হিসেব করব ?' 

হিসেব পচে যাঁয়। 

এঁদকে সর্বস্ব ত্যাগী, অথচ সারদার জন্যে ভাবনা। এক দিন তাকে জিগগেস 
করলে রামকুর্ণ, “তোমার কটাকা হলে হাতখরচ চলে ?' 

মুখ নামালো সারদা । বললে, 'পাঁচ-ছ টাকা হলেই চলে।' 

তারপর, হঠাৎ আরেক অল্ভুত জিজ্ঞাসা : শবকেলে কখানা রুটি খাও 

এবার লজ্জায় আর বাঁচে না সারদা। কি করে বাল! এ ি একটা বলবার মত 
কথা! কিন্তু রামকৃ্ণ ছাড়ে না। জিগগেস করে বারে-বারে। মাটির সঞ্চো মিশে 
গয়ে সারদা বললে, 'এই পাঁচ-ছখানা খাই 1, 

তারপর আরো একটু অন্তরঙ্গ হয় রামকৃফ। বলে, 'বুনো পাখি খাঁচায় রাতাঁদন 


থাকলে বেতে যায় । মাঝে-মাঝে পাড়ায় বেড়াতে যাবে।' 
১৬৩ 


এক 'দন ক'টা পাট এনে দিলে সারদাকে। বললে, এগ্াল দিয়ে আমাকে 'শিকে 
পাকিয়ে দাও। আমি সন্দেশ রাখব লুচি রাখব ছেলেদের জন্যে । 

সারদা শিকে পাকিয়ে দিল। ফে'সোগ্ুলো দিয়ে থান ফেলে বালিশ করলে । 
কোনো জিনিস অপচয় হতে দেয় না সারদা! যত সামান্য জানিস হোক, যত করে 
রেখে দেয়, কাজে লাগায়। বলে সেই অপূর্ব কথা : 'যাকে রাখো সেই রাখে ।” পটপটে 
মাদুর পেতে ফেসোর বালিশে মাথা রেখে সারদা শোয়। 'দাব্য ঘূম আসে। 
পাড়াগেয়ে মেয়ে, সারদার জন্যে বড় ভাবনা রামকৃষের। কোথায় না জান শোচে 
যাবে, নিন্দে করবে লোকে, তখন ভারি লজ্জা পাবে বেচারী! কিন্তু আশ্চর্য, কখন 
যে কি করে, কাকপক্ষীও টের পায় না। 

'বাইরে যেতে আমও কখনো দেখলুম না।' বলে ফেলল রামকুষণ। 

কথাটা সারদার কানে যেতেই মুখ শুকিয়ে গেল। ওমা, এখন কী হবে! ঠাকুর 
যা মনে-মনে চান তাইই মা ও"কে দোখয়ে দেন। এখন তো তবে এক "দন তাঁর 
চোখে ঠিক ধরা পড়ে যাব! এখন উপায়? আকুল হয়ে ভবতারিণীকে ডাকতে লাগল 
সারদা । 'হে মা, আমার লজ্জা রক্ষা করো ।' 

এমন মা, বিপন্না মেয়ের দায় মোচন করলে । দুই পাখা দিয়ে ঢেকে রাখল মেয়েকে। 
কত বছর ধরে আছে সারদা, এক 'দনও কারু সামনে পড়ল না। 

রাত তিনটের সময় উঠে জপে বসে । জপে বসে আর কোনো হস থাকে না। সোঁদন 
জ্যোৎস্না রাত, নবতে িসপড়র পাশে বসে জপ করছে সারদা । চারাদকে রুদ্ধশ্বাস 
স্তব্ধতা। ধ্যান খুব জমে 1গয়েছে। ঠাকুর কখন বটতলায় গেছেন টেরও পায়ান। 
অন্য দিন জুতোর শব্দে টের পায়, আজ তাও নয়। লালপেড়ে শাঁড়র আঁচল খসে 
বাতাসে উড়ে-উড়ে পড়ছে, খেয়াল নেই । তন্ময়তার প্রাতিমৃর্তি। 

যখন ধ্যান ভাঙল তাকালো চাঁদের 'দকে। হাত জোড় করলে । বললে, 'তোমার 
এঁ জ্যোৎস্নার মত আমার অন্তর নির্মল করে দাও।' 





“আজ নরেন এখানে খাবে ।' ঠাকুর বললেন এসে নবতে । 'বেশ ভালো করে রাঁধো।' 
মগের ডাল আর রুটি করল সারদা। তাই খেল নরেন এক পেট। খাবার পর 
ঠাকুর জিগগেস করলেন, 'ওরে কেমন খোঁল ?' 

১৬৪ 


'বেশ খেলুম। যেন রুগীর পথ্য।' 

ঠাকুর ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। নবতের উদ্দেশে চেশচয়ে বললেন, 'ওকে ওসব ফি 
রে'ধে দিয়েছ ১ ওর জন্যে ছোলার ডাল আর মোটা-মোটা রুটি করে দেবে।' 
তাই আবার করে দিল সারদা। তাই আবার খেল নরেন। 

'নরেনের হচ্ছে ব্যাটাছেলের ভাব। নিরাকারের ঘর। পুরুষের সত্তা! ও হচ্ছে পুরুষ- 
পায়রা । পুরুষ-পায়রার ঠোঁট ধরলে ঠোঁট টেনে ছিনিয়ে নেয়।' 

কিন্তু মেয়ে-ভাব প্রকীতি-ভাব কার? বাবুরামের। ওর হচ্ছে প্রেমের ঘর। 

কন্তু নরেন আর আসে না কেন? কেন দেখা দিয়ে আবার লুকিয়ে থাকে? 
নরেন আসেনি কিন্তু সোঁদন বাবুরাম এসে উপাস্থত। 

যখন পাঁচ বছর বয়েস তখন যদি কেউ বলত, 'তোর এমন বাবুর মত চেহারা, তোকে 
একাট টুকটুকে সুন্দরী বউ এনে দেব” অমনি কচি-কচি দুটি হাত নেড়ে অসম্মতি 
জ্রানাত, "ও কথা বোলো না-ময়ে যাব, ময়ে যাব।' সেই বাবুরাম। 

বড় বোন কৃফভাবনন। শ্যামবাজারের বলরাম বোসের ন্ত্রী। ঠাকুরের রসদদার 
বলরাম বোস। 

'যখন আসবে এখানকার জন্যে কছু নিয়ে এস। শুধু হাতে আসতে নেই।' এ 
কথা এক দিন বলেছিলেন বলরামকে । আর যায় কোথা! প্রা মাসে ডালা পাঠায় 
বলরাম । 

কেশবও যখন আসে হাতে করে কিছু নিয়ে আসে। অন্তত একটি ফুল। 
শ্যামবাজারে ষদু পান্ডিতের 'বঙ্গ 'বদ্যালয়ে' ভর্তি হয়েছে বাবুণাম । থাকে খুড়োর 
বাড়তে । পাঠশালায় সহপাঠী কালী প্রসাদ । স্বামী অভেদানন্দ। 

সেইখান থেকে চলে এসেছে মেদ্রোপালটান ইনস্টিটিউশনে। মাস্টারমশায়ের 
ইস্কুলে। ঠিক অত্কুরটি উড়ে এসে পড়েছে ঠিক মাঠটিতে। 

গঙ্গাপারে সাধ্‌্সন্নেসী খুজে বেড়ায় বাবুরাম। কতই দেখে, কিন্তু ঘনের 


মতনাঁটকে দেখে না। যাকে দেখে আর জিগগেস করতে হয় না, এ কে--সেই 
[জজ্ঞাসাতীতকে। 


ঘৃণাক্ষরেও জানে না তেমন একজনকে দেখেছে ভার ভশ্নিপাঁতি। দেখেছে তাল মা। 
এমন কি তার দাদা তুলসারাম। 

'কোথায় অমন সাধু খুজে বেড়াচ্ছিস 2" এক দিন তাকে বললে তুলসারাম। 
'যাঁদ সাঁত্যকার সাধূ দেখতে চাস তবে দক্ষিণে*বরে যা! দেখে আয় লামকৃষ- 
দেবকে ।' 

রামকৃষ্ের কথা শুনেছে বাবুরাম। পড়েছে খবরের কাগজে । জোড়াসাঁকোর এক 
হরিসভায় এক 'দিন বুঝি তাঁকে দেখেওছিল দূর থেকে। কিন্তু তাঁর কাছে যাই 
কেমন করেঃ কে নিয়ে যায়! 

শুধু একবার মনে করো, যাবে, তিনিই বাবস্থা করে দেবেন। ছেলে যাঁদ বাপের 
কাছে যেতে চায়, বাপ টাকা পাঠিয়ে দেয়, লোক পাঠিয়ে দেয়। তোমার কাছে 


যাব__একবার শুধু একাঁট খবর পাঠিয়ে দাও তাঁকে । আর দেখতে হবে না। তিনি 
১৬৫ 


পাঠিয়ে দেবেন যান-বাহন লোক-লস্কর টাকা পয়সা। 

রাখালকে চিনত, তাকে বললে খুলে মনের কথা । 

'আম তো যাই প্রায়ই দাক্ষণেশ্বর । 

“আমাকে নিয়ে যাবে ?' রাখালের হাত চেপে ধরল বাবুরাম। 

কিন্তু যাবে কি করেঃ পায়ে হে'টে না নৌকোয়? যাবে তো ফিরবে কি করে; 
যাঁদ ফিরতে না পাও, খাবে কিঃ শোবে কোথায়? কোনো প্রশ্ন নিয়েই আর 
মাথা ঘামায় না বাবূরাম। ঠিকানা জানা হয়ে গেছে। ঠাকুর পাঠিয়ে 'দিয়েছেন 
দশারী। 

শানবার ইস্কুল ছুটি হলে দুই বন্ধু চলে এল হাটখোলার ঘাটে। রামদয়াল 
চক্রবর্তীও এসেছে দেখাছ। হোরমিলার কোম্পানিতে চাকরি করে রামদয়াল, থাকে 
বলরামের বাড়তে । সেও দাক্ষণে*বরের যান্রী। 

পেশছুতে সেই সন্ধ্যে। ঠাকুর ঘরে নেই। 

রাখাল কখন চলে গেছে মন্দিরের দিকে । বাবুরামকে বসে থাকতে বলে গেছে, 
তাই বসে আছে বাবুরাম। বসে আছে প্রার্থনার মত। প্রসাদের জন্যে যে প্রতীক্ষা 
তাই প্রার্থনা । 

কতক্ষণ পরে রাখালের কাঁধে হাত রেখে ভাবাবিষ্ট ঠাকুর ঘরে ঢুকছেন। টলছেন 
মাতালের মত। হতবাকের মত তাকিয়ে রইল বাবুরাম। চোখের সামনে এ কে 
নয়নভুলানো! 

ছোট খাটটিতে বসলেন ঠাকুর। রামদয়াল পাঁরচয় করিয়ে দিল। 

'বলরামের আত্মীয়? তা হলে তো আমাদেরও আত্মীয়।' হঠাৎ উঠে দাঁড়য়ে 
ডাকলেন বাবুরামকে । 'এসো তো, আলোয় এসো তো একাটিবার, তোমার মুখখানি 
দেখি।' 

ঘরের কোণে মিটমিটে একট দীপ জবলছে। সেইখানে বাবুরামকে টেনে আনলেন 
ঠাকুর। বাবুরামের ভীন্তনম্ন কিশোর মুখখানি দেখলেন একদৃ্টে। বললেন, 'বাঃ, 
বেশ ছেলোট তো!' পরে তার হাতখাঁন টেনে নিলেন তাঁর হাতের মধ্যে। ওজন 
নিলেন। বললেন, 'বেশ।' 

বাবুরামকে দেখলাম-দেবীমৃর্ত। গলায় হার। সখা সঙ্গে । ওর দেহ শুদ্ধ-_ওর 
হাড় পর্য্ত শুদ্ধ । একটা 'কছু করলেই ওর হয়ে যাবে। 

পরে এক 'দন বলেছিলেন ঠাকুর, 'দেহরক্ষার বড় অসুবিধে হচ্ছে। বাবুরাম এসে 
থাকলে ভালো হয়। নেটো তো চড়েই রয়েছে। ক্রমে লীন হবার যো। আর রাখাল ? 
রাখালের এমন স্বভাব হয়ে দাঁড়াচ্ছে, আমাকেই তাকে জল 'দিতে হয়। আমার সেবা 
বড় সে আর করতে পারে না। তবে টানাটানি করে আসতে বাঁল না, বাঁড়তে হাঞ্গামা 
হতে পারে। আম যখন বাল চলে আয় না, তখন বেশ বলে, আপাঁন করে নিন না। 
রাখালকে দেখে কাঁদে, বলে, বেশ আছে।” 

তাই এক 'দিন যখন মাকে নিয়ে বাবুরাম গিয়েছে দাঁক্ষণেশবর, ঠাকুর বললেন 
মাতাঁঞ্গনশ দেবীকে, 'তোমার এই ছেলোঁটি আমাকে দেবে 2' 


১৬৬ 


মাতঙ্গিনী দেবী নিজেকে কৃতার্থ মনে করলেন। বললেন, 'এ তো আমার পরম 

দৌভাগ্য।, 

বাবুরামের দেহ-লক্ষণ পরাঁক্ষা করে ঠাকুর আবার বসলেন ছোট খাটে। হঠাং 

রামদয়ালকে লক্ষ্য করে বললেন স্নেহাকুল কণ্ঠে, 'গওগো নরেনের খবর জানো 2 

সে কেমন আছে? 

ভালো আছে।' বললে রামদয়াল। 

এখনে অনেক দিন আসে না। তাকে দেখতে বড় ইচ্ছে করছে। কেন আসে না-- 

এক দিন আসতে বোলো ।' 

কানু ছাড়া গীত নেই, ঈশ্বর ছাড়া কথা নেই। কথায়-কথায় রাভ দশটা বেজে 

গেল। 

অমৃতময়ী কথা। 

নারদকে রাম বললেন, তুমি আমার কাছে কিছু বর নাও। নারদ বললেন, রাম, 

আমার আর কি বাকি আছেঃ কি বর নেব? ভবে যাঁদ একান্তই দেবে, এই 

বর দাও যেন তোমার পাদপদ্মে শ্রদ্ধাভন্তি থাকে, আর যেন তোমার ভূবনমো হন 

মায়ায় মুগ্ধ না হই। রাম বললেন, নারদ, আর কিছু বর নাও। নারদ আবার 

বললেন, রাম আর কিছু চাই না, যেন তোমার পাদপদ্মে শ্রদ্ধা-ভান্ত থাকে এই 

করো। 

যেখানে ভান্ত সেখানেই ভগবান। 

লক্ষণ রামকে জিগগেস করলেন, রাম, তুমি কত ভাবে কত রূপে থাকো, কিরিপে 

তোমায় চিনতে পারব? রাম বললেন, ভাই, একটা কথা গেনে রাখো । যেখানে 

উাঁজতা ভক্তি, সেখানে নিশ্চয়ই আমি আছি। উীর্জতা ভান্ততে হাসে কাঁদে নাচে 

গায়। যাঁদ কারু এরূপ ভক্তি হয় নিশ্চয় জেনো সেখানে ভগবানের আনর্ভাব। 

ঠাকুরের তো সেই অবস্থা । প্রেমে হাসে কাঁদে নাচে গায়। তবে কি এইখানেই 

ঈশবরসাক্ষাৎ ঃ বাবুরামকে ঠাকুর যখন আত্মীয় বললেন তখন ভার মানে কি বাবুলাগ 

ঠাকুরের ভন্ত ১ অন্তরঞ্গদের একজন ? 

রাত দশটা বেজে গেছে। ঠাকুর বললেন, এবার খেয়ে নাও সকলো । 

রামদয়াল আর বাবুরাম বারান্দায় শুলো। রাখাল ঠাকুরের সঙ্গে এক ঘরে। 

শয়ন যেন সাম্টাঙ্গ প্রণাম এই শুধু মনে হতে লাগল বাবুরামের। যেন বা মাত- 

অঙ্কে মাথা রেখে শিশুর মতো ঘুমিয়ে আছে। জলে স্থলে অন্তরীক্ষে নিগড় 

শান্তি। যেন কোন গভশরের দেশে এসে সহঙ্জ বিশ্রাম পেয়েছে আজ। 

“ওগো ঘুমুলে 2, 

অতন্দ্র মধ্যরাত্রিই হঠাৎ করুণ স্বরে কেদে উঠল নাকি ? 

বাবুরাম চোখ চাইল, দেখল ঠাকুর। বালকের মত পরনের কাপড়খানি বগলের নিচে 

ধরা। রামদয়ালের শিয়রের কাছে দাঁড়য়ে ডাকছেন। 

দুজনে ঘূম ফেলে উঠে বসল । বললে, 'আজ্ঞে না, ঘুমুইনি।' 

“ওগো আমার ঘুম আসছে না। নরেনের জন্যে আমার প্রাণের ভেতরটা মোচড় 
১৬৭ 


শদচ্ছে! যেন জোরে কে গামছা নিংড়োচ্ছে বকের মধ্যে। তাকে একবার 'নয়ে 
আসতে পারো?” 

'আজ্দে, ভোর হোক। ভোর হলেই তাকে আম সংবাদ দেবো ।' বললে রামদয়াল। 
“তাই কোরো । শুধু একবারটি একটু চোখের দেখা । তাকে মাঝে-মাঝে না দেখলে 
থাকতে পার না) 

এই বাঁঝ ভগবানের কান্না। বাবুরাম দেখতে লাগল, শুনতে লাগল । ভন্তই শুধু 
ভগবানের জন্যে কাঁদে না, ভগবানও 'বিনিদ্র রাত্রি জেগে ভন্তের জন্যে অশ্রবর্ষণ 
করে। ভন্ত না থাকলে ভগবানও অনর্থক । যান কাঁব তাঁর একটি রাঁসক পাঠক 
চাই। এই রাঁপকটি না থাকলে সমস্ত রসসমূুদ্রই শুম্ক। সমস্ত কবিতাই মাটি। 
শুধদ ভগবান নন ভন্তও কঠ্ঠের হতে জানে। আর সেই ভন্তকে দ্রবীভূত করবার 
জন্যে ভগবানের এই বিগাঁলিত কাল্না। 

বাবুরাম ভাবতে লাগল, কী নিষ্ঠুর না-জানি এই নরেন্দ্রনাথ! 

শুধু কি এক দন না এক রান্র?ঃ ভালোবাসার কি 'দিন-রান্রি আছে? কান্নার কি 
ক্ষান্ত আছে কোনো কালে? এক 'দিন শেষে মা'র মান্দরে গিয়ে ধন্না দিলেন। মা 
গো, তাকে এনে দে। ভাকে না দেখে যে থাকতে পাচ্ছি না। 

ঠাকুরের কান্নার রোল ঘরের মধ্যে বসে শুনতে পাচ্ছে ভন্তেরা। পরস্পরের মুখ 
চাওয়াচাওয়ি করছে। একটা পরের ছেলের জন্যে এমন করে কাঁদতে পারে কেউ? 
মা গো, এক কালে তোর জন্যে কে'দোছলাম, এখন নরেনের জন্যে কাঁদাছ। তুই 
দেখা দিলি আর নরেন দেখা দেবে না? আমার এই কান্নার ডাকটি তার কানে 
পেশছে দে মা। তুই পাষাণ হয়ে শুনতে পোল আর ও রন্তমাংসের মানুষ হয়ে 
শুনতে পাবে নাঃ 

আবার ভক্তদের মধ্যে এসে বসেন ঠাকুর। বলেন, 'এত কাঁদলাম 'কলন্তু নরেন্দ্র তো 
এলো না! সে এত বোঝে আর আমার প্রাণের টানটাই বোঝে না! 

আবার ঘরের বাইরে গিয়ে কান পাতেন! এ বুঝ শোনা যাচ্ছে তার পায়ের শব্দ। 
তার দরাজ গলার কলস্বর। 

কোথাও কিছু নেই। তখন নিজেকেই নিজে উপহাস করেন ঠাকুর। “বুড়ো 'মিনসে, 
পরের একটা ছেলের জন্যে এমনি কাঁদি, লোকে দেখলে কী বলবে বলো দোঁখি ? 
তোমরা আপনার লোক, তোমাদের কাছে না-হয় লঙ্জা নেই, কিন্তু অন্যে কী 
বলবে 2 অন্যে কী বলবে ভেবেও তো সামলাতে পাচ্ছ না।, 

সেবার ঠাকুরের জন্মোৎসব করছে ভন্তরা। নতুন সাজে সাঁজয়েছে ঠাকুরকে । চন্দন- 
চার্টত পষ্পমালা দুলিয়ে দিয়েছে গলায়। আনন্দের হাটবাজার বসে গিয়েছে 
চারদিকে ৷ রাম দত্ত প্রসাদ বিলোচ্ছে। গোম্ঠমিলন গান শুরু হবে এবার। 
কিন্তু ঠাকুর মাঝে-মাঝে একটা 'বিষপ্রতার রেখা টানছেন। “তাই তো, নরেন্দ্র এখনো 
এলো না। 

নরোত্তম কীর্তন গাইছে যার কীর্তন তিনি মাঝে-মাঝে আখর দিচ্ছেন। মাঝে- 


মাঝে আবার তা কান্নার আখর। কই, নরেন্দ্র কই ?, 
১৬৮ 


নরেন্দ্র ছাড়া সমস্ত ব্যঞ্জন আল্দান। সমস্ত ব্যজনা স্বাদ । 

উন্মনা ভাবে কখন একট; তন্ময় হয়ে ছিলেন ঠাকুর, নরেন হঠাৎ এসে তাঁকে প্রণাম 
করলে। ঠাকুর লাফিয়ে উঠলেন। তাঁর আনন্দ তখন আর দেখে কে! একেবারে 
নরেনের কাঁধে চেপে বসলেন, বসেই গভনর ভাবাবেশ। 

আর নরেন £ প্রেমময়ের স্পর্শে বেদান্তবাদীর কাঠিন্য গলে যেতে লাগল । দুটি 
পারপূর্ণ চোখ আচ্ছন্ন হয়ে এল অশ্রুতে। 

চারদিকে আনন্দের ঢেউ বইতে লাগল । বইতে লাগল সেবার ম্রোতাস্বনী। 
ঠাকুর খাচ্ছেন, প্রসাদ-লোভে ভন্তরা তাঁকে বেম্টন করে আছে। হঠাৎ দু'চার গ্রাস 
খেয়েই ঠাকুর বলে উঠলেন, 'নরেনের গান শুনব। গান শৃনতে-শুনতে খাব। তাঁর 
গুণগান শোনাবার জন্যে মহামায়া নরেনকে অখন্ডের ঘর থেকে নিয়ে এসেছেন। 
ওর গান শুনলে আমার ভিতরে কী হয় জাঁনসঃ আমার 'ভিতরে 'যানি, তানি 
ফোঁস করে ওঠেন । 

নরেন গান ধরল : 


'নাবড় আঁধারে মা তোর চমকে অরূপরাশ 
তাই যোগী ধ্যান ধরে হয়ে গিরিগ্হাবাসণ | 
অভয় চরণ তলে প্রেমের বি্লী খেলে 

চিন্ময় মুখমন্ডলে শোভে অট্র অট্ট হাসি" 


গান শুনেই চাকুর সমাধিস্থ । অন্লরস ছেড়ে চলে গেছেন অন্য রসে । আনন্দরসে। 
কিন্তু ঠাকুরের পাঁরহাসরসও অফুরন্ত। 

বেলা দুটোর সময় ভন্তরা বসেছে পউক্ডিভোদ্নে । চিড়ে দই আর চিনি পাঁরবেশন 
হচ্ছে। 'রামের কি ছোট নজর!' বললেন, ঠাকুর, “আমার জন্মোৎসবে কনা চি*ড়ের 
ব্যবস্থা করল! এই শীতের দিনে িঞ্ড়ে-দই ' ভার বদলে--' ঠাকুর গান ধরলেন : 
'মোন্ডা খাজা খুরমা গজা মোদক-বিপাণ-শোভনম্‌।' 

ভন্তবৃন্দ উল্লাসের হিল্লোল তুলল । 

গান জমাবার জন্যে “মারে আরে' বলে ঠাকুর আখর দিচ্ছেন, এমন সময় এক ভত্ত 
হার হাঁর' বলে উঠল। সব রস মাঁটশ ঠাকুর হেসে উঠলেন । 'শালা এমন বেরাঁসক, 
রসগোল্লা-রসগোল্লা না বলে হরি-হরি বললে ।' 

এমন সময় ফের দই নিয়ে এল। এই দেখে ঠাকুর হাত তুলে গাইতে লাগলেন : 


পদে দই দে দই পাতে, ওরে বাটা হাঁড়ি-হাতে। 
ওরা কি তোর বাবা খুড়ি, ওদের পাতে হাঁড়ি-হাঁড় 


একটা হুল্লোড় পড়ে গেল। 
আর তারই মধ্যে সেই অরাঁসক ভক্ত 'রসগোল্লা' বলে 'জয়' চি 


১৬৯ 





যদু মল্লিকের বাগানে গিয়ে আবার কাঁদে রামকৃফণ। 

ভোলানাথ, মোটা বামুন, হাত জোড় করে বলে, 'মশায়, ওর সামান্য পড়াশহনো, ওর 
জন্যে আপনি কেন এত অধীর হন? 

সামান্য পড়াশুনো ? নরেনের জড় আর একটাও ছেলে আছে? ঝলসে ওঠে 
রামকৃষ্ণ। 'যেমন গাইতে-বাজাতে, তেমান বলতে-কইতে, তেমাঁন আবার লেখা- 
পড়ায়। রাত-ভোর ধ্যান করে, ধ্যান করতে-করতে সকাল হয়ে যায়, হস থাকে 
না। সে কি যে-সে? তার ভেতর এতটুকু মোক নেই-বাঁজয়ে দেখ গিয়ে, টং- 
টং করছে। আর সব ছেলেদের দোঁখ- দেড়টা-দুটো পাশ করেছে হয়তো, ব্যস, 
এঁ পর্যন্তই । চোখ-কান টিপে কোনো ব্লকমে পাশ করতেই যেন সব শান্ত বেরিয়ে 
গেছে। আমার নরেনের সে রকম নয়, সে হেসে-খেলে পাশ করে যায়। ব্রাহনমসমাজে 
ভজন গায় সে-আর-আরদের মতন নয়, সে সাঁত্যকারের ব্রহয়জ্ঞানী। বুঝলে, 
ধ্যান করতে বসে সে জ্যোতি দেখে। সাধে কি আর নরেনকে এত ভালোবাস ?' 
কিন্তু যাকে এত ভালোবাসেন সে তাঁকে মানতে রাজী নয়। সে তাঁকে কাঁদায়। 
এক দন সরাসার বললে মুখের উপর, "তুমি ঈশবরের রূপ-টূপ যা দেখ তা তোমার 
মনের ভূল।' আহতের মত অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন রামকৃষ্ণ । বললেন, 'বাঁলস 
ক রে! কথা কয় যে! 

“কথা কয় না কচু!' কথাটা হেসে ডীঁড়য়ে দিল নরেন্দ্। 'সব আপনার মাথার খেয়াল! 
বলে কি ছোঁড়া! মাথার খেয়াল ? 

'বাঁলস কি রে! মা স্পম্ট চোখের সামনে দাঁড়ান, হাঁটেন-চলেন, কথা কন-_, 
'বাজে কথা! মাটর প্রাতমা নড়বে-চড়বে কি!*কথা কইবে কি! 

'বাঃ নিজের চোখ-কানকে অবিশ্বাস করব 2' 

'মাথার গরমে ছায়া দেখেন আপনি, হয় তো বা অপচ্ছায়া!' নরেন নিজ্ঞজুরের মত 
বললে, “হাওয়ায় হয়তো বা কি শব্দ হয়, ভাবেন ছায়া বুঝ কথা কইছে।' 
'তুই বললেই হল ?' নরেনকে ডীঁড়য়ে দিতে চাইলেন রামকুফণ। 

'আপাঁন বললেই বা হবে কেন?" প্রত্যাখ্যানে দড় নরেন্দ্রনাথ : পশ্চিমের বিজ্ঞান 
প্রমাণ করেছে, অনেক জায়গায় চোখ-কান এমনি করে প্রতারণা করে। আপনিও 
যে প্রতাঁরত হচ্ছেন না তার প্রমাণ কি? কে বলবে সমস্তই আপনার চোখ-কানের 
ভুল নয়?, 


৯৭০ 


'সমস্তই আমার চোখ-কানের ভুল?" অসহায়ের মত তাকিয়ে রইলেন রামকৃফ। 
নশ্চয়। নইলে ষা সাঁত্য অদৃশ্য তাকে দেখা যাবে ?ক করে? যা অচল সে কি 
করে নড়েচড়ে £ 

এর মধ্যে আবার হাজরা আছে টি্পনি ঝাড়তে। 

বলছে, 'ঈশবর অনন্ত, তাঁর এ*্বর্য অনন্ত- সব বুঝ । তাই বলে 'তাঁন কি আর 
দন্দেশ-কলা খাবেন ? না, গান শুনবেন? ও সব ধোঁকা, ধাস্পাবাজ।' 

'তা ছাড়া আবার ?কি।” তার কথায় দাগা বুলালো নরেন। 

বড় মন-মরা হয়ে গেলেন রামকৃষ্ণ । নরেন তো মিথ্যে বলবার ছেলে নয়! তবে এত 
দন তিনি ধা সব দেখে এসেছেন, শ্বাস করে এসেছেন, সব ভুয়ো! সব 
কাল্পনিক? ভবতারিণীর কাছে গিয়ে কেদে পড়লেন রামকৃষ্ণ । 

'মা, এ কী হলঃ এ সব কি মিছে? নরেন্দ্র এমন কথা বললে! তুই শুধু পাথরের 
মৃর্ত? তুই অচল, অনড়? তুই বোবা, বাধর 2" 

মা কথা কয়ে উঠলেন। বললেন, 'ওর কথা শুনিস কেন ঃ কিছু দিন পরে ও-ই 
নিজে দেখতে পাবে ঈশ্বরীয় রূপ, সব কথা সত্য বলে মানবে । কিছু ভাবিসনে । 
যাঁদ মিথ্যে হবে, সব কথা তবে আঁবকল মিলল কি করে 2' 

শুধু তাই নয়, দোখয়ে দিলেন ভবতারণী। দৌখয়ে দিলেন, সব্ত চৈহনা, অখন্ড 
চৈতন্য- চৈতন্যময় রূপ । 

তেড়ে ছুটে গেলেন রামকৃষ্ণ । পাকড়াও করলেন নরেনকে। বললেন, "শালা, তুই 
আমায় আব*বাস করে দিয়েছিল! চলে যা, তুই আর এখানে আসিস নে।' 

যার জন্যে এত কান্না, তাকেই না বাঁড়র বার করে দেওয়া । 

মুখের কথায় নরেন নড়ে না, কেননা সে জানে অন্তরের কথাটি । তাই সে আস্তে- 
আস্তে বারান্দায় সরে গিয়ে বসে তামাক সাজতে । নীরবে হঠকোটা বাঁড়য়ে দেয় 
হাজরার দিকে । হাজরাও চুপ। 

সেই যে সোদন চলে গেল নরেন, রামকৃষ্ণের ভয় হল, আর বাঁঝ সে আসবে না 
রাগ করে। কিন্তু, না, আবার এসেছে আরেক দিন। সেদিন আনন্দ কত রামকৃষ্ণ! 
মনে-মনে বলছেন, ও যে আমার আপনার লোক, তাই ওকে বকলেও ও আসবে। 
যে আপনার লোক তাকে বকলেও সে রাগে না। 

তাই তো ঈশবর মুখের কথার ধার ধারেন না। অন্তরের বচনহশন ভাষাটি শোনবার 
জন্যে নির্তর কান পেতে থাকেন। 

'নরেন্দের কথা আর লই না।' 

সোঁদন আবার আরেক তর্কা। 

রামকৃষ্ণ বললেন, চাতক আকাশের জল ছাড়া আর কিছ_ খায় না। 

নরেন তা মানতে রাজণী নয়। বললে, 'বাজে কথা । এমনি লও চাতক খায়।' 
মহা ভাবনা ধরল রামকৃষের । আবার ছুটলেন ভবতারিণীর মন্দিরে । মা, এ সব কি 
মিথ্যে হয়ে গেল? যা এত দিন সব দেখোছ-জেনেছি সব গাঁজাখ্যার ? 

সেদিন কি মনে করে নরেন্দ্র এসে হাজির । 


১৭৯ 


“ঘরের ভিতর কতগুলো কা পাখী উড়ছে ফরফর করে। নরেন্দ্র বলে উঠল, 
“এ, এ, 

কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করলেন রামকৃষ্ণ, ণক ?, 

এ চাতক! এ চাতক! উল্লা করে উঠল নরেন। 

কতগুলো চামচিকে। 

হেসে উঠলেন রামকু্ণ। বললেন, 'সেই থেকে নরেন্দ্রের কথা আর লই না।' 
[কিন্তু সব সময়ে ভয়, নরেন্দ্র এই বুঝ আর কারু হয়ে গেল। আমার ব্ঝ ₹ল 
না! তাই তার সঙ্গে কথা কইতেও ভয়, না কইতেও ভয়। 
স্নেহকরুণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন রামকৃষ্ণ । ভাবাবহবল হয়ে গান 
ধরেন : 


'কথা বলতে ডরাই না-বললেও ডরাই। 
মনে সন্দ হয় পাছে তোমাধনে হারাই-হারাই ॥, 


গান শুনে অশ্রু-ভরোভরো চোখে তাকিয়ে থাকে নরেন। ভাবে ভালোবাসায় পাহা 
বাঁঝ দ্রবময়ী নির্ধারণী হয়ে যাবে। 

কিন্তু এ বুঝ আবার হারিয়ে গেল। কত দিন আবার দেখা নেই নরেনের। 
কাঁহাতক আর বসে থাকবেন পথ চেয়ে! সোদন নিজেই রওনা হলেন কলকাতার 
[দকে। কিন্তু, হঠাৎ খেয়াল হল, আজ তো রাঁববার, যাঁদ তার বাঁড়তে গিয়ে দেখা 
না পাই! যাঁদ কোথাও কারু সঙ্গে আড্ডা দতে বোৌরয়ে গিয়ে থাকে! কোথায় 
আর যাবে! আজ যখন রাবার, নিশ্চয়ই ব্রাহমসমাজে ভজন গাইবার ডাক পড়েছে 
সন্ধের সময়। সেখানে গেলেই নির্ঘাত তাকে দেখতে পাব। আমার তো আর 
কিছুই বাসনা নেই, শুধু তাকে একটু দেখব কাছে থেকে। 

যেমন ভাবনা তেমন কাজ। সরাসার সমাজে গিয়ে উপাস্থত হলেন রামকুফণ। 
মুহূর্তে একটা প্রলয়-কান্ড ঘটে গেল। বোঁদতে বসে আচার্য ভাষণ 'দচ্ছেন, 
জনতার সৌঁদকে লক্ষ্য নেই। সেই 'সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্' সহসা যেন মুর্ত ধরে 
আঁবর্ভূত হয়েছেন সভাস্থলে, এমান মনে হল ভ্রনতার। তাঁকে একবারাটি একট; 
চোখের দেখা দেখবার জন্যে চারাঁদকে রব পড়ে গেল। শুরু হয়ে গেল বাঁধভাঙা 
1বশঙ্খলা। বোণ্টর উপর উঠে দাঁড়াল একদল, অনা দল ঘিরে ধরতে চাইল 
রামকৃষকে। ণ 
স্তাভতের মত বসে রইল আচার্য। মাথায় একবার এল না ঠাকুরকে যোগ্য সমাদরে 
সম্বর্ধনা করে নিই। বসাই এনে বোদর উপরে । 
আচার্ষের কথা ছেড়ে দি, সমাজের কর্তৃপক্ষের কেউই একটা সাধারণ শিষ্টাচার 
পর্যন্ত দেখালো না। মনে-মনে রামকৃষের উপর তারা চটা ছিল। তাদের সমাজের 
দু-দুটো মাথা-কেশব আর বিজয়কে রামকৃষ্ণ বশ করেছে! টেনে নিয়েছে নিজের 
মতে। 

১৭২ 


কিন্তু তাই বলে তিনি এমনি ভাবে অপমানিত হবেন? বোঁদর উপর বসে ছিল 
নরেন্দ্রনাথ নিচে লাফিয়ে পড়ল। এঁগয়ে গেল ঠাকুরের দিকে। 

তাকে দেখতে পেয়ে ভাবে মাতোয়ারা হলেন রামকৃচ। তার দিকে ধাবমান হতে- 
না-হতেই সমাধিস্থ হয়ে পড়লেন। 

তখন আবার সমাধ-অবস্থায় রামকৃষকে দেখবার জন্যে জনতা আলোঁড়ত হয়ে 
উঠল। এমন সময় কারা ঘরের গ্যাস দিল 'নাবয়ে। ঘনান্ধকারে ভরে গেল চার 
দিক। তুমুল গোলমাল। 'দিগৃভ্রান্ত দ্বারভ্রান্ত জনতা । এদক-ওদিক ছুটতে লাগল 
বিপর্যস্তের মত। 

এখন রামকৃষ্ষকে কি করে রক্ষা করবে নরেন্দ্র! কি করে অন্ধকার থেকে নিয়ে 
আসবে বাইরে । নরেন একাই একশো । একাই আবৃত করে রাখবে । বালিম্ঠবাহু 
পুত্র যেমন পিতাকে বেস্টন করে রাখে । কারু সাধ্য নেই রামকৃষের ছায়া মাড়ায়। 
রামকৃষের সমাধ ভাঙল। চার পাশে তাকালেন অন্ধকারে । কই, তুই আছিস ? 
আয়, আমাকে ধর। তোকে দেখতে চলে এসেছি কতদূর! 

হাত ধরে রামকুষকে বাইরে নিয়ে এল নরেন। পিছনের দরজা 'দয়ে। অন্ধকার 
ঠেলে-ছেলে। একটা গাঁড় ডাকালো। চলো দাঁক্ষণেশবরে। 

পথে ঠাকুরকে বকতে লাগলো নরেন। 'কেন আপাঁন এসোছিলেন এখানে ?' 

তুই জানিস না কেন এসোৌছিলাম £ সুখাঁস্মতমুখে ভাকিয়ে রইলেন ঠাকুর। 
'সেজন্যে এখানে আপনি আসবেন, এই ব্রাহমসমাজে ; এখানে ওরা আপনাকে 
সম্মান দেখাল, না, অভ্যর্থনা করল? ঘর অন্ধকার করে পালিয়ে গেল সকলে। 
আমার জন্যে আপনি কেন এ অপমান নিতে এলেন; আপনার অপমানে আমার 
বুক ফেটে যাচ্ছে__ 

অপমান! ঠাকুরের মুখপদ্মের প্রসন্নাভা এতটুকু চ্লান হল না। 

'অপমান ছাড়া আবার 'কি। ওরা আপনাকে বোঝে না, বোঝবার ওদের সাধযও 
নেই-ওদের এখানে আসবার আপনার কা দরকার! আমাকে ভালোবাসেন বলে 
আপনার সমস্ত কান্ডজ্জান খোয়াতে হবে 2, 

যা খুশি তাই বল। তোর কথায় কে কান দেয়! তোর কথা আর লই না। তোর 
দেখা পেয়েছি, তুই আমাকে গাঁড় করে দাঁক্ষিণেশ্বরে পেশছে দিতে যাচ্ছিস এই 
ঢের। নইলে কে কোথায় কী অনাদর বা উপেক্ষা করল তাতে আমার বয়ে গেল। 
'ভালোবাসেন বাসুন, কিন্তু নিজের দিকে খেয়াল রাখেন না কেন2, 

ওরে ভালোবাসায় কি নিজের দিকে খেয়াল থাকে £ 'ভালোবাসা যে আত্মনাশশ। 
কন্তু এই ভালোবাসার পারত কিঃ শেষে ভরত রাজার মতন আপনার না 
দশা হয়! ভরত রাজা হরিণ ভাবতে-ভাবতে হরিণ হয়ে জল্মোছিল, আপনারো না 
শেষ পযন্ত 

ঠাকুরের মূখে হঠাৎ চিন্তার ঘোর লাগল। বললেন, 'তুই একেকটা এমন কথা বাঁলস 
যে বিষম ভাবনা ধরে যায়।' 

“আমি ঠিকই বলি।, 


৯৭৩ 


“তাই তো রে, তাহলে কী হবে! আম যে তোকে না দেখে থাকতে পার না। 
আমায় তবে উপায় বলে দে।' 

তবু ভালোবাসায় মান্রা টানতে পারবেন না ঠাকুর। মন্দা পড়তে দেবেন ন্‌ 
জোয়ারে। শেষকালে দাক্ষিণে*্বরে পেশছে মা'র দুয়ারে এসে হাজির হলেন। 
নরেনকে কেন এত ভালোবাস ? কেন ওকে দেখবার জন্যে চোখ দুটো ক্ষয় হয়ে 
যায়? ও আমার কে? হাসতে-হাসতে ফিরে এলেন মান্দর থেকে । বললেন, 'যা 
শালা, তোর কথা আর লই না। মা সব বলে দিলেন, বাঁঝয়ে দিলেন-_ 

“কী বলে দিলেন ?' 

'বলে দিলেন তুই ওকে সাক্ষাৎ নারায়ণ বলে জানিস, তাই অত ভালোবাসিস। 
যোঁদন ওর মধ্যে নারায়ণকে দেখতে পাঁবনে সোঁদন ওর মুখদর্শন তোর অসহ্য 
হবে?" প্রসন্ন আস্য প্রেমে তরল হয়ে এল। 'আমার ভরত রাজার মত দশা হবে 
বলতে চাস? নারায়ণ ভেবে নারায়ণকে ভালোবেসে যে পাড় জমাতে পারে তার 
আর পারাবারের ভয় কি।' সেই ভালোবাসার কাছে নরেন দাঁড়য়ে রইল অসহায়ের 
মত। আত্মীবস্মৃতের মত। 

'ভগবান শ্রীকৃষ জন্মেছিলেন কনা জান না, বৃদ্ধ চৈতন্য প্রভাতি একঘেয়ে, 
1শবানন্দকে বিবেকানন্দ চিঠি লিখছেন আমোরকা থেকে : রামকৃষ্ণ পরমহংস দি 
লেটেস্ট এ্যান্ড দি মোস্ট পারফেই- জ্ঞান প্রেম বৈরাগ্য লোকাঁহতাঁচকীর্ধা উদারতায় 
জমাট-কারু সঙ্গে কি তাঁর তুলনা হয়ঃ তাঁকে যে বুঝতে পারে না তার জন্ম 
বৃথা। আমি তাঁর জল্ম-জন্মান্তরের দাস, এই আমার পরম ভাগ্য, তাঁর একটা 
কথা বেদবেদান্ত অপেক্ষা অনেক বড়। তস্য দাস-দাস-দাসোহহং। তবে একঘেয়ে 
গোঁড়াম দ্বারা তাঁর ভাবের ব্যাঘাত হয়_এই জন্য চাঁট। বরং তাঁর নাম ডুবে যাক 
তাঁর উপদেশ ফলবান হোক । তান কি নামের দাস 2... 





জযাড়গাঁড় করে কারা আসছে দাঁক্ষণেশ্বরে। বারান্দায় দাঁড়য়ে ছিল রাখাল। 
সহজেই চিনতে পারল। কলকাতার এক নামজাদা বড়লোক 
রামকৃষেরও চোখ পড়েছে । যেমনি দেখা অমাঁন জড়সড় হয়ে পালিয়ে গেলেন ঘরের 


মধ্যে। অচেনা আগল্তুক দেখে শিশু যেমন ভয়ে পালায়। 
১৪৪ 


এ কি হল? রাখালও িছু-পিছু ঘরে ঢুকল। 

যা, যা, শিগাগর যা। ওরা এখানে আসতে চাইলে বালস এখন দেখা হবে না।' 
এমনতরো তো কোনো দিন হয় না। অর্থ তো কোনো দন ফিরে যায় না বার্থ 
হয়ে। 

অবাক মানল রাখাল। বাইরে এসে জিগ্গেস করলে অভ্যাগতদের : শক চাই ?" 
এখানে একজন সাধু আছেন না? তাঁকে চাই।' 

ক দরকার ?' 

'আমার আত্মীয়ের থাক-যাক অসুখ । কিছুতেই সুরাহা হচ্ছে না। উনি দয়া করে 
যাঁদ কোনো ওষুধ-টোষূধ দেন-_” 

এতক্ষণে বুঝল রাখাল। কিন্তু অন্তরের ভাবাঁট কি করে বোঝেন ঠিক অন্তরযামী 
তা কে বলবে! 

উনি ওষুধ দেন না। আপনারা ভুল শুনেছেন” 

এক দিন আরেক জন বড়লোক এসোছিল। আমায় বলে, মশায়, এই মোকদ্দমাটি 
কিসে জিত হয় আপনার করে দিতে হবে। আপনার নাম শুনে এসেছি। আম 
বললুম, বাপ, সে আমি নই- তোমার ভুল হয়েছে। 

বলছেন রামকৃষ্ণ: 'যার ঠিক-ঠিক ঈশ্বরে ভান্ত হয়েছে, সে শরীর, টাকা -এ সব 
গ্রাহ্য করে না। সে ভাবে, দেহসুখের জন্যে কি লোকমানোর জন্যে কি টাকার 
জন্যে আবার জপ-তপ কি! জপ-তপ ঈশ্বরের জনে ।' 

বলে, দুদক রাখব! দু'আনা মদ খেলে মানৃষ দুদক রাখতে চায়। কিন্তু খুব 
মদ খেলে রাখা যায় দুদক ? 

তেমান ঈশ্বরের আনন্দ পেলে আর কিছুই ভালো লাগে না। কামকাণ্চনের কথা 
যেন বুকে বাজে। শাল পেলে আর বনাত ভালো লাগে না। রামকৃষ্ণ কীর্তনের 
সুরে গান গেয়ে উঠলেন। “আন লোকের আন কথা ভালো তো লাগে না তখন 
ঈবরের জন্যই মাতোয়ারা। আর সব আলুনি, পানসে। 

ব্রলোক্য বললে, "সংসারে থাকতে গেলে টাকাও তো চাই, সপ্টয়ও চাই। পাঁচটা 
দানধ্যান__, 

'আগে টাকা সণ্টয় করে নিয়ে তবে ঈশ্বর 2" রামকৃষ। ঝলসে উঠলেন : “আর, দান- 
ধ্যানই বা কত! নিজের মেয়ের বিয়েতে হাজার-হাজার টাকা খরচ, আর পাশের 
বাঁড়তে খেতে পাচ্ছে না। তাদের দুটি চাল দিতে কষ্ট হয়। 'দতে-ুতে হিসেব 
কত! ও শালারা মরূক আর বাঁচুক_আঁম আর আমার বাড়ির সকলে ভালো 
থাকলেই হল। মূখে বলে সর্বজীবে দয়া! 

জশবে দয়া! জশবে দয়া! দূর শালা! কণঁটানুকীট-তুই জ্ঞীবকে দয়া করবি? 
দয়া করবার তুই কে? তোর স্পর্ধা কিসের? তুই কিসে এত আত্মজ্ভরী ? 
সোঁদন ঠাকুর তাই ধমকে উঠোঁছলেন নরেন্দ্রকে। বল, জাঁবে দয়া নয়, জীবে শ্রদ্ধা, 
জীবে প্রেম, জগবে সেবা । শিবজ্ঞানে জাঁবের বন্দনা । 

দয়ার মধ্যে একট. উচ্চু-নিচুর ভাব আছে। আমি দয়াল, আম উপরে দাঁড়য়ে; 


১৪৫ 


তুমি দয়ার ভিখারী, তুমি নিম্নাসীন। এ অসাম্য সহ্য হল না রামকৃষের। তিনি 
সবন্ধ নরায়িত নারায়ণ দেখলেন। দেখলেন আশ্চর্য সৌষাম্য। সব এক, সব সমান, 
সব বিভন্ত হয়েও অবীচ্ছন্ন। প্রত্যেককে দাঁড় করিয়ে দিলেন একটি শ্যামল 
সমভূমিতে- যার পোশাকী নামটি ভূমা, আর চলাত নামাট ভালোবাসা । 

এই রামকৃষণের সাম্যবাদ। সকলে আমরা অমৃতস্য প্রা আনন্দময়ীর ছেলে, 
রামপ্রসাদের ভাষায়, ব্রহমময়ীর বেটা । এক বাপের সমাংশভাক বংশধর । আধিকারের 
স্তরভেদ নেই, আমাদের মধ্যে শুধু প্রেমের সমানম্লোত। 

বনের বেদান্তকে ঘরে নিয়ে এলেন রামকৃষ্ণ। একেই বললেন, 'অদ্বৈতজ্ঞান আঁচলে 
বেধে কাজ করা।' একেই বললেন, নিরাকার থেকে আবার সাকারে চলে আসা। 
এবার সাত্যকারের সাকার। মানুষের মধ্যে ঈশ্বরকে স্বীকার করা, আবিম্কার করা, 
অভ্যর্থনা করা। 

নরেনের তৃতীয় নয়ন আবার উদ্দীপ্ত হল। দেখল সর্বত্র অভেদ। পশ্ডিত-মুখ, 
ধনী-দরিদ্র, ব্রাহমণ-চণ্ডভাল সকলে একই পরমপ্রকাশের খণ্ড মার্ত। প্রত্যহের 
তুচ্ছতার মধ্যে সে আচ্ছন্ন হয়ে আছে, তাকে মুস্ত করে যুস্ত করে দিতে হবে সে 
সর্বভাসকের সঙ্গে । দিতে হবে তাকে তার সুমহান আঁধকারের সংবাদ। তার 
অন্তরের 'নভূত গুহা থেকে জাগাতে হবে সে প্রসূগ্ত কেশরী। তার অনুভবের 
মধ্যে আনতে হবে তার আস্তত্বের পরমার্থের আস্বাদ। 

শুধ্‌ নিজে দেখলে চলবে না, দেখাতে হবে। শুধু নিজে চিনলে চলবে না, চেনাতে 
হবে। আম যাঁদ একা জেগে উঠে দোখ আর-সবাই তখনো ঘাময়ে রয়েছে, তখন 
আমার আকাশ-ভরা প্রভাত-আলোর আনন্দ কইঃ 

ছন্ন কথার খেই ধরল প্রৈলোক্য। বললে, 'সংসারে তো ভালো লোকও আছে। 
চৈতন্যদেবের ভভ্ত পুণ্ডরীক বিদ্যানাধ, তিনি তো সংসারে ছিলেন-_ 

'তার গলা পর্যন্ত মদ খাওয়া ছিল।' বললেন রামকৃষ্ণ, 'যাঁদ আর একটু খেত, 
সংসার করতে পারত না।' 

“তা হলে সংসারে কি ধর্ম হবে না?" 

'হবে। যাঁদ ভগবানকে লাভ করে থাকতে পারো। তখন কলহ্ক-সাগরে ভাসো, 
কলভ্ক না লাগে গায়। তখন পাঁকাল মাছের মতো থাকো। ঈশবরলাভের পর যে 
সংসার সে বিদ্যার সংসার। তাতে কাঁমনীকাণ্ুন নেই, শুধু ভন্ত আর ভগবান। 
এই আমার দিকেই দেখ না। আমারও মাগ আছে, ঘরে-ঘরে ঘাঁট-বাঁটও আছে-_ 
হরে প্যালাদের খাইয়েও দিই, আবার যখন হাবীর মা এরা আসে এদের জন্যেও 
ভাঁব।' 

চৈতন্যলাভের পর সংসারে গিয়ে থাকো । যাঁদ অনেক পারশ্রমের পর কেউ সোনা 
পায়, তা বাক্সের মধ্যেই রাখো বা মাটির নিচেই রাখো, সোনার কিছুই হয় না। 
কাঁচা মনকে সংসারে রাখতে গেলেই মন মাঁলন হয়ে যায়। দুধে-জলে একসঙ্গে 
রাখলেই যায় সব একাকার হয়ে। দুধকে মল্থন করে মাখন তুলে জলের উপর 
রাখলে আর গোল থাকে না, ভাসে । 

১৭৬ 


কাগজে তেল লাগলে তাতে আর লেখা চলে না। তবে যাঁদ বেশ করেখাঁড় 
'দয়ে ঘষে নস, লেখা ফুটবে । তেমনি কামকাণ্নের দাগ-ধরা জীবনে সাধন করতে 
হলে ত্যাগের খাঁড় ঘর্ষণ করো। 

শশধর পশ্ডিতকে দেখতে যাবেন রামকৃ্ণ। অত বড় পণ্ডিত, অথচ এক শীবন্দু 
ভয় নেই কাছে ঘে'ষতে। আমার কি! আমার তো বাজনার বোল মুখস্ত বলা নয়, 
হাতে বাজানো । ওরা শন্ধদ জল তোলপাড় করে, আর আম অতলতলে ডুব 
ধদই। 

ওরে নরেন, তুই সঙ্গে চল। মন্দ কি, পাঁণ্ডতদের সঙ্গে দর্শনচর্চা করে আসাঁব। 
কিন্তু, দেখা হলে শশধর পণ্ডিত কী বললে? বললে, 'দর্শনচর্চা করে হৃদয় 
শুকিয়ে গিয়েছে । দয়া করে আমায় এক বিন্দ্‌ ভন্তি দিন 

ন্তানের খররোদ্রে দগ্ধ হয়ে গেলাম, দাও এবার একটু ভান্তর বিষাদ-মেঘ, 
ভালোবাসার অশ্রাবন্দদ। তোমার জন্যে শুধু সেজে-গুজে সুখ নেই, তোমার 
জন্যে কেদে আনন্দ। আমি তোমার রাজরানি হতে চাই না, আম তোমার 
কাঙালিনী হব। 

রামকৃফ শশধরের বুকে হাত ব্বালয়ে দিলেন। তৃষ্ণা মিটল শশধরের। দীপ্ত চোখ 
অশ্রুতে ছলছল করে উঠল। 

রামকৃফেরও 'পপাসা পেল হঠাৎ। বললেন, জল খাব। 

গৃহস্থ যাঁদ নিজের থেকে কিছ না-ও দেয়, তবু সাধু-সম্বেসী চেয়ে নিয়ে কিছ 
খেয়ে আসবে । আর কিছ না হোক, অন্তত এক গলাশ জল। নইলে অকল্যাণ 
হয় গৃহস্থের। 

আর সকলের হোক বা না হোক, রামকৃষের ভূল হয় না। 

তিলক-কণ্ঠীধারী এক ভন্ত শুদ্ধ ভাবে জল নিয়ে এল। কিন্তু মুখের কাছে লাশ 
তুলে ধরতেই, এ কী হল হঠাং? রামকৃষ্ণ গ্লাশ নামিয়ে রাখলেন। তাঁর কণ্ঠনালশ 
আড়ষ্ট, বিশুজ্ক হয়ে গিয়েছে । এক ফোঁটা জল গলবে না ভিতরে। 

পলাশের জলে কূটোকাটা পড়েছে বোধ হয়। তাই বোধ হয় আপান্ত করলেন খেতে। 
প্লাশের জল ফেলে দল নরেন। আরেক গ্লাশ জল এনে দিল আরেক জন। 
এবার সে জল স্বচ্ছন্দে পান করলেন রামকৃষ্ণ । সন্দেহ নেই, আগের লাশে ময়লা 
ছিল বলেই সেটা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। 

কিন্তু নরেনের মন মানতে চাইল না কিছুতেই । "নিশ্চয়ই গভীর আর কোনো 
রহস্য আছে। ঠাকুরকে একাই পাঠিয়ে দিলে গাঁড়তে করে। বললে, আমার বিশেষ 
কাজ আছে। পরে যাব। 

বিশেষ কাজ নয় তো কি! সব দিক থেকে যাচিয়ে-বাজিয়ে 'নিতে হবে ঠাকুরকে । 
সব কিছুর জানতে হবে হাট-হদ্দ। কেন উনি & ভন্তের হাতের জল খেলেন না? 
1ঠতলক-কণ্ঠশধারণকে প্রশ্ন করা যায় না সরাসার। তার ছোট ভাইকে পাকড়াও 
করলে। ভাগ্যক্রমে তার সঙ্গে আগে থেকে আলাপ ছিল নরেনের। জিজ্ঞাসা করলে, 
ব্যাপার ফি হে তোমার দাদাঁটির ? বাল, স্বভাবচরিঘর কেমন? 


৯২ (৬৮) ১৭৩ 


মাথা চুলকোলো ছোট ভাই । বললে, দাদার কথা কি করে বাল ছোট হয়ে? 
নিমেষে বুঝে নিল নরেন। কিন্তু ঠাকুর বুঝলেন কি করে? তান কি অল্তর্যামী 
অল্তরজ্ঞ? 

আবার গেরুয়া কেনঃ একটা কি পরলেই হল? রামকৃষ্ণ রাঁসকতা করলেন, 
'একজন বলোছিল চণ্ডী ছেড়ে হলুম ঢাকী। আগে চণ্ডীর গান গাইতো, এখন 
ঢাক বাজায়।' 

সংসারের জবালায় জহলে গেরুয়া পরেছে সে বৈরাগ্য বেশি দিন টেকে না। 
হয়তো কাজ নেই, গেরুয়া পরে কাশী চলে গেল। তিন মাস পরে ঘরে চাঠ 
এল, আমার একটি কাজ হয়েছে, কিছ 'দিন পরেই বাঁড় 'ফিরব, ভেবো না আমার 
জন্যে। আবার সব আছে, কোনো অভাব নেই, কিন্তু কিছুই ভালো লাগে না। 
ভগবানের জন্যে একা-একা কাঁদে । সে বৈরাগ্যই আসল বৈরাগ্য। 

মন যাঁদ ভেকের মত না হয়, ক্রমে সর্বনাশ হয়। তার চেয়ে শাদা কাপড় ভালো। 
মনে আসান্ত, আর বাইরে গেরুয়া! কী ভয়ঙ্কর! 

ভগ্রবতী ঝি এসে দূর থেকে প্রণাম করল ঠাকুরকে । অনেক দিনের ঝি। বাবুদের 
বাড়তে কাজ করে। ঠাকুরের জানাশোনা । 

প্রথম বয়সে স্বভাব ভালো ছিল না। 'িন্তু তাই বলে ঠাকুর তাঁর করুণার সুগন্ধ 
বারর ধারাট শুকিয়ে ফেলেননি। দিচ্ছেন তাকে তাঁর আময় বচনের আশীর্বাদ । 
বললেন, “ক রে, এখন তো ঢের বয়েস হয়েছে। টাকা যা রোজগার করাল, সাধৃ- 
বৈষবদের খাওয়াচ্ছিস তো? 

'তা আর কি করে বলব ?' অল্প একটু হাসল ভগবত । 
'কাশী-বন্দাবন- এ সব হয়েছে? 

'তা আর কি করে বলব ?' কুশ্ঠিত হবার ভান করল ভগগবতা : 'একটা ঘাট বাঁধিয়ে 
দিয়োছি। তাতে পাথরে আমার নাম লেখা আছে।' 

'বাঁলস কি রে?' 

হ্যাঁ, নাম লেখা আছে শ্রীমতী ভগবতশ দাসী ।' 

আনন্দে হাসলেন রামকৃষ্ণ । বললেন, 'বেশ, বেশ ।' 

কি মনে ভাবল ভগবতাঁ, হঠাৎ ঠাকুরের পা ছঠয়ে প্রণাম করলে। 

যেন একটা ছে কামড়েছে, যল্রণায় এমনি আঁস্থর হয়ে পড়লেন ঠাকুর। ছোট 
খাটাটতে বসে ছিলেন, ঝটকা মেরে দাঁড়য়ে পড়লেন। মুখে শুধু, "গোবিন্দ, 
'গোঁবন্দ'। কী যেন একটা অঘটন ঘটে গেল মুহূর্তে। অসহন আর্তির দৃশ্য। 
িশুঅঙ্গে কে যেন তপ্ত অঙ্গার ছংড়ে মেরেছে। 

ঘরের যে কোণে গরঙ্গাজলের জালা, সোঁদকে হাঁপাতে-হাঁপাতে ছুটলেন ঠাকুর। 
পায়ের যেখানে ভগবত ছঃয়োছল সেখানে ঢালতে লাগলেন গঞ্গাজল। 
জীবল্মৃতার মত বসে আছে ভগবতা। সাড় নেই স্পন্দ নেই, দহনের পর দেহের 
ভস্মরেখা। জীবনে অনেক সে পাপ করেছে, কিন্তু এ পাপের বোধ হয় তুলনা 
নেই। 


৯১৭৬ 


যত তোমার পাপ করবার ক্ষমতা, তার চেয়ে ভগবানের বেশি ক্ষমতা ক্ষমা করবার। 
পাঁততপাবন করুণাসিম্ধ, তাই আবার অমৃতবচন বিতরণ করলেন। 

বললেন, 'বেশ তো গোড়ার দূর থেকে প্রণাম করোছিলি। কেন 'মাছামাছ পা ছঠতে 
যাস? 

যাক গে। তাই বলে মন-খারাপ করিস নে। গা-হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে এতক্ষণে। 
শোন, একটু গান শোর্ন। গান শুনলে তুইও ঠাণ্ডা হবি। 

ঠাকুর গান ধরলেন। 

দুর্গাপূজার দিন মঠে বহ7 লোক সেবার প্রণাম করছে শ্্রীমাকে। প্রণামের পর 
বারে-বারে গঙ্গাজলে পা ধুচ্ছেন শ্রীমা। যোগেন-মা বললেন, 'মা, ও কি হচ্ছে? 
সার্দ করে বসবে যে।' 

'যোগেন, কি বলব! এক-একজন প্রণাম করে যেন গা জুড়োয়, আবার এক-একজন 
প্রণাম করে যেন গায়ে আগ্দন ঢেলে দেয়। গঞ্গাজলে না ধুলে বাঁচনে।' 

তোমার পা ছোঁবার সুযোগ দাওনি। তাই দূর থেকেই তোমাকে প্রণাম করাছ। 
তাতেও যাঁদ পাপস্পর্শের জবালা লাগে, গঞ্গাজল কোথায় পাব মা, আমার অশ্রুজলে 
ধুয়ে নিয়ো পাদপদ্ম। 

ভবতারিণীর মান্দিরে 'গিয়ে ভাবাবস্থায় কথা বলছেন ঠাকুর, 'করাঁছস কি? এত 
লোকের ভিড় কি আনতে হয়ঃ নাইবার-খাবার সময় নেই। গলা তো ভাঙা 
ঢাক। এত করে বাজালে কোন দিন ফুটো হয়ে যাবে যে। তখন কা করাব? 
তবু ভিড়ের কমাত নেই। ভন্তের দল যেমন আসছে তেমনি আসছে আবার ভণ্ডের 
দল। 

'অমন সব আদাড়ে লোকদের এখানে আনিস কেন?' এক 'দন সরাসাঁর জগদম্বার 
সঙ্গে ঝগড়া করছেন রামকৃঞ্ণ। 'আঁম অতশত পারব না। এক সের দুধে পাঁচ 
সের জল- জহাল ঠেলতে-ঠেলতে ধোঁয়ায় চোখ জবলে গেল। তোর ইচ্ছে হয় তৃই 
দগে যা। আমি অত জবাল ঠেলতে পারব না। অমন সব লোকদের আর 
আ'নিসনি।, 

সাধুর মধ্যেও ভণ্ডের ছড়াছড়ি । 

'ষে সাধ্‌ ওষুধ দেয়, ঝাড়ফঠক করে, টাকা নেয়, বিভূতি-তিলকের আড়ম্বর করে, 
খড়ম পায়ে দিয়ে যেন সাইনবোট মেরে নিজেকে জাহির করে বেড়ায়, তার থেকে 
কিছু 'নাবনে। 

শুধু ভান্ত খজে বেড়াব। অহেতুক ভান্ত। নারদঁয় ভান্ত। ভাঁন্তর আঁম-র অহঙ্কার 
নেই। এ আমি আমির মধ্যেই নয়। যেমন হিণ্েে শাক শাকের মধ্য নয়। অন্য 
শাকে অস্‌খ করে, 'হিণ্েে শাকে পিত্ত যায়। মিছরি মিম্টর মধ নয়। অন্য মিন্টিতে 
অপকার, মিছার খেলে অম্বল নাশ হয়। ভান্ত অজ্ঞান করে না, বরং ঈশ্বর লাভ 
কাঁরয়ে দেয়। 

আমার শান্ত নেই, আসান্তও নেই। শুধু ভান্ত নিয়ে বসে আছি এক কোণে। 
মধুৃস্নগ্ধ পদ্ম যদি ফোটে, শুনতে পাব সে ভৃ্গের গঞ্জরণ। 





আচ্ছা, রসিক মেথর কি কোনোঁদন পা ছ;য়ে প্রণাম করেছিল ঠাকুরকে? যাঁদ বা 
করোছিল, গায়ে কি জ্বালা ধরোছিল ঠাকুরের ? যেমন হয়েছিল ভগবতার বেলায় : 
ময়লা পরিচ্কার করে বলে রাঁসকও কি ময়লা ? 

কে বলে! মেথররূপী নারায়ণ। ঝাড় অস্পৃশ্য বটে, 'িল্তু ঝাড়ুদার অস্পৃশ্য নয়। 
পা ছযয়ে প্রণাম করেছিল কিনা জানা নেই, কিন্তু ঠাকুর একাঁদন সটান রাঁসকের 
বাড়তে 'গিয়ে উপাস্থত। শরীরে না হোক, মনে-মনে। 

বলছেন ঈশান মুখুচ্জেকে, ধ্যান করাছলাম। ধ্যান করতে-করতে মন চলে গেল 
রসকের বাঁড়। রসকে ম্যাথর। মনকে বললমম, থাক শালা, এখানেই থাক । মা 
দেখিয়ে দিলেন, ওর বাঁড়র লোকজন সব বেড়াচ্ছে, খোল মান্র, ভিতরে সেই এক 
কুলকুণ্ডাঁলনণী, এক ষটটক্।' 

রাঁতর মাকে চেনো তো? লালাবাবুর রানি কাত্যায়নীর মোসাহেব, গোঁড়া বৈফবাঁ। 
খুব আসা-যাওয়া করে দক্ষিণে*বরে। ভান্ত দেখে কে। কিন্তু যেই রামকৃষকে দেখল 
মা-কালার প্রসাদ খেতে, অমনি পালালো । 

কী আশ্চর্য, সেই রাঁতর মা'র বেশেই মা-কালী দেখা দিলেন একাঁদন। যা শান্ত 
তাই বৈষবী। বললেন, তুই ভাব নিয়েই থাক। 

কিন্তু আমার ভাব কি জানো? চোখ চাইলেই কি তান, আর নেই? আম 
নিত্য-লীলা দুইই লই। সব মতই সেই এককে নিয়ে। একঘেয়েকে নিয়ে নয়। 
তাই আম শান্তেও আছি, বৈষফবেও আছি, বেদেও আছি, বেদান্তেও আছি। রাম 
শিবকে পুজো করোছিলেন, শিব রামকে। কৃফ স্তব করেছিলেন কালকে, আবার 
কৃষই কালীর্প ধরেছিলেন। আম সব ঘটে আছি, সব সংঘটে। শুধু অকপট 
হলেই হল। আকারে যে অনাকারেও সে। কিম্বা বলো, সাকার-নিরাকার আমার 
বাপ-মা। বাপ নিগ্গণ মা গুণান্বিতা। কাকে নিন্দা করে কাকে বন্দনা করবে, দুই 
পাল্লায় সমান ভারি। 


পন্গণ মেরা বাপ সগ্‌ণ মাহতারি, 
কারে 'িন্দো কারে বন্দো, দোনো পাল্লা ভাঁর।, 


“যে সমন্বয় করেছে সেইই লোক ।' বললেন রামকৃফ। 
৯১৮০ 


যত মত তত পথ। কিন্তু পথটাই পেশছুনো নয়। মতেই না হয় মাতভ্রম। বাদ 
ভূল-পথেও যাও, ঘর-পথেও যাও, অন্তরে যদি অসরল না থাকে, তবে সে-পথও 
একাদন সোজা-পথ হয়ে যাবে। হবে ঠিক জগন্নাথদর্শন। 

যাত্রার লগ্নে লক্ষ্যাটি যাঁদ ঠিক থাকে, পথ যাই হোক, একদিন ঠিক হাত ধরবেন 
অন্ধকারে । ক্লান্ত হলে কোলে নেবেন। তাঁর হাতে শুধু 'হিত, পায়ে শুধু 
ছায়া। ঈশ্বর ক্ষীরের পৃতুল। হাত ভেঙে খেলেও মান্ট, পা ভেঙে খেলেও 
মিন্টি। 

এই একমান্র আসল, যার আসল ভেঙে খেলেও সুদ বাড়ে। 

কলকাতায়, পাথুরেঘাটায় যদ মাল্লকের বাঁড় যাচ্ছেন ঠাকুর। কিন্তু গাঁড়র যোগাড় 
হয় কোথেকে ? 

বরানগরের বেণী সা ভাড়ায় গাঁড় খাটায়। কথা আছে, ঠাকুর বলে পাঠালেই 
দক্ষিণেশ্বরে গাঁড় আসবে । আর, কলকাতা থেকে ফিরতে যত রাতই হোক না, 
গাড়োয়ান গোলমাল করতে পাবে না। যত বোঁশ টাইম তত বোঁশ ভাড়া । আগে 
রসদদার ছিল মথুর, পরে পেনোটর মাঁণ সেন, শেষে শম্ভু মাল্লক, এখন সিশ্দুরে- 
পঁটির জয়গোপাল। তবে যার বাঁড়তে যাওয়া, সেই 'দয়ে দেয় গাঁড়ভাড়া। 

কিন্তু যদ মল্লিক যা কৃপণ। বরাদ্দ দু্টাকা চার আনার বৌশ গাঁড়ভাড়া দেবে 
না। ধিন্তু বেণী সা'র সঙ্গে বন্দোবস্ত হয়েছে ফিরতে যত রাতই হোক, তিন 
টাকা চার আনা দিলেই গাড়োয়ান আর গোলমাল করবে না। নইলে, দেরি হতে 
দেখলেই গাড়োয়ান কেবল চলো, চলো, করে দিক্‌ করে। কিন্তু গেলেই কি 
তক্ষনি-তক্ষুনি ফেরা যায়? যদুর মা এসেছে, সে কত ভালোবাসে, তার সঙ্গে 
দুটো কথা না কয়েই বা আসি কি করে? কিন্তু এখন বাড়াত টাকা একটা কে 
দেয়! 

একাঁদন যদুকে বললেন সরাসাঁর : হ্যাঁ হে, এত টাকা করেছ, এখনো টাকার লোভ 
গেল নাঃ' 

“দেখ ছোট ভটচাজ,' বললে যদ মল্লিক, 'ও লোভ যাবার নয়। তুমি যেমন ভগবানের 
লোভ ছাড়তে পারো না, তেমান বিষয়ী লোকও ছাড়তে পারে না টাকার লোভ । 
আর কেনই বা ছাড়বে? তুমি ভগবানের প্রেমের জন্যে পাগল, আমি তাঁর এ*বযেরি 
জন্যে পাগল! আচ্ছা, বলো 'দাঁকানি টাকা ক তাঁর এশবর্ঘ নয়?' 

ঠাকুরের মুখ আনন্দে উজ্জবল হয়ে উঠল। বললেন, 'যাঁদ এটা ঠিক বুঝে থাকো 
টাকাটা তোমার নিজের এশ্বর্য নয়, ভগবানের এঁশ্বর্য, তাহলে আর তোমার ভাবন! 
ণক গো! কিন্তু এ কথা তুমি সরল ভাবে বলছ, না, চালাক করে বলছ 

“সে কথা তুমিই জানো। তোমার কাছ থেকে কি মনের কথা লুকোনো যায়? 
িন্তু যাই বলো, ও সব মোসাহেবগুলোকে রেখেছ কেন 

ভন্দরলোকের ছেলে, ভিক্ষে করতে পারে না, কিছ; পাবার আশায় এখানে পড়ে 
থাকে । ওদের বাণণিত করলে ওরা যায় কোথায় 2: 

শকন্তু ওদের সঙ্গে মিশলে ক্ষতি হতে পারে।' 


১৮৯ 


“দেখ ছোট ভটচাজ, বিষয়-আশয় রাখতে গেলে অমন লোকের দরকার আছে।' 
আবার বিষয়-আশয় ! ৮ণটল হয়ে উঠলেন ঠাকুর। “সবই তো ইহকালের জন্যে সংগ্রহ 
করছ, ও পারের জন্যে কি যোগাড়যন্ল করলে ?, 

"ও পারের কাণ্ডারী তো তুমি। শেষের দিনে তুমি আমায় পার করবে সেই আশায়ই 
তো শেষ পধন্ত বসে থাকব । আমার উদ্ধার না করলে তোমার পাঁতিতপাবন নামে 
কাল পড়বে। 

চলো যদ মল্লিকের বাঁড়। 

তার মা ঠাকুরকে কাছে বসে খাওয়ান আর কাঁদেন। তাঁর বাৎসল্য-রস। 

গাঁড়তে উঠলেন ঠাকুর। সঙ্গে লাটু, হাতে ঠাকুরের বট;য়া আর গামছা । আর 
হয়তো অতুলকৃ্ণ, 'গিরীশ ঘোষের ভাই। কৌতৃহল? হয়ে এটা-ওটা দেখছেন ঠাকুর 
আর 'শিশুর মত 'জগগেস করছেন লাটুকে। 

বরানগরের বাজার ছাড়িয়ে চলেছেন এখন মাঁতাঁঝলের পাশ 'দিয়ে। ডাইনে একটা 
মদের দোকান, ডান্তারখানা, চালের আড়ত, ঘোড়ার আস্তাবল। তার দক্ষিণে সর্ব- 
মঙ্গলা আর 'ত্তে*্বরীর মান্দর। 

মদের দোকানে মদ খাচ্ছে মাতালেরা আর খুব হল্লা করছে। কেউ-কেউ বা গান 
ধরেছে স্ফৃর্তিতে। কেউ-কেউ বা বাঁচন্র অঞ্গভাঞ্গ করে নাচছে স্খালত পায়ে। 
সব চেয়ে মজার, দোকানের যে মালিক, সে নির্লিপ্ত হয়ে দুয়ার ধরে দাঁড়য়ে আছে 
বাইরে চেয়ে। দোকানের চাকর তদারক করছে বেচাকেনা । এ সবে মাঁলকের 
যেন আঁট নেই। কপালে মস্ত এক 'সিপ্দরের ফেটা কেটে দাঁড়য়ে আছে 
দোরগোড়ায়। 

যার জন্যে দাঁড়য়ে আছে সে বাঁঝ ঘরের সমুখ দিয়ে চলে যায়। আনমনে চলে 
যাবে। হয়তো একবার ভুলেও ভ্রুক্ষেপ করবে না। 

মদ-বেচা শখাঁড়, তার আবার আবদার! কিন্তু ঠাকুর তো মদ দেখেন না, ঠাকুর 
মন দেখেন। জীবকা দেখেন না, জীবন দেখেন। দোকানের মদের ভান্ড আমার 
পূর্ণ থাকতে পারে কিন্তু অন্তরে করুণার কুম্ভাট আমার শন্য। 

ঠাকুরকে দেখতে পেয়েই হাত তুলে প্রণাম করল দোকানি। ঠাকুরের চোখ পড়ল 
দোকানের 'দকে। তরল-অনল-উচ্ছল মাতালদের 'দকে। তাদের 'বিহবল মাতা- 
মাঁতর দিকে। এ ি! ঠাকুরও যে মুহূর্তে বিভোর হয়ে গেলেন নেশায়। তাঁর 
গা-হাত-পা টলতে লাগল, এড়িয়ে গেল কথা! এ কি! ঠাকুরও মদ খেয়েছেন নাক ? 
কখন খেলেন ? 

মদ দেখে কারণের কথা মনে পড়েছে ঠাকুরের__জ্বগৎকারণের কথা । কারণানন্দ দেখে 
মনে পড়েছে সচ্চিদানন্দকে। ঠাকুরও মদ খেয়েছেন, 'কল্তু এ মদের নাম হরিরস- 
মাদরা। এ মদের নাম সূরা নয় সুধা । এ মদ মদের চেয়েও দর্মদ। 

শুধূ তাই নয়, চলাতি গাঁড়র পা-দানিতে এক পা রেখে মাতালের মত নাচতে 
শুরু করলেন ঠাকুর। হাত নেড়ে-নেড়ে বলতে লাগলেন চেশচয়ে : 'বা, বেশ হচ্ছে, 
খুব হচ্ছে, বা, বা, বা! 

৯১৮৬২ 


এ ক, পড়ে যাবেন যে! চলতি গাঁড় থেকে রাস্তায় ছিটকে পড়লে কি আর রক্ষে 
অছে? প্রস্তব্যস্ত হয়ে অতুল ধরতে গেল ঠাকুরকে, হাত বাড়িয়ে টানতে গেল 
(ভিতরে । লাট্ বাধা দিয়ে বললে, “পড়ে যাবেন না, ভয় নেই। নিজে হতেই 
সামলাবেন_ 

আড়ম্ট হয়ে রইল অতুল। বুক িপ-ঢপ করতে লাগল । নিজে হতেই সামলাবেন! 
কে জানে । পড়ে গেলেই তো সর্বনাশ! আর নয়, পাগলা ঠাকুরের সঙ্গে আর কখনো 
যাব না এক গাঁড়তে। 'দব্যি সহজ মানুষের মত কথাবাত৭ বলাছলেন, হঠাৎ 
কোথাকার কতগুলো মাতাল দেখে মত্ত হয়ে গেলেন। এ কখনো শাানান। 

শুনিন তো ঠিক, কিন্তু দেখাঁছ স্বচক্ষে। কারণীভূতকে দেখে কারণশরণীরে 
অকারণ আনন্দ! 

গাঁড় ছাড়িয়ে গেল শ:াঁড়খানা। ঠাকুর 'স্থর হয়ে বসলেন এসে ভিওরে। স্বাভাবিক 
সহজ সুরে বললেন, এ সর্বমঙ্গলা। বড় জাগ্রত । প্রণাম করো।' নিজেই প্রণাম 
করলেন সর্বাগ্রে। 

মদ খেয়ে টং হয়েছে গিরীশ। এমন মাতাল, বেশ্যাও তখন দরজা খংলে দিতে 
নারাজ । হঠাৎ 'কি হল, দাঁক্ষিণে*্বরের কথা মনে পড়ে গেল আচমকা । একটা খোড়।র 
গাঁড় ডাকিয়ে নিয়ে উঠে বসল । চলো দক্ষিণে*বর। সেখানে এমন একজন আছেন 
যান দরজা কখনো বন্ধ করেন না। 

রাত নিশতি। মান্দরের ফটক কখন বন্ধ হয়ে গিয়েছে । সবাই ঘ্বাময়ে পড়েছে 
এতক্ষণে । 

তা হোক, তবু কোথাও যাঁদ জায়গ৷ থাকে, সে দাঁক্ষণেশবরে। ঝলকাতার উত্তরে, 
কিন্তু আসলে দক্ষিণ। 

যা ভেবোছল। ফটক বন্ধ। চার পাশ অন্ধকার । 'নিস্পন্দ। 

ধিল্তু যিনি ঘৃমোন না, আর্ত জনের অন্ধ জনের কানা শোনবার ভান্যে উত্কর্ণ 
হয়ে আছেন তাঁকে ডাকতে দোষ ক! 

'ঠাকুর! ঠাকুর! চীৎকার করে ডাকতে লাগল 'গিরীশ। 

কে, গিরীশ না? সেই নোটো নেচো গিরীশ! নির্জন নিঃসহায় অন্ধকারে মামাকে 
ডাকছে কাতর প্রাণে! আমি কি থাকতে পার স্থির হয়ে ? 

বাইরে বোরয়ে এলেন ঠাকুর। ফটক খোলালেন। মাতাল গিরীশের হাত ধরলেন 
আনন্দে। মদ খেয়েছিস তো কি, আমিও মদ খেয়েছি । সুরাপান করি নারে, 
সূধা খাই রে কুতৃহলে। আমারে মন-মাতালে মাতাল করে, মদ-মাতালে মাতাল 
বলে। বলে গ্রিরীশের হাত ধরে হরিনাম করতে-করতে নাচতে লাগলেন ঠাকুর । 
স্বভাব আর ছাড়তে পারে না গিরীশ। সে দিন আবার মাতাল হয়ে এসেছে 
গাড়িতে করে। 

ধক করেই বা ছাড়বে? গঞ্প করলেন ঠাকুর : 'বর্ধমানে দেখোছিলাম। একটা 
দাড়া গাই-গরুর কাছে যাচ্ছে। জিগগেস করলমম, এ কাঁ হল? তখন গাড়োয়ান 


বললে, মশায়, এ বোঁশ বয়সে দামড়া হয়েছিল। তাই আগেকার সংস্কার যায়নি। 
৮৩ 


একটা বাটিতে যাঁদ রশদন গোলা হয়, রশদনের গণ্ধ 'কি যায়? বাবুই গাছে কি 
আম হয়? 

ঠাকুরও তেমনি তাঁর স্বভাব ছাড়তে পারেন কই? তাঁর অযাচিত করুণার স্বভাব। 

ওরে গিরীশ এসেছে । নিজেই এগিয়ে গিয়ে আদর করে ধরে নিয়ে এলেন। মাতাল 
বলে প্রত্যাখ্যান করলেন না। 

লাটূকে বললেন, 'যা তো, দ্যাখ তো গাঁড়তে কিছু আছে 'কিনা ।' 

লাটু গিয়ে দেখে মদের বোতল পড়ে আছে। আর গ্লাশ আছে কাঁচের। ঠাকুরের 
হুকুম, নিয়ে চলল গ্লাশ-বোতল । ভন্তরা যারা দেখল হেসে উঠল। 

ঠাকুর বললেন, 'রেখে দে তোর কাছে। এখানে খোঁয়ার এলে তখন কোথায় পাব? 

মদের মধ্য দিয়েই ওর মাস্তি আসবে। শেষকালে আর মদ থাকবে না, থাকবে 
মাদকতা । ক্লোধ থাকবে না থাকবে তেজ। কাম থাকবে না থাকবে প্রেম। লোছ 
থাকবে না থাকবে ব্যকুলতার হাওয়া । 

গিরশশের চোখের 'দকে তাকিয়ে রইলেন ঠাকুর । রাঙা চোখ শাদা করে দিলেন। 

গিরীশ বললে, 'আমার আস্ত বোতলের নেশাটাই মাটি করে দিলে । 

'যাঁদ পাপ থেকে পারন্লাণ পাবই জানতুম,' গিরীশ আপশোষ করেছিল, তবে আরো 
ছু পাপ করে নিতুম শখ 'মাটয়ে।' 

সে বার লছমনঝোলায় শরৎ-মহারাজ আর হার-মহারাজ খুব ভাঙ খেয়েছে। নেশা 
করে শুধু ঠাকুরের কথাই কইতে লাগল। কইতে-কইতে চোখ শাদা হয়ে গেল, 
নেশার লেশমান্র রইল না। 

বাঁক রাতটূকু তোমার কথাই কইতে দাও। এই ব্যাঁধর রাত, বিকারের রাত কেটে 
যাক। তোমার কথায় জাগ্‌ক একবার সেই আরোগ্যের সঃপ্রভাত। 





'আমাকে বিদ্যাসাগরের কাছে নিয়ে যাবে ? মাস্টারমশাইকে জিগগেস করলেন ঠাকুর। 
'আমার দেখতে বড় সাধ হয়।' 

বিদ্যাসাগরের ইস্কুলে মাস্টার করেন, একদিন কথাটা পাড়লেন গিয়ে মাস্টারমশাই। 
বিদ্যাসাগর জিগগেস করলেন, 'কেমনতরো পরমহংস হে? গেরুয়া কাপড় পরে 
থাকেন নাকি? 

১৮৪ 


'না, লালপেড়ে কাপড় পরেন। গায়ে জামা, পায়ে বার্ণশ-করা চাঁটজনুতো। 
রাসমাঁণর কালাবাঁড়তে থাকেন একটি ঘরে, তন্তপোশের উপর সামান্য বিছানা, 
তাতেই শোন, মশারি খাটান। দেখতে অত্যন্ত শাদাসধে, কিন্তু এমন আশ্চর্য লোক 
আর দেখা যায় না। ঈ*বর ছাড়া আর কিছু জানেন না সংসারে ।" 
বটে? খাঁশ হয়ে উঠলেন বিদ্যাসাগর । বললেন, 'শানবার চারটের সময় নিয়ে এস' 
গাঁড় করে যাচ্ছেন রামকৃষ্ণ । সঙ্জে মাস্টার, ভবনাথ আর হাজরা। 
আহা, ভবনাথ কেমন সরল! বিয়ে করে এসে আমায় বলছে, আমার স্ত্রীর উপর 
এত স্নেহ হচ্ছে কেন? তা, স্তর উপর ভালোবাসা হবে না? এটিই জগতমাতার 
ভুবনমোহিনী মায়া। 
এই স্ত্রী নিয়ে মানুষ কী না দুঃখভোগ করছে। তবু মনে করে এমন আত্মীয় 
আর কেউ নেই। কুঁড় টাকা মাইনে-তিনটে ছেলে হয়েছে-তাদের ভালো করে 
খাওয়াবার শান্ত নেই, বাঁড়র ছাদ 'দয়ে জল পড়ছে, পয়সা নেই মেরামত করার--- 
ছেলের নতুন বই কিনে দিতে পারে না, ছেলের পৈতে দিতে পারে না-এর কাছে 
আট আনা ওর কাছে চার আনা 'ভিক্ষে করে-_ 
িদ্যারাপণণী স্ীই যথার্থ সহধার্মণী। এক হাতে সংসারের কাজ করে, আরেক 
হাতে স্বামীর হাত ধরে নিয়ে চলে ঈশ্বরের পথে। 
আর হাজরা ? 
অনেক জপতপ করে, মন পড়ে আছে বাড়তে, স্মী-ছেলে জম-জমার উপর । তাই 
ভিতরে-ভিতরে দালালিও করে। ট্াকাওয়ালা লোক দেখলে কাছে ডাকে, লম্বা-লম্বা 
কথা শোনায়, বলে, রাখাল-টাখাল যা সব দেখছ, জপতপ করতে পারে না, হো-হো 
করে ঘরে বেড়ায়। 
'যাঁদ কেউ পর্বতের গুহায় বাস করে, গায়ে ছাই মাখে, উপবাস করে, নানা কঠোর 
সাধনা করে, কিন্তু ভিতরে-ভিতরে বিষয়ে মন, কামকাণ্চনে মন, সে লোককে বাঁল 
ধিক। আর যার কামকাণ্চনে মন নেই, খায় দায় বেড়ায়, তাকে বাঁল ধন্য ।' 
পোল পার হয়ে শ্যামবাজার হয়ে আমহাস্ট স্ট্রিটে পড়েছে গাঁড়। এই বাদুড়- 
বাগানের কাছে এসে গেলাম । মুহূর্তে ভাবাবেশ হল রামকৃষফের। 
এই রামমোহন রায়ের বাগান-বাঁড়। 
রামকৃষ্ণ বিরন্ত হয়ে বললেন, এখন ও সব আর ভালো লাগছে না।' 
এখন শুধু বিদ্যাসাগর । 'বিদ্যা-_যা থেকে ভক্তি, দয়া, প্রেম, জ্ঞান-_ যা শুধু ঈশ্বরের 
পথে নিয়ে যায়। সেই বিদ্যার সমদূদ্র। 
দোতলা, ইংরেজ-পছন্দ বাঁড়। চারাদকে দেয়াল, পাঁশ্চম ধারে ফটক। পাঁচ 
থেকে নিচের ঘর পর্যন্ত ফুলের কেয়ার। বিদ্যাসাগর উপরে থাকেন। 'সিপড় 
দয়ে উঠেই উত্তরে একাটি কামরা, তার পুবে হল-ঘর। হল-ঘরের পুব প্রান্তে 
টেবিল-চেয়ার। সেইখানে পশ্চিমমুখো হয়ে বসে কাজ করেন বিদ্যাসাগর হলঘরের 
দাক্ষণে বিদ্যাসাগরের লাইব্রোর। সে আরেক বিরাট শব্দসমূদ্র। পাশেই নিরশহ 
শোবার-ঘর। 

১৮৫ 


মা গো, পাণ্ডতের সঙ্গে দেখা করতে চলোছ। আমার মুখ রাঁখস মা।, 

গাঁড় থেকে নামলেন রামকৃষ্ণ । গায়ে একটি লংক্রথের জামা, পরনে লালপেড়ে ধুতি, 
অঁচিলটি কাঁধের উপর ফেলা । পায়ে বার্ণিশ-করা চটি জুতো । উঠোন পোরয়ে 
যেতে-যেতে জিগগেস করলেন মাস্টারকে, 'জামার বোতাম খোলা রয়েছে, এতে ছু 
দোষ হবে না? 

'আপনার কিছুতে দোষ হবে না।' বললে মাস্টার। 'আপনার বোতাম দেবার 
দরকার নেই।' 

নশচন্ত হলেন ঠাকুর। বালককে বোঝালে যেমন নিশ্চিন্ত হয়, তেমান। 
হল-ঘরে না বসে উত্তরের কামরায় বসেছেন বিদ্যাসাগর । বয়স আন্দাজ বাধ । 
রামকৃষের থেকে ষোলো-সতেরো বছরের বড়। খর্বাকৃতি, মাথাটি প্রকাণ্ড, চার পাশ 
উঁড়য়াদের মতো কামানো । পরনে শাদা থান কাপড়, গায়ে হাত-কাটা ক্লানেলের 
জামা, গলার পৈতে দেখা যাচ্ছে, পায়ে ঠনঠনের চাঁট জুতো । বাঁধানো দাতিগ্লো 
ঝকঝক করছে। 

রামকৃষ্ণ ঘরে ঢুকতেই বিদ্যাসাগর উঠে দাঁড়য়ে অভ্যর্থনা করলেন। যে টেবিল 
সামনে রেখে দক্ষিণাস্য হয়ে বসে ছিলেন বিদ্যাসাগর, তার পুব পাশে এসে দাঁড়ালেন 
রামকৃষ্ণ। বাঁ হাতখাঁন টোৌবলের উপর। যেন সংলগ্ন হয়ে আছেন বিদ্যাসাগরে। 
একদস্টে তাঁকে দেখছেন আর হাসছেন ভাবাবেশে । ভাবাবেশ সংবরণ করবার জন্যে 
মাঝে-মাঝে বলছেন রামকৃষ্ণ, 'জল খাব।' 'জল খাব? 

দেখতে-দেখতে ভিড় হয়ে গেল ঘরের মধ্যে। পিছনে একটা 'িঠ-তোলা বো 
ছিল, তাতে বসলেন রামকুষ্ণ। সেখানে একটি ছেলে বসে। বিদ্যাসাগরের কাছে 
'ভিক্ষে করতে এসেছে, পড়াশোনার খরচ চলে না। তার থেকে সরে বসলেন ঠাকুর। 
বললেন, 'মা, এ ছেলের বড় সংসারাসাক্ক। তোমার আবদ্যার সংসার । এ আবদ্যার 
ছেলে ।' 

আর এ ছেলোঁট 2 সামনে-বসা আরেকাঁট ছেলেকে নির্দেশ করলেন বিদ্যাসাগর 
'এ ছেলেটি সং। যেন অন্তঃসার ফল্গু নদী । উপরে বালি, কিন্তু একট; খখড়লেই 
জল দেখতে পাবে ভিতরে ।' 

জল এসে গেল ভিতর থেকে । বিদ্যাসাগর মাস্টারকে জিগগেস করলেন, ধকছ? 
খাবার দিলে ইনি খাবেন কি?' 

“আজ্ঞে আনুন না।' বললে মাস্টার। 

বিদ্যাসাগর ব্যস্ত হয়ে ছুটে গেলেন বাঁড়র মধ্যে। একথালা 'মিন্ট নিয়ে এলেন। 
বললেন, 'এগ্যাল বর্ধমান থেকে এসেছে ।' 

মিন্টিমখ করলেন রামকৃফ। ভবনাথ আর হাজরাও কিছ? অংশ পেল। মাস্টারের 
বেলায় বিদ্যাসাগর বললেন, ও তো ঘরের ছেলে । ওর জন্যে আটকাবে না। 
সাগরে এসে মিললাম। এতাঁদন খাল বিল হৃদ নদী দেখোছ, এইবার সাগর 
দেখলুম! 

১৮৬ 


বিদ্যাসাগর হেসে জবাব 'দিলেন, "তবে নোনা জল খানিকটা 'নিয়ে যান।' 
নাগো! নোনা জল কেনঃ তুমি তো অবিদ্যার সাগর নও, তুমি যে বিদ্যার সাগর । 
তুমি যে ক্ষীরসমদদ্র। 

এক ঘর লোক। কেউ বসে কেউ দাঁড়য়ে। কথার রসগ্রহণ করে হাসছে সবাই। 
কিন্তু বিদ্যাসাগর চুপ। 

'তোমার কর্ম সাত্বক কর্ম।' বলছেন রামকৃষ্ণ, 'সত্গুণ হয় দয়া থেকে। শৃকদেবাঁদ 
লোকশিক্ষার জন্যে দয়া রেখোছলেন। তোমার 'বদ্যাদান অন্নদান-_ সেও এ দয়া 
থেকে। নিন্কাম হয়ে করতে পারলে এতেই ভগবান-লাভ। কেউ করে নামের জন্যে, 
পুণ্যের জন্যে, তাদের কর্ম নিজ্কাম নয়। আর তোমার হচ্ছে দয়ার থেকে, দয়ার 
জন্যে। তাই তুমি তো সিদ্ধ গো! 

'আম সিদ্ধ?" চমকে উঠলেন বিদ্যাসাগর । 'আমি আবার ভগবানের জন্যে সাধন 
করলুম কবে?" রামকৃফ্ণ হাসলেন । বললেন, 'আলু-পটল সদ্ধ হলে কা হয়ঃ 
নরম হয়। তুমিও তো তেমাঁন নরম হয়ে গেছ । পরের দুঃখে তোমার হৃদয় দ্বুবীভূত 
হয়েছে। তোমার এত দয়া, তুমি নও তো আর কে সিদ্ধ 2" 

ণশবনাথের কোলে একাঁট সাত-আট বছরের মেয়ে। 'শবনাথ তখন আছে বন্ধু 
যোগেনের সঙ্গে । যোগেন ছ্বিতীয়পক্ষে একটি বিধবা মেয়েকে বিয়ে করে 
সমাজপরিত্যন্ত হয়ে বাস করছে নিরালায়। একটা হিন্দু চাকর পর্যন্ত জে।টোন। 
থাকবার মধ্যে আছে সতীর্থ বন্ধু শিবনাথ আর মহাপ্রাণ অধাক্ষ বিদ্যাসাগর 
বিদ্যাসাগরই পুরোত যোগাড় করে দিয়েছেন বিয়ের, নিমল্ল্িতদের খাওয়াবার খরচ 
দিয়েছেন, নববধূকে দিয়েছেন মূল্যবান উপহার । 

যোগেনের বাড়িতে প্রায়ই আসেন বিদ্যানাগর। মজার-মজার গল্প বলে হাঁসিয়ে 
যান সবাইকে । বিষাদভার লাঘব করেন। কঠোর ব্রতোদযাপনের প্রাতিজ্ঞাতে ধার 
যোগান। সে দিন এসে দেখেন, 'িবনাথের কোলে সুশ্রী একটি মেয়ে। 

'কে এই মেয়ে? 

'নাপিতদের মেয়ে। আমাদের পাড়াতেই থাকে । দাদা বলে আমাকে ।' 

বা, বেশ মেয়োট তোট' একটু আদর করতে হাত বাড়ালেন বিদ্যাসাগর । 

ণকন্তু জানেন কি? কণ্ঠ প্রায় রুদ্ধ হয়ে এল 'শিবনাথের : "ও বিধবা ।' 

ধিধবা ? যেন বাজ পড়ল ঘরের মধ্যে । স্তম্ভিতের মত দাঁড়িয়ে রইলেন বিদ্যাসাগর । 
যল্ণায় মুদ্ুত করলেন দু'চোখ । শিবনাথ দেখতে পেল, বড়-বড় জলের ফোঁটা 
গাঁড়য়ে পড়ছে গাল বেয়ে। 

হঠাৎ দু'বাহ্‌ বাঁড়য়ে অবোলা শিশুটাকে টেনে নিলেন বৃকের মধ্ো। 

ধশিবনাথ বললে, ওকে ফের বিয়ে দেবার জন্যে ওর মাকে বোঝাচ্ছি কঁদন থেকে। 
পকছু ভাবতে হবে না। ওকে আগে বেথুন ইস্কুলে ভর্তি করে দাও। খরচ-পল্ন 
যা লাগে সব আম দেব। তার পর একদিন পালকি ভাড়া করে ওকে আর ওর 
মাকে পাঠিয়ে দিও আমার বাঁড়তে, আমার মা'র কাছে।' 
বদ্যাসাগর কি সিদ্ধ নয়? 


১৮৭ 


[শবনাথ যখন ব্রাহন্ন হয়, তখন তার বাবা কে'দেছিলেন। বলোছলেন 'বিদ্যাসাগ্ররকে, 
“মানুষ যেমন যমকে ছেলে দেয়, তেমান আমি কেশবকে ছেলে 'দয়োছ।, 

শুনে স্থির থাকতে পারেননি বিদ্যাসাগর। বাপের দুঃখে কেদোছলেন আকুল 
হয়ে। 

শিবনাথকে বাঁড়র থেকে বের করে 'দয়েছে বাপ। ত্যাজ্যপত্তর করেছে। স্মী আর 
ছোট্র একটি মেয়ে নিয়ে আলাদা বাসা করে আছে কায়ক্লেশে। স্কলারাঁশপের টাকা 
কণশটই ভরসা। 

পথে-ঘাটে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে দেখা হয় মাঝে-মাঝে। মুখ 'ফাঁরয়ে নেন না 
বিদ্যাসাগর । বরং মুখ বাড়িয়ে গলা নাময়ে 'জগগেস করেন আলগোছে, “হ্যাঁ রে, 
কেমন করে চলে 2" 

শুধু বাপের কম্টেই কাঁদেন না, ছেলের কম্টেও কাঁদেন। প্রায়ই খোঁজ নিতে আসেন। 
এটা-ওটা পরামর্শ দেন। শিবনাথ যাঁদ কখনো অর্থ সাহায্য চেয়ে বসে, বোধ হয় 
তারই জন্যে নীরবে অপেক্ষা করেন। 

কত ছেলেবেলা থেকে ভালোবাসেন শিবনাথকে। যখনই তাদের বাঁড় যান, 
দু'আঙূুলের চিমটেতে শিবনাথের ভূপড়র মাংস টেনে ধরেন। ওটাই তাঁর আদরের 
চেহারা। সে আদরের ভয়ে পালিয়ে বেড়ায় শিবনাথ। কিন্তু বিদ্যাসাগর ঠিক 
তাকে ধরে আনেন। তার ভূশড়তে চিমটি না কাটতে পেলে বিদ্যাসাগরের শান্তি 
নেই। ৃ 

তখন তো বাপে-ছেলে একসঙ্গে ছিল । এখন ছেলে একা, বাপ একা । দুয়ের দ্‌ঃখেই 
কাঁদেন বিদ্যাসাগর । একবার এ বাঁড় যান, আরেক বার ও বাঁড়। 

কাঁদবার আগে পর্যন্তই বিচার। একবার কান্না এসে গেলে বিচার ধুয়ে যায়। 
বিদ্যাসাগরের কাছে কত লোক এসে গাল পাড়ে শিবনাথকে। ব্রাহমসমাজে ঢুকেছে 
বলেই সবাইর রাগ । কিন্তু বিদ্যাসাগর বলেন, 'যাই ও করুক, ফেলতে পারব না 
ওকে । যাই বলো, ওকে বুকে রাখলে আমার বুক ব্যথা করে না।' 

সেই শিবনাথের ঘরে আরেক জন তার বন্ধু এসেছে। বন্ধূটিও শিবনাথের মত 
সমাজদ্রোহশী, বিধবা বিয়ে করেছে, আর শিবনাথের মতই 1পতৃ-পাঁরত্যন্ত। খুব 
ধনী বাপের ছেলে, এখন একেবারে দুরবস্থার চরম। তার উপর রোগ হয়েছে 
মারাত্মক । 'বিধবাবয়ে ঘটাতে হাত 'ছল 'শবনাথের, তাই এখন ত্যাগ করতে 
পারল না বন্ধুকে । সপত্রকলন্র আশ্রয় দিল। ডান্তার ডাকাল। কিন্তু কিছুই সুরাহা 
হল না। তখন বন্ধ বললে, বাবাকে একটা খবর দাও । 'তাঁন ক্ষমা না করলে আর 
সারব না আঁম। তার বাবার সঙ্গে পাঁরচয় নেই শিবনাথের। কি করে তাঁকে ধরে! 
নিজে গেলে হয়তো উলটো ফল হবে। বন্ধুর আন্তম কামনা পূর্ণ হবে না। 
তখন অগাঁতর গাঁত, বিদ্যাসাগরকে গিয়ে ধরল 'শবনাথ। বিদ্যাসাগর তেলেবেগুনে 
জহলে উঠলেন। 'জানো ও ছোকরার চারন্র ৯ ওর সব অতাঁত কীর্তি? 

সব জানে শিবনাথ। মুখ বুজে হেন্ট হয়ে রইল। বুঝল, বৃথা, আশালতা দগ্ধ হয়ে 
গেল সূর্যতেজে। 


৯১৮৮ 


'ওকে সাহাষ্য করবে না আর কিছু! উলটে ওকে চাবকে দেওয়া উচিত ।' 

সেই বিরাট আননের উপর ক্রোধের রুদদ্ররঙ্গ দেখতে লাগল শিবনাথ। নিরুপায়ের 
মত প্রণাম করল বিদ্যাসাগরকে। চলে যাবার আগে ফিরে দাঁড়য়ে বললে, 'একজন 
মৃত্যুপথযান্নরীর শেষ ইচ্ছাটি পূর্ণ করতে পারলাম না।' 

মহামানষাঁট নড়ে উঠলেন। ধমক দিলেন শিবনাথকে। 'বোস্‌। আম তোকে চলে 
যেতে বলোছ ? হ্যাঁ সেই কাল সকালের আগে তো আর কিছু হবে না? যা, কাল 
সকালেই নিয়ে যাব তার বাপকে। আর, শোন, দাঁড়া, এই কটা টাকা নিয়ে যা।' 
শিবনাথের হাতে ক'টা টাকা গুজে দিলেন বিদ্যাসাগর : “তুই একা কাঁম্দন চালাবি ? 
এই নে। দেখিস ওর স্তর আর সন্তান যেন কন্টে না পড়ে।' 

বলো, সিদ্ধ কি নয় বিদ্যাসাগর ? যে মাতৃভন্ত সে কি সাধক নয়ঃ মা বলেছেন 
ভাইয়ের বিয়েতে হাজির হতে, যেমন করেই হোক, দামোদর সাঁতরেই চলে গেলেন। 
তার পর মা যখন চলে গেলেন, বাঁড়-ঘর ছেড়ে চলে গেলেন নিজজনে। আর কিছুর 
জন্যে নয়, মা'র জন্যে কাঁদতে বুক ভরে। পরের জন্যে যে কাঁদে সে তো পরমের 
জন্যেই কাঁদে । পরই তো পরম। পরেশও যে, পরমেশও সে-ই । ব্রহমই তো পররব্রহয়। 
ব্রহেনর জন্যে যে কাঁদে সেই তো 'সিম্ধ। বিদ্যাসাগর বললেন রামকৃষকে, “কল্তু 
জানেন তো, কলাইবাটা সেদ্ধ হলে শন্ত হয়ে যায়।' 

তুম তেমনি নও গো। তুমি দরকচা-পড়া পাণ্ডিত নও। শকুনি খব উ্চুতে ওতে, 
[কিন্তু তার নজরে ভাগাড়ের দিকে । যারা শুধু পাঁণ্ডিত, শুনতেই পণ্ডিত, এঁদকে 
কামকাণ্চনে আসান্ত, তারা শকুনির মতই পচা মড়া খজছে। তুমি সে রকম নও। 
বিদ্যার এ্বর্ধ- দয়া ভান্ত বৈরাগ্য খখজছ। তুমি সিদ্ধ নও তো কে সিদ্ধ 2' 

এক জ্ত্রানময় পুরুষ দেখছেন এক আনন্দময় পুরুষকে । 





ঢুকে, ণকল্তু হাতে মোটে আমার তিন ফ্রাঙ্ক_” 
তখনকার গহসেবে দেড় টাকার কাছাকাছি। 
মধূসৃদন তাকাল একবার শূন্য চোখে। বললে, 'শুধয আজকের দিনটা অপেক্ষা 


করো। 
১৮৯ 


'কত 'দিন-রাতই তো গেল এমান অপেক্ষা করে-করে। তুমি কি মনে করো তোমার 
দেশের লোক কেউ তোমাকে সাহায্য করবে 2' 

সে আশা ছেড়েছে মধূসূদন। সাহায্য দূরের কথা, পাওনা টাকাই পাঠাচ্ছে না 
সারকেরা। এদিক-সোঁদক করে চার হাজার টাকা পাওনা। একাঁট কপর্দকেরও 
দেখা নেই। 

সারক তো নয় কালসাপ। তাদের কথা ভাবছে না মধুস্‌দন। দেশে কত-কত 
মানী-গুণী। কত-কত টাকার আশ্ডিল। তাদের কথাও ভাবছে না। হেন লোক নেই 
যার সঙ্গে চেনাশোনা নেই মধুসদনের । এক-এক করে মনে করতে লাগল মুখগ্দলো। 
একটা মুখও এমন নয় যে মন উন্মুখ হয়। 'বন্তবান তো অনেক আছে, “কিন্তু 
চিত্তবান কোথায়! 

না, একজন বোধ হয় আছে। 

একজন নয়, দুজন। একজন ঈশ্বর, আরেকজন ঠিক সেই ঈশ্বরের নিচেই । 

তারই জন্যে অপেক্ষা করতে বলছে ম্ত্রীকে। 

এমানতে আস্থরমাত মধুসূদন, মুহূর্তের বশে কাজ করতে গিয়ে অনেক ভুল 
সে করেছে জীবনে, অনেক 'নর্বাম্ধতা, 'িন্তু এবার পারন্রাতা খুজতে গিয়ে ভূল 
করোনি এতটুকু । এত 'দনে একট 'স্থিরবাদ্ধর পাঁরচয় 'দিয়েছে। অন্তত এই 
একবার । 

'শুধয আজকের দিনটা-_" 

ক আছে আজকে ? 

“আজকে ডাক আসবার দিন। আজ ঠিক চিঠি আসবে । একটা শৃভসংবাদ এসে 
যাবে কিছ; । 

'যাঁদ না আসে? 

'যাঁদ না আসে!' চেয়ার ছেড়ে উঠে পায়চাঁর করতে লাগল মধুসূদন : 'তাহলে 
আম সটান জেলখানায়, আর তোমরা, তুমি আর ছেলেমেয়েরা, কোনো একটা 
অনাথ-আশ্রমে ।' 

জামার হাতায় চোখ মুছল হেনারয়েটা। 

শকন্তু, কান্নাটা শেষ পর্যন্ত স্থায়ী নাও হতে পারে। কেননা টাকার জন্যে যাকে 
এবার 'লিখোছ-_' 

'কেসে? 

“সমস্ত বাঙলাদেশে সে শুধু; একজনই আর্য ধাঁষর মত জ্ঞানী, ইংরেজের মত 
কর্মোৎসাহশী আর বাঙালী মায়ের মত কোমলহৃদয় ! এখানেও যাঁদ না হয়! না, 
না, হতেই হবে, নিজে বিপন্ন হয়েও আসবে বপদৃদ্ধারে। আম নদী-নালার কাছে 
যাইনি, গিয়েছি সমুদ্রের কাছে।' 

দরজার কড়া নড়ে উঠল। 

এঁ এলো বাঁঝ সেই সমদদ্রের মৃন্ত হাওয়া! বাধাহশন স্বাধীনতার শন্্রতা। 


আদালতের বোলফ। দরজা একটু ফাঁক করে উপক মেরে দেখল এহলখগটা। 
৯১৯০ 


ক্ষপ্র হাতে ফের বন্ধ করে 'দিল। ক্লোক করবার মত আর নেই কোনো মালামাল । 
এবার হাতে-হাতে গ্রেপ্তার করতে এসেছে । আবার নড়ে উঠল কড়া। 

কে? 

“চঠি।' 

উল্লাসে লাফয়ে উঠল মধুসূদন 'বাঁলান, চিঠি আসবে দেশ থেকে?' ত্বারত হাতে 
খুলে ফেলল দরজা । 'কোথাকার চিঠি?' 

তোমাকে বাঁলনি। সাগরের মত প্রাণ! বাঙালী মায়ের মত হয়! আশ্চর্য, এমন 
আকাক্ক্ষাও ফলে মানুষের জীবনে! এই দেখ। পনেরো শো টাকার ড্রাফট 
পাঠিয়েছেন বিদ্যাসাগর । 

শুধ7 ক সেই একবার? আরো বহুবার টাকা পাঠালেন। জাঁড়য়ে পড়লেন খণ- 
জালে। শেষ পর্যন্ত ব্যারিস্টার পাশ কারয়ে ছাড়লেন। 

সেই মাইকেল দেশে ফিরছে এত দিনে । বিদ্যাসাগর তার জন্যে পছন্দসই বাড় 
ভাড়া করে রেখেছেন। িলেত-ফেরতের মত উপযুস্ত করে সাঁজয়ে দিয়েছেন 
জিনিসে-আসবাবে। কিন্তু সে-বাঁড়তে উঠল না মাইকেল। গেল স্পেন্স 
হোটেলে। 

অবজ্ঞা দেখে আভমান করলেন না বিদ্যাসাগর। নিজে থেকে আনতে গেলেন 
ডেকে। 

এক কথায় ফিরিয়ে দিল মাইকেল। এ নোঁটভ পাড়ায় & নোংরা পরিবেশের মধ্যে 
সে থাকবে! বিলেত থেকে ব্যারিস্টার হয়ে আসা ব্যর্থ করে দেবে এমন করে! 
বিষণ মনে ফিরে এলেন বিদ্যাসাগর। শূন্য সাজানো বাঁড়র দিকে তাকালেন 
শুন্য চোখে। 

তব কি সেই বাঙালী মায়ের হৃদয় শুষ্ক হয় কখনো? কত বাধা-বপদ ফিরতে 
লাগল পদে-পদে-এমন কি, হাইকোর্টেই ভুকতে পাচ্ছে না মাইকেল। চিরযোম্ধা 
বিদ্যাসাগরের ডাক পড়ল । গাঁয়ের নামে যাঁর নাম-আর কে আছে অমন বারাসিংহ! 
হাটয়ে দিলেন সব বাধা-নিষেধ, ঢুকিয়ে দিলেন হাইকোর্টে । 

কর্মে ঢুঢু, শুধু মুখেই কৃতজ্ঞতা । শুধু চলচিত্তের চলচ্চিত্র । স্থিরদাযাতি নক্ষত্র 
নয়, ধাবিত স্খালত উল্কাপিন্ড। 

টাকার কথাটা একবার মনে করিয়ে দিলেন বিদ্যাসাগর । টাকা? কত চাই ? দৃই- 
দশ-কুঁড় হাজার টাকা এই এসে পড়ছে হাতের মূঠোয়। মধুস্‌দনের জন্যে কত 
ধার হয়েছে বিদ্যাসাগরের ? 

মুখে শুধু বড়-বড় কথা। ষত বহবাস্ফোট। হাতে টাকা এলে আর ধার শোধ নয়, 
'নার্বরোধ স্বেচ্ছাচার। ছন্দে যেমন অবন্ধন ব্যয়ে তেমনি উড়নচণ্ডি। 

'ণুধ্‌ বিদ্যাসাগরেরই খণ বাড়ে। তাঁর সংস্কৃত প্রেসের দুই-তৃতীয়াংশ বিকি হয়ে 
'শয়। তব কি বাঙালী মায়ের হৃদয় নিষ্ঠুর হয়, নীরস হয়? 

বলুলা, এ কোন সাধনায় সিম্ধ বিদ্যাসাগর ? রামকৃফ কি আর ভুল বলেন; 

'দই মধুস্‌দনই রামকৃফের কাছে কাঁট কথা চেয়েছিল। শান্তির কথা, আশ*বাসের 
১৩ 


৯৯১ 


কথা। মা-কালী রামকৃষ্ধের মুখ চেপে ধরেছিলেন, ধর্মত্যাগ্গীর সঞ্গে বলতে 
দেননি কথা। 

কিন্তু কথার চেয়ে গান বড়। ধর্মের চেয়ে বড় ঈমবরকরুণা। 

সেই করুণায় বিগালত হল রামকৃফ। করুণার ধারা নেমে এল সমরমন্োতে। কথা 
বলতে দিচ্ছেন না, কিন্তু গান তো কথা নয়, গান গাইতে দোষ কি। আর এ গান 
তো অন্যের রচনা, রামপ্রসাদের রচনা। রামকৃ গান ধরল। আর, মধস্‌দনের 
কৃতজ্ঞতা নেমে এল অশ্রুবর্ধণে। 

আমি আমন্রাক্ষর লিখি, কিন্তু হে অক্ষর, তুমি তো আমন্ত্র নও। 

তুমি মিথ্যেবাদী, তুমি প্রবক।' গন করে উঠলেন বিদ্যাসাগর : ভদ্রলোকের 
ছেলে বলে এসে আমার সঙ্গে এই চাতুরখটা করলে ?' 

সামান্য একজন পুলিশ সাব ইনস্পেকটর। ভয়ে-দুঃখে দাঁড়য়ে আছে বম হয়ে। 
কী যে অপরাধ করেছে বুঝতে পারছে না। 

অপরাধের মধ্যে টাকা ধার নিয়েছিল বিদ্যাসাগরের কাছ থেকে । বিপদে না পড়ে 
কি আর কেউ কর্জ করে! আর, সে কী নিদারুণ 'বিপদ। ছ মাসের জেলের হন্কুম 
হয়েছে, চাকরিরও দফা রফা। এখন হাইকোর্টে মোশন করতে হবে। মনোমোহন 
ঘোষকে ব্যারস্টার দেবার ইচ্ছে, কিন্তু তার সাতশো টাকা 'ফি। বাঁড়তে লেখা হয়েছে, 
এখনো এসে পেশছয়নি টাকা। 

সুতরাং মুরাব্ব ধরে চলো বিদ্যাসাগর । অনপায়ের উপায়, অশরণের আশ্রয়। 
“ক করতে হবে তাই বলো না।, 

মনোমোহন ঘোষকে আপান শুধু একটা চিঠি লিখে দিন যেন বিনা 'ফ-তে কাজটি 
করে দেয়। হ্যাঁ, আজকেই দিন মামলার । হপ্তা খানেকের মধ্যেই টাকা এসে যাবে 
বাঁড় থেকে, তখন 'দয়ে দেব ঘোষ-সাহেবকে- নির্ঘাত 'দিয়ে দেব। 

'বাঁড় কোথায় ?, 

নাটোর । পুলিশে চাকরি করে, বিরুদ্ধ দল 'মধ্যোমাথ্য ফাঁসয়ে দিয়েছে । জেলটা 
রদ করাতে না পারলে একটা পাঁরবার ছারখারে যাবে । শুধু যাঁদ একটা সুপারিশ 
লিখে দেন-_ 

চুপচাপ কতক্ষণ ভাবলেন বিদ্যাসাগর । বললেন, "এ কর্ম আমার দ্বারা হবে না। 
এক পা জেলে এক পা বাইরে এমন লোকের টাকা বাকি রেখে কাজ করতে বলা 
আবিচার করা। মামলায় যাঁদ হার হয়? জেলের হুকুম যাঁদ বহাল থাকে ঃ না 
বাপু, অসম্ভব, এমনাঁট পারব না কিছুতেই । 

তবে আম যাই কোথা? শুনেছি যার কেউ নেই তার 'বিদ্যেসাগর আছে। যার 
বদ্যেসাগরও নেই সে যাবে কোন দুয়ারে £ 

কাগজ-কলম টেনে নিলেন বিদ্যাসাগর । ঘসঘস করে লিখতে লাগলেন, মাই 
ডয়ার ঘোষ-_ 

হঠাৎ থেমে পড়ে বললেন, 'অসম্ভব। এ কর্ম হবে না আমার ম্বারা। অন্যাঃ 
অনুরোধ কার কি করে?, ] 
১৯২ 


দারোগা কেদে ফেলল। বললে, 'তা হলে আম জেলেই যাব? 

একটা তীর যেন এসে বিদ্ধ করল বিদ্যাসাগরকে। চোখের কোণ ভিজে উঠল। 
জানা ছিল, তব্দ ব্যাচ্কের খাতা খুলে আরেকবার দেখলেন এক পয়সাও মজুত 
নেই। তবু, আশ্চর্য, একটা চেক কাটলেন। সাত শো টাকার চেক। বললেন, 'এই 
চেক নিয়ে গিয়ে ঘোষকে দাও। আর বলো, কাল সাড়ে এগারোটার আগে যেন 
ব্যাঞ্কে না পাঠায়। যে করে হোক আজকের দিনের মধ্যে সাত শো টাক ব্যাঞ্কে 
জমা করে দেব ।, 

হাইকোর্টে খালাস পেয়েছে দারোগা । ধার শোধ করতে টাকা নিয়ে এসেছে । এক 
আধলা কম নয়, পুরো সাত শো টাকা। সাত দিনের মধ্যে ধার শোধ দেবার কথা 
ছিল, চার দিনের দিনই পেশছে দিয়েছে টাকা । সহাস্য মুখে প্রণাম করে উঠেছে। 
কিন্তু হঠাৎ এ কা বিস্ফোরণ! তুমি মিথ্যেবাদন, তুমি প্রবণ্ণক, তুমি অভদ্র 

'তা ছাড়া আবার কী ।' বিদ্যাসাগর তেমনি গরজাতে লাগলেন : “তুমি না বলোছলে 
তুমি পুলিশে কাজ করো ?' 

'আজে্ে হ্যাঁ” 

শমথ্যে কথা । একশো বার মিথ্যে ।' 

“সেকি কথা? আপান খোঁজ নিন, খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন । সামান্য চাকার, 
মিথ্যে বলতে যাব কেন ?' 

“মধ্যে ছাড়া আর কা বলব! একটু যেন প্রশমিত হয়েছেন বিদ্যাসাগর । কণ্ঠস্বরে 
নির্জলা ক্রোধের পাঁরবর্তে এসেছে যেন একটু অভিমানের ঝাঁজ : 'এত দিনে কত 
লোক “দেব” বলে টাকা নিয়ে আর দিল না। অপারগের কথা ছেড়ে দিই, কত 
সম্পন্ন বড়লোকও টাকা ধার নিয়ে মেরে দিলে । বন্ধুবান্ধবের তো কথাই নেই। 
যে দেশে নিলে আর 'দতে চায় না, সে দেশের লোক হয়ে, শুধু তাই নয় পাাঁলশের 
দারোগা হয়ে, পুরোপুরি ফারয়ে দেবে, এ বিশ্বাস কার কি করে? তা ছাড়া 
সাত 'দিনের কড়ার করে চতুর্থ দিনে ফেরত দেবে এ ক্পনার অতাঁত। তবে ভোমাকে 
মিথ্যাবাদী বলব না তো কি! তোমার খালাস পাওয়া উচিত হয়নি। সাত 'দনের 
কড়ারে টাকা নিয়ে চার দিনের দিন যে শোধ দেয় সে পুলিশের দারোগাগার করে 
জেলে যাবে না তো কে যাবে! 

কাউকে চিঠি লিখতে বসেই প্রথমে লেখেন : শ্রীহরিঃ শরণম্‌'। বাজে বা বেফাঁস 
কথা লেখবার লোক নন বিদ্যাসাগর । কিন্তু সংসারে বাস্তবচক্ষে যাঁদ কারু শরণ 
নিয়ে থাকেন, তবে সে বাপ-মা। পাকপাড়া রাজবাড়র হডসন সাহেবকে 'দিয়ে 
দৃখানা ছবি কাঁরয়ে নিয়েছেন--তাদের সামনে দিনারম্ভের প্রথম প্রণামাট না রেখে 
জলম্পর্শ করেন না বিদ্যাসাগর । ওই তাঁর হর-গোৌরাঁ। তাঁর রাম-সণীতা। তাঁর 
লক্ষী-নারায়ণ। 

'পাকপাড়া রাজবাড়িতে ভালো এক সাহেব পোটো এসেছে, মা, ভগবত দেবীকে 
বললেন বিদ্যাসাগর, ইচ্ছে করছে তোমার একখানা ছবি আঁকিয়ে নি।' 

দূর, আমার ছবি কণ হবে! ছি-ছি!' ভগবত দেবী মুখ ফিরিয়ে নিলেন। 


১৩ ৬৮) ১৯৩ 


ছবি তো তোমার জন্যে নয়, ছবি আমার জন্যে। যখন যেখানে থাক, সকাল-সন্ধে 
থাকবে আমার চোখের সামনে । প্রাণটা যখন কেমন করে উঠবে তখন একবার 
দেখব চোখ ভরে।' 

বলামকৃষণের সেই কথা । যাকে দেখতে এসেছিস, চোখ মেলে চোখ ভরে দ্যাখ মা'র 
মুখখানি। ঈশ্বরের মুখের আভাস যাঁদ কোথাও থাকে তবে এই মা'র মূখে। 
'না বাপ সাহেবের সামনে বসে ছাব আঁকাতে পারবো না।' ভগবতী দেবী আবার 
পাশ কাটাতে চাইলেন। 

'না, মা, সে খুব ভালো লোক, আমাকে খুব ভালোবাসে, তার সামনে বসতে দোষ 
নেই।' 

একটু বোধ হয় নরম হলেন ভগবতশী। বললেন, 'তা সে এখানে আসবে তো? 
'না মা, তোমাকে পাকপাড়ার রাজবাঁড়তে গিয়ে বসতে হবে। সেখানে সে আড্ডা 
করেছে। সে আন্ডা ভেঙে এখানে আনতে গেলে ছবি হয়তো ভালো হবে না-; 
পুত্রের মুখের দিকে তাকালেন ভগবতন। বললেন, 'তোর যা ইচ্ছে তাই কর। 
নিন্দে হলে লোকে তো আর আমাকে 'নন্দে করবে না, তোরই 'নিন্দে করবে। বলবে, 
বিদ্যাসাগর মাকে পাকপাড়া ছাব তুলতে নিয়ে গেছে।' 

লোকের নিন্দাকে বিদ্যাসাগর যেন কত ভয় করে! আম মাতৃবন্দনা করব তায় 
লোকনিন্দা! 

সেই মা'র মৃত্যুতে দশ দিক শূন্য হয়ে গেল বিদ্যাসাগরের । বালকের মত কাঁদতে 
লাগলেন অঝোরে । মৃত্যুর সময় কাছে থাকতে পানানি, সেবা করতে পানানি, দুটো 
কথা শুনতে পানান, এ দুঃখ রাখবার জায়গা নেই। নির্জনে চলে গেলেন, ফিরতে 
লাগলেন দীনহশনের মত। পায়ে জুতো নেই, মাথায় ছাতা নেই, বেশে-বাসে 
পরিচ্ছন্নতা নেই। থাকেন একাহারে, স্বপাকে নিরামিষ খেয়ে। নিতান্ত অসস্থ 
হয়ে না পড়লে সাহাষ্য নেন না 'দিনময়ীর। কিন মেঝের উপর শঃয়ে ঘ্‌মোন। 
আর নিরবাঁচ্ছন্ন ভাবে তদ্গত “চিন্তে মা'র গুণাবলীর ধ্যান করেন। 

এমনি এক বছর। একটানা এক বছর। 

কত বছর তার পর চলে গেছে। এক 'দিন কি কথায়-কথায় এক বন্ধু হঠাৎ তাঁর 
মা'র গণের কথার উল্লেখ করলেন। যেই শোনা, কাতর কান্নায় ফেটে পড়লেন 
বদ্যাসাগর। 

বন্ধ তো অগ্রস্তুত। বিদ্যাসাগর অত্যন্ত পশীড়ত, দেখা করতে এসোছলেন। 
কথাচ্ছলে উঠে পড়েছিল ভগবতা দেবীর প্রসঙ্গ । 'িন্তু ফল এমন হবে অনমান 
করতে পারেনান। এ ষে একেবারে শোকসমূদ্র! 

«এত কম্ট দেব জানলে ও-কথা পাড়তুম না।' 

“কষ্ট? তুমি আমাকে কষ্ট দিলে কোথায় 2 তুমি তো আমার বন্ধুর মত কাজ 
করলে। তোমার জন্যে আমার মায়ের কথা মনে পড়ল, মায়ের নামে দ্‌ ফোটা 
চোখের জল ফেললাম। এত দুর্দশা, সব সময়ে বাপ-মাকে স্মরণ করতে 
পার কই? 


৯১৯৪ 


এই বিদ্যসাগর। সাগরের তুলনা সাগর। 'সাগরং সাগরোপমং'। 

এই মাতৃসাধক কি 'সম্ধ নয়? নয় কি তপঃপরায়ণ খাঁষ ? 

রামকৃষ কী করতেন? যত 'দিন চন্দ্রমাণ জীবিত ছিলেন, রোজ সকালে গিয়ে 
প্রণাম করে আসতেন। বৃন্দাবনে থেকে যাবেন ভেবোছলেন মায়ের কথা মনে 
পড়তেই বৃন্দাবন ভেসে গেল। তার পর মা যখন গত হলেন তখন রামকৃফের সে 
কী কান্না! রামকৃষণের মন্দই তো মা! মুখেই হোক আর মনেই হোক মাকে যে ডাকে 
সে তো ভগবতাঁকেই ডাকে । বিদ্যাসাগরের মা-ও তাই ভগবত! 





ব্রহম যে ক মুখে বলা যায় না।' বিদ্যাসাগরকে বলছেন রামকৃষ্ণ : 'সব শাস্ম-দর্শন 
এ+টো হয়ে গেছে। তার মানে মুখে পড়া হয়েছে, মুখে উচ্চারণ হয়েছে। কিন্তু 
একটি জানিস কেবল এ+টো হয়ান। সে ব্রহম। সে অনচ্ছিন্ট ।' 

আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন বিদ্যাসাগর । 'বা, এঁট তো বেশ কথা। এ কথা তো 
কোথাও শুনানি! একটি নতুন কথা শিখলাম আজ ।' 

ব্রহন্ন অন্নাচ্ছিন্ট। 

একেবারে মুখের মধ্যে এনে ছেড়ে 'দিয়েছেন। ঘাঁনষ্ঞ আস্বাদের মধ্যে। রসনার 
রসাশ্রয়ে। কিন্তু সাধ্য নেই দল্তস্ফুট করো । মুখ খুলেছ কি উড়ে পালিয়েছে! 
বাক্যের ব্যর্থ অলগ্কারে ভাবস্বরূপের বন্দনা চললেও বর্ণনা চলে না। ভূষণ দিয়ে 
কি রূপের উদ্ঘাটন হয় £ 

ণকল্তু যারা ব্লহমজ্ঞানী 2, 

তারা নূনের পৃতুল। নুনের পুতুল সমূদ্র মাপতে গিয়েছিল। কত গভীর জল 
তার খবর দেবে। খবর দেওয়া আর হল না। যাই নামা অমনি গলে যাওয়া। কে 
কার খবর দেবে 2, 

মানুষ তো খুব বাহাদুর, তাই মনে করে আমরা তাঁকে জেনে ফেলেছি। সেই সে 
[পম্পড়ের গল্প। একটা পিশপড়ে চিনির পাহাড়ে বেড়াতে গিয়েছিল। এক দানা 
খেয়ে পেট ভরে গেল। আরেক দানা মুখে করে বাসার 'দকে নিয়ে যাচ্ছে। যাবার 
সময় ভাবছে এবার এক সময় এসে গোটা পাহাড়টা নিয়ে যাব। 

রহম তো 'নালস্তি, কিন্তু ভগবানাটি কে? 


৯৯৫ 


যাঁনই ব্রহম তিনিই ভগবান। একজনেরই দু রকমের পোশাক। বাঁড়তে থাকার 
মত শাদাঁসধে চেহারার একজন, আরেকজন বাইরে বেরুবার মত একটু ফিটফাট 
সাজগোজ । একজন গুণাতীত, আরেকজন গুণময়। একজন বড়ভাবশ[ন্য, আরেকজন 
ষড়েশ্বযপূর্ণ। 

আপনার কাকে বোশ পছন্দ, প্রহমকে না ভগবানকে ? 

ব্রহ্ন যেন গতসর্বস্ব দেউলে। যেন 'নাঁচ্কণন পথের 'ভাঁখার। চাল নেই চুলো নেই, 
যেন গাছতলায় আশ্রয়। যে বাবুর ঘর নেই দ্বার নেই, 'বাঁন পয়সায় যে বিকিয়ে 
গেল, সে বাবু আর কিসের বাবু? ভগবান ষড়েশ্বর্ষে প্রকাশমান। কত তাঁর প্রতাপ 
কত তাঁর প্রভুত্ব। তাঁর যাঁদ এশবর্য না থাকত তা হলে কে মানত তাঁকে? আমার 
কিন্তু বাপু ব্রহেন্রর চেয়ে ভগবানকে বেশি ভালো লাগে। ভগবান হচ্ছে রাজা, 
কন্তু ব্রহন্ন হচ্ছে জমিহীন জমদার। 

'ঈশবর যাঁদ সর্বভূভেই আছেন, তবে একজনকে বোঁশ শান্ত আরেকজনকে কম শান্ত 
দিয়েছেন এর মানে কি?' 

যেমন আধার তেমান শান্তর আয়তন। শান্ত আধারের নয়, শান্ত ভাঁর। 'তানই 
িকাঁশত হয়েছেন। যেমন দীপ তেমনি আলো । যেমন মাঠ তেমনি ফসল । যেমন 
কলসা তেমান সরা। 

সব তিনি। তোমাকে যখন কেউ মানে তখন জানবে তাঁকেই মানে । তোমাকে যে 
মানে তাতে তোমার শিং বেরিয়েছে দুটো ? 

শুধু পাশ্ডিত্যে কিছু নেই। তাঁকে জানবার জন্যেই বই পড়া, জনে-জনে জানাবার 
জন্যে নয়। পাণ্ডিত্য হচ্ছে ঢাকের বাঁদ্য। পাড়া-পড়শীর ঘুম না ভাঁঙয়ে ক্ষান্তি 
নেই। সারা গায়ে গয়না পরে একা-একা নিজের ঘরের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে 
কে কবে শান্তি পায়! বাইরের লোককে দেখাবার জনো রাস্তায় ছোটে । নামের 
পেছনে পদবীর পুচ্ছ নাড়ে। নিজের কথাঁট পরের কথার উদ্ধৃতির স্তূপে 
চাপা দেয়। 

শুধু কোটেশন আর ফুটনোট। জানতে তো জেনোৌছ কিছুই নয়, তবু কতটা 
পড়েছি তার ফর্দ নাও। আমার বাক্যের বহরে যাঁদ একটু অবাক হও। যেমন 
এশবর্য দেখিয়ে সূক্ষমভাবে চাই তোমাকে একটু ঈর্ধালু করতে । শুধু 'নিজকে 
দেখানো । শুধু প্রাচীরপন্নে নিজের নামজার। 

যাঁদ কাউকে জাঁহর করতে হয়, তাঁকে জাহর করো। যাঁদ কাউকে. সাব্যস্ত করতে 
হয় তাঁকে সাব্যস্ত করো। 

“আমি ও আমার, এই দুটি অজ্ঞান। আমার বাঁড়, আমার টাকা, আমার বিদ্যা, 
আমার এমবর্য, এই যে ভাব এ হয় অজ্জান থেকে ।' বললেন রামকৃফণ : 'আর, হে 
ঈশ্বর, তুমিই সব কর্তা, আর এ সব তোমার জিনিস- বাঁড়-ঘর, ধন-দৌলত, পৃত্র- 
পরিবার, বন্ধু-বাম্ধব-আমার বলতে কেউ কিছু নয়, সব তোমার-_ এইাটিই 
জ্ঞানভাব।, 

লোকে বুঝেও বোঝে না। ঘা খায়, আবার উঠে বসে অহঙ্কারের বেড়া মেরামত 
৯৯৬ 


করে। সূর্ধ যে অস্তে চলেছে সৌঁদকে খেয়াল নেই। সারা দিন চলে শুধু এই 
মেরামতি টুকটাক। আত্মরাঁতর ক্ষদ্র-সংস্কার। দিন যায় দৈন্য আর যায় না। 
তার পর মৃত্যুর পর আবার খবরের কাগজে হেডলাইন দিতে ছোটে । হোমরা-চেমরা 
কে-কে এসোছল শ্রাদ্ধ খেতে তার 'ফারাস্তি ঝাড়ে। চাকার থেকে পেনসন নিয়ে 
বাঁড় করে দরজার উপরে ছাড়া-চাকরির নেম-প্লেট ঝোলায়। 

সন্ন্যাসী শুয়ে আছে লোহার কাঁটার উপর । সংসারী শুয়ে আছে অহঙ্কারের 
কন্টকে। 

বড় মানুষের বাগানের সরকার, বাগান যাঁদ কেউ দেখতে আসে, খুব আড়ম্বর করে 
বলে, এ বাগানাটি আমাদের, এ পুকুরাট আমাদের । কিন্তু কোনো দোষ দেখে বাবু 
যাঁদ তাকে ছাঁড়য়ে দেন, তখন তাঁর আম কাঠের [সন্ধৃকটাও নিয়ে যাবার তার 
যোগ্যতা থাকে না। বাবুর দারোয়ানকে দিয়ে সিন্দৃকটা পাঠিয়ে দেয়। 

হেসে উঠলেন বিদ্যাসাগর । 

বদাল হবার সময় আদালতের ফার্নিচার ফেরত দাও । মায় দোয়াতদানাঁটি পর্যন্তি। 
ভগবান দুই কথায় হাসেন, বললেন আবার রামকৃফ্ণ। এক হাসেন, কবরেজ যখন 
রুগীর মাকে বলে, মা, ভয় কি; আম তোমার ছেলেকে ভালো করে দেব। এই 
বলে হাসেন, আম মারছি, আর এ না বলে, বাঁচাবে! আর হাসেন, দু ভাই 
যখন দাঁড় ফেলে জায়গা ভাগ করে, আর বলে, এ 'দিক আমার, ও 'দিক তোমার । 
এই বলে হাসেন, আমার জগৎ ব্রহনান্ড, আর ওরা বলছে, এ জায়গা আমার ! 
“আচ্ছা, তোমার কী ভাব 2 ঈষং ঝ'কে পড়ে জিগগেস করলেন বিদ্যাসাগরকে। 
মৃদ্-মৃদু হাসছেন বিদ্যাসাগর । বললেন, 'সে এক দিন আপনাকে গিয়ে বলব আম 
দ্প-চাপি।' 

আমার পরোপকারের ভাব। পর মানে ভগবান, উপ মানে সমীপস্থ, আর কার মানে 
কার্য । আমি এমন কার্য করব যাতে মুহূর্তে ভগবানের সমীপস্থ হয়ে যাব। 
ভগবানকে কি করে আনান্দত করব? এত যাঁর আছে তাঁকে আর আম ক দিয়ে 
খুশি করতে পাঁর £ তাঁকে খুশি করতে পাঁর শুধু পরের আশ্রু মুছয়ে। আপান 
বলছেন ভগবান হাসছেন। আমি তো দোখ অহার্নশি কাঁদছেন 'তাঁন। কদিছেন 
'ঘরে-ঘরে, পথে-পথে। শৃঙখলে নিপীড়িত হয়ে কান্নার ভাষা হারিয়ে, শাসনের 
কারাগারের দেয়ালে মাথা ধুকে-্ঠুকে। 

[তিনিই সব এ ভাবটুকু থাকলেই হল। তাঁর জন্যেই সব করছি, নিজ্জের নাম- 
যশের জন্যে নয়, গীতায় একেই বলেছে নিজ্কাম কর্ম। গীতায় এমাঁনতেও যা, 
ওলটালেও তাই । এমানতেই গীতা, ওলটালে তাগশী। তাগশ মানে ত্যাগ । ত্য 
ধাতুর উপর 'বাহত প্রত্যয়ে তাগী-ও সিদ্ধ! মরা-মরা বলতে-বলতে যেমন রাম 
হয়েছিল তেমনি গীতা-গীতা বলতে-বলতে ত্যাগী হয়ে যাও। নিজের সমস্ত 
জ্ঞান-কর্ম বিদ্যাবুদ্ধি তাঁর হাতে, একটা বৃহত্তম সত্তার উপলাহব্ধতে, উৎসজন 
করো। এর জন্যে চাই 'বশবাস। সংশয়ের ঝড়ের রাতে প্রতায়ের দীপপবর্তি। এর 
হাঁদস পাঁণ্ডতের বিচারে নেই, আছে একাঁট নির্মলসরল বালকের 'ীবশ্বাসে। 


১১৪ 


যড়দর্শনেও তাঁর দর্শন হয় না, দর্শন হয় শুধু বালকের পবিব্রতায়। সেই যে কথায় 
বলে না, স্বয়ং রামের সাগর বাঁধতে হল আর হনুমান রামনামের ব*বাসের জোরে 
িঙিয়ে গেল এক লাফে। 

'যদি তাঁতে বিশ্বাস থাকে, বললেন রামকৃষ্ণ, 'তা হলে পাপই করক আর মহা- 
পাতকই করুক, 'ছ7তেই ভয় নেই, 

শান্ততে হয় না, ভান্ততে হয়। একের পর এক গান ধরলেন রামকৃষ্ণ । সরে-সুরে 
সহধার হুদ নেমে এল মর্তাধামে। 

তত্ব আত সোজা । শুধু একটি ভালোবাসার তত্ব । যাতে এ ভালোবাসাঁট আসে 
তার জন্যেই তাঁকে মা বলা। মা বড় ভালোবাসার 'জিনিস। 

বিদ্যাসাগরের চোখ ছলছল করে উঠল। এ কি আর বিদ্যাসাগরকে বোঝাতে হবে ? 
পূজা হোম যাগযজ্ঞ, ও-সব কিছুই নয়। আসল হচ্ছে ভালোবাসা । যাঁদ একবার 
ভালোবাসা আসে তবে কী হবে ও-সব অনুষ্ঠানে 2 যদ ভালোবাসা হবে ক হবে 
আর বেশভূষায় ? চোখে যাঁদ জল আসে কাজলের রেখা আর থাকে না। 

তুমি যে সব কর্ম করছ এ সব সৎকর্ম” বললেন রামকৃষ্ণ, 'যাঁদ আম কর্তা এই 
অহঙ্কার ত্যাগ করে নিজ্কামভাবে করতে পারো তা হলেই হল। এই 'িজ্কাম কর্ম 
করতে-করতে ঈমবরে ভালোবাসা আসবে ॥ 

একেক জনের একেক রকম পথ । কারু জ্ঞানে, কারু ভান্ততে, কারু বা শুধু নিশ্কাম 
কর্মে । নি্কাম কর্মই নিয়ে যাবে মনস্কামের চরম তীর্থে। 

“আমি বলছি, নিচ্কাম কর্মই হচ্ছে ঈশ্বরপ্রেম। আর ভালোবাসা হলেই দর্শন। 
আর সব দর্শনে চোখাচোখ হয় না, ভালোবাসাতেই মুখচীন্দ্ুকা। হ্যাঁ গো, দেখা 
যায় ঈশবরকে । তাঁর সত্গে কথা কওয়া যায়। এই যেমন তোমাকে দেখাঁছ চোখের 
উপর চোখ রেখে । এই যেমন কথা কচ্ছ তোমার সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে।' 

রাত হচ্ছে, এবার উঠবেন রামকৃফ্ণ। 

'যা সব বলছি তোমাকে তুম সব জানো ।' হাসলেন রামকৃফণ : 'তবে খবর নেই। 
বরণের ভাণ্ডারে কত-কি রত্ন আছে, বরুণ রাজার খবর নেই।' 

“তা আপনি বলতে পারেন।' হাসলেন বিদ্যাসাগর । 

“অন্তরে সোনা আছে, কিন্তু একট; মাটি চাপা পড়ে আছে। যাঁদ একবার সম্ধান 
পাও, তখন অন্য কর্ম কমে যাবে । শুধু খনন করবে সেই গহন অন্তর । এ দেখ না, 
গৃহস্থের বউর কত কর্ম, অল্তঃসত্বা হলেই কর্ম কমে আসে । শেষে ছেলে হলে 
হেকনড৫কই নিয়ে থাকে, গ'টিকে নিয়েই নাড়াচাড়া করে। সংসারের কাজ আর 
শাশুড় করতে দেয় না।' 

তাই শুধু এগোও। কর্মারণ্যে কুঠার হাতে করে কাঠ কাটতে বৌরয়েছ, "কিন্তু 
শুধু চন্দন গাছ দেখেই থেমে যেও না। এ কুঠারে যে রূপোর খনি সোনার খাঁনও 
খংড়তে হবে। তবে থামছ কেন? এগোও, এগিয়ে যাও। মাঁণ-মাঁণক্যের ভান্ডার 
রয়েছে সামনে। অন্তরেই সেই আকর, অন্তরেই সেই রক্সাগার। থেমো না, আড়ষ্ট 


হয়ে দাঁড়য়ে পোড়ো না 
১৯৮ 


এখনি অন্ধ বন্ধ কোরো না পাখা! অনেক তোমার সম্ভাবনা । অনেক তোমার 
প্রতিশ্র€ীতি। তোমার মান্তাহীন যান্রা। তোমার সংক্রান্তিহীন দিনপঞ্জৰ। প্রাতাদনই 
তোমার জন্মাদন। 
'সব জানো, তবে খবর নেই।, 
'তা কখনো হয়? 
হ্যাঁ গো, অনেক বাবু জানে না চাকর-বাকরের নাম কি।' উঠলেন রামকৃষ্ণ । 'একবার 
যেয়ো বাগান দেখতে । রাসমণির বাগান। ভারি চমৎকার জায়গা ।' 
'যাবো বৈ কি। আপাঁন এলেন আর আম যাবো না?' 
'আরে আমার কাছে যাবে কি? ছি-ছি! বাগান দেখতে যাবে।' 
'সে কি কথা! একট; ক্ষুগ্ন হলেন কি বিদ্যাসাগর 2 বললেন, "ও কথা বলছেন 
কেন? 
'আরে, আমরা হচ্ছি জেলোডাঙি। খাল-বিলেও যেতে পার, আবার বড় নদশতেও 
যেতে পারি। 'কন্তু তুমি হচ্ছ জাহাজ, ?ক জানি যাঁদ যেতে গিয়ে চড়ায় হঠাং 
ঠেকে যায় 
সকলে হেসে উঠল। 
রামকৃষ্ণ টিপ্পনি কাটলেন : “তবে এ সময় যেতে পারে জাহাজ ।' 
ইীঞঙ্গত বুঝে নিলেন বিদ্যাসাগর । বললেন, 'হ্যাঁ, এটি বর্ধাকাল বটে।' 
নবানুরাগের বর্ধা। নবানুরাগের সময় মান-অপমান থাকে না, বিদ্যা-অবিদ্যা থাকে 
না, শুধু জলে জলময়। তখন প্রেমের নদী, প্রেমের হাওয়া, প্রেমের ময়রপঙখী। 
প্রেমের অঞ্জনে তখন বিশ্বময় নিরঞ্জন। 
দাঁড়য়ে মূল মন্ত্র জপ করছেন রামকৃষ্ণ । ভাবারূঢ় হয়েছেন। হয়তো বিদ্যাসাগরের 
আধ্যাত্মিক মগ্গলের জন্যে প্রার্থনা করছেন মা'র কাছে। 
ভন্তসঙ্গে সিশড় দিয়ে নামছেন ধীরে-ধীরে। নিজের হাতের মধ্যে একটি ভক্তের 
হাত-ধরা। আগে-আগে বাতি-হাতে চলেছেন 'বিদ্যাসাগর। 
শ্রাবণের কৃফপক্ষ। যচ্ঠীর চাঁদ দেখা দেয়নি এখনো । বাগানে অন্ধকার। তার মধ্য 
দিয়ে বাতির একটি ক্ষীণ রেখা চলেছে ফটকের দিকে । সেই ক্ষীণ রেখার পিছনেই 
জ্যোতিজ্মান 'দিনকর। জগতজোড়া অন্ধকারের মধ্যে দেখা যাচ্ছে কি সেই আশার 
ক্ষীণ-দ্যুতি ? সেই আভাসের পিছনে নব ভাস্করের আবির্ভাব ? 
ফটকের সামনে কে একজন গৌরবর্ণ সুপুরুষ দাঁড়য়ে। বয়েস চল্লিশের কাছাকাছি । 
মাথায় পাগাঁড়, দাঁড়গোঁফ একমুখ । শখ নাকি 2 অথচ পরনে ধৃতি, পায়ে জৃতো- 
মোজা । বাঙালী তো, গায়ে চাদর নেই কেন 2 
রামকৃষকে দেখামারই পাগাঁড়শুদ্ধ মাথা পায়ে লুটিয়ে দিল। 
'এ কিঃ তুমি? বলরাম ? এত রানে 2, 
“অনেকক্ষণ এসোছি। দাঁড়য়েছিলাম এখানে ।' 
“সে কি? ভেতরে যাওনি কেন ?' 
'সবাই আপনার কথা শুনছেন, এর মধ্যে আম গিয়ে কেন তালভঙ্গ করি? 

১৯৪ 


ঘরের মধ্যেই থাকি আর দরজার বাইরেই থাঁক, আমি আছি আমার ভাবের ঘরের 
দরজা খুলে। 

ঠাকুর গাড়িতে উঠলেন। 

মাস্টারের কানে-কানে বললেন বিদ্যাসাগর, 'গাঁড়ভাড়া দেব ?' 

আজে না, ও হয়ে গেছে। 

বিদ্যাসাগর প্রণাম করলেন ঠাকুরকে। প্রত্যেকে, একে-একে। 

গাঁড় চলল দাঁক্ষণে*বর। কিন্তু গাঁড়র মধ্যে যান বসে তিনি চলেছেন কোথায় 2 
তিনি চলেছেন জীবের ঘরে-ঘরে। কায়ে মনে আর বাক্যে একটি শুধু বাণী নিয়ে। 
সে বাণী ভালোবাসার বাণী । শুধু ভালোবাসা । ঈশ্বরকে ভালোবাসা । ঈশ্বরকে 
ভালোবাসলেই আর সকলকে ভালোবাসবে । এ জীবন পেয়েছ শুধু সেই 
ভালোবাসার আলো জবালাতে। গাঁথতে শুধু সেই একটি ভালোবাসার বরমালা। 


তুমি তোমার 1সংহাসন ছেড়ে নেমে এলে। নেমে এলে আমার পর্ণকুটিরের ভগ্ন- 
দুয়ারে । আমার দুয়ারের চৌকাঠে ঠেকে যাবে বলে ফেলে এলে তোমার রাজমূকুট। 
আম দীনদঃখী বলে পরে এলে 'রস্ততার সাজ। আমি ছোট বলে তৃঁমিও 
ছোট হলে। আম কি তোমাকে ছোট করোছি ? তুমি নিজেই ছোট হয়েছ আমার 
জন্যে। আম দূর্বল বলেই সুলভ হয়েছ। ভঙ্গুর বলেই হয়েছ সকোমল। নইলে 
তোমাকে ধার কি করে? রাঁখ কি করে বুকের 'নাবড়ে 2 

কন্তু, ছোট হয়ে শুনতে চাও তুমি বড় কথা । আমার ছোট মুখের বড় কথা। 
সে-কথাটির নাম ভালোবাঁস। তোমাকে ভালোবাসতে পারলেই বিশবসংসার ভরে 
উঠবে, ঘুচে যাবে সব ঘর-গড়া ব্যবধান। এইটিই বড় কথা। এইটিই শোনবার 
জন্যে ছোট হয়ে কাছে এসেছ । ছোট হয়েছ বড় করবার জন্যে। 'রস্ত সেজেছ মাস্তর 
পথ দেখাতে। 

তুম ভিখার শিব। ভস্মমাথা। হাড়ের মালা গলায় দোলানো । তুমি 'নাচ্কণ্টন 
বলেই তে প্রবাঁণ্চতের বন্ধু । সরল বলেই তো ডাক দিয়েছ সহজ হতে। 

কিন্তু এ কেমনতরো শিব? কেমনতরো সাধু ১ থেকে-থেকে কেবল হাত পাতে । 
কেবল খেতে চায়। 

২০০ 





দু পয়সার দেদো সন্দেশ কিনে দাক্ষিণেশবরে এসেছে অঘোরমাণি। থাকে কামার- 
হাঁটিতে, দত্তদের ঠাকুরবাঁড়র দাক্ষণের কোঠায় । রাধাকৃষের মান্দর। নিজের হাতে 
ভোগ রাধে অঘোরমণি। কলাপাতায় করে গোপালের জন্যে ভোগ সাজায়। গণ্গা- 
জলের ছোট গ্লাশ পাশে রেখে পিপড় পাতে সামনে । এস, বসো, খাও--আহবান 
করে গোপালকে। * 

দুপয়সার দেদো সন্দেশের জন্যেই হাত বাড়ায় রামকৃষ্ণ । বলে, 'কই, কি এনেছ 
আমার জন্যে? দাও। ওক, ঢাকছ কেন আঁচলে ?' 

'ছি-ছি, অমন রোথো সন্দেশও কেউ চায় হাত বাঁড়য়ে! লজ্জায় পিছিয়ে গেল 
অঘোরমাঁণ। কত ভালো জিনিস এনে খাওয়াচ্ছে ভন্তেরা, কত তবক-দেওয়া, কত-বা 
রাংতা-জড়ানো। অঘোরমাণির যেমন অদ্ট, দৃপয়সার দেদো সন্দেশের বেশি 
জোটোন। তা, লুকিয়ে এনেছি আঁচলের তলায়, একেবারে আসামান্ই খেতে 
চাওয়ার কী হয়েছে? একটু রয়ে-সয়ে ধীরে-সুস্থে চাইলেই তো হয়। 

'দাও না গো! এনেছ তো ল্‌কোচ্ছ কেন?" 

কুণ্ঠিতভঞ্গিতে সন্দেশগুলো বের করে দিল অঘোরমণি। তুচ্ছ 'জনিস নিয়ে 
এসেছি তোমার জন্যে, কিন্তু তুমি কি আমার নৈবেদোর দৈন্য ধরবে ? দেখবে না 
কি আমার নিবেদনের ভাবাঁট ? তাঁম কি ভাবে নও ? তুম দক উপকরণে ১ 
স্বচ্ছন্দে মুখে পুরল সেই দেদো সন্দেশ। সানন্দে খেতে লাগল রামকৃফ। বললে, 
'তুঁম গারব মানুষ, পয়সা খরচ করে বাজার থেকে সন্দেশ আনো কেন 2' 

ন বছরে বয়ে হয়েছিল, তেরো বছরে বিধবা হয়েছে। অল্প কিছু ধানজমি 
পেয়েছিল *বশুরঘর থেকে, বাক করে তারই সামান্য আয়ে দিন চালায়। দিন 'কি 
আর চলে? দিন না চলে তো মনও চলে না। মন অচল হয়ে পড়ে থাকে বিগ্রহের 
পদমূলে। 

গোপালমল্লে দীক্ষা নিয়েছে অঘোরমাণ। সমস্ত স্বাম্টর যে সম্রাট তাকে সে সম্তান- 
রূপে কাছে টেনে এনেছে । দিন কাটাচ্ছে শুধু মন্দিরের তদারকে। ফুল তুলছে, 
মালা গাঁথছে, চন্দন বাটছে, বাসন মাজছে, ঝাঁটপাট দিচ্ছে। তারপর কোনোরকমে 
নিজের স্নানাহার সেরে বাকি সময় শুধু জপযজ্ঞ। শুধু মানসনামগুঞজন। 

এমনি এক-আধ 'দিন নয়, একটানা 'তাঁরশ বছর । 
'নারকোলের নাড়্‌ করবে নিজের হাতে, তাই আনবে দুটো-একটা ।' কিন্তু এতেও 
বিশেষ আগ্রহ নেই রামকৃষণের। বললে, 'যা নিজের জন্যে রাঁধো, তারই থেকে কিছ 
নিয়ে 'এলেই তো ভালো হয়। কী রেধেছিলে আজ 2 লাউশাকের চচ্চাঁড়, না, আলু 
বেগুন-বাঁড় 'দয়ে সজনেখাড়ার ঘ্যাঁট ১ "তাই নিয়ে এসো না দু-একাঁদন। তোমার 
হাতের রান্না খেতে বড় সাধ যায়।' 

কেবল খাওয়া আর খাওয়া । এ ছাড়া সাধুর কি আর কোনো কথা নেই? দত্তগিল্লি 
খুব ভালো সাধূরই খোঁজ দিয়েছে যা হোক। গোপাল-গোবিন্দের কথা নেই, শুধু 
এ-খাই না ও-খাই। দূর ছাই, আর আসব না। আমি অনাথ-কাগাল লোক, কোথায় 
পাব অত ভোজনের পারিপাটা । নিক্তের পেট চলে না, এখন আবার আঁতাঁথ খাওয়াই | 


৯০৬ 


তাও, যে আঁতাঁথ দুয়ারে এসে দাঁড়ায় না, দূর থেকে বসে হুকুম দেয়। দরকার 
নেই অমন আদিখ্যেতায়। ধিকল্তু কি হল অঘোরমাঁণর, কদিন যেতে না যেতেই 
চচ্চাড় রে'ধে হাজির হল দক্ষিণেশবরে। 

'দাও, দাও, কী এনেছ বাটিতে করে? লাউশাক না সজনেখাড়া 2, হাত বাঁড়য়ে 
বাঁটটা টেনে নিল রামকৃষ্ণ । কোনোরকম ভূমিকা না করে খেতে লাগল রাঁসিয়ে- 
রাঁসয়ে। বললে, 'আহা, কা রান্না! সুধা! সুধা! 

অঘোরমাঁণর চোখে জল এল। কী এমন রে*ধেছি, সাধু একেবারে স্বাদে-গন্ধে 
গদগদ হয়ে উঠেছে। কী করুণা এই সাধুর! দরিদ্র বলে উপেক্ষা করল না, সাধারণ 
বাঞ্জনে কী অসাধারণ ব্যঞ্জনা পেল না জানি। এমন একাঁট মশলা এসে মিশেছে যা 
বাজারে কেনা যায় না, সোঁট হূদয়-রসের পাঁচফোড়ন । ভান্ত-প্রণীতির সম্বরা। 
যতই খায় ততই শুধু খাই-খাই। এটা আনো ওটা আনো। এটা রাঁধো ওটা রাঁধো। 
আর কোনো প্রসঙ্গ নেই, শুধু ভোজনাবলাস! শুধু নোলার শকশকানি। অনেক 
সাধু দেখোছ জীবনে কিন্তু এমন পেটুক সাধু দোখনি! 

এ তুমি আমাকে কোথায় এনে ফেললে! গোপালের কাছে মনে-মনে কাঁদে 
অঘোরমাঁণ। এমন সাধুর কাছে আনলে যার খাওয়া ছাড়া আর কথা নেই। ধর্ম- 
কর্মের ধার ধারে না, যেন খাওয়াই পরমার্থ। এত আম খাওয়াই কি করে? আমার 
ভাঁড়ার কি অফ;রল্ত ? 

রাত তিনটের সময় জপে বসেছে অঘোরমণি। জপ সেরে প্রাণায়াম শুরু করেছে, 
কে একজন তার পাশে এসে বসল । গা ছমছমিয়ে উঠল অন্ধকারে । কে, কে তুমি ? 
চমকে চোখ চেয়ে দেখল- একি, এ যে সেই দক্ষিণেশ্বরের সাধু । ডান হাত মুঠ 
করে ধরা, যেমনাট দেখেছে দক্ষিণেশবরে, আর মুখে সেই মধুর মৃদুল হাঁস। এত 
রাতে এল 'কি করে এখানে ? অন্ধকারে পথ চিনে-চনে ? 

আশ্চর্য একটা সাহস হল অঘোরমাঁণর। নিজের বাঁ হাত বাঁড়য়ে ধরল রামকৃফের 
বাঁ হাত। ম্হূর্তে ঘটে গেল অভাবনীয় । পাশে বসে আর সেই প্রৌঢ় রামকৃষ্ণ 
নেই, তার বদলে একটি দশ মাসের শিশু । নধর নবনীতকোমল। স্নেহদ্রব 
নবজলধর। একি, এ যে সাত্যকার গোপাল! হামা দিয়ে একেবারে বুকের কাছে 
চলে এল দেখাঁছ। হাত তুলে মুখের 'দকে তাকিয়ে বলছে, 'মা গো, ননী দে।' 

এ কি কান্ড! অঘোরমাঁণ আকুলকণ্ঠে কেদে উঠল : 'বাবা, আম কাঙালিনী চির- 
দুঁখনী। ননী কোথা পাব? আমি খুদ খাই পাতা কুড়ুই ।' 

সেকথা শুনে নিবৃত্ত হবার ছেলে নয় গোপাল। অঘোরমাঁণর আঁচল টানে, হাত 
থেকে মালা কেড়ে নেয়। বলে, 'ও-সব আমি শুন না। মা হয়োছস কেন তবে 2 
খেতে দাব কি না বল-_”' 

কে থেকে নারকেল-নাড় বের করে অঘোরমণি। ছোট হাতখানি ভরে নাড়ু দেয়। 
বলে, 'বাবা গোপাল, তোমাকে এ বাস জিনিস দিতে বুক ফেটে যাচ্ছে__' 

তার আগে যে খিদেয় আমার পেট চুপসে যাচ্ছে। বাঁস নাড়ু, বাসি নাড়ুই সই॥ 
সল্তানাবরহে যে মা উপবাসণ, তার সাত স্নেহ কি কখনো বাস হয়? 

২০২ 


মূখ ভরে খেতে লাগল গোপাল। উপভোগের আনন্দে চোখের পাতা নাচতে লাগল। 
কিন্তু খেয়েই কি সে শান্ত হবেঃ না কি সে শান্ত হবার মত ছেলে? ঘরময় 
ছুটোছাট করে বেড়াতে লাগল। কখনো বা অঘোরমণির কোলে, কখনো বা কাঁধে 
চেপে বসতে লাগল । জপ-তপ ঘুচে গেল অঘোরমাঁণর। 

সকাল হলেই ছু্টল' দক্ষিণে্বরের দিকে । ছুটল প্রায় পাালনীর মত। অগোছাল 
চুল, অসামাল বেশবাস। বুকের উপর দুবাহুর মধ্যে কখন উঠে এসেছে গোপাল। 
তার রাঙা পা দুখানি টুকটুক করছে বুকের উপর। 

গোপাল! গোপাল! বলতে-বলতে রামকৃষ্ণের ঘরের মধ্যে ডুকে পড়ল অঘোরমণি। 
কোনো দিকে ভক্ষেপ নেই, রামকৃষ্ণের পাশ ঘে*ষে বসে পড়ল। আর, এরই জন্য 
যেন অপেক্ষা করছিল রামকৃষ্ণ। ভাবাবেশে অঘোরমাণর কোলে চড়ে বসল। 

যে দেখল সেই অবাক। বাষাট্র বছরের বাঁড়র কোলে আটচল্লিশ বছরের প্রো 
সন্তান! যে ঠাকুর স্নীজাতির ছোঁয়া সহ্য করতে পারেন না তাঁর এ কেমনতরো 
ব্যবহার! কেমনতরো তা কে বোঝে! একবার মা হয়ে কোলে নিয়োছিল ছেলেকে, 
রাখালকে, এবার ছেলে হয়ে কোলে বসলো মা'র! 

ক্ষীর-সর খাইয়ে দিতে লাগল অঘোরমাঁণ। খাইয়ে দিচ্ছ তো কাঁদছ কেন? অন্তরের 
স্নেহধারা নয়নের অশ্রুধারা হয়ে বেরুচ্ছে । আম নন্দরান-তুঁমি নন্দদুলাল। তুমি 
গোপাল আর আম গোপালের মা- 

ভাব সংবরণ করে সরে বসল রামকুষ্ণ। কিন্তু গোপালের মা'র আর ভাব থামে না। 
ছেলে সরে বসে, 'িন্তু মা'র স্নেহভাবের কি ইতি আছে? সে ভালোবাসায় কি 
ভাঁটা পড়ে ? সেখানে শুধু জোয়ারের জল। শুধু ঢেউয়ের পর ঢেউ । তাই ঘরময় 
নাচতে লাগল অঘোরমণি। আর গাইতে লাগল, 'ব্রহমা নাচে বিফ নাচে আর 
নাচে শিব। 

“দেখ দেখ আনন্দে ভরে গেছে । গোপাললোকে চলে গেছে গোপালের মা।' 
বললে রামকৃফ। 

'এই যে গোপাল আমার কোলে, এই যে আবার তোমার ভেতর-' নৃভোর আর 
বিরাম নেই অঘোরমণির : “আয়রে গোপাল বোরয়ে আয়, আয়রে আমার কঠিন 
কোলে-. 

এবার ছেলের হাতে কিছ খাও গোপালের মা। ছেলের ভালোবাসার কিছ স্বাদ 
নাও। নিজের হাতে খাইয়ে দিল রামকৃষ্ণ । বূকে হাহ বলয়ে ভাবভূমি থেকে নিয়ে 
এল বাদ্তবভূমিতে। 

'বড় দুঃখে দিন কেটেছে বাবা। কোথায় ছিলি তুই এতাঁদন ? টেকো ঘুরিয়ে স্‌তো 
কেটে দিন কেটেছে । আজ বুঝি তোর দুখিনী মায়ের কথা মনে পড়লো ? তাই 
এত আদর করছিস মাকে? বল্‌. ঘখন একবার তোকে কোলে পেলাম, আর তুই 
যাব না কোল ছেড়ে 

রামকৃষ্ণ এখন নিজেই রামলালা। 


০০৩ 


কামারহাটিতে। কিন্তু যখনই পথে নেমেছে, গোপাল কখন ছুটে এসে 'দাব্য কোলে 
চড়ে বসল। তা বসেছিস বোস, বুকে করে নিয়ে যাচ্ছি বাঁড়। কিন্তু বাড়ি এসে 
এ তুই কী রঙ্গ শদরু করে 'দাল? এ কি, আমাকে আজ তুই জপ করতে 'দাবনে 
দুষ্টু ছেলে? বেশ, তাই, করব না জপ, মালার থলে গঞ্গাজলে ফেলে দেব। কিন্তু 
এখন তুই ক চাস বল তো? এই তো দেখাছস আমার বিছপনার 'ছার, শুকনো 
তন্তপোশের উপর ছেখ্ড়া মাদুর পাতা । নরম বিছানা-বাঁলশ আম পাব কোথায় : 
শুবি তো শো এই শুকনো কাঠে। শুয়েছে বটে কিন্তু গোপালের স্বাস্ত নেই। 
খতমূত করতে লেগেছে । দুধের শিশুকে কি তার মা এমন কাঠন বিছানায় শুতে 
দেয়? বালিশ নেই তোষক নেই, এ কা নিষ্ঠুরতা! 

বাবা, আজ এরকমই শোও, কাল কলকাতায় গিয়ে নরম বিছানা কারয়ে দেব।' 
বাঁ বাহুর বালিশে গোপালের মাথা রেখে ঘুম পাড়াল গোপালের মা। মাতৃঅঙ্গের 
স্নেহস্পর্শ পেয়েছে, আর চাই কি গোপালের! অঘোরে ঘুমিয়ে পড়ল। 
অঘোরমাণিকে দেখিয়ে রামকৃফ বললে, 'এ খোলটা কেবল হিতে ভরা। হরিময় 
শরীর।' মাথা থেকে পা পযন্ত হাত বুলিয়ে দিলে। শিশু যেমন মাকে আদর 
করে তেমান। পায়ে হাত দিয়েছে বলেও চমকাল না গোপালের মা। ছেলে যাঁদ 
পায়ে হাত দেয়, মা কি চমকায়, না, প্রসন্ন হয়ে আশশর্বাদ করে ? 

সোঁদন বাঁড় ফেরবার সময় মাকে অনেকগ্যল মিছারি দিলে রামকৃষ্ণ । ভভ্তরা যত 
এনেছিল উপহার, সমস্ত। গোপালের মা বললে, 'এত মিছার 'দয়ে কী হবে? 
তার চিবুক ধরে সোহাগ করে বললে রামকৃষ্ণ, “ওগো, আগে ছিলে গুড়, পরে হলে 
চান, এখন হয়েছ 'মছার। এখন 'মছাঁর খাও আর আনন্দ করো ।' 

গোপালের মা। 'না বিইয়ে কানায়ের মা।' সর্বজীবে গোপাল দেখে। ক্ষুধার্ত ভগবান 
মাতৃহ্দয়ের কাছে স্নেহের নবনী 'ভক্ষা করে ফিরছেন। 

আত্মীয়ের মধ্যে একটি শুধু বেড়াল। বেড়ালের মধ্যে ঠাকুর দেখেছেন কালণ, 
অঘোরমাণি দেখছে গোপাল। সেবার ঠাকুর তখন অগপ্রকট হয়েছেন, বোসপাড়া 
লেনের বাঁড়তে 'সস্টার 'নিবোদতার ঘাড়ে বেড়ালাট ঘুময়ে আছে। 'নিবোঁদতাও 
নার্বকার। এ কি দূর্দেব, কে একজন স্মন-ভন্ত তাড়িয়ে দিল বেড়ালটাকে। 
'আহাহা, কি করলি মা, কি করাল? গোপাল যে চলে গেল, চলে গেল-_' 

কিন্তু কোথায় সে যাবে? সে ষে বস্ত্ালের নিধি। সকাল হতেই চলেছে সে 
বাগানে মা'র সঙ্গে কাঠ কুড়োতে। পিঠে পড়ে মা'র রাম্না দেখতে । পুকুরে নেমে 
বাঁপাই ঝূড়তে। 

[দিন যায়। অঘোরমাণ বুড়ো হয়, কিন্তু গোপাল আর বড় হয় না। চিরকাল মা'র 
বুকের আঁচল ধরে টানে আর কাঁদে, 'মা খেতে দে, খিদে পেয়েছে- 

কোথায় তুমি খেতে দেবে, তা নয়, তুমিই খেতে চাও! ভ্রমর হয়ে ফিরছ গুঞ্জন 
করে, গুনগুন করে বলছ, কোথায় ফুলাঁট ফুটেছে, কে আমাকে একটু 
মধু দেবে! 


২০৪ 
51/৬1 71710 5 লিতি ছা